মাস কয়েক পরের ঘটনা। সেদিন ভার্সিটিতে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে মাহফিলের ব্যবস্থা হয়েছে। এ রকম ধর্মীয় সভায় সেলিম কখনও যায়নি। কারণ সেও বাপের মত ধর্মকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু আজ সে এসেছে। তার মনে হয়েছে মেয়েটা যখন বোরখা পরে তখন নিশ্চয় সেও থাকবে। তাই সে কর্মীদের একজন হয়ে কাজ-কর্মও দেখাশোনা করছে। সভা শেষে গজুল ও স্বরচিত কবিতা গাওয়ার প্রোগ্রাম করা হয়েছে। সেলিমকে সবাই ধরে বসল, তোকেও একটা স্বরচিত কবিতা আবৃতি করতে হবে। প্রথমে অমত করলেও সে এটাই কামনা করছিল। সেই জন্য একটা কবিতাও লিখে পকেটে করে এনেছে। সকলের শেষে সেলিম মাইকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল, অনেক মেয়ের মধ্যে দশ-বারোজন বোরখাপরা মেয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের মুখ নেকাব দিয়ে ঢাকা। তাদের দিকে চেয়ে নিরাশ হয়ে কবিতাটি আবৃতি করল
প্রিয়তমা, ও আমার ভালবাসার সৌগন্ধময় প্রিয়তমা,
বড় আশা নিয়ে এসেছি এখানে, তুমি আছ কিনা জানি না।
তবু আজ আমি শোনাব তোমায় আমার মর্মবেদনা,
ও বাতাস পৌঁছে দিও তার কানে আমার কামনা ও বাসনা।
ভুলিতে পারিনি কভু কিছুতেই সেই দুর্লভ মুহূর্তের কথা,
যে ক্ষণে হয়েছিল তোমার রূপের মিলন আর আমার ভালবাসা।
মনে আছে আমার জীবনের সেই প্রথম প্রহর বেলায়,
তোমার চোখের মদিরা পান করেছিলাম আমার শিরা উপশিরায়।
এক ধরনের পুলকে পুলকিত হয়েছিল তখন আমার মন,
তোমার কমল হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠেছিলাম যখন।
তোমার ভ্রমর কালো নয়ন দুটির মায়াবি দৃষ্টিতে,
পাগল করে রেখেছে আমার তণু ও মনেতে।
সেদিনের সেই দৈব ঘটনায় কিছু কি হয়নি তোমার?
এদিকে বসরার গোলাপের গন্ধে ভরে গেছে হৃদয় আমার।
খুঁজেছি তোমায় পথে-প্রান্তরে, অগণিত অলকার অলিন্দে ও বারান্দায়,
প্রত্যেক অবগুণ্ঠিতা নারীর পানে চেয়ে দেখেছি তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায়।
অবশেষে ক্লান্ত চরণে শেষ আশা নিয়ে দাঁড়িয়েছি আজ এইখানে,
আল্লাহগো তুমি দেখা করে দিও আমার প্রেয়সির সনে।
ওগো প্রিয়তমা, সত্যিই যদি এসে থাক এই শুভ মাহফিলে,
তা হলে পিপাসা আমার মিটিয়ে দিও সব শেষে দেখা দিয়ে।
সভা শেষ হওয়ার পর সেলিম সকলের অলক্ষ্যে মনে অনেক আশা নিয়ে মেয়েটিকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল।
লাইলী ওর করিতা শুনে শত চেষ্টা করেও নিজেকে সংযত রাখতে পারল না, ধীরে ধীরে বারান্দার একটা থামের আড়ালে এসে দাঁড়াল।
সেলিম একটা বোরখা পরা মেয়েকে থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার কাছে এসে বলল, যদি কিছু মনে না করেন তবে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
লাইলী মাথা কাত করে সম্মতি জানাল।
সেলিম বলল, আপনি যদি আমার কবিতা শুনে এখানে এসে থাকেন, তা হলে বুঝবো আমি যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, সে আপনি। মেয়েটিকে চুপ করে থাকতে দেখে সেলিম আবার বলল, আমার অনুমান যদি সত্যি হয়, তা হলে দয়া করে মুখের নেকাবটা সরিয়ে আমার মনস্কামনা পূরণ করুন। আশা করি, আমাকে বিমুখ করবেন না।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে লাইলী মুখের নেকাব উঠিয়ে সেলিমের মুখের দিকে তাকিয়ে লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে নিল?
