ঋতুচক্রে বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আজকাল আর ঋতুচক্র তার সময়ের মধ্যে থাকছে না। বর্ষা শুরুর আগের শুরু হয় বর্ষা। আবার সময় চলে গেলেও অনেক সময় বর্ষার দেখা মেলে না। তারপরেও বাংলায় মেঘের আগমন ঘটে। শ্রাবণধারায় আন্দোলিত হয় প্রকৃতি। সে নতুন ভাবে সাজতে থাকে বৃষ্টির স্পর্শে। নদীর কোল জুড়ে চলে আসে নতুন শিশুর মতো নতুন পানি। মাছেরা অপার স্বাধীনতায় খেলা করে নতুন পানিতে। প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্নতার কালিমা।
পৃথিবী বদলে গেছে। আধুনিক জীবনে নেমে এসেছে সময়হীনতা। বর্ষা যাপনের ফুসরত করে উঠতে পারছে না নাগরীক মন। কিন্তু বর্ষা তার আগের রূপ নিয়ে হাজির হয় পৃথিবীতে। মেঘে মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যায় নাগরিক রাজপথ। কংক্রিটের নিচে মাটি থেকে ভেসে আসে সোদা মাটির গন্ধ। যে বীজ অঙ্কুর উদ্গম হতে পারছিল না এক ফোঁটা পানির জন্য সেও জেগে উঠার জন্য প্রার্থনা করে প্রভুর কাছে। আল্লাহ মেঘ দে, আল্লাহ পানি দে। প্রভু তার অপার কৃপায় বর্ষা জাপনের সুযোগ করে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজে যায় পৃথিবী। জেগে উঠে নতুন প্রাণ। এই সময় বাংলার লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা সবাই নতুন উদ্যোমে তাদের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরে জনমানুষের সামনে। বাংলার এই আদি প্রকৃতির আগমনকে উদযাপনের জন্য ‘মোলাকাত’ আয়োজন করেছে ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭’। লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ হবে এই সংখ্যাটি আমরা সেটাই আশা করি। লেখকদের ব্যাপক আগ্রহে আমরা যার-পর-নাই আনন্দিত। আজকে আমরা প্রকাশ করলাম ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭ : পর্ব-১’।
আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত

সূ চী প ত্র

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর :: বিদ্যাপতি
কালিদাসের মেঘদূত শ্লোক ১-১২ (পূর্ব মেঘ) :: সৃজনানুবাদ : নরেন্দ্র দেব
বর্ষার কবিতা, প্রেমের কবিতা :: মহাদেব সাহা
প্রার্থনায় ঝুম বৃষ্টি :: সরকার মাহবুব
সম্মোহন আজ শুধু আলিঙ্গন চায় :: তৈমুর খান
অঝোরে বৃষ্টি হলে :: তাজ ইসলাম
বরিষনের চৌকগাথা :: রহমতুল্লাহ লিখন
সেদিন বৃষ্টির দিনে :: নূরনাহার নিপা
বর্ষাকালের মাধুর্য :: ওয়াসিম সেখ
বর্ষা এলো :: শাহীন খান
বৃষ্টি যেন ফুল :: হামীম রায়হান
বর্ষা :: মিজান ফারাবী
বৈরী বর্ষায় :: আবদুল হামিদ
বৃষ্টি :: রেজা ফারুকী
বৃষ্টি লোগাত বৃষ্টি :: শওকত আলম
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি :: মুজাহিদুল ইসলাম
বৃষ্টির জল করে টলমল :: শাহিন আলম
বৃষ্টি এলো :: মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ
বৃষ্টিকে আসতে দাও :: রাসেদুল হাসান রাসেল
বর্ষার দিনে করোনা :: এম. তামজীদ হোসাইন

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর
বিদ্যাপতি

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর
ঝঞঝা ঘন গরজন্তি সন্ততি
ভুবন ভরি বরিখিন্তিয়া।
কান্ত পাহুন কাম দারুণ
সঘনে খর শর হন্তিয়া
কুশিল শত শত পাত-মোদিত
মূর নাচত মাতিয়া।
মত্ত দাদুরী, ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছাতিয়া
তিমির ভরি ভরি ঘোর যামিনী
থির বিজুরি পাঁতিয়া।
বিদ্যাপতি কহ কৈছে গোঙায়বি
হরি বিনে দিন রাতিয়া
…………………………………………..

