আজ নিরু’র বিয়ে হয়ে গেল, বরের সাথে নিরু গ্রাম ছেড়ে বড় শহরে চলে গেল৷ নিরু’র বাবা নেই৷ খুব অল্প বয়েসে বিধবা হয়েছে নিরু’র মা৷ নিরু তখন নয় কি দশ বছরের৷
তারপর থেকে টানাপোড়েন৷ নিরু’র বাবা বেঁচে থাকতে যে, খুব বেশী সচ্ছলতা ছিল সংসারে, এমন নয়৷ তবু ভরসা ছিল৷ সংসারে এক একজন মানুষ এক একটা ভরসা৷
ভরসা’টা একদিন হঠাৎ করে চলে গেলে মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ে৷ নিরুদের মাথাতেও আকাশ ভেঙ্গে বাজ পড়েছিল সেদিনই৷
সেই থেকে যখন যা কাজ পেয়েছে নিরু’র মা আয়েশা বেগম তাই করেছে৷ কখনো গার্মেন্ট’স এর ছোট চাকরী, কখনো সেলাইয়ের কাজ, কখনো অন্যের বাড়িতে গভর্নেস এর কাজ৷
কপাল’টা ভালো শ্বশুরের আমলের একটা দেড় তলা ছাদ ছিল মাথার উপরে৷ নীচতলায় একটা পরিবার থাকার মতো সব ব্যবস্থা আর ছাদের উপর এক ধারে দুইটা ঘর৷
সেই দুই ঘরেই শুরু হলো আয়শা বেগমের নতুন জীবনের সংগ্রাম৷ নীচ তালা’টা ভাড়া দেয়া হলো৷
মাস গেলে একটা নিশ্চিত টাকা আসার পথ হয়ে থাকলো৷ এইভাবেই নিরুর পড়ালেখা, মা মেয়ের পরনের কাপড় আর পেটের ভাতের ব্যবস্থাটা চলে যায়৷
সেও দশ বছর আগের কথা৷ নিরু এখন বড় হয়েছে৷ আই এ পাশ করেছে৷ তারপর আর কলেজে যাওয়া হয়নি৷ আয়শা বেগমের মাথায় একটাই চিন্তা, নিরুকে বিয়ে দেয়া৷
তাহলেই তিনি চিন্তা মুক্ত হোন, মরতে পারেন নিশ্চিন্তে৷ আর তাই দরকার একটা সরকারী চাকুরী করে এমন ছেলে৷ মাস গেলে বেতন পাবে৷ আজীবন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা৷ পাড়া গায়ের স্বল্প শিক্ষিত আয়েশা বেগমের মাথায় এর চেয়ে বেশী কিছু আর কোন চিন্তা আসেনা৷
তাই নিরু’র বি.এ ক্লাসেও আর যাওয়া হয়নি৷ পাড়ার এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায় আর প্রেম করে বেকার ছেলে মুহিতের সাথে৷
মুহিত দেখতে শুনতে সুন্দর, লম্বা সুঠাম শরীরের অধিকারী, দুই বারে বি.এ পাশ করা ভবঘুরে ছেলে৷ কোন কাজ কর্ম নেই,কাজ করার মনোযোগ বা ইচ্ছা কোনটাই নেই৷ ভাইয়ের সংসারে থাকে খায়৷ কাজের মধ্যে একটা কাজ মন দিয়ে করে তা হলো নিরুকে ভালোবাসে৷ স্বপ্ন দেখে ঘর বাধা’র, স্বপ্ন দেখে সংসার করা’র৷
কোন কাজ কর্মহীন ছেলে কে কেইবা পছন্দ করে৷ বেকার বলে সবাই অবহেলার চোখে তাকায় মুহিতের দিকে৷ সারা দিন টো টো কম্পানীর ম্যানাজার হয়ে পাড়ার রাস্তায়, রাস্তায়, টং দোকানে ঘুরাঘুরি আর লুকিয়ে নিরুর সাথে দেখা করা নদীর ধারে, আম বাগানে৷ আর নতুন সিনামা হলে এলেই… সিনামা দেখতে যাওয়া৷
মুহিতের পরিবারেরও একই চিত্র৷ বাবা নেই, বুড়া মা, বড় ভাই আর ভাইয়ের বউ পরিবারে৷ বড় ভাইয়ের নিত্য উপদেশ, ভাবীর মুখ ঝামটা আর বিরক্তি থেকে মুহিত কে আগলে রাখে বুড়া মা৷ কিন্তু তা আর কত দিন…
একটা সময় এলো নিরুর বিয়ের কথা চলতে থাকলো জোরেসোরে৷ ঘটক আসে প্রায় রোজ রোজ বাড়িতে৷ এক নজর দেখে পছন্দ হওয়ার মতোন সুন্দরী নিরু৷ ভয়টা সেখানেই৷ পাত্র যে কোন দিন ঠিক হয়ে যাবে৷ একটা সরকারী চাকুরিজীবী পাত্র৷
নিরু এবার পায়ে ধরে মুহিতের৷ যে কোন একটা চাকরি তুই জোগাড় কর… অথবা চল আমরা পালিয়ে যাই এই সমাজ ছেড়ে! কান্নায় ভেঙ্গে পরে নিরু৷
তুই মাকে থামা, বিয়েটা ভেঙ্গে দে,
তুই একবার মায়ের কাছে যা,
আমি তোকে ছাড়া কি ভাবে থাকবো? অন্য কারোর সাথে সারাজীবন সংসার কি ভাবে করবো মুহিত?
