ভুটানিদের মাতৃভাষায় জংখা মানে ড্রুক ইয়ুল, বাংলায় বলে ‘বজ্র ড্রাগনের দেশ’ Thunder Dragon। ‘এশিয়ার সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে খ্যাত দক্ষিণ এশিয়ার ছ্ট্টো দেশ ভুটান। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ট্রাভেল এজেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন আটাব ATAB’র উদ্যোগে ‘ভুটান ভ্রমণ-২০১৯ সম্পন্ন হয়ে গেলো। ভ্রমণ প্রোগ্রাম শুরু হয় ১৪ তারিখ রাত ৮টায় গরীবুল্লাহ শাহ (রহ) মাজার সংলগ্ন ‘সিল্ক লাইন’ এসি বাস কাউন্টার থেকে। কেউ কেউ আগে ভাগে সুবিধানুযায়ী বিমানে করে ঢাকা গিয়ে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। অবশ্য এর আগে প্রোগ্রাম নির্ধারিত ছিল ২২-২৬ ফেব্রুয়ারি। যেকোনো সঙ্গত কারণে তা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিলো। ফ্লাইট ছিল ভুটানের ‘দ্রুক এয়ারলাইন্স’ এবং সকাল ৯.২০ মি: ঢাকা থেকে পারো। যথাসময়ে পারো’র উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় আমাদের বিমানটি। মাত্র ৪০ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। আমরা পৌঁছে যাওয়ার পর উঞ্চ অভ্যর্থনা জানানো হয় ভুটানের ঐতিহ্যবাহি ‘উত্তরীয়’ দিয়ে।

রাজকীয় ভুটানের ইতিহাসঃ
বিস্তারিত বলার আগে ভুটানের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হই। সংস্কৃত শব্দ ভু-উত্থান থেকে ভুটান। যার অর্থ উচ্চভুমি। এর চেয়ে অন্য কোন নাম সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো না। কেউ কেউ বলেন ‘ভোটস্ আন্ত’ মানে ’তিব্বতের শেষ সীমানা’থেকে ভুটান এসেছে। ভুটান উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল, পশ্চিমে ভারতের সিকিম ও তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা, পূর্বে অরুণাচল প্রদেশ এবং দক্ষিণে আসাম ও উত্তরবঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভুটান সার্কের (ঝঅঅজঈ) একটি সদস্য রাষ্ট্র এবং মালদ্বীপের পর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম জনসংখ্যাবহুল দেশ। মাত্র সাড়ে সাত লাখ (প্রায়) লোকের দেশ ভুটানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর থিম্পু। ফুন্টসলিং ভুটানের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র। ভুটানের আয়তন ৪৬,৫০০ বর্গকিলোমিটার। স্থলবেষ্টিত দেশ ভুটানের আকার, আকৃতি ও পার্বত্য ভূ-প্রকৃতি সুইজারল্যান্ডের সদৃশ বলে দেশটিকে অনেক সময় এশিয়ার সুইজারল্যান্ড বলে অভিহিত করা হয়।

ছোট ছোট পাহাড়ঘেরা দেশটি ১৬শ শতাব্দী থেকে ভুটান একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ৮০% লোক লামা বৌদ্ধবাদে বিশ্বাসী। হিন্দু আছে কয়েক শতাংশ, মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ১৯০৭ সাল থেকে ওয়াংচুক বংশ দেশটি শাসন করে আসছে। ১৯১০ সালে রাজা উগিয়ান ও বৃটিশ শক্তি পুনাখায় চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে বৃটিশ ভারত ভুটানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেন। ওয়াংচুক ১৯২৬ সালে মারা গেলে তার পুত্র জিগমে ওয়াংচুক পরবর্তী রাজা হন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর ভুটানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে গণ্য করে। ১৯৪৯ সালে ভুটান ও ভারত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে ভুটান ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে সহযোগিতা লাভের ব্যাপারে সম্মত হয়। ১৯৫২ সালে জিগমে ওয়াংচুকের ছেলে জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসে। তার আমলে ভুটান পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে এবং ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে। ১৯৭২ সালে ১৬ বছর বয়সে জিগমে সিঙে ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসেন। তার আমলে ধীরে ধীরে ভুটানগণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যায়। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি রাজার পদ ছেড়ে দেন এবং তার ছেলে খেসার নামগিয়াল ওয়াংচুক ভুটানের রাজা হন। ২০০৮ সালের ১৮ই জুলাই ভুটানের সংসদ একটি নতুন সংবিধান রচনা করে। এই ঐতিহাসিক দিন থেকে ভুটানে রাজতন্ত্রের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বর্তমানে জিগমে খেসার নামগিয়াল ওয়াংচুক ভুটানের রাজা।

