সন্ধ্যের মায়া

সূর্য ডুবে গেলে,যদি সন্ধ্যা নেমে আসে
আলসেমীদের আড়মোড়া ঘুম ভেঙে,
প্রেম আসুক উজ্জ্বয়নীর বেশে…

আঘ্রাণে আজ মাতাল হাওয়া নাচে
বুকের ভেতর ইচ্ছেনদী বাঁচে;
ঘড়ির কাঁটায় মনের পাতায় হঠাৎ তাড়াহুড়ো
রঙ মাখাবো তোর উষ্ণ কিছু আঁচে…

তোকে ছোঁবে বলে হালকা কিছু ঝড়
গালের পরে চুমু হয়ে আসে;
সন্ধ্যে নামার আগে তুই বাঁধিস যদি ঘর
আটকে যাবে শ্বাস, হবে অন্যরকম আদর…
…………………………………………..

দর্পণ

মন উজানের ফেরিওয়ালা নীল ঘুমেতে ডুবে,
নীল ঘুমেতে প্রজাপতি কেমন করে উড়ে?

শরীর জুড়ে নীলকমলের এ কেমনতর সুখ?
নীলকন্ঠে জ্বলেপুড়েও বাড়ছে প্রেমের ভুক।

সবুজ হাওয়ায় ভাসছে ওই স্বর্গলোকের ধ্বনি
চুপিসারে মাতাল জোয়ার তুলছে প্রতিধ্বনি।

অকপটে নিছক কপটতা,এ কেমনতর ছল?
কাজল পরা আঁখি পানে, এ গভীরতার জল?

সোনার ফাঁকি জহুরি জানে,অহংবোধে অলংকার
কৌশলে কি নিবিড় যতন,রঙ্গরসে বাঁধে তার?

পথের বাঁকে খেলা শেষে নিত্য দহন সমর্পণ
সুখের আশায় যে ঘর বোনা,সেথা নাটুকে দর্পণ।

যেথায় যেমন যার ঠিকানা,নাহয় কাঁটাতারের খেয়া
অন্ধকারে আলো জ্বেলে বাড়ুক ভালবাসার মায়া।
…………………………………………..

ভরা পূর্ণিমা

আজ কোজাগরী পূর্ণিমায় স্নানের
ইচ্ছেরা জাগে,
আজ মন আলোর মাখামাখি চায়
সারা গায়ে,
আজ তবে জ্যোৎস্নাময়ীর আদরে ভরাব
আঁখির জলদিঘী।
আজ কাজলরেখার গাঢ়মেঘে ভাসাবো
মলিনবিধুর চোখ।
আজ আলতো ছোঁয়ায় বিনুনি সাজাবো
লতায়িত কেশরাশি।
আজ বালুচরি নকশায় এঁকে নেবো
আলতায় দু”পা।
আজ বাহুডোরে বাঁধা রবে দীর্ঘশ্বাস
চুম্বিত ললাট।
আজ নীলাভ রং ছোঁবে মম হিয়া
ভূপালীর রাগে।
আজ তনু তোমাতে আমাতে ডুবে যাবে
নিষিদ্ধতর প্রেমে।
আজ উত্তাল পাতাল পূর্ণিমারাতে
অজানার স্রোতোবহায়
একাকার হবার দিন।
…………………………………………..

চাওয়া

কতটুকু চেয়েছি তার হিসেব বড়ই গড়মিলে,
যদি বলি আজন্ম,হয়ত মিথ্যে বলা হবে;
দুর্বোধ্য আদি রহস্য ঘেঁটে যদি কোন ভালবাসার
প্রাচীন দলিল তুলে আনতে পারো;
তবে সেই আদি পুঁথি মালায় গাঁথা আছে আমার অপেক্ষার শ্বাসরুদ্ধ কিছু দুপুরের গল্প।

প্রতিক্ষার প্রহর জানে কতটা চেয়েছি তোমায়;
নিশ্চুপ কাটিয়ে দিয়েছি অন্ধকারে অন্ধত্বের ছায়া মেখে,
কত সূর্যোদয় চলে গেল,কত নিশুতি রজনী ডেকেছিল স্নানের স্বাদ দেবে বলে;
সোনালী ভোরের আলো কামুকতায় বাড়িয়েছে হাত
শুধু আমাকে ছুঁবে বলে;
আমি সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছি বিনাবাক্যে।