ভালোবাসার নিদারুন কষ্ট দুটি হৃদয় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ৷ দূরে যাওয়ার যন্ত্রনা, হারানোর বেদনা আর একটা চাকুরী যেন নিয়তি হয়ে দাড়ালো দু’জনের মাঝে৷ দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা অনিশ্চিত ভবিষ্যত সামনে এসে দেয়াল তুলে দিলো৷
মুহিত ছুটে যায় নিরু’র মায়ের কাছে৷ অনুরোধে আর্তিতে নত হয়৷ একটু সময় ফরিয়াদ করে৷
আয়েশা বেগম অত্যন্ত স্নেহে মুহিতের মাথায় হাত রাখে৷ পরম মমতায় জীবনের বাস্তবতার কথা বলে৷ আয়েশা বেগম মুহিত কে পুত্র স্নেহ করে কিন্তু বেকার ছেলে কে মেয়ে জামাই হিসাবে দেখতে চায় না৷ নিজের জীবনে যে কষ্ট সহ্য করেছে তা নিরুর জীবনে আসুক এটা চায় না তিনি৷ আর তাই মাতৃ স্নেহে মুহিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, বলে— আমি তোমাকে এক মাস সময় দিলাম বাবা৷ যদি একটি সরকারী চাকুরি জোগাড় করতে পারো, নিরুকে তোমার হাতে তুলে দিবো, তখন আমার কোন আপত্তি থাকবেনা৷
সরকারী চাকুরি ! তাও আবার একমাসে ? কোন প্রাইভেট চাকুরী পাওয়াও হয়ত সম্ভব নয়, এই অল্প সময়ের মধ্যে৷
মুহিত তবুও একটা যে কোন চাকুরীর জন্য ফাইল হাতে বিভিন্ন অফিসে, অফিসে দিন রাত চষে বেড়াতে লাগলো৷ পায়ে হেঁটে, অফিস পাড়ায়, পাড়ায় ঘুরে, ঘুরে কোথাও আশ্বাস পেলো আর কোথাও নো এন্ট্রি নোটিশ বোর্ড৷
মুহিতের পায়ের আধা পুরোনো চামড়ার সেন্ডেল আরো ক্ষয়ে গেল, পীচঢালা পথের গরম বুঝি মুহিতের পা বেয়ে মাথা অব্দি উঠতো, মনে করিয়ে দিতো দিন শেষ হয়ে আসছে ৷
অতঃপর একটি মাসও শেষ হয়ে গেল৷

নিরু বরে’র সাথে শহরে এসে নতুন বাসায় উঠেছে৷ সুন্দর পরিপাটি , গোছানো জীবন৷ হিসাব করা, ছক বাঁধা জীবন৷ নিরু’র বর শাহেদ কত বেতন পায় নিরু ঠিক জানে না৷ কিন্তু নিরুর কাছে মনে যেন ওরা যেন একটু বেশী সচ্ছল, এতো সচ্ছল জীবনে নিরু অভ্যস্ত ছিল না৷ সেটাও কারন হতে পারে৷
সব কিছু নতুন , সংসার , সংসারের আসবাব , মানুষটা পর্যন্ত৷
অথচ এখানে মুহিত থাকার কথা ছিল৷ মুহিত কে নিরুর খুব মনে পরে৷ খুব চিন্তা হয় ৷ জীবনে কি করবে ও৷ এতো অগোছালো জীবন কারো’র হয়! পরিকল্পনাহীন ছন্নছাড়া জীবন!