পারো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টঃ
ভুটানের একমাত্র এয়ারপোর্ট পারো। ছোট একটি জায়গায় তা অবস্থিত এবং আয়তনেও বেশ ছোট। সমগ্র দেশ পাহাড়ও মালভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত। কোনো সমতলভুমি নেই। পারোতে বিমান ল্যান্ড করা অনেক টাফ ব্যাপার। পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক এয়ারপোর্টের একটি। আকাশ পথে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার সীমানা পার হওয়ার পর ভুটানের সীমানা শুরু হয়। আমাদের বিমানটি চলছে পাহাড়ের উপর দিয়ে কখনো বা পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে। ভয়ে গা শিউরে উঠছে কারো মাঝে মাঝে। অবশেষে বিমান ল্যান্ড করলো। আমরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। অতি অল্প সময়ে পৌঁছে সবই তো অবাক! আগে যারা ভুটান যায়নি তারা জানত না যে, পৌঁছতে এত কমসময় লাগে। আমরা আরো জানতাম না যে, ভুটান এবং বাংলাদেশের স্থানীয় সময় সমান। থিম্পু গিয়ে আমাদের সহযাত্রী এডভোকেট খোরশেদ ভাইয়ের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে ফোন করলাম দেশে। নিরাপদে পৌঁছার খবরটা পরিবারকে দেওয়ার জন্য। আমার মিসেসকে কয়েকবার কল দিয়ে পেলাম না। পরে জানতে পারলাম বড় ছেলের কাছে মোবাইল সেট ছিলো। সে মজা করে গেইমস্ খেলছে!
বললাম, ওখানে সময় কত?
সোয়া দুটা। মিসেসের উত্তর।
বলো কী? এখানেও একই সময়!
সেও অবাক!

এয়ারপোর্টটিতে তেমন একটা ব্যস্ততাও নেই। আমাদের নিয়ে আসা বিমানটি ছাড়া আর কোন বিমান দেখতে পেলাম না। বিমান থেকে তাকিয়ে চারদিকে পাহাড়ের অবস্থান লক্ষ করছি। আমরা অতি দ্রুত সময়ে ইমিগ্রেশন পার হলাম। আমরা যার যার ল্যাগেজ নিয়ে বের হলাম এয়ারপোর্ট থেকে। আবু জাফর সাহেব এবং শুক্কুর সাহেব সবাইকে এক জায়গায় একত্রিত হওয়ার জন্য বললেন। গ্রুপ ছবি নেবে তাই। আমরা কাছে রক্ষিত ছিল ভ্রমনের ব্যানার দুটি। সবাই দাঁড়িয়ে যে যার মতো করে ছবি তুলতে লাগলো। অত:পর নির্দিষ্ট গাইড রিসিভ করে এবং আমাদের ৩৬ জন ডেলিগেটকে ২টি গাড়িতে করে ‘পারো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ থেকে ভুটানের রাজধানী থিম্পুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল।