আমার কপালের বিন্দু বিন্দু স্বেদ,
জেনে গেছে আমার ভিতরের অস্থিরতা, উত্তর-দক্ষিণ,পূর্ব-পশ্চিমে ক্রমাগত উচ্চারিত হচ্ছে
সহস্র কবিতা;যার প্রতিটি শব্দ লেখা হয়েছে নিকোটিনে;
নিকোটিনের নীল বিষ রক্তকণিকায় মিশে
দিবা নিশি আর্তনাদে, হাহাকারে প্রনয়ের ঠোঁটে পৌঁছে দিচ্ছে মাদকতার বাণী;
সে বাণীতে ইতিহাস গড়া হবে;
প্রচন্ড ঝড়ো থাবায় লণ্ডভণ্ড করে দেবে বিশ্বসংসার;
বিশ্ব সংসারের বালুকণারাও একদিন জেনে যাবে
কতটা চেয়েছি তোমায়।
…………………………………………..

নারীজন্ম

নারী কি দূর্বাঘাস
নরম, তুলতুলে?
নারী কি দশভুজা
ঝড়ো,প্রলয়ঙ্করী?
নারী কি স্রোতাস্বিনী
টলমল, ছল ছল?
নারী কি তানপুরা
রিনিঝিনি,গুনগুন?
নারী কি অশ্রুজল
অভিমান, ক্রন্দন?
নারী কি প্রেমালাপ
আকণ্ঠ চুপিচুপি?
নারী কি মায়াময়
বক্ষোরুহ জড়াজড়ি?
নারী কি নীলাম্বর
নীলজলে ছোঁয়াছুঁয়ি?
নারী কি অগ্নিতাপ
পুড়েপুড়ে একাকার?
নারী কি আসবাব
ঘরময় সাজসজ্জা?
নারী কি গৃহপালিত
শৃঙ্খলতার শেকল?
নারী কি মাতৃগর্ভ
প্রসবব্যাথা চিৎকার?
নারী কি যন্ত্রণা
বিষবৃক্ষের মন্ত্র?
নারী কি মাতৃদায়
বৃদ্ধাশ্রম ঠিকানা?
নারী কি জরায়ু
প্রাণের জঠরবাস?
নারী কি নূপুর
শিকলে কারাবাস?
নারী কি মাদীকুকুর
সন্তান উৎপাদন?
নারী কি মাংসপিন্ড
জিহ্বার লালাক্ষরণ ?
নারী কি প্রণয়লীলা
গভীরতর স্পর্শ ?
নারী কি মাতৃছায়া
ভালবাসার আঁচল?
নারী কি আশ্রয়
ভরাডুবি জল?
…………………………………………..

স্বপ্নজাল

এক সকালে স্নানে ভেজা চুল
এক সকালে হঠাৎ অবাধ্যতা
এক সকালে বুকের মধ্যে ঘুম
না হয় রাত্রি নেমে আসুক।

এক বেলা আপিস দিয়ে ফাঁকি
এক বেলা চোখে রেখে চোখ
এক বেলা রুষ্ট শুষ্ক ঠোঁট
না হয় ভেজা ভেজায় হোক।

এক দুপুরে তপ্ত কড়া রোদ
এক দুপুরে শক্ত তক্তাপোষ
এক দুপুরে উষ্ণ উষ্ণ শ্বাস
না হয় কাছে টেনেই আনুক।

এক বিকেলে আকাশ ভীষন নীল
এক বিকালে আলো ছায়ার খেলা
এক বিকেলে হাতের পরে হাত
না হয় একটু ভালবাসুক।

এক সন্ধ্যেয় যাওয়ার রাস্তা বন্ধ
এক সন্ধ্যেয় হঠাৎ লোডশেডিং
এক সন্ধ্যেয় সিঁড়ির ঘরের নিচে
না হয় হৃদকম্পন বাড়ুক।

এক রাত্রি জোছনা মাখামাখি
এক রাত্রি হাসনাহেনার গন্ধ
এক রাত্রি শুধুই জেগে থাকা
না হয় স্বপ্নলোকেই ভাসুক।
…………………………………………..

