সকাল থেকে পা দুটো কেমন ঝিম ঝিম করছে। বুকটাও খুব বেশি কাঁপছে। হাত দিয়ে দেখি সমস্ত শরীর জ¦রে পুড়ে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে শিয়রে দাঁড়িয়ে আছি। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। ভয়ে হৃদপি-টা শুকিয়ে আসছে। জিবে একটুও জল নেই। ভয় আর শঙ্কা নিয়ে সময় পার করলেও আজকের ভয়টা একেবারেই অন্যরকম। যদিও আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে কেটে যায় আমার প্রতি রাত। প্রতিটি দিন। এক একটি দিনকে আমি সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করি। বেলা শেষে সে আমার জন্য রেখে যায় কিছু হতাশা। যে হতাশার মধ্যে স্বপ্নের বীজ বুনি।
বার্ষিক পরীক্ষায় বসতে পারবো না জেনে মনটা খারাপ হলো। কেন জানি পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে হয় না। আমি যে খুব বেশি ভালো ছাত্রী তা কিন্তু নয়। তারপরেও অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রয়াস নিয়ে এগিয়ে চলতে ভালো লাগে। এর মধ্যে জীবনের একটা বৈচিত্র্য থাকে। নিজেকে নিয়ে অহংকার করায় আমি গৌরব অনুভব না। আবার নিজেকে ছোট ভাবতেও কষ্ট হয়। আমি যা যাতেই আশ^স্ত হতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। অন্যকে সম্মান জানানোর দৃষ্টিভঙ্গি আমার জীবনে এক নতুন মাত্রা। যা জীবনের গতিধারাকে বদলে দিয়েছে। দেখিয়ে দিয়েছে জীবনের সোনালি অধ্যায়।
জীবনসংগ্রামের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আছি। এক খুদে যোদ্ধা। সমস্যা ছাড়া যে জীবনের একটি দিনও ভাবতে পারে না। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছি। কখনো নিজের সাথে। কখনো পরিবারের। আবার কখনো সমাজের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে। আমার সেই নীরব যুদ্ধ কেউ দেখতে পায়। কেউ উপলব্ধিও করতে পারে না। তবুও আমি যোদ্ধা।
আমি পড়ার টেবিলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছি। গুরুজি আমাকে দেখে বললেন, ‘কাঁদিস না, মা। এ আধাঁর একদিন কেটে যাবে।’ প্রতিকূলতার সাথে টিকে থাকাই সাহসী মানুষের গল্প। আমি বললাম- ওস্তাদ জি, একটি ছোট্ট শিশুর কাছে সাহসী মানুষ হবার চেয়ে বাবার সুস্থতা অনেক বেশি প্রয়োজন। আমি একটি শিশু হলেও এক বছরে আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি বাবার জায়গা কখনো অন্যকে দেয়া যায় না। তা কেউ নিতেও পারে না। বাবা সন্তানের অব্যক্ত কথাটি কত সহজে বুঝে নেয়। অন্যকে তা বলেও বোঝানো যায় না। কতো তফাত মানুষের মধ্যে। সম্পর্কের কত গুরুত্ব।
জীবন্ত লাশ হয়ে পড়ে থাকা একটি মানুষ আবার বাবা। প্রাণ সংশয়ে থাকা এই ব্যক্তি এখনো আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে। অথচ নিজের ভবিষ্যতই অনিশ্চয়তায় ভরে গেছে। হয়তো একরাশ কালিমা তার সমস্ত আশাগুলোকে অন্ধকারে ঢেকে দেবে। সে জানে এই কথা। তবুও মন থেকে মানতে পারে না। আমার স্বপ্নগুলো তার বাঁচার প্রেরণা হতে চায়।
অস্তমিত সূর্যকে দেখে মানুষ কখনো আনন্দিত হয় না। আলো তার আভা দিয়ে রাঙিয়ে দেয় পৃথিবী। রাতের জ্যোৎ¯œাতেও মানুষ সুখ খুঁজে পায়। কারণ প্রকৃতিতে আঁধার নয়, মানুষের জন্য এক বিশাল সম্মোহিত শক্তি। বাবাকে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারি না। তাকে আমি না ভাবতে পারছি আলো, আর না অন্ধকার। তবুও সে আমার শক্তির এক অফুরন্ত উৎস।
জীবন থেকে সে সময়টুকু হারিয়ে গেলো জানি তাকে আর ফিরে পাবো না। ভবিষ্যতের দিনগুলো থেকে হয়তো আজকের সময়টা আমার কাছে অনেক মূল্যবান। সমস্ত ক্লান্তি শেষে বাবার একরাশ হাসি আমার সব দুঃখ-ব্যথাকে ভুলিয়ে দেয়। এইতো বেশ। এখানেই জীবনের সুখ। জীবনের স্বার্থকতা।
আমি স্যারকে দেখে চা করতে গেলাম। যদি এমন কাজের সাথে আমি কখনো অভ্যস্ত ছিলাম না। তবুও ইদানীং সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে অবিরত। পারিবারিকভাবেই স্যারের সাথে আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক। তা অনেক আগে থেকে। তাছাড়া তিনি আমার গুরুজি। বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে বাবা তাকে সাথে করে নিয়ে আসতেন। স্যারও অন্যরকম। বেশ খুশি হতেন। বাবা দাওয়াতে না করার শক্তি তার ছিল না। একদিন স্যার আমাকে বললেন- জানিস মা, তোর বাবা অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। তাইতো তাকে এত পছন্দ করি।