ঠিক সেই সময় সেলিমের বন্ধু রেজাউল তাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, কিরে, এখানে কি করছিস? এদিকে আমি তোকে খুঁজে খুঁজে পেরেশান। আজকে আমাদের বাড়িতে ব্যাটমিন্টন খেলতে যাবি বলেছিলি না?
রেজাউলকে দেখে লাইলী নেকাবটা মুখের উপর ঢেকে দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে গিয়ে গেটে অপেক্ষারত রিকশায় উঠে বসল।
লাইলীর চলে যাওয়ার দিকে সেলিমকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রেজাউল বলল, ওর দিকে চেয়ে আছিস কেন? কেরে মেয়েটা? আমাকে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি করে চলে গেল।
সেলিম বলল, দিলি তো সব মাটি করে। এইতো সেই মেয়ে, যার সঙ্গে সেদিন এ্যাকসিডেন্ট করে ঘায়েল হয়ে আছি।
তাই বল, তাইতো তোর কবিতা শুনে মনে যেন কেমন সন্দেহ হয়েছিল। তা মেয়েটার নাম কি রে, কিসে পড়ে? বাড়ি কোথায়?
থাম থাম, অত প্রশ্ন করার দরকার নেই, ঐ সবের কিছুই জানি না। ওর সঙ্গে দেখা হতে না হতেই তুই এসে পড়লি, আর ও পালিয়ে গেল। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ভাগ্যচক্রে যদিও আজ দেখা পেলাম, কিন্তু ভাগ্যের কি নিমর্ম পরিহাস, পেয়েও আবার হারিয়ে ফেললাম।
রেজাউল বলল, তুই মেয়েটার মধ্যে কি এমন দেখেছিস? যার জন্য এত পাগলপনা হয়ে গেলি। ওর থেকে সুন্দরী কত মেয়ে তোর পিছু ঘুরঘুর করে, সে কথা আমি আর তোকে কি বলব, তুই নিজেই তো জানিস। আর দেখে নিস, ঐ মেয়েটাও কয়েকদিন পর তোর পিছু পিছু ঘুরবে একটু ভালবাসার পেসাদ পাওয়ার জন্য। তা ছাড়া ওর পোশাক দেখে মনে হল গরীব ঘরের মেয়ে। এখন আমাদের বাড়ি চলতো।
সেলিম বলল, হতে পারে ও গরিব ঘরের মেয়ে; কিন্তু সুন্দরী মেয়েতো জীবনে কত দেখলাম বন্ধু, সুন্দর তা দিয়ে মেয়েদের বিচার করা বোকামী। ওকে যদি তুই দেখতিস, তা হলে এসব কথা বলতিস না। এরকম মেয়েরা কোনদিন ছেলেদের পিছনে ঘুরঘুর করে না বরং ছেলেরাই ওদের পিছনে ঘুরঘুর করে। আজ তুই যা, আমি অন্য একদিন তোদের বাড়ি যাব বলে সেলিম গেটের কাছে এসে একটা রিকশায় উঠে বলল, একটু আগে বোরখা পরা একটা মেয়েকে নিয়ে যে রিকশাটা গেল তাকে ফলো কর। ততক্ষণে লাইলীর রিকশা অনেক দূরে চলে গেছে। সেলিম রিকশায় করে ঘন্টাখানেক ধরে খুঁজাখুঁজি করেও তাকে পেল না। শেষে ভার্সিটিতে ফিরে এসে নিজের গাড়িতে করে বাড়ি ফিরল। এরপর থেকে বোরখা পরা মেয়ে দেখলে সেলিমের মন খারাপ হয়ে যায়। তখন বোরখার উপর তার ভীষণ রাগ হয়। ইচ্ছা করে বোরখাকে ছিঁড়ে ফেলে দিতে। এটার জন্যে সে তার প্রিয় মানষীকে খুঁজে পাচ্ছে না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, পরীক্ষাটা হয়ে যাক, তারপর যেমন করে হোক তাকে খুঁজে বের করবে।