ময়লা শার্ট’টা কে ধুয়ে দিবে, সেন্ডেল জোড়া কে এগিয়ে দেয়, ঘেমে গেলে কে ঘাম মুছে দেয়, পাশে বসে কে ভাত বেড়ে দেয়!
খেতে বসে বা অবসরে মায়ের চেয়ে বেশী মুহিতের শুকনো মুখটা ভেসে উঠে কল্পনায়৷
এদিকে রতনপুর গ্রামে মুহিত বড় ভাইয়ের সুপারিশে অনেক চেষ্টা করে অবশেষে একটা কোম্পানীতে কাজ পায়৷ কয়েকদিন মনোযোগী, তারপর আবার অনিয়ম৷ সময় মতো অফিসে না ঢোকা, সময়ের আগে বের হয়ে যাওয়া, নিজের টেবিলে বসে গালে হাত দিয়ে ঝিমানো…
তাই চাকরীটা আর কন্টিনিউ করা হয় না৷ নিরু কেমন আছে? শুধু নিরু’র কথা মনে হয় ! রাতে ভালো ঘুম হয় না৷ যদি কিছু টাকা থাকতো একটা স্বাধীন ব্যাবসা করতো পারতো, নিজের মতো করে৷ অফিসে বসের তাবেদারী সহ্য হয়না৷
যেই চিন্তা, সেই কাজ৷
মুহিতের মাথার ভেতর ঘুরপাক করে একটা স্বাধীন কাজ৷ নিজের স্বাধীন ব্যাবসা৷ কিন্তু সেতো অনেক টাকার প্রয়োজন৷ কোথায় পাবে এতো টাকা৷ স্কুল কলেজের দুই তিনজন বন্ধু আছে শ্রীনগর এ৷ ভাল অবস্থায়৷ কেউ ভালো চাকরী করে, কেউ ভালো ব্যবসা করে৷ একবার নিরু’র বাসাতেও যাওয়া যায়৷ নিরু বড়লোকের বউ , কিছু না কিছু তো দেবেই৷ নিরুকেও একটু দেখে এলো৷ ওর জন্য বুক বাম পাশটায় ব্যথা চিন চিন করে৷ মুখটা খুব কাছে থেকে চোখে ভেসে উঠে৷
সময়টা বর্ষাকাল চলছে৷ সারাদিন আকাশ কালো করে মেঘ ছেয়ে থাকে, রোদ উঠে কোন কোন দিন৷ এবার মনে হয় বর্ষার প্রকোপ’টা একটু বেশী৷ বিরামহীন বৃষ্টি হচ্ছে কয়েকদিন ধরে৷ মাঝে মাঝে একটু ধরে আসে আবার অঝোরে নামে৷
মুহিত শ্রীনগর এসে উঠেছে শফিকের বাসায়৷ শফিক ওদের রতনপুর গ্রামের হাইস্কুলের হেড মাস্টারের ছেলে৷ ভালো ছেলে, ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট৷ বিদেশ থেকে এম বি এ করে এসেছে ৷ নিজেই এড ফার্ম চালায়৷ শফিকের বউ’টাও খুব ভাল৷ উটকো মেহমানে বিরক্তি প্রকাশ করেনি একটুও৷ বরং খুব আপন জন , যেন প্রায়ই দেখা হয় , সেভাবেই মুহিতের সাথে কথা বলছে৷
শফিকের বউ টেবিল ভর্তি করেছে বিভিন্ন রকমের রান্না দিয়ে৷ মুহিতের পেটে ক্ষুধা ছিল প্রচন্ড৷ বন্ধু আর বন্ধু পত্নীর আন্তরিকতায় সব লজ্জা সংকোচ চলে গেল৷ পেট ভরে, শান্তি করে খেল মুহিত অনেক দিন পরে৷
রাতের খাবারের পর মুহিত সব কথা খুলে বললো শফিক কে৷ শফিক মনোযোগ দিয়ে শুনলো৷ বলল তোর চিন্তা মন্দ নয় ৷ তবে আমার মনে হয়না খুব একটা সুবিধা করতে পারবি৷ আমি দিবো, রেজা দিবে৷ আর তারেক কে তো তুই চিনিস, বেটা হার কিপ্টা, ওর অফিসে গেলে একটা সিগারেট খাওয়াতে বেটার জান বের হয়ে যায়৷ ওর আসা বাদ দে৷ কিন্তু লাখ খানেক টাকা ছাড়া কোন কাজই শুরু করতে পারবি না৷
শফিক মুহিতের পিট চাপড়িয়ে অভয় দেয়৷ চিন্তা করিস না, এসেছিস যখন একটা কিছু হবে৷ আমি আছি দোস্ত৷ নিশ্চিন্তে ঘুম দে… আমি দেখছি কি করা যায়, এবার যে তুই একটু জীবন নিয়ে সিরিয়াস হলি বেটা তাতেই আমি খুশী, শফিক হাসতে হাসতে রুম থেকে চলে যায়৷
