লেফট রাইট লেফট

ঐতিহাসিক ৩২। থুবড়ে থাকা ৬৭৭। ঝাঁঝরা ১৮ বুলেট।
৮/১৫-কে হেলিকপ্টার নিয়ে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে-
লেফট! রাইট! লেফট!

২৪২৫৬১ রিসিভার পড়ে আছে ফ্লোরে পাইপ…
…সিঁড়িতে চশমা। রাসেল কই? রাসেলের সাইকেল!
লেফট! রাইট! লেফট!

৫৭০’এ কুয়ার শীতল জলে সর্বশেষ স্নান, অলৌকিক লোবানে
রেড ক্রিসেন্টের রিলিফের কাপড়ে মোড়ানো ইতিহাস ৪৬৮২!
লেফট! রাইট! লেফট!

২০,২৩৯ দিনের অবসান ঘটিয়ে
মহামানব মাটির বিছানায়; বিছানা ভিজে যাচ্ছে রক্তে!
মন-কবরে চিরকাল জীবন্ত থাকবে- ১৭ মার্চ।
লেফট! রাইট! লেফট!

বাইগার পাড়ে আগরবাতি জ্বালিয়ে
ঝিঁঝিঁপোকা কাঁদে, কাঁদে সন্ধ্যা।
‘জলপাই রঙের সিপাহি অন্ধকারে’ অস্ত্রের উল্লাসে বিব্রত ৭ মার্চ।
লেফট! রাইট! লেফট!

৩০ শ্রাবণ। প্রবল বৃষ্টি; ভেসে যাচ্ছে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ,
ভাঙ্গা চশমার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে- ফণিমনসার সানগ্লাস, সানগ্লাস…..

লেফট! রাইট! লেফট!
……………………………………………

প্রতিবেশি

রেডিও থেকে খবর শোনা যাচ্ছে এবং
কয়েক জন তরুণ আর বয়স্ক লোক বেরিয়ে গেলো, পাশের বাড়ি থেকে
কলিং বেলের বাজনা বেজে উঠলো,
বৃষ্টিভাজার ঘ্রাণ, ডাল বাগারের সুবাস ছড়াচ্ছে, পাশের বাড়ি থেকে।

ঝুনা নারিকেল ঝরে পড়ার শব্দ আসছে-
কাপ-পিরিচের কথোপকথন পাচ্ছি, পাশের বাড়ি থেকে
গ্রামোফোনের রেকর্ড ছড়াচ্ছে অতুল প্রসাদের সুবাস,
জোছনা মাখা মিষ্টি ফুলের ঘ্রাণ মিশ্রিত বাতাস, পাশের বাড়ি থেকে।

ভাইবোনের লুডুর গুটি চালার আওয়াজ এবং
বিকেলে একটি সাইকেলের ঘন্টা বেজে উঠতো, পাশের বাড়ি থেকে
গায়ে হলুদের গন্ধ, বিয়ের গান বেজেতো-
বারান্দা থেকে পাইপের ধোঁয়া-গন্ধ আসতো, পাশের বাড়ি থেকে।

রাতে পুলিশ হানা দেয়ার নৈঃশব্দ শব্দদৃশ্য ভাসতো এবং
দু’টি কবুতর ফিরে আসতো আবার উড়ে যেতো, পাশের বাড়ি থেকে।
পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র খুঁজছে গোয়েন্দা
স্লোগান মুখর একটি মিছিল বেরিয়ে গেলো, পাশের বাড়ি থেকে।

৩০/৩, উমেশ দত্ত রোড থেকে এখন হাজার বত্রিশ সাবজেল। এই জেলে
একটা সবুজ প্যাচানো সিঁড়ি বেয়ে উঠছে দোতলায়, পাশের বাড়ি থেকে
ত্রিশে, একত্রিশে আমরা প্রতিবেশি। আমাদের জন্য
তরকারির বাটি, কুরবানীর মাংস, ইফতারি আসতো পাশের বাড়ি থেকে।

গাছের স্নিগ্ধ ছায়া ছড়িয়ে দিতো এবং
আগরতলার কিছু কথাবার্তা শোনা যেতো, পাশের বাডি থেকে
স্বপ্নের নকশি কাঁথা বুনা হচ্ছিলো, ইতিহাস তৈরি হচ্ছিলো, পাশের বাড়ি থেকে
একদিন এই বাড়িটি হয়ে গেলো আমাদের বাংলাদেশ!