কালিদাসের মেঘদূত শ্লোক ১-১২ (পূর্ব মেঘ)
সৃজনানুবাদ : নরেন্দ্র দেব

১.
বধূ-প্রেমমধুমত্ত যক্ষ হেলা করিনিজ কাজে,
কুবেরের শাপে বর্ষ যাপে সে নির্বাসনের মাঝে।
প্রিয়ার বিরহে ব্যাথাতুর প্রাণ, হয়েছে মহিমা হারা,
জনকতনয়া স্নানে যে তটিনী বহিছে পূণ্য ধারা
তরু ছায়া ঘেরা স্নিগ্ধ সে তটে –রামগির আশ্রমে
রহিয়া একাকী, বিচ্ছেদ-তাপদুঃসহ তার ক্রমে।

২.
সেই গিরিবনে ফেরে আনমনে, প্রিয়ানাহি সাথে হায়,
অভাগা যক্ষবিরহ-ব্যাকুল উদাস নয়নে চায়।
খসেছে স্বর্ণবলয়* শীর্ণ প্রকোষ্ঠ হ’তে ধীরে,
নব আষাঢ়ের প্রথম দিবসে, শৈল সানুটি ঘিরে
হেরে প্রমত্ত মাতঙ্গসম অতিকায় কালো মেঘে
মাতিয়া উঠেছে বপ্র-ক্রীড়ায় অধীর উতল বেগে!

৩.
ক্ষণেক তাকায়ে সেই মেঘপানে যক্ষ ভাবিছে মনে,
কে না চাহে হেন জলদ-মেলায় মিলিতে প্রিয়ার সনে?
কার অন্তর হেন জলধার না-করে উতল বলো,
কন্ঠ জড়ায়ে আছে প্রিয়া যার সেজনও যে চঞ্চল!
কান্তা যাহার বহুদূরে আজ, সে প্রবাসী কিসে হায়,
বিরহ-কাতর চিত্তে তাহার সান্ত্বনা কিছু পায়?

৪.
আসিছে বরষা, হেরি মেঘদলে জাগে শুধু তার মনে,
আমারে ছাড়িয়া কেমনে সে প্রিয়া বাঁচিবে প্রাবৃট্ ক্ষণে
সহসা কেমন মনে হল তার – বাঁচাইতেপারা যায়,
যদি কোন মতে মেঘের মুখে সে আমার বারতা পায়!
এত ভাবি ত্বরা কুটজ কুসুমে অর্ঘ রচিয়া আনি
মধুর বচনে স্তুতি করি মেঘে কহিছেজুড়িয়া পাণি ।

৫.
ধূম-জ্যোতি আর সলিল-মরুতে রচিত যাহার কায়া,
দূত কাজের সে নহে যোগ্য, প্রাণহীন সেত’ ছায়া!
বার্তাবহ তো হতে পারে শুধু জীবন্ত প্রাণী যারা;
এ সকল কথা ভাবিলনা কিছু, যক্ষ পাগল পারা-
করজোড়ে হায়, মেঘের সকাশে জানায় সে নিবেদন;
কি বুঝিবে ভেদ জড় চেতনের-কামার্ত যার মন।

৬.
ভুবন বিদিত পুষ্কর কূলে তোমার জন্ম জানি,
তুমি কামরুপী প্রকৃত-পুরুষ, পৌরুষ তব মানি।
বিধির বিপাকে বধূ আজি মোর রহিয়াছে বহু দূরে,
তাইত, তোমায় জানায় হে মেঘ, কামনা যেন হে পুরে।
বিমুখ হলেও প্রার্থনা মোর, কি লাজ মানীর পাশে?
অধমের কাছে পেলেও কিছু গো তবু যে লজ্জা আসে।

৭.
সন্তপ্তের তুমিই শরণ, সুশীতল তব বারি;
ধনপতি ক্রোধে দহি’ যে বিরহে, সহিতে আর না পারি।
লয়ে যাও মোর সন্দেশ বহি, কৃপাগুণে ভরি হৃদি,
যক্ষরাজের অলকা যেথায়; হে মেঘ, করুণা নিধি!
রম্য প্রাসাদ-উদ্যানে শোভে মহেশ মূর্তি যার,
হর-শির-চাঁদে ধৌত হর্ম্য – উজ্জ্বল চারিধার।

