হঠাৎ মোবাইলের রিং টোন বেজে উঠল। আমি রিসিভ করলাম। বললাম আসসালামু আলাইকুম- কে আপনি? তিনি বললেন: আমি মতিউর রহমান মল্লিক। কেমন আছো মুস্তাগিছ? অত্যন্ত নরম মিষ্টি কণ্ঠ, খুবই চেনা পরিচিত, যেনো আমার অনেক কাছের মানুষ। আমাকে বললেন, তোমার ছাত্রজীবন কি শেষ? আমি বললাম- না মল্লিক ভাই। তিনি বললেন, কি করবে কিছু ভেবেছো। আমি বললাম, মল্লিক ভাই এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি, ভাবছি কি করা যায়? তখন আমি সবে মাত্র সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিচালক থেকে বিদায় নিয়ে কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ (সসাস) এ যোগদান করেছি। তিনি বললেন যদি কিছু মনে না করো তাহলে তুমি এক কাজ করো, তোমার বিছানা পত্র, কাঁথা-বালিশ নিয়ে প্রত্যাশা প্রাঙ্গণে চলে এসো। এখানে থেকে সারাদেশের নাট্য নাট্যগোষ্ঠীগুলোর তত্ত্বাবধান করা সহজ হবে। আর আমাদের সাথে চারটা ডাল ভাত খেয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই কাজটি এগিয়ে নেবে।
সেদিনের ছোট্ট একটি কথায় মূলত: পরম শ্রদ্ধেয় কবি মতিউর রহমান মল্লিক পরিবারের একজন সদস্য হয়ে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম বিকল্পের পরিচালক আমিরুল মোমেনীন মানিককেও আমার মতো করে রাজশাহী থেকে প্রত্যাশায় এনেছে মল্লিক ভাই । আমাদের দু’জনকে দু’টি টেবিল ও দু’টি চেয়ার নিজ হাতে এনে আমাদের অফিসে বসার ব্যবস্থা করলেন। মরহুম চিত্রনায়ক মিঠুন ভাইকে বললেন আমাদেরকে সকল কাজ বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। এই তো কিছুদিন আগের ঘটনা, শুধু আমি নই, আমার মতো হাজারো সাংস্কৃতিক কর্মীকে তিনি এভাবেই ভালোবাসতেন মনপ্রাণ দিয়ে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্মান করতেন অনেক মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে। তাঁর এই ভালোবাসার ঋণ আমরা কখনো শোধ দিতে পারবো না। তিনি এমনই একজন নিবেদিত মানুষ ছিলেন, তাঁর কাছে কেউ গেলে, কোনো স্ট্যাটাস, বয়স বিবেচনা করতেন না সবাইকে তিনি খুবই সম্মান করতেন। বিশেষ করে সংগঠনের যে কাউকে।
সবার প্রিয় মল্লিক ভাই:
মতিউর রহমান মল্লিক শুধু একজন কবি, শিল্পী, গীতিকার, সুরকারই নন বরং তিনি নিজেই ছিলেন একটি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সংঠনের মতো।
শিল্পী আর শিল্পীগোষ্ঠী’র প্রতি তার হৃদয় নিংড়ানো দরদ আর ভালোবাসা তাঁর মতো আর কাউকে আমার গোটা জীবনে আর একজনও দেখিনি। ইসলামি সাংস্কৃতিক অঙ্গণের প্রতিটি শিল্পী, কলাকুশলী সবাইকে তিনি ভালোবাসতেন প্রাণখুলে।

মল্লিকের গান ও কবিতা :
অসংখ্য গানের গীতিকার তিনি। তাঁর গান জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে অনেকগুলি কারণ রয়েছে তারমধ্যে একটি হলো তিনি কোরআন, হাদিসের আলোকে সাহিত্য রচনা করতেন। তিনি বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে গান লিখতেন। কেউ তাকে কষ্ট দিলে, সেটাকে গান বা কবিতার মাধ্যমে ছন্দবদ্ধ করে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করতেন। একদিন তাঁর সাথে মগবাজার ওয়ারলেস জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি মল্লিকভাইয়ের জন্য একটি জায়নামাজও নিয়ে গিয়েছিলাম। নামাজ শেষে তিনি জায়নামাজটি এতো সুন্দর করে ভাঁজ করলেন, তা দেখে সত্যিই শেখার মতো ছিলো। তখন তিনি বললেন মুস্তাগিছ- যে কোনো কাজই খুব যত্ন সহকারে করবে এবং তা যেনো হয় খুবই সুন্দর। তারপরই শিশুদের জন্য তাঁর সেই গানটি পেলাম।
‘যে কোনো কাজ করো না ভাই যে কোনো কাজ করো ।
তা যেনো হয় সবার চেয়ে সবচেয়ে সুন্দরো।’