এক শ্রাবণের বুলেট এবং বৃষ্টি, রক্ত এবং জল মিলেমিশে পাশের বাড়ি থেকে-
গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে গেলো ধানমন্ডির লেকে এবং আমাদের উঠোনে।
গুলিবিদ্ধ রবীন্দ্ররচনাবলী, গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত যন্ত্রণাকাতর কবুতর চক্কর খেয়ে
সেদিন পড়ছিলো বাংলাদেশের বারান্দায়!

আমাদের গৌরবগাথা এবং আমাদের কলঙ্কচিহ্ন দু’টো এই বাড়িতে।

এপ্রিল ০৫, ২০১৯। টরন্টো।
……………………………………………

একজন শেখ মুজিব

ক্যালিফোর্নিয়া,
কুইবেক,
স্কটল্যান্ড,
কাটালান,
কাশ্মির,
আরাকান,
বেলুচিস্থান একটি পৃথক পতাকা চায়।

কিন্তু তাদের শেখ মুজিব নেই।
……………………………………………

বাঙালির নৌকা

আমি, আমি পারি নি হত্যার সেই প্রতিশোধ নিতে
মধ্যরাতে গাঢ় হয়ে উঠি, ছুড়ে দেই থুতু-ঘৃণা।
ঘুম তো আসে না কিছুতেই আমি ঘুমুতে পারি না,
মৃত্যুর অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে জড়াই শীতে।।

যারা রাজাকার ছিল আজ ‘দেশপ্রেমিক’ তারাই
এখনো এখানে থামে নি কো ক্যু-কর্ম ও রক্তপাত
ইনিয়ে-বিনিয়ে দুঃখিনী মা অশ্রু ফেলে সারারাত
বৃষ্টির সোহাগে তুমি শুয়ে থাকো টুঙ্গিপাড়ায়।

জানি তুমি আর আসবে না, পদ্মার প্রিয় ইলিশ
দেখবে না নদী নৌকা; ঘাসে খুঁজবে না সে সজীব।
জীবনানন্দ; মাটি আর মানুষের মিলমিশ।

দেশের মানুষ নির্বিকার। গায়ে সরল বৌ কাঁদে,
তাদের হৃদয়ে রত্মাক্ষরে তুমি থাকবে মুজিব।
থুথুরে বৃদ্ধ আজো বলে, আমার প্রিয় নৌকা দে।

নান্দিনা, জামালপুর, ১৯৭৭
……………………………………………

তীর্থস্থানে শ্রদ্ধাঞ্জলি

রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ গুলিবিদ্ধ সিঁড়িতে চশমা
রক্তে ভেজা ধানমন্ডি, ছিন্নভিন্ন বত্রিশ নম্বর
ছিন্নভিন্ন ইতিহাস, বজ্রপাতে বিমূর্ত বাতাস,
বিমূর্ত রাত্রির মন, পাখিগুলো মৃত হরপ্পা।।

আমার স্নায়ুর মধ্যে হিম ঠান্ডা বরফের স্রোত
চোখের ভেতর ফ্রিজ যেন কোনো মৃত পাথরের
বিবর্ণ টুকরো জল, স্তব্ধ হাত-পা এবং পতাকা
বুকে নিঃশ্বাস সমূহ জমে থাকে শোকে শক্ত-শিলা।

কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা গ্রাস করে শরীর সর্বস্ব
স্মৃতি লুপ্ত হয়ে যাচ্ছি। স্থির দৃষ্টি, কষ্টে মুহ্যমান।
নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি, সংবিধান বিবস্ত্র, ধর্ষিতা ।

নিত্য ভোর হবে তবু জাগবে না ঘুমন্ত মুজিব
মুজিবের টুঙ্গিপাড়া বাঙালির আজ তীর্থস্থান।
তীর্থস্থানে শ্রদ্ধাঞ্জলি, সন্তানকে ক্ষমা করো পিতা।

টুঙ্গিপাড়া, ১৫ আগস্ট ১৯৯৩
……………………………………………

মুজিব

বায়ান্ন সালের ছ’বছরের ছোট; তবু আমার বুকে কোনো গুলির চিহ্ন, যেন বেঁচে আছি বরকতের বদলে। গায়ে আসাদের শার্ট অথচ ঊনসত্তরে আমি মিছিলে যাই নি। ষাট দশকে কেবল কিশোরে, বুঝি নি ছয় দফার মর্ম-মন। কখনো যাই নি কারাগারে, —তারপরও মনে পড়ে জেলখানার স্মৃতি-চিত্র।

যুদ্ধে যাই নি একাত্তরে। তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তবু কেন নিজেকে মনে হয় বীর উত্তম! রায়ের বাজারে কিংবা মিরপুরে ওরা হত্যা করে নি আমাকে, —তবু আমি শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর-কায়সার।