রাজধানী থিম্পুতে সড়ক পথেঃ
পাহাড়ী জনপদ, সরু আঁকা বাঁকা রোড। ছোট ছোট দু’টি মিনি বাস। চলছে নিজস্ব গতিতে। আমাদের গাইড মি: সোনম তার করণীয় ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। একসময় সবার থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে ভ্রমণ পারমিট নিয়ে নেন। আমাদের বাসে ছিলেন আটাব চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান আবু জাফর সাহেব। তিনি মি: সোনমের সাথে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছেন ইংরেজিতে। ভুটানের শিক্ষিতরা সবাই ইংরেজিতে বেশ পারদর্শী। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় সে দেশে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক। স্বাক্ষরতার হার প্রায় ৬০%। সোনমের পরনে ছিল সে দেশের পোষাক। সে কিছুটা লাজুক প্রকৃতির হলেও বেশ মিশুক। জাফর ভাইয়ের সাথে আলোচনা চলছে। সোনমের পরিবার, শৈশব, বিয়ে, ছেলে-সন্তান, তার স্ত্রী এবং ভুটান সম্পর্কিত অনেক কথা-বার্তা। মাঝে মাঝে দু’জন হেসে উঠে। আমরাও তাদের হাস্যরসে মেতে উঠি। ইদ্রিস ভাই ছিলেন আরো একধাপ বেশি এক্সাইটেড! পাশে থেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন আবু তাহের ভাই। বাসের পেছন দিকের ডেলিগেটদের সাথে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছিলেন মিসেস আজাদ এবং অন্যরা। আবদুল হান্নান ভাই তো সবর্দা ব্যস্ত ছিলেন ছবি, সেলফি এবং গ্রুপ ছবি তুলতে। বলে চলেছেন, ভাবী, এই তো একটু তাকান তো এ দিকে! ক্লিক হয়ে গেলো। সাথে সাথে পোস্ট দিচ্ছেন ফেসবুকে। ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের ভ্রমনের খবরাখবর বিশ্বময়।
থিম্পুতে আমাদের হোটেল ছিল চার তারকার বিশিষ্ট ‘ইয়ার ড্রো লিং’। হোটেলে যার যার রুমে অবস্থান নিয়ে ফ্রেশ হয়ে সবাই অভ্যর্থনা কক্ষে এলেন। সিদ্ধান্ত লাঞ্চের পর বাইরে যাওয়া। আমরা দুপুরের আহার গ্রহণ করে সাইট ভিজিটে বেরিয়ে পড়লাম। কেবল গাড়িতে করে সারাক্ষণ ঘোরাঘুরি এবং দেখার যা দেখা চলছে। উচুঁ-নিচু পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় বাস থেকে নামার সুযোগ কম। পুরো রাজধানী দেখা যাচ্ছে বাস থেকে। একসময় পৌঁছে গেলাম ‘কঁবহংবষঢ়যড়ফৎধহম ঘধঃঁৎব ঢ়ধৎশ’এ, যেখানে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গৌতম বুদ্ধের বিশাল মুর্তি! যা চীনের সহায়তায় নির্মিত। সোনম বলতে থাকেন। আমরা চারদিকে দেখতে থাকি, আর সবাই ব্যস্ত ছবি তোলায়। দিন যতই শেষ হয়ে আসছে রোদের তীব্রতাও কমে আসছে। হিমালয়, তিব্বতের পাদদেশে হওয়ায় হিম হিম ভাব বেশি। ভুটানে বেশি সময়ই শীতকাল থাকে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর ব্যতীত)। তাই শীতকালে ভুটান ভ্রমণ উপযুক্ত সময় নয়। রাতে তো তাপমাত্রা মাইনাসে চলে যায়। আমরা শীতের কাপড় নিয়ে গেছিলাম। সন্ধ্যার দিকে কিছুুসময় মার্কেটে ঘুরলাম। কিন্তু কেনাকাটার মতো কোন কিছু পেলাম না। হোটেলে চলে আসি এবং রাতের আহার গ্রহণ করে পরদিনের জন্য লাগেজ গুছিয়ে রাখি।