৮.
হেরিয়া তোমার পবন-আরুড়, বিরহিনী নারী যারা,
ছুটিয়া আসিবে পথমাঝে সবে’ তোমারে হেরিতে তারা,
প্রবাসী বঁধূর প্রত্যাগমের লগ্ন নিকট জানি,
আশা চঞ্চল অন্তরভরা প্রীতি তারা দিবে আনি;
তোমার উদয় দেখে বলো কেবা প্রিয়া হতে দূরে রবে,
আমি পরাধীন, আমার এদিন তবে কি ব্যর্থ হবে?

৯.
অনুকূল বায়ু বহিয়া তোমারে ল’য়ে যাবে ধীরে ধীরে,
তোমার বামেতে চাতক-নিনাদ ধ্বনিবে আকাশ চিরে;
নয়নাভিরাম বলাকার পাঁতি কন্ঠে দুলাবে মালা,
গর্ভাধানের ক্ষণপরিচয় জানাবে কত বালা!

১০.
অবিরাম গতি গেলে দিবারাতি প্রেয়সীর দেখা পাবে
পতিপ্রাণা তব ভ্রাতৃজায়াটি বিরহ-ব্যাকুল ভাবে
বিরলে বসিয়া গণিতেছে দিন, বিষাদে মলিন মুখ,
কোনমতে আছে পরাণ ধরিয়া লভিতে মিলন-সুখ।
কুসুম সমান সুকোমল তনু কি যেন বেদনাহত,
আশার শীর্ন বৃন্তে ঝুলিছে শিথিল ফুলের মত!

১১.
শ্রাবণ-মধুর গরজনে তব আকাশ শিহরি’ ওঠে,
তোমার সজল স্নিগ্ধ পরশে ভূঁইচাপা ফুল ফোটে,
বন্ধ্যা ধরণী হবে ফলবতী, জাগাতে সে আশা প্রাণে
শুরুগম্ভীর মৃদঙ্গ হেন মেঘের ডমরু গানে
কৈলাস পথে উড়ে চলে শুনি, হংসরাজের দল,
চঞ্চু-অগ্রে মৃণালখন্ড করে ওঠে ঝল্মল!

১২.
রঘুপতি-পদ-চিহ্নিত যার শৈল-মেখলা, প্রিয়,
আলিঙ্গিয়া সে তুঙ্গ শৃঙ্গে মধুর সম্ভাষিও।
ক্বচিত কখনো উভয়ের দেখা, নহে সে অধিকক্ষণ,
বিরহ ব্যাথার বাষ্প তাহার স্নেহে কোরো নিবারণ।
…………………………………………..

বর্ষার কবিতা, প্রেমের কবিতা
মহাদেব সাহা

বৃষ্টির কথা থাক, বিরহের কথা বলি।
শুনাই দুজনে বিদ্যাপতির বিষণ্ন পদাবলী,
বর্ষার কথা থাক, বকুলের কথা বলি।
ঝরা বকুলেই ভরে রাখি এই প্রশস্ত অঞ্জলি।
আকাশের কথা থাক, হৃদয়ের কথা শুনি।
যদিও বিরহ তবু মিলনের স্বপ্নজালই বুনি,
অশ্রুর কথা থাক, আবেগের কথা শুনি-
সহস্র রাত কেটে যাক
দূর আকাশের তারা গুনিব।
গরিমার কথা থাক, বিনয়ের পাঠ ধরি।
কলহের কোনো কাজ নেই, কিছু করুণার গান করি।
বিদ্যার কথা থাক, প্রেমের কবিতা পড়ি।
চারদিকে এই জলধারা তবু সৃষ্টির দ্বীপ গড়ি।
…………………………………………..