ফাঁসিতে ঝুলি নি; তবু আমার নাম কর্নেল তাহের। পঁচাত্তরে ৩২ সিঁড়িতে গুলিবিদ্ধ হয় নি আমার শরীর। তবু মনে হয় আমিই মুজিব, শেখ মুজিব, শেখ মুজিবুর, শেখ মুজিবুর রহমান —বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
……………………………………………

নৌকাবাইচ

নদীতে কে রং ঢেলেছে, স্রোতে কালারফুল,
জল তরঙ্গে ঢেউয়ের বাঁকে জলের হুলুস্থুল!
রংধনুর রং গলে জলে রঙের আলপনা
স্বপ্নসিঁড়ি ছাড়িয়ে গেছে মনের কল্পনা।

বুড়িগঙ্গায় পাঁপড়ি ছড়ায় গুনগুনিয়ে গুণ,
জলে সুবাস ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে জুলাই থেকে জুন।
নৌকোৎসবে মাছবাড়িতে সাজে কী যে নাইচ
নদীর পাড়ে লক্ষ মানুষ হবে নৌকাবাইচ!

ভিড় করেছে হাজার পাখি, বাদবাকিরাও যে(ই)ও
টাকডুমাডুম বৈঠা চালাও—মারো টান, হেঁইও ও।

টরন্টো, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮
……………………………………………

মুজিব : একটি গীতিকাব্য

মুক্ত আকাশ, মুক্ত বাতাস এনে দিলেন যিনি,
আমরা সবাই তার কাছে আজ অনেক অনেক ঋণী।

রক্তলি সেসব ভুলতে পারি না,
হৃদয় থেকে তাঁরে খুলতে পারি না।
নেই তিনি নেই, তবু অমর থাকবেন চিরদিনই।

পঁচাত্তরে আগস্টের সেই পনেরো,
শ্রাবণভেজা নীল বেদনা মনেরও।
মন গহিনে ঘুমিয়ে আছেন ইতিহাসে তিনি ।।
……………………………………………

কাগজের নৌকা

পঞ্চম শ্রেণির বাংলা খাতায় একবার গাঙ অর্থাৎ নদীর রচনা লিখতে লিখতে নদীর নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম অথবা সেই রচনার পাতা ছিড়ে কাগজের নৌকো বানিয়েছিলাম। সেজন্য ক্লাস-টিচার হাত-পাতা তালুতে কষে কষে বেতের বাড়ি দিয়েছিলেন। নৌকার বিকল্পে একবার কলাগাছের ভেলা বানিয়ে বর্ষার কবিতা লিখেছিলাম। এবং ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম—নদীর নাভিতে!

আরেকবার ধর্ম-স্যার আরবি পড়াতে পড়াতে বলেছিলেন, জলোচ্ছাসের গ্রাস থেকে পৃথিবীর প্রাণীকুলকে রক্ষা করেছিল নূহের নৌকা। তীর্থযাত্রার সেই নৌকায় চড়ে আমি আর কাজল এক ঘোরের ভেতর কোথায় যেনো হারিয়ে গিয়েছিলাম। পরে বাজারে মাইকে। ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি…

আমি বীর ব্রহ্মপুত্রের সন্তান। কাঠের নৌকা আমাদের আত্মীয়; প্রতীক। নৌকার আমাদের লড়াই, ইতিহাস। নৌকায় চড়ে কবর দিয়েছি পূর্ব পাকিস্তান। এই নৌকা এনে দিয়েছে বাংলাদেশ। আমি এখনো সর্ব শ্রেণির রচনার পাতা ছিড়ে বানাই কাগজের নৌকা!

টরন্টো, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
……………………………………………

দ্বিতীয় মৃত্যু

গতকাল দিল্লির শেখ মুজিব সড়কে
শীতের জোছনা মাখানো মধ্যরাতে
ইন্দিরা গান্ধী আর বঙ্গবন্ধু হাঁটছিলেন।
আমি কুয়াশার ওপিঠ থেকে
কাছে এসে বললাম:
আপনাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখছি!
বই বের করতে চাই! অনুমতি দিন।
তিনি চশমার ফাঁকে তাকিয়ে বললেন,
আমাকে তোমরা দ্বিতীয় বার হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছ!
ইন্দিরা বাংলা বোঝেন না; আমিও হিন্দি জানি না।
অতএব লজ্জা-শরম স্পর্শ করলো না।
তখন কোথায় যেন একটি গুলির শব্দ হলো!
গান্ধী কি আবারও গুলিবিদ্ধ হলেন?