অকবিতার মৃত্যু

আড্ডা দিতে দিতে প্রেম,
আড্ডায় কবিতা।
আড্ডায় জাগতিক বোধের জাগরণ,
হঠাৎ উঁকিঝুঁকি দেয় প্রেম মানবিক বোধ!
অথবা এক পশলা বৃষ্টির কান্নাঝরা কবিতা,
হয়ত নাকের পরে ঘাম…
অথবা সন্ধেহারা পাখি,
কখনোবা শৈশব…
ধুলোবালি…
এক্কাদোক্কা…
কখনোবা রাত্রি… ঘোর অমাবস্যা।
অথবা পূর্ণিমা,ভরাডুবি আলো,ভরাডুবি জল…
কবিতায় তুমি… আমি… আমাদের সহস্র সন্তান,
কবিতায় যত আর্তনাদ,
স্বপ্ন, হয়ত স্বপ্নঘোর গ্লাস, থালা- বাটি ভেংগে চুরমার!
হয়তবা একটা ছোট্ট সংসার,
হয়ত জলের ভিতর পা…
হয়ত মুছে যাওয়া কিছু প্রিয় ক্ষণ,
অথবা দিন শেষে অবেলায়,
অবহেলায় আরো একটি অকবিতার মৃত্যু, সারি সারি লাশ
আমাদের অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন।
…………………………………………..

নিখোঁজ সমাচার

একটা রুমাল,
যার ভাঁজে অম্বরের নীল,
বসনে আগুন পলাশ,
মৃদু মৃদু মোহনীয়তায় ছড়ায় শিউলির সৌরভ,
গোপনে আড়ালে মুছে দেয়
হৃদে জমা অনুসম স্বেদ;
প্রণয়ের তোড়ে ভাসিয়ে নেয় নির্ঝরিণীর বুকে,
লহরীর তালে উন্মাদনায় বেঁধে রাখা
সেই রুমালটা
হঠাৎ নিখোঁজ হল!!
…………………………………………..

বাসন্তীকা

সুঘ্রাণে মো মো আম্র মুকুল
সেই সুখে হাসছে নদীর দু’কুল।

কাঁঠালের মুচি আর সাথে দিয়ে বড়ই
ভর্তার স্বাদেতে জিভে জল বেরুই।

শীত বুঝি এইবার দিল আড়ি
ললনার অঙ্গে বাসন্তী শাড়ি।

টিপ আর চুরিতে হলুদ তাহার
খোঁপায় দিল গুজে ফুলের বাহার।

প্রেম প্রেম গন্ধে ঋতুরাজ এলো
কচি কচি পাতারা সবুজ হলো।

ফুটেছে বৃক্ষে তব পলাশ শিমুল
প্রিয়তা আসবে বলে হৃদয় ব্যাকুল।

কৃষ্ণচূড়ার লাল হৃদয়াঙ্গম
প্রকৃতি মেতেছে মাতাল সঙ্গম।

সুখের পালঙ্ক মনের দোলায়
রজত মুহুরী আঁকে আলপনায়।

জানালার পর্দায় দখিনা বাতাস
কোকিলের কুহুরবে সুরেলা আভাস।

লাজুক ভোরে মেঘ শিশু হেঁটে যায়
এসো তবে সবে মিলে বসন্তে হারায়।
…………………………………………..

জাগরণ

ভুল করেই হাত দিয়েছিলাম পকেটে,
মূহুর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন;
মূহুর্তেই অগ্নি স্পর্শে পুড়ে গেল হাত।
না..দমে গেলে চলবে না,
দ্বিগুণ ইচ্ছেশক্তি নিয়ে হাত বাড়ালাম দ্বিতীয়বার,
অদ্ভুত!!
নিমিষেই বেড়িয়ে এলো
দাম্ভিকতা আর অহঙ নামক দুটো শব্দ;
রীতিমতো ভয় পেলাম,
কিন্তু ভয় পেলে চলবে না,খুঁজতে হবে হাতুড়ি;
ভাঙতে হবে অহঙবোধের দেয়াল!

