শীতল দহন

কথা সম্পর্কের কাটাকাটি চলে দিনরাত
আহত শ্রবণ লুটায় অব্যক্ত ভূমির চারপাশ
বাতাস-আগুন বহে ঘরকন্নার খাদ জুড়ে
দেয়ালে দেয়ালে ক্ষত মসির দাগ
গুমোট বাতাস প্রাণবায়ু আটকে বিষন্ন ধোঁয়া
জিহ্বায় জড়ানো লালারসে নিস্তেজ কথন
ব্যবচ্ছেদ রচিত দূরত্বে ঢুকে পড়ে শীতলতা
স্তব্ধ অরণ্য ভূমি গড়ি ইমারত জুড়ে
…………………………………………..

দূর লক্ষ্য

অসহ্য জ্যোৎস্নায় শুনি
দীর্ঘশ্বাস পতনের গভীর শব্দ
ক্ষয়ে যায় স্নেহ ভালোবাসা শ্রদ্ধা সম্পর্কের ধার
আমার হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে জ্বলছে নিভছে জোনাকি
বাস্তুপুকুর মজে যায় আর প্রাচীন আমগাছটাও জীর্ণ
ধস নামা কুঁড়ির বাঁধে চাঁদ ছায়ায় নিরন্তর হাঁটি

কোন দূরের লক্ষ্যে চলে যাই
…………………………………………..

দৃষ্টি জাল

দুচোখের এত বিস্ময় হারিয়ে যাই

একটা সম্মোহিত দৃষ্টি পথে হাঁটি
চোখের ভেতর আর এক অন্তর্লীন চোখ
তীক্ষ্ণ ফলার মতো ভেদ করে আসে
উপড়ে ফেলে ফুসফুস পালাতে পারি না
না তাকানো দৃষ্টি বেঁধে রাখে আগপাশ
ঘর্মাক্ত তীব্র নাসিকায় এ মায়ার শিকার
তবু কোথাও এক বিচ্ছুরিত আলো
ধাঁধানো চোখে বিন্দু সৌন্দর্যের জোয়ার
…………………………………………..

এক দৃষ্টিতে

জল ভরা জমি ঝোপঝাড়ের ফোকর গলে
সরু কাঞ্চন পথ ধরে এগোয়
পলাশ পুকুরের মোড় ঘুরতেই হারিয়ে যায়
আবার আবছায়ার মতো আমবাগানের ফাঁকে ফাঁকে
অদৃশ্য দৃষ্টি তবুও চলে শ্রাবণ মেঘের নিচে
গঞ্জের খাল পেরিয়ে বেনাবন আদর মাখায়
ঘর্মাক্ত পায়ে বসুধা কণা লেপে যায় স্নেহে
থামছে না এখনও পেরিয়ে যায় কোন সময়পথ

তারপর ডোবার ধারে উপড়ে পড়া জামগুঁড়ির বিশ্রাম
ভেজা মুখে ঠিকরে পড়ছে কমলা আলো
চালা ভাঙা পাশের কুঁড়ে ঘরে আটকে যায়
…………………………………………..

সুবাসিত

অর্ধেক হৃদয় রেখে এলাম শ্মশান পুকুরে
ন্যাড়া গাছ থেকে উড়ে গেল কাক
বিষন্নতা ছুঁয়ে না আর
মৃত পৃথিবী থেকে আমিও ফিরি সবুজ রেখায়
পড়ন্ত সূর্য ছড়ায় মুগ্ধ আবিরের হোলি
লাল ফড়িং কুনো ব্যাঙ খেলে বাতাস মুখ
কুঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বুড়ি মা
লাঠির ভারেও কোলে নাতি
কোথা থেকে জুঁইয়ের সৌরভ ভরে দিল চারদিক
…………………………………………..

অন্তঃ যাপন

চামড়ার ভাঁজ ঘড়ির কাঁটার মতো এগোয় বারোটায়
ফোকলা দাঁত হারায় সজীবতা পাঁজিপুঁথি গুটাতে গুটাতে
লড়াই শেষ হয় না তবু লাঠির তৃতীয় ভরে
এক জীবন্ত প্রাণ স্মৃতি ভারে কুঁজো কলসি হয়ে
অন্তঃসারশূন্য সাদা চুলের পথিক অনন্তকাল হাঁটে
আর ছোঁবে না গঞ্জের খাল কোলে নিয়ে পাট খেত
কুঁড়ির বাঁধ মধ্যরাতে শুয়ে থাকে একা দূরে নক্ষত্র
তালগাছের মাথায় নিশাচর শব্দে উড়ে না জোনাকি
ছায়া এসে ভিড় করে রুদ্ধ বাতাস গোপন অন্ধকারে
অনন্তের ডাক আসে ক্ষীণ সুদূর কন্ঠে
…………………………………………..

শেষ ঘন্টা

নীরব যাত্রায় শেষ ঘন্টার চলন
কত কথা ভিড় করে রুদ্ধ কন্ঠে
অধীর দাগে পোড়া চোখ দেখে নিতে চায়
যেন আজন্ম ঋণ-কথা ফুরাবে না আর
কন্ঠ-সুর বুক ভরা শ্বাসের মতো টেনে নিতে
এই তো শেষ ঝাপসা দৃষ্টি আকাশ ভরে
অবশ পা ক্লান্তি নিয়ে গুটায় পথ
পৃথিবীর মুক্ত হাওয়া জল মাটি সরে যায়
…………………………………………..

ছিন্নমূল

পূর্ব পশ্চিম ভাগ হয়ে
একটা দেয়াল বেড়ে উঠছে ক্রমশ
দিন ছোট হয়ে দূরত্ব বাড়ে হাতে রাখা হাতের
ঘরকন্নার ভিটেমাটি ধূসর রঙে চৌচির
অজানা শব্দের গুঞ্জন ঢুকে পড়ে হৃদয়ে
ধীরে ধীরে দূরে সরে নদী
সুদেষ্ণা ইঙ্গিত মিশে যায় ধুলোয়
তবু কোনো ঝড় আসে না ধ্বংসের

শুধু দীর্ঘ হতে হতে ছিন্নমূল হয় শ্বাস
…………………………………………..

ভাঙন রেখা

রংটা চটতে শুরু করেছে অনেক আগেই
তারপর খুলে পড়ছে একটা একটা অঙ্গ
আঙুল হাত পা কানের লতিকা
গোপন অঙ্গ ঝরে পড়তেই একটা পর্ব শেষ হল
থামে না তবু এ ভাঙন পাশ ফিরে শু’তেই
শ্বাস অঙ্গ মড়মড় শব্দে গুঁড়িয়ে গেলো
আর নাকের কাছে বিরাট এক গর্ত
শিরা ধমনি শুকিয়ে শুকিয়ে কালো সুতো
অবশ স্নায়ুতন্ত্র ছায়া বিলীন
শুধু হৃদয়টাই জীর্ণ হয়েও রয়ে গেছে
…………………………………………..

উত্তরণ

সর্পিল রাত শুয়ে আছে আমার ভেতর

আত্ম ছায়ার প্রতিধ্বনি সত্তা সমগ্রে বিশ্বাসে
ক্রমে মলিনতা লেপে যায় দেয়ালে দেয়ালে

বিশ্বাস কথার বাঁকে ঘূর্ণি সীমাহীন
তবু এই অন্ধকার বেঁচে থাকার উৎস খোঁজ

এক সবুজ পথের ইশারাই উত্তরণ