নিরু কেমন আছে, যা আহ্লাদি মেয়ে, বরটা নিশ্চয় খুব যত্ন করে রেখেছে৷ মুহিত চোখ বন্ধ করে নিরুর কথা ভাবে৷
প্রতিদিন না দেখা হলে কেমন গাল ফুলিয়ে রাখতো, সিনামা হলে বসে অন্ধকারে শক্ত করে মুহিতের হাত ধরে রাখতো, কোন ভয়ের দৃশ্য বা কষ্টের দৃশ্যে৷
রতনপুরের নদীর ধার, বড় আম বাগানটার কথা ভাবতে ভাবতে মুহিত ঘুমিয়ে যায় ৷
“আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে”
খুব সকালে ঝুম বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো মুহিতের৷ জানালা দিয়ে বাহিরে অপরুপ প্রকৃতির শোভা যেন মন ভোলানো চোখ জুড়ানো৷
শ্রীনগরের এই এলাকাটা অনেক সবুজ৷ বাসার আশে পাশে নানা রকম গাছ৷ রুক্ষ
যান জট ময় নয়৷ শান্ত নিরিবিলি৷ কোলাহল মুক্ত৷
শুয়ে শুয়ে মুহিত মনস্থ করে আগামীকাল নিরু কে দেখতে যাবে৷ রতনপুর থেকে আসার সময় চাচীর কাছে থেকে নিরু’র বাসার ঠিকানা নিয়ে আসছে মুহিত৷ নিজের ভাবনার কাছে মুহিত লজ্জিত হয় ৷ ও এতো নিরু’র কথা কেন ভাবছে? নিরু’র নিজের সংসার হয়েছে, সেখানে ও সুখেই আছে৷ তবে কেন?
আজ রেজার অফিসে যাবে, একটু ঘুরাঘুরি করে দিনটা পার হয়ে যাবে, আর রাতটা কোন রকম চোখ বুজে কাটিয়ে দিবে ৷
দুপুরে রেজার অফিসে লাঞ্চ শেষ করে বাহির হয় মুহিত৷ শহরের মাঝখানেই একটি টলমলে পানির ঝিল৷ বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা আছে৷ একটু পর পর ব্রেঞ্চ পাতানো আছে৷ চারিদিকটা অনেক সবুজে সবুজে ভরা৷ মিহি বাতাস শরীর জুড়িয়ে দেয়৷ ঝিলের পানিতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলছে৷ বেং বেরং এর বাহারী৷
রাতে খাবার টেবিলে বসে শফিকের সাথে সারাদিনের কাজ কর্মের অগ্রগতির বিষয়ে আলাপ হয়৷ রেজা’র বিষয়ে তারেকের বিষয়ে কথা হয় ৷ শফিক খুবই বন্ধু বাৎসল্য৷ স্বজন মানুষ৷ মুহিতের বিষয়টা আন্তরিতার সাথে ভেবেছে৷
মুহিতের মানিব্যাগ এ এখন অনেক টাকা৷ ব্যবসা নিয়ে এখন সিরিয়াসলি ভাবা যায়৷ কাল যাবে নিরু’র সাথে দেখা করতে৷ ফিরে এসেই কাজে মনোযোগ দিবে মুহিত৷ অঝর বৃষ্টি বাহিরে, মুহিত ঘুমিয়ে যায় বরষা মুখর রাতে৷
সকালে ঘুম ভাঙ্গল বৃষ্টির শব্দে৷ কখন থামে ঠিক নেই৷ সহসা বৃষ্টি থামবে বলে মনে হয় না৷ আকাশ কালো করে মেঘ জমে আছে৷ বিছানা ছেড়ে উঠে পরে মুহিত৷ তৈরী হতে হবে, বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করা বোকামী হবে৷ তৈরী হয়ে যায় মুহিত৷ বেড়োনোর সময় শফিকের বউ পিছন থেকে ডাক দিল৷
মুহিত ভাই, আপনার বন্ধুর রেইনকোট’টা নিয়ে যান৷ ওতো গাড়িতে অফিসে যাবে৷ এক্সট্রা ছাতা ও নেই…
মুহিত ইতস্তত করে৷ থাকনা ভাবী লাগবে না৷
কি যে বলেন, ভিজবেন নাকি? গায়ে পড়ে নিন৷ যা বৃষ্টি!