তোর মায়ের রান্না অত্যন্ত চমৎকার। দেখলেই জিবে জল আসে। আমি স্যারের কথায় একটু হেসে দিলাম। জানি, স্যার অত্যন্ত রসিক। ভদ্র গোছের মানুষ। যাকে শত আবদার করেও অনেকে বাসায় নিতে পারে না। সেই মানুষটি অনায়াসেই আমাদের বাড়িতে চলে আসে। মায়ের মুখেও স্যারের অনেক প্রশংসা শুনেছি।
চা করে নিয়ে এলাম। স্যার চায়ে মুখ লাগালেন। বাবা স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বাবাকে দেখে নীরবে কেঁদে যাচ্ছি। এইভাবে বাবাকে দেখবো ভাবতেও পারিনি। বাবা বলছেন, কেবল চা-ই খাচ্ছিস কেন এখান থেকে দুটো ফল নে। স্যার চা খাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু চিন্তার গভীরতায় গিয়ে যেন বাবার কথা-ই ভাবছেন। চা খাবার মাঝে বাবা স্যারকে লক্ষ করে কয়েকটা কথা বলেছেন, স্যার কিন্তু তা শুনতে পায়নি।
এবার বাবা একটু বিরক্ত হয়ে গেলেন। কী খবর! আমি তোকে কতগুলো কথা বললাম, তুই তার একটার জবাব দিলি না। তুই আমায় কিছু বলেছিস ভাই? বলেছি,‘তুই আমার বন্ধুই নও, তুই আমার ভাই। জীবনযুদ্ধে আমি এক পরাজিত সৈনিক। আমি আমার মেয়ের কষ্ট দেখতে পারি না। ওর জন্য কিছু করতেও পারি না। আমি এক দুর্ভাগা বাবা।’ যদি পারো আমাকে ভাই বলে মেনে নিস। ওরাই তোকে পরম বন্ধু বলে জানবে। তুই ছাড়া ওদের যে আর কেউ রইল না।

ওর কথা শুনে আমি আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না। বেশ কান্না পেল আমার। তবুও আমি স্বাভাবিক থাকলাম। আর একটা কথাও বললাম না কারো সাথে। কেবল ওর কথায় হ্যাঁ-না বললাম। ও বিষয়টা বুঝে আর কথা বাড়ালো না। আমার চোখের ভাষা ওকে বলে দিয়েছে ওকে আমি ভালোবাসি। ওর অশুভ কথা আমাকে বাকরূদ্ধ করে দিয়েছে।
ওঠার আগে আমি ওর মেয়েটিকে কাছে নিয়ে বললাম- মামণি, ভেঙ্গে পড়ো না। সবই ঠিক হয়ে যাবে। অপেক্ষা করো আর ¯্রষ্টাকে ডাকো। তিনি চাইলে সবই পারেন। শূন্য মরূদ্যানেও গজিয়ে উঠে সবুজের নীরবতা। কাঠফাটা রোদেও দেখা মেলে বৃষ্টির ঝর্ণাধারা। এই কথা বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম। যদিও একটুখানি বসার খুব আবদার ছিল। কিন্তু সময়ের বহমানতায় আমি তাকে একপ্রকার নিরাশই করলাম। বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
দীর্ঘ একমাস ধরে ওর সাথে আর কোনো যোগাযোগ নেই। আমি দেশের বাইরে। একটা বিশেষ প্রশিক্ষণে এসেছি। ও গেঞ্জি পরতে দারুণ পছন্দ করে। আর চকলেট দেখলে এখনো বাচ্চা ছেলেদের মতো হয়ে যায়। তাই ওর পছন্দ মতো কয়েকটি গেঞ্জি আর চকলেট নিয়েছি। ওকে অনেকদিন দেখি না। এটাই ওর জন্য বিশেষ উপহার।
ফ্লাইট থেকে নেমে আমি ওর বাড়ির উদ্দেশেই রওনা হলাম। ভাবলাম, বাড়ি যাবার আগে ওকে দেখে যাবো। যেহেতু ডাক্তারের সময় সীমা অনুযায়ী ওর অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এতদিনে ও উঠে দাঁড়াবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। জল্পনা-কল্পনায় নিয়ে পথ চলছি। ওর বাড়িতে প্রবেশ করতেই রাইসা আমার সামনে এসে হাজির। ও আমাকে সালাম জানালো। পরক্ষণেই আমি ওর কাছে জানতে চাইলাম, তোমার বাবা কেমন আছে? ও বলল, ভালো। আমি আনন্দে হেসে দিলাম। এর চেয়ে খুশির খবর বোধহয় আর কিছু হয় না। একজন মানুষ মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছে।
আমি ঘরে উঠেই ওকে আর দেখতে পাচ্ছি না। এবার আমার ধারণা সত্যিই হলো। ও পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে। আমি রাইসাকে বললাম, তোমার বাবা কোথায়? ও বলল, ঘরের বাইরে। কোথায় পাওয়া যাবে? নদীর ধারে। ওখানে কী করছে? কিছুই না।
রাইসা আমাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে এলো। অথচ এখানে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। আমি বললাম, তুমি আমাকে এ কোথায় নিয়ে এলে? আপনি তো বললেন- বাবাকে দেখবেন। ওই যে বাবা। আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম ইট পাথরে ঘেরা সেই ছোট্ট সমাধিটির দিকে। যেখানে ঘুমিয়ে আছে আমার প্রিয় বন্ধু। আমি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম- তুমি আমায় ছেড়ে এভাবে চলে গেলি! তুই হারিয়ে যাসনি বন্ধু। তুই বেঁচে থাকবি আবেগে নয়, বিশ^াসে। আমার সৃষ্টিতে। তুই তোর মেয়েকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিস সেখানে আমি ওকে পৌঁছে দিতে পারবো কি না জানি না। তবে একজন মানুষ হয়ে পাশে রইব। ভালো থাকিস বন্ধু।