ডচুলায় যাত্রা বিরতিঃ
দ্বিতীয় দিন আরেক গুরুত্বপূর্ণ শহর পুনাখা যাওয়ার পথে যাত্রা বিরতি হয় ডচুলা পাসে। রাজধানী শহর থিম্পু থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ডচুলা পাসের রয়েছে এক অপরূপ সৌন্দর্য মহিমা। অনেক উপরে উঠা এই স্থানটি থেকে যেন আকাশ ছোঁয়া যায়! পাহাড়ে ঘেরা স্থানটিতে অসংখ্য মন্দির আছে। আর মেঘালয়ের পাশে হওয়ায় মেঘের খেলা নিত্য চলে এখানে। গাইড সোনম বলেন, ‘দ্রুকওয়াংগাল লাখাং’ মন্দিরটি এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। ১০৮টি চোর্টেন্স রয়েছে, যা ভারতীয় যুদ্ধে নিহত ভুটানি সেনাদের স্মরণে ২০০৩ সালে নির্মাণ করেছিলেন ভুটানের রানী মাতা আশি দর্জি ওয়াংমো ওয়াংচুক।’ সেখানে নেমে আমরা ৩০ মিনিট সময় পাই, যে যার মত ওয়াশরুমে ফ্রেশ হই। সমাগত বিপুল পরিমাণ ইউরোপীয়ান পর্যটকের দেখা পাই। প্রচ- হিম বাতাসে সবাই শিহরিত হই! কেউ কেউ দ্রুত গিয়ে বাসে উঠে শীতকে এভয়েড করার লক্ষ্যে।

পুনাখায় নৈসর্গিকরূপ অবগাহনেঃ
থিম্পু রাজধানী হওয়ার আগে শীতকালীন রাজধানী ছিল পুনাখা পুনাখার ‘কিংগালিং’ হোটেলে আমরা পৌঁছার আগে গাইডের ঠিক করা একটি হোটেলে দুপুরের আহার গ্রহণ করি। আবারো সাইট ভিজিটের পালা। পুনাখা জং-এর সামনে বাস এসে থামে। সোনম বলছে, ‘এটি পুনাখার প্রশাসনিক ভবন। ৬০০ ফুট সুদীর্ঘ এই জংটি তৈরি হয় সেই ১৬৩৭-৩৮ সালে। ১৯০৭ সালের ১৭ই ডিসেম্বর ভুটানের প্রথম রাজা উজেন ওয়াংচুক এই পুনাখা জং থেকেই তার রাজত্ব পরিচালনা শুরু করেন। বর্তমানে ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ এই পুনাখা জংটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীতকালীন বাসস্থান। ভুটানে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা দানের সবচেয়ে বড় আশ্রম।’ ভুটানের সব থেকে উর্বরতম ভ্যালি এই পুনাখা। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পুনাখা জং, ফো চু এবং মো চু নদী । ফো চু (বাবা) ও মো চু (মা) নদীর পাশে সুশ্রী কন্যার মতো সেজেগুজে থাকে সবসময়। নদীতে পানি খুব একটা নেই। আমরা গাড়ি থেকে নেমে নদীর উপর ঝুলন্ত ব্রিজে সবাই যাই, অপরূপে বিমোহিত হই। সবাই মনের মাধুরি মিশিয়ে প্রকৃতির সাথে আনন্দ উপভোগে মেতে উঠলেন। ইদ্রিস ভাই, মজার করার উদ্দেশ্যে নদীর উপর দিয়ে ঝুলন্ত ব্রিজের এপার হতে ওপারে এক দৌড়ে গেছেন এবং আরেক দৌড়ে ফিরে এলেন। সবাই বাহ্বা দিলে তাকে!