কিছু দূর হেঁটে এসে মেইন রাস্তায় বাস এ উঠে মুহিত৷ নিরুর বাসা ওল্ড টাউনে৷ বাসে সিট নেই বসার, গাদাগাদি করে সবাই উপরের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলছে৷ মুহিত ও ঝুলছে৷ বৃষ্টিতে অনেকেই ভিজে জবজবে ৷
ঘন্টা খানেক লেগে গেল ওল্ড টাউনে পৌঁছাতে৷
পথ ঘাট গা ঘিনঘিনে কর্দমাক্ত৷ ঠিকানা অনুযায়ী বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ায় মুহিত৷ পুরানো দিনের বড় সড় একটা দালান বাড়ি৷ টানা বরষায় দেয়াল স্যাঁতস্যাঁতে দেখাচ্ছে৷
দরজার পাশে একটা কলিং বেল দখা যাচ্ছে৷ বেল এ চাপ দেয় মুহিত৷ অনেক বার , কিন্তু কেউ দরজা খোলেনা৷ চিন্তায় পড়ে যায় মুহিত , বাসায় কেউ কি নেই৷ এতোটা পথ এতোটা আশা নিয়ে এসে ফিরে যাবে , নিরুকে একবার দেখবে না…
বিফল মন নিয়ে মুহিত ঘুরে দাঁড়ায় চলে যাবার জন্য ঠিক তখনি দরজাটা খুলে গেল ৷
—মুহিত
ডাক শুনে মুহিত ফিরে তাকায়৷ দরজায় নিরু দাঁড়িয়ে আছে৷ বেশ সাজ গোজ করা৷ বাহিরে বের হবে বোধ হয় !
ঝলমল করছে নিরু৷ কি সুন্দর লাগছে দেখতে,
—ভেতরে আয় ,
মুহিত ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে৷কী রে দরজা খুলতে এতো দেরি করলি যে? কোথাও যাচ্ছিস? এতো সাজ গোজ
গহনা পড়ে আছিস যে?
—আমি না বড় লোকের বউ? সব সময় এভাবেই থাকি৷ আমার বর পছন্দ করে৷
—ওহ, তা তোর বর কই ? ডাক
—তাকে কোথায় পাবি, তিনি তো রোজ রোজ এ দেশ ও দেশ করে বেড়ান৷এখন ইতালিতে৷
—ও, তাহলে তো আমার আসা ঠিক হয়নি৷
তুই একা বাসায় , তোর বর যদি সন্দেহ করে?
—তিনি অনেক ভাল মানুষ৷
—আদর করে?
—দেখিস না কত সেজে গুজে থাকি, আদর তো করে৷ তুই কি করিস রে এখন৷ নাকি আগের মতোই ঘুরে বেরাসরে…
—অনেক বড় ব্যবসা করি৷ নিজের এড ফার্ম, স্বাধীন ব্যবসা ঘুরিফিরি , এখানে আসছি একটা শ্যুটিং এর কাজে , ভাবলাম তোর সাথে দেখা যাই৷
—ভালো করেছিস, মা কেমন আছে রে ?