ভ্রাতৃশিবির এর প্রোগ্রাম। আমি তখন সাইমুমের নাট্য বিভাগে কাজ করি। তিনি আসলেন মগবাজার কাজী অফিস লেন অফিসে, তখন সাইমুমের অফিস ছিলো সেখানে। এসে সবাইকে বললেন ভ্রাতৃ শিবিরের জন্য একটি নতুন গান লাগবে কি করা যায় তোমরা বলতো। কয়েকজনের সাথে কথাও বললেন, কিন্তু কোনো কাজে দিলো না। সবাই কেমন জানি গা ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে। তখন তিনি বললেন, কাউকে না কাউকে তো লিখতেই হবে। কাজ না করলে কি চলবে? এরপর তিনি টেবিলে বসলেন এবং লিখে ফেললেন সেই অসাধারণ গান
‘আল কোরানের আহবানে দ্বীন কায়েমের প্রয়োজনে
নতুন করে আবার আমি শপথ নিলাম আজ
কেউ না করুক আমিই করবো কাজ’
সবাইকে কাজের গুরুত্ব বুঝাতে তিনি বার বার তাগিদ দিয়েছেন। এবং লিখেছেন তার সেই প্রিয় গান
‘একজন মুজাহিদ কখনো বসে থাকে না বসে থাকে না
অর্থবিত্ত নাইবা থাকলো তার
নাইবা থাকলো সাজানো সংসার।’
তিনি সংসারী মানুষ ছিলেন না কখনোই। আবার সুযোগ পেলে সংসারের খোঁজও রাখতেন। পরিবারের সদস্যদের কে ভালোবাসতেন প্রাণদিয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সংগঠনের জন্য সময় দিতেন। আর এজন্য তার মায়ের কথাও শুনতে হয়েছে অনেক। আমার বন্ধু মাকসুদ বললো মল্লিক ভাইয়ের একটি গান আমাদের বাসায় লিখা হয়েছে। বললাম কোন গান- আমার বন্ধুটির পিতার নাম ছিলো অধ্যাপক ইউসুফ আলী। তাদের বাসা ছিলো যাত্রাবাড়ির মীর হাজীরবাগে। তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার পাশে। সেই গানটি হলো।
‘আম্মা বলেন ঘড় ছেড়ে তুই যাসনে ছেলে আর
আমি বলি খোদার পথে হোক জীবন পার
নিজের জন্য করলি না তুই কিছু
আল্লাহ জানেন ঘুরিস কাদের পিছু
কি যে করিস কোথায় থাকিস বুঝিনে কারবার
আমি বলি খোদার পথে হোক জীবন পার’
এর পরও তিনি থেমে থাকেননি দুঃখ কষ্টকে সাথে নিয়ে গানের মাধ্যমে তিনি এগিয়ে চলেছেন
‘চল চলো চলো মজাহিদ পথ যে এখনো বাকী
ভুলো ভুলো ব্যথা ভুলো মুছে ফেলো ঐ আখি’
সকল শিল্পীদেরকে তাদের উদ্দেশ্য লক্ষ্য গানের মাধ্যমেই টিক করে দিয়েছেন।
‘পণ করেছি সত্য ন্যায়ের গানযে গাবো ভাই
সাইমুমের অরুণ তরুণ শিল্পী সেনা ভাই।
শিল্পী গায়ক নয়তো মেদের আসল পরিচয়
আল কোরআনের কর্মী মোরা বিপ্লবী নির্ভয়।’
কথা কাজে মিল যেনো থাকে সে জন্যও তিনি গানের মাধ্যমেই সব লিখে গেছেন।
‘আমার গানের ভাষা জীবনের সাথে যেনো মিলেমিশে হই একাকার / নিস্ক্রিয় হয়ে গেছি, বলতে না পারে কেউ ব্যথা ভরা কথাগুলো তার’
আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা ছিলো অফুরন্ত হৃদয় নিংড়ানো, প্রতিটি হামদের ভাষাও ছিলো প্রভুপ্রেমের জলন্ত নিদর্শন।
তোমার সৃষ্টি যদি হয় এতো সুন্দর
না জানি তাহলে তুমি কতো সুন্দর কতো সুন্দর।
এই গানে কতো সুন্দর উপমা খুঁজে বের করেছেন তিনি, কখনো বা নদীর সাথে, কখনো বা পাখির সাথে, কখনো ফুল আবার কখনো ফল কিংবা বাতাসের সাথে মহান প্রভুর সৃষ্টির নিদর্শন দিয়ে আল্লাহর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
নবী প্রেম তার মতো আর কার ছিলো, প্রিয় নবীকে এতো বেশি ভালোবাসতেন যা তার গানের মাধ্যমেই সুন্দরভাবে ফুটে উঠে,
‘রাসুল আমার ভালোবাসা রাসুল আমার আলো আশা
রাসুল আমার প্রেম বিরহের মূল আলোচনা
রাসুল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা।’
এখানেও কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের কথা তিনি অকপট ভাবে বুঝিয়েছেন।
কিংবা
‘হে রাসুল বুঝি না আমি রেখেছো বেধে মোরে কোন সুঁতোয় তুমি।’
কবিতায় তার জুড়িমেলা ভার শত শত কবিতা লিখে তিনি সবার মাঝে হয়ে আছেন অমর। এই মহান মানুষটি তাঁর চারপাশ এতো সুন্দর করে সাজিয়েছিলেন দেখলে মনে হবে সাজানো বাগান। তার ছিলো আকাশের মতো বুক আর ফুলের মতো মন, সুবাস ছড়িয়ে যেতেন সবখানে। তাইতো বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্রে সংস্কৃতি প্রেমিদের ভিড় সব সময় লেগেই থাকতো।
তিনি তৈরি করে গেছেন অসংখ শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, আবৃত্তিকার, নাট্যঅভিনেতাসহ অসংখ্য ভক্তকুল। নিজে কখনো কোনোকিছু নিতেন না বরং তিনি বিলিয়ে যেতেন, মানুষকে দেয়াটাই বেশি পছন্দ করতেন। কবি মতিউর রহমান মল্লিক প্রতিটি সাংস্কৃতিক কর্মীর হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।
