প্রায় দশ বছর পর খুকুমণির এক সময়কার খুবই প্রিয় বান্ধবী লিজা, খুকুমনির বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। এত বছর পর লিজাকে দেখে খুকুমনির মা তাকে জড়িয়ে ধরলো। মফস্বলের মায়েরা খুব আবেগী হয়, তাই মেয়ের বান্ধবীর মাঝেই মেয়ের মুখ দেখতে পেয়ে আর স্থির থাকতে পারলো না। আবেগের মাখামাখি যখন কিছুটা কমে আসতে থাকে তখন লিজা খুকুমণির কথা জিজ্ঞেস করলো।

খুকুমণির কথা শুনেই তার মা যেন শক্ত হয়ে গেলো। তার মধ্যে আবেগের লেশমাত্র দেখা গেলো না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কঠিনভাবে বললো-
“আমার তিন মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে মরে গেছে। যে মরে গেছে, তার খবর আমি কি করে জানবো। আর ওর ব্যাপারে আমার জানার কোনো ইচ্ছাও নেই।”

লিজা খুব অবাক হয়ে গেলো এ কথা শুনে। বুঝতে পারলো এটা তার ভেতরের কথা নয়। প্রচণ্ড অভিমানের বশে তিনি এসব বলছেন। তখন লিজা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো-
“খালাম্মা, আপনি খুব ভালো করেই জানেন যে, খুকু আমার কত আপন ছিল। বুঝতে পারছি ভীষণ কষ্ট থেকেই এসব বলছেন। আমাকে সব খুলে বললে আপনার মন কিছুটা হালকা হবে।”

খুকুমণির মা তখন আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলো-
“তুমি তো জানোই বিশ বছর হলো আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে দশ বছর ওর সাথে দেখা হয় না। এমনকি কোনো যোগাযোগও নেই। অনেকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু খুকুই ইচ্ছে করে দূরে সরে থেকেছে। এখন তো মোবাইলের যুগ। ওর নম্বরটাও আমরা কেউ জানি না। অনেকদিন আগে ওর মামা শ্বশুরের কাছে ফোন দিয়েছিল মুনা। খুকুর ছোট বোন। ওর মামাশ্বশুর ফোনটা খুকুর কাছে দিয়েছিল কথা বলার জন্য। মুনার নাম শুনেই খুকু ফোন কেটে দেয়। কথা বলেনি। মাঝে মাঝে আমার বুক ফেটে কান্না আসে ওকে দেখার জন্য, তার সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু ওর এইসব ব্যবহারে মনটা আমার ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি না ও আমাদের সবার সাথে এমন করছে কেন? এমনকি ওর বাবা মারা যাওয়ার সময়ও দেখতে আসেনি, ওকে খবর দেওয়ার পরও আসেনি, ওর বাবা ওকে কত দেখতে চেয়েছিল।”

ওর মেট্রিক পরীক্ষার আগেই আমরা ওর বিয়ে ঠিক করলাম আমার বোনের ছেলের সাথে। সেই ছোটকাল থেকেই ইকবাল ওকে খুব পছন্দ করতো। তাছাড়া ছেলেটার আচার-ব্যবহারও খুব ভালো। কথা ছিল পরীক্ষার পরই অনুষ্ঠান করে ওরা খুকুকে ওদের বাড়ি নিয়ে যাবে। তার আগে ইকবাল আর আমার বোন এসে ওকে নাকফুল পরিয়ে বায়না করে রেখে যায়। তখন ইকবাল চিটগাং একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সুপারভাইজার ছিল। পড়াশুনা বেশি না করলেও কাজের দক্ষতা আর ব্যবহারে মালিকের পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছিল। খুকুরও কোনো অমত ছিল না এ বিয়েতে। ইকবালের সাথে সে সেভাবেই মানিয়ে চলতো।

খুকুর যখন পরীক্ষা চলছিল তখনই আমরা বিয়ের জোগাড় যন্ত্র করছিলাম। ওর এক বান্ধবী লাভলী আমাদের বাড়িতে খুব যাওয়া-আসা করতো। তার এক ভাই ছিল যার নাম রাজু। ঐ রাজুও বোনের বান্ধবীর সুবাদে বাড়িতে আসা যাওয়া করতো। আমাকে খালাম্মা বলে ডাকতো। খুকুর বিয়ের কথাও সে জানতো এবং ইকবালের ব্যাপারে আমার কাছে বেশ সুনামও করতো। ছেলেটা তখন বিএ পড়তো। আমি ওদেরকে খুব বিশ্বাস করতাম।