পুনাখা থিম্পুর চেয়ে একটু উষ্ণ। সূর্যের প্রখর রোদে গরম লাগছে। শীতের পোষাক কারো গায়ে নেই। আমাদের গাড়ির অবস্থান একটু দূরে। ঝুলন্ত ব্রীজ থেকে সবাই চলে এলেন। আমি প্রায় শেষ পর্যায়ে। রোদের কারণে শরীর ঘর্মাক্ত। মাথা থেকে ক্যাপ খুলে হাতে নিলাম। হঠাৎ জাফর ভাই লক্ষ করলেন আমাকে।
তিনি বললেন, মাসুম, তুমি তো একেবারে এয়ারপোর্ট?
আমিও হালকা রসিকতার স্বরে বললাম, আপনি জানতেন না বুঝি?
হেসে উঠলেন আশে পাশে যারা ছিলেন সবাই।
বাসে সবাই উঠে পড়েছি। যাত্রা এখন গন্তব্যের দিকে। মানে ‘কিংগালিং হোটেলে’। হোটেল ভবনটির নির্মাণ শৈলি বড়ই চমৎকার! লোকেশনও দারুণ স্থানে। পাশ দিয়ে বয়ে সুন্দর একটা নদী। হোটেলের বেলকনি থেকে নদীর ওপারের দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম! হোটেল কক্ষগুলো কী বিশাল! অভ্যর্থনা কক্ষে সবাই আসন্ন হাব নির্বাচন নিয়ে মেতে উঠেছে। যে যার মতামত পেশ করছেন। শহীদ ভাই চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্যানেল লিডার হতে চায়। জাফর ভাই, তার অবস্থা দেখে মুচকি মুচকি হাসেন! আমরা সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছি। উনার হাসার মাঝেই রয়েছে নির্বাচনী খেলার আসল রহস্য!

আবার পারোতে, নেমসে কোলিং রিসোর্টেঃ
তৃতীয় দিন এবং ভ্রমণের শেষ দিবস। পারো’র ‘নেমসে কোলিং রিসোর্টে’ সবাই নিজ নিজ রুমে অবস্থান করলাম। পারো শহরটি অন্য শহর থেকে একটু ভিন্ন। এখানে অন্যান্য শহরের চেয়ে লোকজনের সমাগম বেশি। আমরা সবাই গাইড সহকারে বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়লাম। ব্যস্ত শহর, চলছে মেলার আয়োজন। উদ্দেশ্য কিছু কেনাকাটা। কিন্তু বিধিবাম। শপিংকরার মত উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। আনোয়ার ভাই কিছু ভালো মানের চাউল কিনে নিলেন। বললেন ওজন যখন ৩০ কেজি ফ্রি, তাই খালি হাতে যাবো কেন? পারোতেও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। পারো জং, ন্যাশনাল মিউজিয়াম এবং টাইগার্স নেস্ট ইত্যাদি। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা সেস্থান গুলোতে যেতে পারিনি। হয়তো বা অন্যকোন সময়ে আবারো ভুটান ভ্রমণের সুযোগ আসলে তখন ট্রাই করা যাবে।

ভ্রমণপিয়াসি চেয়ারম্যান আবু জাফর এবং মজিবুল হক শুক্কুর সাহেবের সুন্দর পরিচালনা, দক্ষ গাইডের নির্দেশনা, অভিজ্ঞ চালকের সহযোগিতায় একটি দারুণ ভ্রমণ উপভোগ করি সবাই। ১৮ মার্চ সকাল ৭.২০ ছিল আমাদের নির্দিষ্ট ফিরতি ফ্লাইট ‘পারো-ঢাকা’। ভোর ৫টার আগেই সবাই রেডি হয়ে থাকি এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য। সবাই দেশে আসার জন্য উদগ্রীব। যথাসময়েই প্লেন ঢাকার উদ্দেশ্যে আকাশে উড়াল দেয়। এমন একটি সুন্দর, আকর্ষণীয় এবং দারুণ উপভোগ্য ভ্রমণ উপহার জন্য শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান এবং সেক্রেটারিকে কৃতজ্ঞতা জানাই। মূলত: ৩/৪ দিনের এ ভ্রমণ ছিল স্বপ্নের মতই। আমাদের ঘোরাফেরা, শপিং, খাওয়া-দাওয়া এবং আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলো পরিদর্শন ছিলো বেশ মনোরম পরিবেশে। ভুটানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হন সবাই। সে দেশের মানুষের সুন্দর ব্যবহার, অভ্যর্থনা, আচার-ব্যবহার এবং আতিথেয়তা স্মরণে রাখার মতোই।