প্রার্থনায় ঝুম বৃষ্টি
সরকার মাহবুব

প্রার্থনায় ঝুম-বৃষ্টিকে চাই
আলোঝলমলে রোদেলা সকাল
ছাড়া ছাড়া মেঘে ঢাকা আষাঢ়ের মেঘলা দুপুর
পলাশে শিমুলে সোনালুর সমৃদ্ধ বিকেল
শীতের শিশিরে ভেজা হীম হীম মায়াবী সন্ধ্যাকে চাই
চাঁদ মাখা জোছনায় চাঁদের উঠোন চাই !

কখনো বা মাঠ চাই- ফসলের উদাস জমিন
কখনো বা ঘাট চাই- পারাপার করে দেবে জীবনের এপার ওপার
কখনো বা পথ চাই- হেঁটে যাবো অনন্তে অসীমে !

প্রার্থনায় ঝুম-বৃষ্টি, রোদেলা সকাল, মেঘলা দুপুর
সমৃদ্ধ বিকেল, মায়াবী সন্ধ্যা, চাঁদের উঠোন
কদম ফুলের ডালি, ভেজা ভেজা সতেজ হলুদ
চাইতে চাইতে ক্ষুদ্র এ জীবনের বেলা বয়ে গেল !

এখন প্রার্থনা মানে- হে মহান প্রভূ
তোমাকে কেবলই চাওয়া জীবনের শুরু থেকে
শেষ অব্দি যত পথ হেঁটে যেতে পারি !
…………………………………………..

সম্মোহন আজ শুধু আলিঙ্গন চায়
তৈমুর খান

ঢেউ দিচ্ছে শুধু অনুভূতির ঢেউ
আমার বিপন্ন তরী ভেসে যায়
দুর্যোগের স্রোতে তীর ভাঙে
কোথায় চলেছি লক্ষ্যহীন ?

বিমর্ষ আঁধার লেপ্টে ধরে
বজ্র কাঁপায় এসে শাসনআলোয়
ধাঁধা লাগে
পথভ্রষ্ট হই বারবার
বৃষ্টিবীর্য পুলক জাগায়
শীৎকারের মগ্নতায় স্বরলিপি বাজে
কোন্ দ্বীপে চুম্বন অপেক্ষা করে আছে ?

তোমার ভ্রুর তীক্ষ্ণ তিরে
হৃদয় ক্ষরণ হয় আজও
স্পর্শরা ফিরে আসে ভেজা বাতাসে
সম্মোহন আজ শুধু আলিঙ্গন চায়

তোমার কুন্তলে জল ঝরে
তোমার বুকের চূড়া বেয়ে নামে জল
আমার কাতর পিয়াস এগিয়ে যায়
ওড়না সরাও দেখি
মেঘের আড়ালে ডাকে কোন্ পাখি!

আজ সব সমর্পণ নিয়ে ভেসে যাই
এই মগ্ন বর্ষায়…
…………………………………………..

অঝোরে বৃষ্টি হলে
তাজ ইসলাম

ভিজতে ভিজতে নেচে ওঠে নগ্ন শৈশব
অঝোরে বৃষ্টি ঝরার পর
ফিরে পাই লাফিয়ে ওঠা পুঁটি টেঙ্গরা রুপালি কৈশোর
অঝোরে বৃষ্টি ঝরার পর
বৃক্ষরা ফিরে পেল হারানো সজিবতা
ধুলির দৌরাত্ব থেকে মুক্তি পেল ফুলের পাপড়ি
ভোরের তাজাল্লিতে দুর হল অন্ধকারে তেজ
সূর্যের একটি হাসিতে
রাত দৌড়ে পালালো ভেড়ার পালের মত
অঝোরে বৃষ্টি ঝরার পর
পাথিরা ফিরে পেল
জীবনের গান
বাতাসে ভেসে আসে ফুলের সুবাস
অঝোরে বৃষ্টি ঝরার পর
চিক চিক করে হাসে লুকিং গ্লাস
ওখানে দেখতে পাই তাবৎ জীবন
আর জীবনের ফেলে আসা রঙিন সময়।
…………………………………………..