মেট্রিক পরীক্ষা যেদিন শেষ, সেদিন খুকু কাউকে সাথে নিয়ে যায়নি। অন্য পরীক্ষায় ওর দুবোনের একজনকে নিয়ে যেত। পরীক্ষা শেষে একসাথে আসতো। ঐদিন আমাকে বললো শেষ পরীক্ষার পর বন্ধু-বান্ধবরা একটু বেড়াবে, গল্প করবে তাই একটু দেরি হবে। আর সে একাই আসতে পারবে। আমি আর দুশ্চিন্তা করি নাই। সেদিন বিকাল হয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায়। খুকুর আসার নাম নেই। আমি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। ওর পরিচিত সব বান্ধবীর বাড়িতে লোক পাঠালাম। তখনতো আর মোবাইলের যুগ ছিল না। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। হাসপাতালে খোঁজ নেওয়া হলো। সেখানেও নেই। শেষে ভাবলাম হয়তো কোনো বান্ধবীর বাসায় থেকে গেছে তাই রাতটা অপেক্ষায় কাটালাম। পরদিন ওর বান্ধবী লাভলী আসলো ওর খোঁজে। লাভলীর কাছে সব বলার পর সে শুধু একটা কথাই বললো যে, তার ভাই রাজুও কাল বাসায় ফেরেনি। পরের দিনও সেভাবেই কাটলো।

তিন দিন পর লাভলী এসে খবর দিলো যে, খুকু আর রাজু দুজনই খুলনায় তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আছে। ওরা বিয়ে করে ফেলেছে। এ কথা শুনে আমি দুঃখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়েছিল যে আমি ইকবালকে কি জবাব দিব। সে তো অনেক আশা নিয়ে বসে আছে। আর খুকুর সাথে রাজুর ভাবটাই কখন হলো। দুজন মিলে আমার বিশ্বাসের ওপর এতবড় আঘাত দিলো। এদিকে এলাকায় জানাজানি হয়ে গেলো খুকু পালিয়ে গেছে। সবাই ছি ছি করতে লাগলো। অনেকে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। ছোটবেলা থেকেই খুকু সবার সাথে মিশতো, এলাকার ছেলেবুড়ো সবাইকে বেশ স্নেহ আর সম্মান করতো। সবাইকে ডাকাডাকি করতো বলেই সবাই ওকে খুব ভালোবাসতো। হঠাৎ করে ওর এই কাজটা কেউ মেনে নিতে পারছিল না। আর সবাই জানে ইকবালের সাথে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। অনেকেই শেষে আমাকে দোষ দিতে লাগলো যে, এত বড় একটা ঘটনা ঘটার আগে আমি কেন সতর্ক হইনি। কেন ওকে চোখে চোখে রাখিনি। আরে, আমি তো ঘুনাক্ষুরেও ভাবিনি ওরা এরকম একটা কাজ করবে। পছন্দ করেছে সেটা আমাকে বললে হয়তো বিষয়টা অন্য দিকে মোড় নিতে পারতো। সবাইকে জানিয়ে বুঝিয়ে সব কিছু সম্পন্ন হতো। এতে হয়তো এমন বাজে অবস্থার সৃষ্টি হতো না।

এভাবে এক মাস গেলো। রাজুর বাড়ি থেকে কেউ আসলো না। আর তার মায়ের এক কথা, আনুষ্ঠনিকভাবে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলেই তারা ছেলে-বউ ঘরে তুলবে। আসলে খুকুর শাশুড়ি এ বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। তার এক বান্ধবীর মেয়েকে একমাত্র ছেলের বউ করবে বলে বান্ধবীকে কথা দিয়েছিল। সেই ইচ্ছা পূরণ না হওয়ায় তার মনের ভেতর আগুন জ্বলতে লাগলো। তাছাড়া খুকুর পরিবারের সাথে রাজুর পরিবারের আত্মীয়তা তার কাছে অসম্ভব বলে মনে হলো। খুকুর বাবা সামান্য একজন কৃষক। অন্যদিকে রাজুর বাবা থানার ওসি। ব্যক্তিগত চাহিদা অপূরণ এবং পারিবারিক মান-সম্মানের ব্যবধানের কারণে রাজুর মা খুকুর বাবা-মাকে তাদের মেয়েকে নিয়ে যেতে বললো। যে ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, তার কাছে বিয়ে দিতে বললো। কিন্তু রাজুর বয়স কম হওয়ায় সে সবকিছুর উর্ব্ধে তার আবেগকেই স্থান দিলো। তার এককথা খুকু তার বিবাহিত স্ত্রী। তাকে যদি তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় তবে তার বাবা-মা তাদের একমাত্র ছেলেকে হারাবে। রাজুর মা ছেলে হারানোর ভয়ে তখনকার মতো আর বাড়াবাড়ি করলো না। তাই, সবার সামনে আপাতত অভিনয় করে ছেলে-বউকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিল। তবে তার মধ্যে যে শয়তানীর বীজ সে বুনছে তা আস্তে আস্তে চারাগাছ হয়ে উঠতে লাগলো। ।

