পরপর দু’টি গুলির শব্দ হয়। গুলির শব্দ শুনেই বোঝা যায়, শত্রুরা খুব কাছেই অবস্থান করছে। থাই কাঁচের জানলা থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ওমরের দিকে তাকায় সে। ওমর মেঝেতে চুপচাপ শুয়ে আছে। যে কোন কঠিন অবস্থাতেও মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে সে। তার মাথার কাছে একটি বন্দুক ও একটি গুলির বাক্স। সে একটা র্দীঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘কিছু একটা করা দরকার?’
ওমর ডান হাতের মধ্যের আঙ্গুল দিয়ে ধুলো জমে থাকা মেঝেতে একটা ফুটবল আকঁতে আকঁতে বলর, ‘আমাদের কিছু করার নেই ইসহাক ইবনে করিম। একটু পর আমরা সবাই মারা যাবো।’
ইসহাক ইবনে করিম মুচকি হাসে। উপুর হয়ে বসে নিজের বন্দুকে হাত বুলায় তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত পায়চারী করে। তারও অনেক পরে থাই কাঁচের জানালা একটু ফাঁক করে বাইরে তাকায়। খালিদ শেখ মুহাম্মদের লাশ তার মুদি দোকানের সামনে পড়া আছে। লাশের এক পাশে একটা কুকুর জিহবা বের করে হাঁপাচ্ছে। আজ সূর্য ওঠার আগে গাজার উত্তর পূর্বাঞ্চলীর শহর বেদ হানুনের উপর দিয়ে প্রচন্ড একটি ঝড় বয়ে গেছে। মুহূর্তে বেশ কিছু তাজা প্রাণ ঝরে যায়। মানুষের হাকডাক, চিৎকার, চেঁচামেচি আহাজারিতে ভারি হয়ে আসে ভোরের বাতাস। হঠাৎ করে ইসরাইলী সেনাবাহিনীর প্রায় চল্লিশটি ট্যাংক ও সজোঁয়া যান, কয়েকশ পদাতিক সৈন্য, তিনটি অ্যাপাচে হেলিকপ্টার গানশিপ, দুটি বুলডোজার, জিপ ও বেশ কয়েকটি বাস নিয়ে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা হামলা চালায় খালিদ মুহম্মদের বাড়িতে। বাড়িতে ঢুকেই তারা তাঁকে হত্যা করে। তারপর লাশ টেনে এনে রাস্তার উপর ফেলে রাখে। তাঁর যুবক দু’ ছেলেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। তাঁর স্ত্রী- কন্যাদের আহাজারিতে ঘুমন্ত পাড়া জেগে ওঠে। খালিদ শেখ মুহম্মদের বাড়িসহ আরও বেশ কিছু বাড়ি গুড়িয়ে দেয় তারা। এ সময় অবশ্য ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। একটানা অনেক্ষন ধরে যুদ্ধ চলে। শত্রু পক্ষের দু’জন লোক মারা যায়। আর তাদের নয়জন লোকজন শহীদ হয়।
ওমর মেঝেতে উঠে বসে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘নাহিয়ান আসছে না কেন? ও কী তাহলে…।’
ওমরের কথা শেষ না হতেই বলল, ‘না-না-না। ও আসবে। ওর মতো এমন সাহসী ছেলে আমি কখনও দেখিনি।
ওমর হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘সাহস হবে না? এক বছর আগে ওরা তাদের চার তলা বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়। সেদিন ওর বাবা মা দু’বোন চাপা পড়ে মারা যায়। নাহিয়ান সেদিন বাসায় ছিল না। বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে নানা-নানীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তা না হলে সেদিন সেও মারা যেতো। সেই থেকে সে অন্য রকম হয়ে যায়। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, এ ওর কাছ থেকে খাবার চেয়ে খায়। তাদের গুঁড়িয়ে দেয়া বাড়িটির ওপর চুপচাপ বসে থাকে। স্কুলেও যায় না সে আর।’