বরিষনের চৌকগাথা
রহমতুল্লাহ লিখন

বর্ষার প্রথম ধ্বনি ঠিক তেমনই,
যেমনি কিশোরী প্রেমিকার পায়ে পায়েল।
পাতায় পাতায় চুয়ে পরা আকাশের কান্না তেমনি,
যেমনি স্বামীর আশায় নববধূর রাতের খেয়াল।

চারিদিকে যখন বুক ফাটা আর্তনাদ
তীব্র তাপে চারপাশে যখন শুধুই জখম,
তখনই আষাঢ়ের আগমনী স্বাদ
যেন প্রেয়সীর শাড়ির মন মাতানো গন্ধ প্রবণ।

বর্ষা শুধু প্রেমিকা নয়, প্রেয়সী নয়,
কদমে কদমে ভরা কবির কলমে গাছ নয়,
বর্ষা মায়ের মত সন্তানের তৃপ্তি হয়,
পিতার রাগী গুড় গুড় ডাকেও পরিবারের খাদ্য হয়।

বর্ষা কাদায় হাসায় ভাসায় আমাদের
কোথাও ভালোবেসে চায়ের কাপে জানালার ধারে,
কোথাও ফুটো চালের নিচে মাটির হাড়ি যাদের
জীবন যুদ্ধের সৈনিক প্রকৃতির থাবায় মরে।
…………………………………………..

সেদিন বৃষ্টির দিনে
নূরনাহার নিপা

সেদিন দেখা হয়েছিল বৃষ্টির দিনে
সেদিন ভিজেছি দুজনে একসাথ
তোমার হাতে তুলে দিয়ে ছিলাম ভালোবাসার লাল টকটকে গোলাপ।

তোমার ঠোট দুটো ছিল গোলাপের মতো
আঁখি দুটো ছিল কৃষ্ণকলি
ফুল গুলো হাসছিল,পাখিরা দেখছিল
আমার প্রেমের প্রথম ছোঁয়া,বৃষ্টি এসেছিল।

গভীর ভালোবাসায় ছুঁয়ে দেয় দুজনার একাকিত্ব

বৃষ্টিকে সাক্ষি করে সেদিন করেছিলাম চুন্বন।
গোলাপের পাপড়ি গুলোকে সাক্ষি করে
কথা দিয়েছিলাম তুমি শুধু আমার।

ভিজে শরীরে তুমি বৃষ্টির জলের ছোঁয়ায়
তোমার কামীনি মোহনী রূপ দেখে আমি ধন্য হই
শুদ্ধ মনে চেয়ে থাকি তোমার দিকে সারাক্ষণ!

তোমার মাথার এলো কেশ গুলো
বৃষ্টির জলে ভিজে একাকার
হৃদয় টা বার বার তোমাকে ছুঁয়তে চাই
মনকাড়া বৃষ্টি আবার কখন আসবে!

আবার দুজনে ভিজবো ফয়েজলেকে পাহাড়ের চূড়ায়
আবার না হয় কিছু কথা জমা দিব সমুদ্রের কাছে
পবিত্র হৃদয়ে তোমায় আজ আমি বলতে চাই।

ভালোবাসি প্রিয় শুধু তোমায় ভালোবাসবো
কখনো আঘাত করোনা এই সরল মনটা
তাহলে যে মরে যাব না পাওয়ার বেদনাটা
শত জনম ধরে শুধু তোমায় ভালোবাসবো।
…………………………………………..

বর্ষাকালের মাধুর্য
ওয়াসিম সেখ

সকাল হতেই নেমেছে বৃষ্টি আজকে সারা বেলা।
গগনে দেখি অন্ধকার জুড়ে করছে মায়ার খেলা।
বৃষ্টি ধারা অবিরত ঝরে চলেছে অঝোরে।
চারিদিকে পুকুর, নদী, মাঠ, ক্ষেত ভরেছে জলে।

ঝম ঝমা ঝম বৃষ্টি পড়ে অঝোর গতিতে।
জলের ফোঁটা নূপুরে ঝংকরিত সদা মেপে।
বৃষ্টিভেজা বাদল দিনে যৌবনেতে শিহরণ জাগে।
নব নব যৌবনালুশ বৃষ্টির জলে কোলাকুলিতে।

কদম্ব তার নব ফুলে, সাদা মোহ তার ফল ধরে।
চারিদিকে ঘ্রাণের সুবাস চোখে সোনালী রূপে।
বাদল দিনে নদীর ধারে মাঝিরা না যায় খেয়াঘাটে,
বিজলী চমকায় গগন পানে মেঘময় বেলা কাটে।