এদিকে বড় পরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে খুকুর বাবা তার শেষ সম্বল আবাদী জমিটুকু বিক্রি করে সোনার গয়না তৈরি করলো। অন্য দুই মেয়ের কথা না ভেবে বেশ বড়সড় আয়োজন করে মেয়ে-জামাইকে সাধ্যাতীত সম্মান করে খুকুর বাবা-মা তাকে হাসিমুখে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিলো।

খুকুতো মহাখুশি। ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে। শাশুড়ি বিয়ের দিন রাতে বাসর ঘরে যাওয়ার আগেই তার হাতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ট্যাবলেট দিয়ে বললো-“দেখো বউমা তোমাদের দুজনেরই তো বয়স কম আর পড়াশুনা এখনও শেষ হয়নি। তাই আমি চাই পড়াশুনা শেষ করে যখন চাকরি-বাকরি করবে তখনই না হয় তোমরা সন্তানের চিন্তা করবে। এতে সবারই ভালো হবে।” খুকু বেশ লজ্জা পেলো এবং শাশুড়ীকে বললো-“মা, আপনি যা বলবেন, আমি তাই মেনে চলব। কারণ এখন আপনারাই আমার সব। আপনার সবকিছু মেনে চলাকে আমি আমার দায়িত্ব এবং কর্তব্য বলে মনে করি। তাই আমার কোনো ভুল হলে বলবেন আমি শুধরে নেব।” খুকুর শাশুড়ি এসব কথা শুনে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো এবং মনে মনে ভাবলো খুব বেশি দিন তোকে আমার কথা শুনতে হবে না।

বিয়ের পরই শুরু হলো খুকুর ওপর তার শাশুড়ির মানসিক নির্যাতন। ছেলের সামনে বউমা ছাড়া ডাকই দেয় না আর ছেলের আড়ালে তুই তুকারি চলে। এমনকি বাপ-মা তুলে গাল দেওয়াটা এবং চোখে আঙুল দিয়ে বাপের দৈন্য-দশাটা দেখিয়ে দেওয়াও যেন প্রতিদিনকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির সমস্ত কাজের দায়িত্ব পড়েছে খুকুর ওপর। ঘুম থেকে উঠে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত চলে অবিরাম পরিশ্রম। কাজের মহিলাকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। তার প্রিয় বান্ধবী লাভলী এখন মায়ের দলে। খুকুর প্রতি বিন্দুমাত্র মমত্ববোধ তার মনে কাজ করে না। এভাবে চলতে চলতে খুকুর রেজাল্ট বের হয়। সে সেকে- ডিভিশনে মেট্রিক পাশ করে। অন্যদিকে তার ননদ ফেল করে। খুকুর খুব ইচ্ছা ছিলো কলেজে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু তার শাশুড়ি ও ননদ এর ঘোর বিরোধিতা করে। ফলে লেখাপড়ার পাট চুকাতে বাধ্য হয় সে। যদিও রাজু চেয়েছিল লেখাপড়া চালিয়ে যাক কিন্তু বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরতার দরুণ সে বেশি জোর দিতে পারেনি।