তার স্বপ্নছিলো অনেক। তাঁর রেখে যাওয়া সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে ,প্রতিটি সংস্কৃতি কর্মীকে ইসলামি সংস্কৃতির শক্ত বুনিয়াদ গড়ে তুলতে হবে। মেধা মননশীলতা দিয়ে নোংরা সংস্কৃতির মোকাবেলা করতে হবে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ইসলামি সংস্কৃতিকে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য ছুটেছেন বাংলার এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত।
বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্র ছাড়াও তিনি ছিলেন ইসলামি সাংস্কৃতিক জগতের সবচাইতে বড় সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি সারা দেশের ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গড়ে তুলেছিলেন। তার মধ্যে চট্রগ্রামের পানজেরী, রাজশাহীর বিকল্প, বগুড়ার সমন্বয়, খুলনার টাইফুন, বরিশালের হেরাররশ্মী শিল্পীগোষ্ঠী অন্যতম।
নামকরা সাংস্কৃতিক সংগঠকও তিনিই তৈরি করেছেন যাদের মধ্যে ডা: স.ম রফিক, চৌধুরী গোলাম মওলা, শিল্পী তাফাজ্জল হোসেন খান, সাইফুল্লাহ মানসুর, আবুল কাসেম, আকরাম মুজাহিদ, নোমান আল আযমী, তারেক মনওয়ার, শিল্পী মশিউর রহমানসহ অনেকে। এছাড়াও অসংখ শিল্পী কলাকুশলী মল্লিক ভাইয়ের নিজ হাতে গড়া।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ভাই এর স্বপ্নের যে সুউচ্চ মিনার রচনা করে গেছেন। আমরা তার গানের মাধ্যমেই উপলব্দি করতে পারি। কবিরা, শিল্পীরা স্বপ্নের কারিগর। মল্লিক চিরদিন বেঁচে থাকবেন না কিন্তু তার কর্ম বেছে থাকবে যুগ যুগ ধরে, প্রতিটি বিশ্বাসী মানুষের অন্তরে। তাইতো তিনি লিখেছিলেন
‘পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়।
মরণ একদিন মুছে দেবে সকল রঙিন পরিচয়।’
কিংবা সেই অনবদ্য গান
‘টিক টিক টিক টিক যেই ঘড়িটা বাজে ঠিক ঠিক বাজে
কেউ কি জানে সেই ঘড়িটা লাগবে কয়দিন কাজে।’
আর তাই তাঁর রেখে যাওয়া সত্য ও সুন্দরের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরও তার মতো করেই এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, গীতিকার সুরকার, নাট্যকার, আবৃত্তিকার সবাইকে হতে হবে ইসলামের আদর্শের সত্যের সেনানী যেমনটি ছিলেন আমাদের প্রিয় কবি মতিউর রহমান মল্লিক।
মল্লিক’র স্বপ্ন পুরলে আমাদের করণীয়

  • মল্লিক একাডেমির কার্যক্রমকে আরো যুগ উপযোগী আধুনিকায়ন করা
  • সাংস্কৃতিক কর্মীর পাশাপাশি অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা।
  • মেধাবী, প্রতিভাধর ও নিরহংকারী শিল্পী তৈরি করা।
  • নতুন আঙ্গিকের গান, নাটক, কবিতা দিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি করা।
  • ইসলামি সংস্কৃতির একাডেমিক পদ্ধতি চালু করা।
  • ইসলামিক সাংস্কৃতিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা।
  • দুস্থ শিল্পী কল্যাণ সংস্থা ও মল্লিক পুরস্কার চালু করা।
  • আধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা।
  • সাবেক শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য ভিন্ন সংগঠন করা।
  • প্রতিটি জেলায় একটি মল্লিক একাডেমির কার্যক্রম চালু করা।
  • চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মিডিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করা।
  • দিন, মাস, বাৎসরিক ওয়ার্কশপ চালু করা।
  • পেশাদার সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা।

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের অনুপস্থিতিতে তাঁর অসমাপ্ত কাজ আমরা যেনো মিলেমিশে সবাই করতে যেতে পারি। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের মাঝে হাজারো মল্লিক তৈরী করে দিন। আমিন।