বৃষ্টিভেজা শরীরে চলি ঐ পথের বাঁকে।
বর্ষাকালে এক হাঁটু জল সেথায় জমে থাকে।
ঝম ঝমা ঝম বৃষ্টি পড়ে সর্ব-স্হানে ঢোকে জল।
বাঁসায় ভিজে পাখিরা সব করছে নিজ কোলাহল।

প্রকৃতি তার মায়ারূপ সবুজে ভরাট করে।
মায়াবী তার অপরূপে নিদারূণ মোহ সাজে।
প্রকৃতির সন্তর্পণে বিশ্ব চলে সজাগ সচারচর।
প্রকৃতির লীলারসে ধ্যান-জ্ঞান সর্বময়কর!
…………………………………………..

বর্ষা এলো
শাহীন খান

বর্ষা এলো রিমঝিমিয়ে
ফুটলো বনে ফুল
নদনদীতে আসলো জোয়ার
ভরলো ডোবার কূল।
উঠোন জুড়ে হাঁসের কেলি
নেই তো পাখির সাড়া
শান্ত হয়ে গেছে যেন
হিজল তলির পাড়া।
ডুব সাঁতারে খেলছে ডাহুক
দিঘি বিলে খালে
চলেন মাঝি অচিন গাঁয়ে
লাগছে হাওয়া পালে।
হাম্বা হাম্বা গরুর ডাকে
ভাংছে নীরবতা
উঁকি মারে সবুজ মাঠে
লজ্জাবতি লতা।
কবি লেখেন গান কবিতা
বসে ঘরের কোণে
উদাস উদাস ভাব এসে যায়
…………………………………………..

বৃষ্টি যেন ফুল
হামীম রায়হান

আকাশে বুঝি মেঘের বাড়ি,
সূর্য মামা দিল আড়ি,
খেলছে লুকোচুরি,
কদম গাছের সবুজ ডালে,
খুশি ফোটে বৃষ্টি কালে,
নেই যে তাদের জুড়ি!
ঝুপ ঝুপ ঝুপ নেই বিরাম,
বৃষ্টি যেন ফুলের নাম,
ঝরছে আকাশ বেয়ে,
ডুবল গাঁয়ের মেঠো পথ,
বৃষ্টি যেন খুশির রথ,
মেঘের ভেলা পেয়ে!
…………………………………………..

বর্ষা
মিজান ফারাবী

শেষ বিকেলে বৃষ্টি নামে-
আষাঢ়ের শুরুতেই প্রবল বর্ষণে,
এই শহরের অলি-গলি, নর্দমা ভরে জলে,
আর মেঘের গর্জনে নামে সন্ধ্যা।
ভূতল বরষায় ভারী হয়,
অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দে।

নগরে ল্যাম্পপোস্টের আলো নিভু নিভু,
বৃষ্টির জলে হাবুডুবু-
বর্ষার জলধারে সবকিছুই অস্পষ্ট হয়ে আছে।
বর্ষা নামে এই সন্ধ্যা রাতেও, আঁধারে।

মৃত্তিকায় বৃষ্টির জলে ঘুমায় শহর,
নির্জনে, বর্ষা মুখর ক্ষণে।
ঘুমন্ত আদিম শহর, জলে জলে,
আবার নিস্তব্ধ প্রহরে জাগে,
বৃষ্টির শহর, ঘুমন্ত নগর।
…………………………………………..

বৈরী বর্ষায়
আবদুল হামিদ

সারাটা বিকেল বৈরী মেঘে ঘিরে ধরেছে,
প্রলয়গ্রাসী তীব্র আঁধারে মাঠ ভরেছে –
এমন সময় নামলো চৌদিক ভারী বর্ষণ
কালো মেঘে ভয়ার্ত সুরে করছে গর্জন।

সারাটা মাঠ খালি হলো এমন বেলায়
তীব্র ভয়ের নামলো যে দূত মাঠের খেলায়,
নেই কোনোজন রাস্তাঘাটেও দেখার মত,
ঘন্টাখানেক আগেও মানুষ ছিলো শত।