আজ আকাশ স্বচ্ছ। টানা কয়েক দিন কুয়াশা থাকার পর আজ সকাল থেকেই রোদ্র উঠেছে। থাই কাচেঁর জানালার ঐ সামান্য ফাঁক দিয়েই চমৎকার ফুরফুরে বাতাস ঢুকছে ঘরে। ইসহাক ইবনে করিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘একদিন বাবা আর আমি বাজার থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি গলির মোড়ে দু’টো ট্যাংক। পাড়ায় বেশ কিছু ছোট ছোট ছেলে সেগুলো লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ছে। সেদিনই যে এ দৃশ্য প্রথম দেখি তা না। এ রকম আরও অনেকবার দেখেছি। হঠাৎ কোত্থেকে যেন বেশ কয়েকটি সজোঁয়া যান ছুটে আসে। আকস্মিক গুলি গুলি চালায় তারা। বাবার বুকে অনেকগুলো গুলি লাগে। কয়েক সেকেন্ডর ভেতরেই তিনি মারা যান। আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। কেন গুলি করলো তারা? ঠিক বুঝতে পারলাম না। পরে খবরে শুনলাম, তারা বলছে ট্যাংক দু’টো আমাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। তাই আকস্মিক হামলা করে বসে।’ ইসহাক ইবনে করিমের দু’চোখ জলে ভরে ওঠে।
অনেকক্ষন পার হয়ে যায়। ইসহাক ইবনে করিম গলির মাথার দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে কিছু সাংবাদিক জড়ো হয়েছে। শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকটি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন সৈন্য রাইফেলের ট্রিগারে হাত রেখে সর্তকতার সঙ্গে পায়চারী করছে। পুরো এলাকায় একটা থমথমে ভাব। আর একটা সংঘর্ষ যে হবে এটা নিশ্চিত । ওমর হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘আচ্ছা খালিদ চাচার কী অপরাধ ছিল?’
ইসহাক ঘাড় বাঁকিয়ে ওমরের দিকে এক নজর চেয়ে নিয়ে বলল, ‘ওদের সন্দেহ উনি একজন বিশিষ্ট হামাস সদস্য।’
‘আসলে কি তাই?’
‘ঠিক বলতে পারবো না। তবে হামাস সদস্য হওয়াটা দোষের কিছু না।’ ওমর তার বন্দুকটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। সে বলল, ‘এই বন্দুকটি আমার বাবার। গত বছর এক গভীর রাতে তারা আমাদের বাসায় হামলা করে। আমরাতো তাদের দেখে ভয়ে জড়োসড়ো। কিন্তু বাবা প্রচন্ড সাহস নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মূহুর্তে একজন শত্রুসেনা কত করেন। তারপর বাবার ওপর নেমে আসে অত্যাচার। কিন্তু আশ্চর্য কী জানো, বাবাকে তারা প্রাণে মারলো না। চোখ বেধেঁ নিয়ে গেল। আমার ধারণা আজও বেঁচে আছেন তিনি। আমি যখন ছোট ছিলাম। তখন বাবা রোজ রাতে আরব্য উপন্যাস থেকে একটা করে গল্প শুনাতেন। গল্প শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়তাম আমি। আমার কেন জানি মনে হয়, বাবা যেখানে থাক, যেমন থাক এতদিন আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।’ এসব বলতে বলতে এক সময় ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। ইসহাক ইবনে করিম অবাক হয়। গত নয় বছর তারা একই স্কুলেই পড়াশোনা করছে। ক্লাসের সব ছেলে ওমরকে ভয় করে। বয়সের তুলনায় সে একটু বেশি লম্বা হয়ে গেছে। তার স্বাস্থ্যও বেশ ভাল। এই প্রথম তাকে কাঁদতে দেখেছে ইসহাক ইবনে করিম তাই সে থাই কাঁচের জানালা টেনে বন্ধ করে ওমরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ একটা বিকট শ্বদ হয়। তাদের বিল্ডিংটা কেঁপে ওঠে। শব্দ শুনে দু’জনেই চমকে ওঠে । ওমর চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। ইসহাত ইবনে করিম জানালা সামান্য ফাঁক বরে বাইরে তাকায়। আরও বেশ কয়েকটি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান এসে ঢুকেছে গলিতে। ইসহাক ইবনে করিম বুক ধক করে ওঠে। সে ওমরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সর্বনাশ! ওরা তো সংখ্যায় অনেক। তবে পার্থক্য হল আমাদের ভারি কোন অস্ত্র নেই।’
ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে ইসহাক ইবনে করিম। মেঝে থেকে বন্দুকটা তুলে নিয়ে ব্যস্তভাবে ঘরের এ মাথা থেকে ওমাথা পায়চারী করে সে। আজ সকাল থেকে এ ঘরে আছে। এটা ওমরদের বাড়ি। এখান থেকে পুরো গলি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। শুধু গলি না মূল সড়কের অনেকখানিও দেখা যায়। শত্রু সৈন্যরা পুরো এলাকা অবরোধ করে রেখেছে। আজ একটা ভয়াবহ সংঘর্ষ হবে। এ সময় দরজায় টোকা পড়ে। দু’জনেই চমকে ওঠে। ইসরাইলী সৈন্য নাতো। ইসহাক ইবনে করিম বন্দুক তুলে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়। তারপর বন্ধুকে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে দরজায় কান পেতে জিজ্ঞেস করে, ‘কে?’ দরজার ওপাশ থেকে নিচু গলায় কেউ একজন বলল, ‘আমি,আমি নাহিয়ান।’ ইসহাক ইবনে করিম একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘নাহিয়ান!’ ‘হুঁ। দরজা খুলে দাও।’ ইসহাক ইবনে করিম দরজা খুলে এক পাশে সরে দাঁড়ায়। নাহিয়ান ঘরে ঢোকে, তার হাতে একটা চটের থলে। ওমর তাকে দেখে খুশি হয়। এবং দ্রুত ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে সে চেঁচিয়ে ওঠে দূরে সরে যায় এবং বলে,‘একটু পরে জড়িয়ে ধরো একটু পরে…।’
নাহিয়ানের কথা শুনে থমকে দাঁড়ায় ওমর। নাহিয়ান চটের থলেটা খুব সাবধানে মেঝেতে রাখে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের ওপর হামলা করা হয়েছে। ইসহাক ইবনে করিম কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, তোমার নানা- নানীর কিছু হয়নিতো?’ নাহিয়ান চুপ করে থাকে। এভাবে অনেকক্ষন কেঁটে যায়। ওমর তার কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, কি হল, কথা বলছো না কেন?’
নাহিয়ান নিচু গলায় বলল, ‘তারা আর এখানে থাকে না। অনেক খুঁজলাম তাদের। অনেককে তাদের কথা জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু কেউ তাদের খোঁজ দিতে পারল না। তাই আসতে একটু দেরি হয়েছে। হয়তো- হয়তো আজকের পর আর তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে না।’
ইসহাক ইবনে করিম চমকে উঠে বললো, কেন? তুমি আবার কোথায় যাবে?’
ওমর বলল, ‘আমাদের কাছে কিছু লুকাচ্ছো?’ নাহিয়ান ওমরের প্রশ্নের কোন জবাব দিল না। সে উত্তর পাশের দেয়ালের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে। দেয়ালে একটা মস্ত বড় ছবি টাঙ্গানো। ছবিটি ওমরের বাবার! নাহিয়ান কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলল, আজ বাবা মা আর দু’বোনে কথা খুব মনে পড়ছে।’ এ সময় বাইরে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। গোলাগুলির শব্দ শুনে তারা তিনজনই চমকে ওঠে। ইসহাক ইবনে করিম জানালার কাছে ছুটে গিয়ে পর্দা সরিয়ে বাইরে দিকে তাকায়। ইসরাইলী সৈন্যরা এদিক- ওদিক ছুটাছুটি করছে। নাহিয়ান বলল, ‘খুব সম্ভবতঃ পাড়ার বড় ভাইয়ারা তাদের ওপর হামলা করেছে।’
ওমর উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চায়, ‘এখন আমরা কি করবো?’