—ভালো আছে, তুই তো আর গ্রামে গেলি না,
—গ্রাম আর ভালো লাগেনা৷ কি আছে রতনপুর,
নিরু রান্না ঘর যায়, খাবারের ব্যবস্থা দেখতে৷ মুহিত সারা বাড়ি চোখ বুলায়৷ আভিজ্যের ছোঁয়ায় মলিনতার ছাপ পড়েছে৷ সব আছে, যত্ন নেই৷ বসার রুমে এসট্রে ভরা সিগারেটের ছাই৷ টেবিলের উপর পানির বোতল গ্লাস, আর…
মুহিত হতবাক হয়ে যায়…
নিরু রান্না ঘর থেকে ফিরে আসে,
—আজ ঘরে তেমন কিছু নেই৷ তোর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে, অনেক ক্ষুধা লেগেছে না রে? আমি বাহির থেকে কিছু কিনে নিয়ে আসি…
—লাগবেনা নিরু, আমি বরং যাই ৷
—তুই না খেয়ে কোথাও যাবিনা৷ আমি যাবো আর আসবো৷ শোন তোর রেইন কোট’টা নিয়ে গেলাম৷ বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে৷
নিরু মুহিতের রেইন কোট’টা গায়ে দিয়ে বের হয়ে যায়, কারেন্ট নেই, পুরা বাড়ি অন্ধকার৷ এর মধ্যে দড়জায় আওয়াজ, নিরু কি এতো তারাতারি ফিরে এলো? দড়জা খুলে দেয় মুহিত৷ হুরমুড় করে একটা পয়তাল্লিশ পঞ্চাশ বছরের লোক ঘরে ঢুকে পড়লো৷
মুহিত অবাক হয়৷ এটা কি নিরুর বর?
লোকটি মুহিতের দিকে তাকিয়ে বিশ্রি করে হাসে৷
—নতুন নাকি
লোকটি পান চিবোতে চিবোতে সোফায় বসে পড়ে৷ ম্যাডাম কই গেলেন?
—বাহিরে গেছে৷ আপনি?
—এই যে বাড়িটা দেখছেন এটা ভাই আমার৷ ছয় মাসের ভাড়া বাঁকী, অবলা মেয়ে মানুষ দয়া করে থাকতে দিয়েছি৷ কারেন্ট আলা’রা লাইন কেটে দিয়ে গেছে, ডিস লাইন, টেলিফোন লাইন সব কাটা৷ আমি দয়া করে যা দেই তাই দিয়ে কোর্টের কেস চালাচ্ছে৷
—কেস?
—কি বলছি মশায় , অফিসের ফান্ড জালিয়াতির কেসে ফেসে গেছে৷ অনেক শক্ত কেস৷ এক ধাক্কায় দুই বছরের হাজত বাস৷
মুহিতের মন খারাপ হয়ে যায়৷ কি দেখতে এলো, কি দেখছে? আরো আগে নিরু’র খবর নেওয়া উচিত ছিল৷ নিরু নিশ্চয় বাড়িতে কিছুই জানায়নি, নিরু’র মতো হাজারো মেয়েরা কিছু বলতে পারেনা৷

—ছয় মাসের ভাড়া কত? আমি পুরা টাকা দিয়ে যাচ্ছি, আপনি আর এখানে আসবেন না৷ দুই মাস পর আমি এসে নিরুকে নিয়ে যাবো৷
—আমার পাওনা মিটিয়ে দিলে আমি আর কেন আসবো? আমি তো উপকার করতেই আসি, বিশ্রি করে হাসে লোকটা৷ আরো কত জন উপকার করতে আসে, আপনেও এসেছেন হি হি হি হি,
—আপনাকে আর উপকার করতে হবেনা৷
মুহিত সব পাওনা মিটিয়ে দেয়৷ কোন বিবাদে যায়নি৷ লোক’টা ভালো না, নিরু’র ক্ষতি করতে পারে,
ভাই সাহেব একটা উপকার করেন, কালকের মধ্যে কারেন্ট আর টেলিফোনের ব্যবস্থা করে ফেলেন৷
—অবশ্যই লেগে যাবে, টাকা দিয়েছেন৷ অবশ্যই লেগে যাবে৷ লোকটি নোংরা হাসি হাসতে হাসতে চলে গেল৷