এমন অঝোর বৃষ্টি আসায় সবকিছু লক,
কিন্তু কাজের শ্রমিকেরাই খায় বড়ো শক,
আয়ের উৎস লক হয় তাদের এমন দিনে
পরিবারের খোরাক কুড়ায় ঋণে-ঋণে।

বন্যা হলে নেই তো আরো বলার কিছু,
হাহাকারের হাজার দুঃখ লাগে পিছু –
এমন কঠিন সময় আসে বৈরী বর্ষায়
বন্যার জল সদাই থাকে মানুষ ধর্ষায়।

বর্ষা কারো সুখের বেলা, কারো দুখের
অভাব এসে দেয় তাড়না, কষ্ট বুকের –
অনেক লোকের নেয় কেড়ে নেয় বাড়িঘর,
ভিটেমাটি হারিয়ে যায়, সুখ করে পর।
…………………………………………..

বৃষ্টি
রেজা ফারুকী

আকাশে মেঘের ছোটাছুটি
নীল কালোয় লুটোপুটি
বর্ষায় কদম ফুল গাছের ডালে
বৃষ্টি পড়ে টিনের চালে
মশুল ধারে।

ভেজা পক্ষী টুনটুনির চঞ্চুতে
চিক্ চিক্ রব
বড়ই করুন
তবুও সুরেলা লাগে!

তারুণ্যেয় ভরা তরুনেরা
বল খেলে জল তরঙ্গে
মহা উৎসবে।

দেয়াতে প্রানের আধার
সবুজ বন বনানী ছেঁয়ে যায়
চারী ধারে
আজি বর্ষার বরিসনে
ভিজিতে মন আকুলী ব্যাকুলী করে।

কদমফুল গাছের ডালে
শ্বেত হরিদ্রের রূপে মাখা
জলের ছোঁয়ায় মুক্ত ঝরে।

বৃষ্টি পড়ে পত্র পল্লবে
তারুন্যের স্বপন
হৃদয়ে দোলে
বৃষ্টি পড়ে নূপুর তালে।
…………………………………………..

বৃষ্টি লোগাত বৃষ্টি
শওকত আলম

টুপ্ টুপ্ বারি ঝরে ঝির ঝির গান,
দুল্ দুল্ দোল খায় মাঠে মাঠে ধান।
তুপ্ তুপ্ ঝি্ম পায় গুলে গুলে ডিম,
ফুট্ ফুট্ চিক্ মারে ঘুলে ঘুলে হীম।

বাউ বাউ বায়ু বয় তির তির কাল,
ঝাউ ঝাউ শাঁখা কাঁপে খিল্ খিল্ গাল।
পিউ পিউ পাখি ডাকে শন্ শন্ মাল্।
টান্ টান্ গুণটানে ঝন্ ঝন্ তাল্।

কাঁপা কাঁপা স্বর উঠে ছল্ ছল্ লোটে,
থই থই চারি ধার চিক্ চিক্ ফোটে।
ডুগ্ ডুগ্ ফোট কাটে মট্ মট্ চোট্,
কল্ কল্ জোট বাঁধে কট্ কট্ বোট্।

চুপ্ চুপ্ থাম্ শীল চাপা বিল,
সাদা সাদা আঁধা মেঘ দীল কাটা নীল।
বুড় বুড় নদী নালা ফুল বাড়ি ঘাট,
পিল্ পিল্ সারি সারি ভেঙ্গে যায় হাট।

ঝুপ্ ঝুপ্ দাগ টানে ডুপ্ দেয় পাড়,
ধুপ্ ধুপ্ শাই শাই ছিড়ে নেয় আঁড়।
কই কই জট্ পাকে বাঁশ ঝাঁড় হাঁপে,
জোল জোল শোর গোল পাড়া গাঁও কাঁপে।

চট্ চট্ পট্ পট্ মুড়ি ফোটে খই,
ঝপ্ ঝপ্ দপ্ দপ্ উড়ে যায় ছই।
চপ্ চপ্ কাঁদা মাটি লব্ লব্ রোল,
ধপ্ ধপ্ চাঁদআালী লাফ্ খায় শোল।

হুট্ হুট্ জ্বল জ্বল জ্বর জ্বর ঠোট,
মল্ মল্ ঘানি ঘোরে কিত্ কিত্ কোট।
ছুট্ ছুট্ গরু ছোটে খুলে দেয় হাল,
টুন্ টুন্ রব রব মাঝি খোলে পাল।
…………………………………………..