বাইরে প্রচন্ড গোলাগুলি চলছে। একটানা স্টেনগানের ঠা-ঠা শব্দে ভাড়ি হয়ে উঠেছে বেইত হানুনের বাতাস। বেশ কয়েকটি বিল্ডিংয়ের আড়াল থেকে থেমে বড়রাও গুলি চালাচ্ছে। কিন্তু কতোক্ষণ গুলি চালাবে তারা? তারা কি শত্রু সেনাদের ওসব আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সাথে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবে? নাহিয়ান এবং ওমরের কাছ থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে মনে মনে অনেক কথাই ভাবে ইসহাক ইবনে করিম। নাহিয়ান নিচু গলায় বলল, ‘যদি কখনও আমার নানা – নানীর সাথে দেখা হয় তাহলে বলবে, আমি ভালো আছি। আমার জন্য যেন কখনও চিন্তা না করে।’
ওমর কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, তুমি কোথায়ও যাচ্ছো নাকি?
‘এতো কথা বলার সময় নাই।’ সে তার চটের থলে খুলে দু’টো কাপড়ের থলে ছুড়ে মারে ইসহাক ইবনে করিম ও ওমরের দিকে। দু’জনই খুব অবাক হয়ে থলে দুটি খোলে। থলে ভর্থি বন্দুকের গুলি। নাহিয়ান বলল, তোমরা তালহা জুবাইয়ের ভাইয়ের ওয়ালের পাশ থেকে হামলা করবে। একটানা গুলি চালাবে না, কারণ গুলির সংখ্যা সীমিত।’
ইসহাক ইবনে করিম উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায়, তুমি কি আমাদের সঙ্গে যোগ দিবে না?
‘না, এই মুহুর্তে তোমরা দু’জনেই যুদ্ধ করবে। আমি সময় হলে যোগ দেবো। যাও, যা বলছি তাই কর।
ওমরদের বাড়ির পাশে হচ্ছে তালহা জুবাইয়েরদের বাড়ি। লাল টালির ছাউনির সুন্দর একতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে সুন্দর একটা বাগান। যতেœর অভাবে গাছগুলো মরতে বসেছে প্রায়। গত কয়েক মাস হল বাড়িটি খালি। তালহা জুবাইযের নিরুদ্দেশ। আর স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি থাকে। ওমর ও ইসহাক ইবনে করিম বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে ঢুকে সামনের ওয়ালের পাশে এসে দাঁড়ায়। থেকে থেকে গুলির শব্দ শুনা যায়। সামনের গেইট বন্ধ। গেইট থেকে কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে দু’জন একই সঙ্গে মাথা তুলে সামনের দিকে তাকায়। মাত্র একশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন শত্রু সৈন্য। ইসহাক ইবনে করিম বন্দুকটা তাক করে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে লক্ষ্য ঠিক করে। কয়েক সেকেন্ড পর ট্রিগার টিপ দেয়। গুলি গিয়ে লাগে একজন শত্রু সেনার ঘাড়ের নিচে। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়ে সে। বাকি সৈন্যরা চারদিকে এলোমেলো গুলি ছুড়ে। এদিকে লক্ষ্য করে ট্যাঙ্কের গোলা নিক্ষেপ করা হয়। তালহা জুবাইয়ের একতলা বাড়ির ওপর দিয়ে ট্যাঙ্কের গোলা চলে যায় অনেক দূরে। ইসহাক ইবনে করিম ও ওমর মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে পড়ে। দু’জনের বুকই ধড়ফড় করে। ওমর কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, তোমর লক্ষ এতো ভাল জানতাম না।’
ইসহাক ইবনে করিম প্রসঙ্গ একটু গুড়িয়ে ভলল, আচ্ছা তোমার পুরো নাম কী?