বিয়ের পর খকু সেই যে শ্বশুরবাড়ি গেছে আর তাকে বাপের বাড়ি আসতে দেওয়া হয়নি। তার বাবা-মা বার বার আনতে গিয়ে অপমানিত হয়েছে। এর মধ্যে তার ননদের বিয়ে ঠিক হয়। তখন খুকুকে তার বরের সাথে বাপের বাড়ি এক বেলার জন্য পাঠানো হয় বিয়ের দাওয়াত দেওয়ার জন্য, আর বলে দেওয়া হয় যেন সোনার জিনিস ছাড়া বিয়েতে না আসে। তাহলে তাদের সম্মান যাবে। খুকুকে দেখে তার মা কান্নায় ভেঙে পড়ে। ইতোমধ্যে সে রাজুর প্রতিবেশীর কাছ থেকে মেয়ের প্রতি দুর্ব্যবহারের কথা শুনেছে। তাই এক ফাঁকে তার মা বলেই ফেলে- “খুকু তুই ওখান থেকে চলে আয়। ওরা তোকে আস্তে আস্তে মেরে ফেলবে। আমরা তোকে আবার বিয়ে দেব। আর তাছাড়া ইকবাল এখনও তোর জন্য পাগল।”

খুকু তখন প্রায় কান্নাভেজা কণ্ঠে মাকে বলে- “মা আমার জীবন থাকতে আমি ঐ বাড়ি ছেড়ে আসব না। ওরা আমাকে যত কষ্ট দেয় দেক। রাজু তো আমার সাথে খারাপ আচরণ করে না। তাছাড়া একদিন না একদিন আমার শাশুড়ি আমাকে মেনে নেবেনই। আমাকে ধৈর্য ধরতে হবে।”

সেদিনকার মতো তারা চলে গেলো। এদিকে খুকুর বাবা মেয়ের সম্মান রক্ষার্থে তার ননদের সোনার গয়না গড়ার জন্য একমাত্র পুকুরটা এক বছরের জন্য লিজ দিলো। তাতেও টাকার চাহিদা পূরণ না হওয়ায় উঠানের আমগাছটা বেঁচে দিলো। সব মিলিয়ে দুটো সোনার চুড়ি বানিয়ে নিয়ে বিয়েতে গেলো। সেখানে তারা খুব একটা সমাদর পেলো না। উল্টো খুকুর শাশুড়ী অন্যদের কাছে তাদের কোনো পরিচয়ই দিলো না। মনে ভীষণ কষ্ট নিয়ে তারা বাড়ি ফিরে আসলো।

খুকুর বিয়ের বছর পার হয়ে গেলো। এদিকে তার স্বামী বিএ পাস করে ফেললো। শাশুড়ি ভাবলো ছেলে দেশে থাকলে সে খুকুকে বিদায় করতে পারবে না। তাই একমাত্র ছেলেকে কৌশলে সৌদি আরব পাঠিয়ে দিলো। যাওয়ার আগে রাজু খুকুকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে চিঠি দিতে বলে গেলো। স্বামী চলে যাওয়ার পরই টেলিফোন সেটটাতে তার শাশুড়ি তালা দিলো যাতে খুকু রাজুর সাথে কথা বলতে না পারে। রাজু বিদেশ গিয়েই খুকুকে ঠিকানাসহ চিঠি লিখলো। কিন্তু চিঠি পড়লো শাশুড়ি-ননদের হাতে। ফলে খুকুর চিঠিও পড়া হলো না, ঠিকানাও জানা হলো না।

আরেকটা কথা, খুকুর ননদ বিয়ের পর একবার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। আর যায়নি। তার স্বামী তাদের বাসায় আসে। তার যুক্তি শ্বশুরবাড়িতে থাকলে টুকটাক কাজ এবং রান্নাবান্না করতে হয়, সেটা তার দ্বারা সম্ভব নয়। আর তাছাড়া বাপের বাড়িতে কাজের লোকের পরিবর্তে তার ভাবি তো আছেই। তার আর চিন্তা কি। বাপের টাকার অভাব নেই। ভাইও টাকা পাঠাচ্ছে। এসব দিয়ে ফুর্তি করতে কার না ভালো লাগে। তাই মা-মেয়ে দুজন মিলে তখন খুকুর ওপর অত্যাচার চালানোর উদ্দেশ্য সফল করার জন্য বেশ সুযোগ পেল, তার শ্বশুরকে প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগই তারা দেয় না। যদিও খুকুর শ্বশুর তার প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর বৃথা চেষ্টা চালায়।