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি
মুজাহিদুল ইসলাম

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায়
বাগানে ফুল হাঁচি দেয়
বৃষ্টি শেষে ফুল কলিরা
দাঁত কেলিয়ে নাচই দেয়।

পাকপাখালি ডানা খোলে
পাতার ফাঁকে উঁকি দেয়
দল বাঁধিয়া প্রজাপতি
সবুজ বনে ঝুঁকি দেয়।

বৃষ্টিদানা তাল পাতায়
হঠাৎ নেমে ছুটি দেয়
খোকা খুকু ভোঁদৌড়ে
মায়ের কোলে খুঁটি দেয়।
…………………………………………..

বৃষ্টির জল করে টলমল
শাহিন আলম

বৃষ্টির জল করে টলমল
নদী আর খালে বিলে
মাছ নিয়ে যায় চিলে
বৃষ্টির সাথে শীতল বাতাস
দোলা দিয়ে যায় দিলে।

বৃষ্টিকে আমি শরীরে মাখি
ছুঁয়ে দিই তার হাত
ছন্দের ধারাপাত
টাপুরটুপুর বৃষ্টি পড়ে
যখন মধ্যরাত।

বৃষ্টি তুমুল বৃষ্টি নামে
ছুটি তাই রোদ খরায়
বৃষ্টির জল করে টলমল
সবার হৃদয় ভরায়।
…………………………………………..

বৃষ্টি এলো
মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ

বৃষ্টি এলো শহর নগর
বৃষ্টি এলো গাঁয়ে
বৃষ্টি এলো কদম শাখে
নুপুর পরা পায়ে।

বৃষ্টি এলো কেয়া বনে
বৃষ্টি এলো বিলে
বৃষ্টি এলো শাপলা ফোটা
বাড়ির পাশে ঝিলে।

বৃষ্টি এলো মাঠে ঘাটে
বৃষ্টি এলো খালে
বৃষ্টি এলো ব্যাঙের ছাতায়
নায়ের মাঝির পালে।

বৃষ্টি এলো ঝম ঝমিয়ে
বৃষ্টি নদীর পাড়ে
বৃষ্টি এলো বকের ঝাঁকে
বৃষ্টি বাঁশের ঝাড়ে।
…………………………………………..

বৃষ্টিকে আসতে দাও
রাসেদুল হাসান রাসেল

আজ আকাশের বুক কালো হয়েছে-
কালো মেঘের ঘনঘটা বিশাল আকাশটার বুক জুড়ে।
মনে হয়-
বৃষ্টি হবে।
বৃষ্টিকে আসতে দাও,
দুজনে না হয়-
বৃষ্টির জ্বলে স্নান করে বৃষ্টি বিলাস করবো।
তোমাতে আমি
আমাতে তুমি-
মিলেমিশে হবো একাকার।
সবশেষে-
বৃষ্টিকে আমন্ত্রণ জানাবো আমাদের কুড়েঘরে।
কদমফুলের মালা দিবো-
বৃষ্টিকে ভালোবেসে।
…………………………………………..

বর্ষার দিনে করোনা
এম. তামজীদ হোসাইন

বর্ষার অঝোর বৃষ্টি ধারা
দিনের ক্লান্তি শেষে শ্রমিকেরা
বাড়ি ফিরে খালি হাতে
কি আর খাবে রাতে?

প্রভাতে ঘুম ঘুম চোখে
আনচান আনচান করে বুকে
কামকাজ নেই হাটবাজারে
দিন কাটে মাটির ঘরে

দিনকাল দেখছি পাল্টে গেছে
করোনা চারদিকে আঘাত করছে
বর্ষার দিনে এখন বৃষ্টি নেই
তবুও নাকি শ্রমিকের কাজ নেই

সবখানে দোকানপাট সব বন্ধ
নিয়মবিধি মানতে সবাই বাধ্য
বাজার-সদাই হয় সময় বেঁধে
রাঁধুনি ক্লান্ত ঘরে রেঁধে রেঁধে