ঋতুচক্রে বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আজকাল আর ঋতুচক্র তার সময়ের মধ্যে থাকছে না। বর্ষা শুরুর আগের শুরু হয় বর্ষা। আবার সময় চলে গেলেও অনেক সময় বর্ষার দেখা মেলে না। তারপরেও বাংলায় মেঘের আগমন ঘটে। শ্রাবণধারায় আন্দোলিত হয় প্রকৃতি। সে নতুন ভাবে সাজতে থাকে বৃষ্টির স্পর্শে। নদীর কোল জুড়ে চলে আসে নতুন শিশুর মতো নতুন পানি। মাছেরা অপার স্বাধীনতায় খেলা করে নতুন পানিতে। প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্নতার কালিমা।
পৃথিবী বদলে গেছে। আধুনিক জীবনে নেমে এসেছে সময়হীনতা। বর্ষা যাপনের ফুসরত করে উঠতে পারছে না নাগরীক মন। কিন্তু বর্ষা তার আগের রূপ নিয়ে হাজির হয় পৃথিবীতে। মেঘে মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যায় নাগরিক রাজপথ। কংক্রিটের নিচে মাটি থেকে ভেসে আসে সোদা মাটির গন্ধ। যে বীজ অঙ্কুর উদ্গম হতে পারছিল না এক ফোঁটা পানির জন্য সেও জেগে উঠার জন্য প্রার্থনা করে প্রভুর কাছে। আল্লাহ মেঘ দে, আল্লাহ পানি দে। প্রভু তার অপার কৃপায় বর্ষা জাপনের সুযোগ করে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজে যায় পৃথিবী। জেগে উঠে নতুন প্রাণ। এই সময় বাংলার লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা সবাই নতুন উদ্যোমে তাদের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরে জনমানুষের সামনে। বাংলার এই আদি প্রকৃতির আগমনকে উদযাপনের জন্য ‘মোলাকাত’ আয়োজন করেছে ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭’। লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ হবে এই সংখ্যাটি আমরা সেটাই আশা করি। লেখকদের ব্যাপক আগ্রহে আমরা যার-পর-নাই আনন্দিত। আজকে আমরা প্রকাশ করলাম ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭ : পর্ব-৩’।
আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত

সূ চি প ত্র

বর্ষা-বিদায় :: কাজী নজরুল ইসলাম
পল্লী-বর্ষা :: জসীম উদ্দীন
বৃষ্টির গান :: ফররুখ আহমদ
বৃষ্টি নামে বর্ষাকালে :: শরীফ আবদুল গোফরান
আষাঢ়ে পদাবলী :: শাহিদ উল ইসলাম
বর্ষাবনত খিড়কির দরজা :: ইন্দ্রজিৎ রায়
আষাঢ় এলো :: জাহানারা নাসরিন
আহা বৃষ্টি! তুই আয় আজ :: শাহনাজ পারভীন
প্রিয় বৃষ্টির আশায় অপেক্ষমান :: আবু রাইহান
তোমাকে দেখি না বলেই :: সুশান্ত হালদার
দুষ্ট ছেলে :: কবির কাঞ্চন
এখানে অমৃত :: নার্গিস পারভীন
আষাঢ় মাসে বৃষ্টি ঝরে :: রানা জামান
বৃষ্টি ভেজা শৈশব :: মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ
বৃষ্টির কৃষ্টি :: জাফর পাঠান
বৃষ্টি ভেজা :: বনশ্রী বড়ুয়া
টিপ টিপ বর্ষায় :: মজনু মিয়া
সেই আষাঢ়ের কথা :: রবীন বসু
বর্ষার নিমন্ত্রণ :: ফারজানা সুবা
বর্ষার কবিতা-২ :: লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

বর্ষা-বিদায়
কাজী নজরুল ইসলাম

ওগো বাদলের পরী!
যাবে কোন্ দূরে ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী!
ওগো ও ক্ষণিকায়, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজ তব?
পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন্ দেশ অভিনব?

তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু
তোমারে স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে বেনু।

কুমারী ভীরু-বেদনা-বিধূর প্রণয়-অশ্রু সম।
ঝরিছে শিশির-সিক্ত সেফালী নিশি-ভোরে অনুপম।

ওগো ও কাজল মেয়ে,
উদাস আকাশ ছলছল চোখ তব মুখে আছে চেয়ে।
কাশফুল সম শুভ্র ধবল রাশ রাশ শ্বেত মেঘে
তোমার তরীর উড়িতেছে পাল উদাস বাতাস লেগে।

ওগো জলের দেশের কন্যা। তব ও বিদায় পথে
কাননে কাননে কদম-কেশর ঝরিছে প্রভাত হ’তে।
তোমার আদরে মুকুলিতা হয়ে ঊঠিল যে বল্লরী
তরুর কণ্ঠ জড়াইয়া তারা কাঁদে নিশিদিন ভরি।’

‘বৌ-কথা-কও’ পাখি
উড়ে গেছে কোথা, বাতায়নে বৃথা বউ করে ডাকাডাকি।
চাঁপার গেলাস গিয়াছে ভাঙিয়া, পিয়াসী মধুপ এসে’
কাঁদিয়া কখন গিয়াছে উড়িয়া কমল-কুমদী দেশে।

তুমি চলে যাবে দূরে,
ভদরের নদী দুকূল ছাপায়ে কাঁদে ছলছল সুরে!

যাব যবে দূর হিম-গিরি শিল, ওগো বাদলের পরী
ব্যথা ক’রে বুক উঠিবে না কভু সেথা কাহারেও স্মরি?
সেথা নাই জল, কঠিন তুষার, নির্মম শুভ্রতা-
কে জানে কী ভাল বিধুর ব্যথা- না মধুর পবিত্রতা!
সেথা মহিমার ঊর্ধ্বে শিখরে নাই তরলতা হাসি,
সেথা যাও তব মুখের পায়ের বরষা-নূপুর খুলি,
চলিতে চকিতে চমকি’ উঠ না, কবরী উঠে না দুলি।

সেথা রবে তুমি ধেয়ান-মগ্না তাপসিনী অচপল,
তোমার আশায় কাঁদিবে ধারায় তেমনি “ফটিক-জল”
…………………………………………..

পল্লী-বর্ষা
জসীম উদ্দীন

আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি,
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি!
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে!
কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, –
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।

গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, –
গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!
কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধে কসি কসি।
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।

লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও,
বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে,
নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে!
যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।

বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি,
সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি।
বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে,
মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে।

আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।
…………………………………………..

বৃষ্টির গান
ফররুখ আহমদ

বৃষ্টি এলো কাশবনে
জাগলো সাড়া ঘাসবনে
বকের সারি কোথায় রে
লুকিয়ে গেলো বাঁশবনে।

নদীতে নাই খেয়া যে
ডাকলো দূরে দেয়া যে
কোন সে বনের আড়ালে
ফুটলো আবার কেয়া যে।

গাঁয়ের নামটি হাটখোলা
বৃষ্টি-বাদল দেয় দোলা
রাখাল ছেলে মেঘ দেখে
যায় দাঁড়িয়ে পথ ভোলা।

মেঘের আধার মন টানে
যায় সে ছুটে কোনখানে
আউস ধানের মাঠ ছেড়ে
আমন ধানের মাঠ পানে।
…………………………………………..

বৃষ্টি নামে বর্ষাকালে
শরীফ আবদুল গোফরান

বর্ষাকালে বৃষ্টি নামে খালে বিলে
ঘরের চালে
বাঁশের বনে কাশের বনে
ডাকাতিয়ার তরীর পালে।

সবুজ শ্যামল ঘাসের বুকে
জুঁইচামেলি ফুলের বাগে
বানের জলে ডাহুক ডাকে
ঢেউয়ের নাচন তালে তালে।

পদ্মপাতায় ব্যাঙের ছাতায়
দাদুর টাকে চরের বাঁকে
হাসনাহেনা বকুল তলায়
বলাখালে জেলের জালে।

শাপলা কমল পদ্ম ফুটে
খালে বিলে ডোবায় ঝিলে
গানে গানে দাঁড়ের টানে
নৌকা চালায় মাঝি খালে।

টাপুরটুপুর বৃষ্টি নামে
বৃষ্টি নামে বর্ষাকালে।
…………………………………………..