নিরু এলো৷ হাতে খাবারের প্যকেট৷ কেমন যেন অস্বস্থিতে নিরু, চোখের দিকে না তাকিয়ে কথা বলে…
—কেউ এসেছিল মুহিত,
—না তো, এই বৃষ্টির মধ্যে কে আসবে, আমি এসে তোকে ঝামেলায় ফেললাম৷ এদিকে একটা বড় কাজ ছিল, ঐ যে শ্যুটিং
ছিল…
—হুম একবার বললি তো, অনেক বড় এড ফার্ম,
—একটা টেলিফিল্ম শুরু করবো খুব শীঘ্রই
—আমাকে নিবি তোর সিনেমাতে,
—তুই কি পারবি অভিনয় করতে , অভিনয়ে তুই খুব কাঁচা৷ ধরা পরে যাস৷ মনে আছে তোর ? তুই যে আমার সাথে লুকিয়ে দেখা করতে আসতিস, চাচী কিন্তু ঠিকই বুঝতো,
নিরু টেবিলে খাবার লাগায়, বাহিরে বৃষ্টি , অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশ, ঘরেও তেমন আলো নেই… এই মুহিত খেতে আয়৷ তোর মুখটা শুকিয়ে আছে, বৃষ্টির দিনে সব দোকান বন্ধ , কিছুই পেলাম না৷ তুই তো খিচুরী পছন্দ করিস…
মুহিত হাত ধুয়ে খেতে বসে৷
—তুই খাবিনা?
—কখন খাওয়া শেষ আমার৷ তোর সিনামার নাম কি রে,
—আমার হবি কিনি বল,
—এটা সিনামার নাম, চলবেনা দেখিস৷ এমন খিটমিটে নাম শুধু তোর খুপরিতেই আসা সম্ভব৷ আবার কবে আসবি এ দিকে?
—আসবো, যেদিন এদিকটায় শ্যুটিং থাকবে৷ আর শোন আমার পরের টেলিফিল্মের নায়িকা কিন্তু তুই৷ তোর বরের অনুমতি নিয়ে রাখিস৷
—সে তো বিদেশে, কথা হলে তোর কথা বলবো৷
মুহিত সোফায় গা এলিয়ে একটা সিগারেট ধরায়, শফিকের দেয়া প্যকেট’টা৷ নিরু টুক টাক কাজ গুছিয়ে নেয় ৷সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায়৷ একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলের উপর রাখে৷ মুহিতের মুখোমুখি বসে৷ কিছুক্ষন কেউ কোন কথা বলে না৷ কিন্তু না বলা অব্যক্ত যতো কথা, হৃদয় থেকে হৃদয়ে আদান প্রদান হয়ে যায় কোন এক অলৌকিক ক্ষমতায়…
মুহিত হঠাৎ ছটফট করে উঠে৷
—যাই রে নিরু, সন্ধ্যা হয়ে এলো, তোদের এদিকটায় কি লোডসেডিং বেশী? মনে মনে ভাবে, আজ রাতটাও বেচারী অন্ধকারে একা একা থাকবে…
রেইনকোট’টা পরে নেয় মুহিত৷ দরজা খুলে বাহির হলো ৷ নিরু এসে দাড়ালো,
—আবার আসবি তো মুহিত? নিরু’র কন্ঠে অনুনয় ৷
—আসবো৷ অপেক্ষা করবিতো?
নিরু’র নির্লিপ্ত দুটি চোখে প্রশ্ন রেখে মুহিত অঝোর বৃষ্টির মধ্যে হেটে যায়, আর পেছন ফিরে তাকায় না…

পরিশিষ্ট—বাস স্টপেজ এ এসে মুহিত রেইনকোটের পকেটে হাত দিতেই কি যেন হাতে ঠেকলো৷ বের করে দেখে নিরু’র গলার একটা মোটা চেইন, একটা চিঠি৷
মুহিত,
চেইন’টা বেঁচে দিস৷ টাকা ভালোই পাবি৷ সিনেমা’টা বানাস কিন্তু! আর নায়িকার রোলটা আমাকে দিস ৷ আমার মতো তুইও অভিনয়ে খুব কাঁচা৷
তোর নিরু”