এসময় তার এরকম প্রশ্ন শুনে ওমর চোখ দু’টো কপালে তুলে নিচু গরায় বলল, ‘হঠাৎ পুরো নাম জিজ্ঞেস করছো কেন?
ইসহাক ইবনে করিম কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল, আমাদের এখান থেকে সটকে পড়া দরকার। তা না হলে কিছুক্ষনের ভেতর মারা পরবো দু’জন।
‘তা ঠিক। চল ওঠা যাক।’
দু’জন ওঠে দাড়ায়। এবং সামনে তাকাতেই দেখে পিছনের গেইট দিয়ে চারজন শত্রু সৈন্য বাড়িতে ঢুকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। একজন সৈন্য হুঙ্কার দিয়ে বলল, ‘তোমরাই তাহলে গুলি চালিয়েছে? এবার তার পরিণতি দেখ।’
হঠাৎ কোত্থেকে যেন নাহিয়ান এসে হাজির হয়। শত্রু সৈন্যদের পিছনে এস দাঁড়ায় সে। ইসহাক ইবনে করিম আশ্চর্য হয়ে বলল, নাহিয়ান তুমি!
শত্রু সৈন্যরা নাহিয়ানকে ঘিরে ধরে। আর তখনই প্রচন্ড একটা বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের শব্দে ইসহাক ইবনে করিম ও ওমর হতবাক হয়ে যায়। মুহূর্তে পাঁচটি লাশ পড়ে থাকতে দেখে তারা। নাহিয়ানের দেহ পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ইসহাক ইবনে করিম ওমরের একটা হাত ধরে বলল, ‘চল পালিয়ে যাই।’
দু’জন দৌঁড়তে থাকে। তালহা জুবাইয়েরের বাড়ির পিছনের গেইট দিয়ে দু’জন বের হবার পর মুহূর্তেই শত্রু সৈন্যরা গোলা মেরে পুরো বাড়ি গুড়িয়ে দেয়। প্রাণপন দৌড়াতে দৌড়াতে ইসহাক ইবনে করিম বলল, ‘এখন বুঝলাম নাহিয়ান কেন বারবার উদ্ভট কথা বলছিল।’
দুই.
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। শত্রু সৈন্যরা তাদের সাজোয়া যান, ট্যাংকবহর ও পদাতিক সৈন্য নিয়ে চলে যায়। রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। এ কয়েক ঘন্টা যুদ্ধে বেশ কিছু ফিলিস্তিনি মারা যায়। লাশ নিয়ে মিছিল করে বেইতহানুন বাসী। সেই মিছিলে যোগ দেয় ওমর ও ইসহাক ইবনে করিম। বন্দুক উঁচিয়ে জোড়ালো কন্ঠে শ্লোগান দেয় ওমর। কিন্তু ইসহাক ইবনে করিম চুপচাপ হাঁটে। তার বুকটা খাঁ-খাঁ করছে। নাহিয়ানকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে। তার চোখের সামনে বোমার আঘাতে মুহূর্তে ছিন্নভন্ন হয়ে যায় নাহিয়ানের দেহ। এ দৃশ্য কি কখনও ভোলা যাবে? তার অন্যমনস্কতা লক্ষ করে ওমর তার কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দেয়। তখন ইসহাক ইবনে করিম দৃঢ় কন্ঠে শ্লোগান দেয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, মাগরিবের আযান ভেসে আসে,আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। মিছিলের শ্লোগানে ও সেই উচ্চারণ, আল্লাহু আকবার-আল্লাহু আকবার।