আষাঢ়ে পদাবলী
শাহিদ উল ইসলাম

এই আষাঢ়ে নড়েচড়ে উঠে
খাল বিল ঝিল নদী ও বৃক্ষ;
মরা নদীও পায় ফিরে যৌবন।

নড়েচড়ে উঠে মাচায় রাখা
জেলেদের ঝং ধরা জাল;
গাবের কষে রঙ্গিন হয় স্বপ্নরা।

সবুজ রঙ মেখে বৃক্ষরা
ফিরে পায় নতুন এক জীবন
ডাঙ্গায় ঘুমিয়ে থাকা আহত
নাও ভেসে যায় নতুন জলে
মাছেদের পেট খালি করে ফুটে উঠে
জলতলে আগামীর ছানা-পোনা
কদম ফুলের ন্যায় দেখতে অবিকল
চড়ুইছানা কেঁদে উঠে ঘরের কোণে
শালিকের ছানারাও কোন এক বিকালে
মেলে ডানা বৃষ্টিস্নাত বাতাসে
আম কাঁঠালের মৌ গন্ধে
দিশেহারা সব মৌমাছি
ঝিলের জলে মাথা উঁচু করে
দাঁড়িয়ে থাকা শাপলাকুল
জামের কষে রঙ্গিন হয়ে উঠা
শিশুদের মুখ
সবই কেবল বিত্ত বৈভবের
কথা বলে
আর তাই আমার আঙিনা জুড়ে আজ এক
উৎসব; আষাঢ়ে পদাবলী পাঠ করে।
…………………………………………..

বর্ষাবনত খিড়কির দরজা
ইন্দ্রজিৎ রায়

বর্ষাকে মহামারি ভাবে কেউ। ভাবে
শ্রাবণ আকাশে, সারি সারি ইঁদুরের জলভরা চোখ। তোমরা
পিছল বারান্দা দিয়ে, পা টিপে টিপে চলে যাও আমার
জীবাশ্ম-খাতা ছেড়ে, মনে মনে বলি যেন আছাড় না খাও।

বেশীর ভাগ অধ্যাপকীয় বরষা-বন্দনাই
ভুষো, ধুকধুকি নাই কেবল ব্যাকরণের বাজনা, মৃত্যুর দেবতারা
বিষবাষ্পের ব্যপারী, ওরা তাও শ্রাবণ বোঝে কিছু

বর্ষাকে মহামারি ভাবে কেউ। ভাবে সিংহের নির্বাক অশ্রু, তোমার
দ্রুত বিলীয়মান ছাপ, সানবাঁধানো মেঝেতে যা ফেলে গেলে
রেখে গেলে দুটো খাজা ছবি, সস্তার ক্যামেরায় তোলা
দেখতে ঘোর লাগে তবু,তাকিয়ে দেখি পাশে কেউ নেই
বিয়েবাড়ির ভিডিও করা, রোগাসোগা ছেলেটা, ক্যামেরা কাৎ করে করে
পোকাগুলো ফেলছে মাঠে, ওকে আড়াল করে রেখেছে বিরাট বিরাট
ছাতা, হাতি, ভালুক আঁকা ময়লা-হলুদ, কালো রংয়ের
সন্ধ্যা…

বারান্দা শেষে তোমার বর্ষাবনত
ছায়া, বিয়েবাড়ি ভিডিও করা ক্লান্ত ছেলেটাকে, কোন মেঘের দল যেন সঙ্গে নিয়ে গেছে।।
…………………………………………..

