ভাষার মাস।চলছে অমর একুশে বইমেলা। চেতনার মেলা। বাঙালি লেখকদের মিলনমেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য লেখকের বই। কিন্তু বেশিরভাগ লেখক তাদের বইয়ের নামকরণ নিয়ে একেবারেই সচেতন নয় বলে মনে হচ্ছে।

বর্তমান লেখকরা ‘বইয়ের প্রচ্ছদ’ দেখিয়ে পাঠকদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। পাঠকরাও এসব বই কিনে বাসায় নিয়ে পড়ে হতাশ হচ্ছে। কথায় আছে, ‘চকচক করলেই সোনা হয় না’। চাররঙের ঝকঝকে প্রচ্ছদ আছে ঠিকই কিন্তু বই পড়ে দুই-একটা লাইন থেকে পাঠক শিখবে, তাও নেই। এমন দৃশ্য দেখা যায় বেশিরভাগ নবীন লেখকের ক্ষেত্রে। তারা নিজেরাই জানে না যে, কী করতে বসছে! কেউকেউ সারা বছরের টিউশনের টাকা বাঁচিয়ে বই করছে,আবার কেউ চাকরির পয়সা দিয়ে করছে। যেভাবেই করুক, এটা একটা বয়সের দোষ!

প্রথম অবস্থায় নবীন লেখকরা বয়সের দোষে এমন কাণ্ড করে থাকে! কয়েকটা লেখা লিখেই প্রকাশনীর সঙ্গে চুক্তি করে বসে! নবীন লেখকদের উচিত হাতে প্রচুর সময় নিয়ে বই করা।

অনেক নবীন লেখকদের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখেছি ‘আলহামদুলিল্লাহ! আজ ১০০ কবিতার রচয়িতা হলাম’! আবার কেউ লিখে, লেখালেখির জগতে আজ আমার ডাবল সেঞ্চুরি! ২০০ কবিতার রচয়িতা হলাম, খুবই আনন্দ লাগছে, ওহে গড! তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। তারা একবার ভেবে দেখে না যে, এই ১০০ বা ২০০ কবিতার মধ্যে ১০-১৫ টি কবিতা হয়ে উঠেছে কিনা, বা কবিতার মতো কবিতা হয়ে উঠেছে কিনা! সবই লেখকদের অতি আবেগ!

লেখকরা মনের আবেগ ঢেলে লিখে, তাই বলে কবিতা সংখ্যা নির্ধারণ করে আবেগ ঢালবে এমনতো নয়। তাই নয় কি? তাদের উচিত লেখার সংখ্যা নির্ধারণ না করে এমন একটি কবিতা নির্মাণ করা, যে কবিতা জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে যায়, যে কবিতার মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করে। সুতরাং লেখকজীবনে লেখার সংখ্যা নির্ধারণ না করে মনযোগ দিয়ে লিখে যাওয়া উচিত। তাদের পাশাপাশি ছন্দ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করা উচিত। কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাসের বইতো পড়তে হবেই। তবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্যে নিজের পরিচর্যা করা উচিত।

অনেক লেখককে বলতে শুনেছি, ‘আমি কবি হতে আসিনি, মনের খোরাক মেটাতে টুকটাক লেখি’৷ যদি তাই হয় তবে নিজেদের কবি বলে দাবী করবে কেনো? সাহিত্য চর্চা মনের খোরাক মেটানোর ধান্দা নয়। সাহিত্য মানে সন্ন্যাস। সাধনা করতে হবে। প্রচুর সাধনা৷ একজন লেখক যতটুকু সাধনা করে ফল পান ততটুকুই। এর বেশি নয়।

এবার আসি আসল কথায়। অনেকেই বইয়ের নাম এমনভাবে ব্যবহার করেন যা অনেক পূরনো কিংবা আধুনিকতার সঙ্গে কোনো মিলই নেই। যেমন, অনুভূতির কাব্য, বেদনাময়ী কাব্য, চিঠির ভাষা, ভূতের কাব্য প্রভৃতি। এসব নাম শুনতে কি আপনার ভালো লাগে? এগুলোর মাঝে কি আপনি আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া পান? এমন নাম দেখে বইটা কেনার বা ভেতরের পাতা ওল্টানোর ইচ্ছে জাগবে? মোটেই না।

আর যদি এমন হতো, নিঃসঙ্গ পৃথিবী হাঁটে চোখের ওপর, ভূত যখন বিজ্ঞানী, ক্ষুধার্ত ধানের নামতা, মেডিটেশনগুচ্ছ, কান্নার নাম ইশ্বর, নাভীর নিকট মৃত্যু; তাহলে কেমন হতো? নামগুলো শুনতে ভালো লাগে না? অবশ্যই ভালো লাগার মতো।নামগুলা চোখে পড়লেই ভাবনা আসবে, নিঃসঙ্গ পৃথিবী চোখের ওপর কেমনে হাঁটে? ভাবায় এই শিরোনামগুলো। তখন পড়তে এবং জানতে তুমুল ইচ্ছে করবে। তদ্রূপ ধরুন ‘ভূত যখন বিজ্ঞানী‘ অবশ্যই শিশুদের মনে ভাবনা আসবে ভূত কিভাবে বিজ্ঞানী হবে? জানতে হবে, জানতে হলে পড়তে হবে। এসবের প্রচ্ছদ যেমনই হোক না কেন শিরোনামে আমরা সচেতন হলে পাঠক আমাদের বই পড়বেই পড়বে। তাই আসুন আমরা প্রচ্ছদের দিকে নজর না দিয়ে ভালো মানের লেখার পাশাপাশি আধুনিক শিরোনাম ব্যবহার করি।
জয় হোক সব লেখকের।