পোস্ট মাস্টারকে বলে রাখা হলো চিঠি যেন কোনোভাবেই খুকুর হাতে না পড়ে। ফলে দুই মাসেও কোনো চিঠি পেল না রাজু। তাই সে টেলিফোন করে খুকুকে চাইলো। তার মা বলেই ফেললো যে, খুকু বাপের বাড়ি গেছে। প্রায় দেড়মাস যাবত খুকু বাপের বাড়িতে আছে বলে চালিয়ে দিচ্ছে। যাতে দুজনের মধ্যে কোনো কথা না হয়। এভাবে বিভিন্ন তাল-বাহানায় খুকুর সাথে রাজুর সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছে তার শাশুড়ি। একদিন মা মেয়ে দুজনই শপিং এ গেলো। পোস্ট মাস্টার কাউকে না পেয়ে দরজার নিচ দিয়ে চিঠি ঢুকিয়ে চলে গেলো। খুকু চিঠিটা দেখতে পেলো। ঠিকানা লিখে রাখলো। খুলে পড়ার আর সাহস পেল না। সেখানেই রেখে দিলো। তার এক প্রতিবেশীকে ঠিকানা দিয়ে দুই বোনকে দিয়ে চিঠি লিখতে বলে দিলো। এদিকে খুকুর শাশুড়ি কিছুই জানতে পারল না।

খুকুর দুই বোন ঠিকানা পেয়ে বোনের প্রতি যাবতীয় অত্যাচারের কথা লিখে পাঠালো। আরও বললোÑসে যদি তার মাকে এসব জিজ্ঞেস করে তাবে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। রাজু সব জানার পর খুকুর বোনের কাছে চিঠি লেখা শুরু করলো। সেটা প্রতিবেশী খুকুর কাছে পৌঁছে দিলো। এভাবে খুকুর লেখা চিঠি তার বোন পোস্ট করতে লাগলো। ফলে রাজুর মা ছেলের কোনো চিঠি আর ফোন না পেয়ে বেশ অবাক হয়ে যায়। প্রায় ছয় মাস পর সে পোস্ট অফিসে খোঁজ নেওয়ার পর আসল ঘটনা জানতে পেরে খুকুর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। খুকুর স্বামী সব জানতে পেরে খুকুকে কিছুদিন বাপের বাড়ি থাকার পরামর্শ দেয়। খুকু রাজুকে জানিয়ে দেয় সে দেশে আসলে তার সাথেই সে শ্বশুরবাড়ি যাবে। তাই বোন-বাপ-মা সবার সাথে ভালোভাবেই তার দিন কাটতে লাগলো।

মাসখানেক পর। খুকুর শাশুড়ি এসে হাজির। বললো “বৌমা আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি বাড়ি ফিরে চলো। তোমাকে ছাড়া আমার সারাবাড়ি অন্ধকার হয়ে আছে।” খুকুর নিজের চোখ এবং কানকে বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হলো। আসলে খুকু চলে আসার পর বাড়ির কাজগুলো এখন মা-মেয়ে দুজনে মিলে করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। আর খুকু তো তাদের বাড়ির কাজের লোকের মতোই। তাই কাজের লোক ছাড়া চলতে পারছে না বলেই খুকুকে নিতে এসেছে। খুকু শাশুড়ির কথায় একেবারে গলে গিয়ে তার সাথে চলে গেলো। গিয়েই বুঝতে পারলো তাকে নিয়ে আসার কারণ। কিন্তু সে মুখ বুজে সব সহ্য করতে লাগলো।

রাজু সব খবর জানতে পেরে টেলিফোনে মায়ের কাছে খুকুকে চাইলো। তার মা দিতে না চাইলে, খুব শক্তভাবে বলার পর দিল। এটাই খুকুর সবচেয়ে বড় সান্তনা যে তার স্বামী সবসময় তার পাশে আছে। এদিকে খুকুর শাশুড়ি তার বোনদের খুব বাজে কিছু কথা বলে শাসিয়ে আসলো যাতে তারা তার ছেলেকে চিঠি না লেখে। ওরা আর চিঠি লিখলো না। ফলে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।