আত্মবিশ্বাসীর মত হাতটাকে আরেকটু ভেতরে প্রবেশ করাতেই কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম,
কি বিভীষিকা!!
কি ভয়ানক কান্না!!
এত হাহাকার,অতৃপ্তি,অপ্রাপ্তি…
মায়া হলো খুব;হু হু করে উঠল বুকের ভেতরটা…
অস্থির হয়ে উঠলাম পূর্ণ করার প্রয়াসে;

পকেটের তলানিতে কি আছে
সেটা দেখতেই হবে এমনতর ইচ্ছেকে একটু প্রশ্রয় দিয়ে
হাত ছোঁয়ালাম পকেটের হৃদ বরাবর…
কি আশ্চর্য!!
শিরশির করে বইছে পবন,
নদীর কলকল শব্দে সুরের ইন্দ্রজাল,
ভাঁটফুলের বুনো মাদকতা;
মস্ত নীলাকাশে এক ঝাঁক বাঁধনহারা বিহঙ্গের ঝাঁপাঝাপিতে উন্মত্ত পাগলপারা
কিছু মূহুর্তকে দেখলাম চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে…দাম্ভিকতার আড়ালে।
এবার জাগাতে হবে;
মেকি অহঙ্কারকে চূর্ণবিচূর্ণ করতে
হাতুড়ির বদলে ভালবাসা তুলে দিলাম হাতে…
জাগরণের খেলায় মুখ থুবড়ে পড়ে রবে
হাহাকার… অতৃপ্তি… অপ্রাপ্তি…
…………………………………………..

মানুষ নই

আমাকে নত হতে শেখানো হয়েছিল
নত হতে হতে নুয়ে পড়ি মাটিতে…
নুয়ে যায় বিবেক,
নুয়ে যায় প্রতিবাদের স্বর…
কণ্ঠনালী চেপে ধরে প্রকাশ্যে চলে
ব্যভিচার… ধর্ষণ… হত্যাযজ্ঞ।

রোজ রোজ আমাকে খুন করা হয়,
রক্ত ঝরে রাজপথে দিবালোকে,
রোজ রোজ আমি ধর্ষিত হই,
খামচে ধরে থাই,উরু নতুবা স্তন…
টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায় জমা পড়ে ক্ষত আর ক্ষত,
তারপরও আমি নুয়েই থাকি।

আমাকে আরো নত হতে বলা হলো,
অতঃপর আমি কাদামাটি ছুঁই
ছুঁই বালুকণা…
ব্রহ্মাণ্ডের বালুকণা থেকে অনুকণা
সকলে জানুক আমি নারী… আমি দেহ… আমি মাংস…
আমি মানুষ নই।
…………………………………………..

বিমর্ষ

আমি কেমন থেমেই আছি অবশ, অসাড়,
হাত, পা গুলো নড়ছে চড়ছে
ভাত খাচ্ছি, চুড়ি পড়ছি,
এমনকি পায়ে নতুন জুতা পড়ছি
তারপরও ঠিক সাড়া পাচ্ছি না,
সময়গুলো ঠিকই গড়ায় আমি শুধু নড়ছি না।

ইচ্ছে করে বিহঙ্গ হই
আকাশ মাঝে চষে বেড়াই,
পাখির সাথে মেলি ডানা,
মেঘের বুকে বৃষ্টি হই,
ইচ্ছেগুলো ঠিকই ভাসে আমিই শুধু গুটিয়ে রই।

স্বপ্ন দেখি এক সকালে শিশির হয়ে তুমি আসো,
স্বপ্নে আমি শিশির গায়ে মাখি,
বসতবাড়ি, ভিটেমাটি কোলের পরে শিশু আঁকি
গালের পরে চুমু আঁকি,
স্বপ্নরা সব ঠিকই আছে শুধু আমি জেগেই থাকি।

কানের কাছে চুপটি করে
অনুভূতি জানান দেয়,ভালবাসায় রাংতা মাখি,
মনের কোণে যত্রতত্র মাখামাখি,
মাখামাখির অর্থ আমি ঠিকই বুঝি,
শুধু ওদের ছুঁতে পারি না,কানে এখন দুল পরি না।