বছরখানেক পর খুকুর ননদের বাচ্চা হলো। বাচ্চার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব পড়লো খুকুর ওপর। সংসারের সমস্ত কাজের পাশাপাশি বাচ্চার দেখাশোনা করতে গিয়ে তার স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হতে লাগলো। সব সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে বুড়িয়ে যেতে লাগলো। শাশুড়ি মনে মনে বেশ খুশিই হলো। তার ইচ্ছা, হয় খুকু মরে যাক, আর না হয় ছেলেকে তালাক দিয়ে একেবারে তার বাড়ি থেকে চলে যাক। রাজুকেও বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিদেশে রাখা হলো। এভাবে প্রায় আট বছর পার হয়ে গেলো। খুকুর স্বামী দেশে ফিরে স্ত্রীকে দেখে খুব অবাক হয়ে গেলো। যে খুকুকে সে রেখে গিয়েছিল, একি অবস্থা হয়েছে তার। বিয়ের এক বছর পর খুকুর স্বামী বিদেশ গিয়েছিল। ফিরলো আট বছর পর। বিয়ের বয়স নয় বছর হয়ে গেলো। খুকু না পেলো কোনো সন্তান, না পেলো স্বামীর সোহাগ। উল্টো সংসারের জন্য খাটতে খাটতে জীবনটাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে।

খুকুর শাশুড়ি এবার নাতির মুখ দেখতে চাইলো। তার ধারনা, খুকু সন্তান জন্মদানে ব্যর্থ হবে এবং এই সুযোগে ছেলেকে বউ থেকে ছাড়িয়ে নিবে বংশ রক্ষার দোহাই দিয়ে। এদিকে রাজুর ভিসার মেয়াদ আছে তিন মাস। দুই মাসেও যখন খুকু সন্তান ধারণ করতে পারল না তখন তার স্বামী তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু ঔষধ দিলো। সেগুলো খাওয়ার পর খুকু সন্তান ধারনে সক্ষম হলো। আসলো শাশুড়ি কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে তার মুখে খাবার না রুচার ফলে শরীরের ভেতর নাড়ীগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছিল। ফলে তার উর্বরতা কমে যাচ্ছিল। ঔষধে কাজ হওয়ার পরে শাশুড়ি আপাতত চুপ হয়ে গেলো। খুকুর স্বামী আবার বিদেশ চলে গেলো। এর মধ্যে খুকুর এক বোনের বিয়ে হলো। কিন্তু খুকুকে যেতে দেওয়া হলো না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলো যখন খুকু ৬ মাসের গর্ভবতী তখন তার বাবা মারা যায়। সন্তানের ক্ষতির দোহাই দিয়ে শাশুড়ি তখনও তাকে আসতে দেয়নি। এরপর থেকে সে কেমন যেন শক্ত হয়ে গেলো। বাপের মুত্যুও যখন তার শাশুড়িকে নরম করতে পারলো না তখন সে বাপ-বোন-মায়ের কথা একেবারে ভুলে যাওয়ার চিন্তা করলো। ক্ষোভে-অভিমানে সে সবার সাথে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিলো। সারাদিন মুখ বুজে শুধু কাজ করে যায়। এর মধ্যে তার স্বামী কয়েকবার ফোনে তাকে চেয়েছে। সে কথা বলেনি।

খুকুর ছেলে সন্তান হলো। খবর পেয়ে তার মা বোন দেখতে গেলো। সে তাদের সাথে খুব একটা কথা বললো না। চলে আসার সময় শুধু বললো “মা, মাগো তোমরা আমার খোঁজ নিয়ো না। মনে করো যে, আমি মরে গেছি। আমি তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। মরার আগে বাপটাকেও দেখতে যেতে পারিনি। তোমাদের মেয়ে হওয়ার কোনো অধিকারই আমার নেই। আর একটা কথা, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।”

তারপর থেকে খুকু পরিবার, সমাজ সব কিছু থেকে আলাদা হয়ে যায়। ছেলে বড় হতে থাকে। তার স্বামী পাঁচ বছর পর এসে আবার সিঙ্গাপুর চলে যায়। এভাবেই স্বামী থেকেও স্বামীহীন জীবন পার করে দিচ্ছে খুকু। বিশ বছরের বিবাহিত জীবনে সব মিলিয়ে দেড় বছর সময় পেয়েছে সে তার স্বামীর সান্নিধ্য। আরও পেয়েছে শাশুড়ি আর ননদের অত্যাচার। সবমিলিয়ে মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে সে একদম একা হয়ে গেছে। চারপাশের যে শূন্যতা তার মাঝে তৈরি হয়েছে, তা আর কখনো পূর্ণ হবে বলে মনে হয় না।