আষাঢ় এলো
জাহানারা নাসরিন

আষাঢ় এলো বাদল নিয়ে তপ্ত মাটির বুকে,
সকল বীজের সুপ্ত অঙ্কুর তুললো মাথা সুখে।
ঝরছে বৃষ্টি, নড়ছে সৃষ্টি, বইছে হিমেল হাওয়া,
ডোবার পাড়ে হলো শুরু বরষার গান গাওয়া।

সই পেতেছে কদম-কেয়া, কামিনী আর জুঁই,
উঠোন জুড়ে মাচার ওপর হাসছে সতেজ পুঁই।
কলাবতী-কেতকী আর কাঁঠালচাঁপার ঘ্রাণ,
ঝিঙেফুলের হাসি দেখে মুগ্ধ সবার প্রাণ।

কলমি-কচু-হেলেঞ্চা আর মৎসরা সব মিলে,
দস্যিরা আজ দল বেঁধেছে পদ্ম-ফোটা বিলে।
সিঁদুর রাঙা মেঘের ফাঁকে মিষ্টি রোদের হাসি,
অর্ধচন্দ্র রঙধনুটি বড্ড ভালোবাসি।

বৃক্ষ শাখে মনোলোভা সবুজ পাতার সাজ,
উঠলো বেড়ে বুনো সুখে গুল্ম-বিরুৎ আজ।
চারিদিকে সবুজ সুখের নামলো শীতল ধারা,
আষাঢ় এলো উৎসবে তাই উঠলো জেগে পাড়া।
…………………………………………..

আহা বৃষ্টি! তুই আয় আজ
শাহনাজ পারভীন

এই বরষায়
ঘন তমসায় এলি বৃষ্টি কেন অবেলায়
এলি বল তুই, এই শহরে
এলি বহরে সাথে আনলি ডেঙ্গু বাংলায়
স্বচ্ছ পানির যত ফোয়ারায়।

সাথে মেঘ আর সাথে মল্লা
এলো জ্বরাসহ যত মৃত্যূ,এলো হল্লা
সাথে ভিড় লাগে, লাগে ভাট্টা
কেন, বল তুই আজ একাট্টা
এলি কেবিনে
ঈদ রাতে আজ হসপিটাল।

কাঁদে বাচ্চা, কাঁদে শিশু আজ
নির্ঘুম মার চক্ষু
ঘুম নেই বাবা ব্যস্ত।
নেই ছুটি আজ সেবিকার
ঘুমহীন সব ডাক্তার
বল বৃষ্টি
অনাসৃষ্টি
এলি সাথে কেন ঢাকাবাসীদের!

আহা বৃষ্টি তুই বেজে যা
বিরামহীন তুই নেচে যা
ভেসে যাক যত লার্ভা
ভেসে যাক পানি, রক্ত
হোক অক্ত-
যাক ভেসে যাক তোর স্রোতে আজ
যত জুলুম আর যত পাপাচার
ভেসে যাক যত অনাচার
আর
ভেসে যাক যত মিথ্যা।

আয় বৃষ্টি আজ শহরে
আয় বৃষ্টি সব জেলাতে
আয় বৃষ্টি জনসভা আর
ঈদ মার্কেট, ঋষি মেলাতে
ভেসে যাক যত ময়লা
পুড়ে খাক হোক আজ কয়লা
সুখে থাক যত পরিবার
তুই আয় সব ফের গড়িবার
তুই আয় আজ হেসে উঠতে
তুই আয় আজ ফুল ফুটতে
তুই আয় তুই আয় আজ
আহা বৃষ্টি!
কি যে মিষ্টি লাগে সুবাস আজ
তুই আয় আজ, তুই আয় আজ।
…………………………………………..

প্রিয় বৃষ্টির আশায় অপেক্ষমান
আবু রাইহান

তোমার আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে
আমার আকাশ ঝরায় রিমঝিম বৃষ্টি
আধো অন্ধকারে ঢাকা চারপাশ
বৃষ্টিদিনে হায় আবছায়া দূরদৃষ্টি !
বাইরে বৃষ্টি হলে ভেতর কাদা হয় না
ভেতরের কাদা আবহমান
প্রিয় বৃষ্টির আশায় অপেক্ষমান,
ভেতরে আসলে তেমন করে
কোনোদিনই বৃষ্টি হয় না !
সবুজ পাতা থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টি দেখলে
এখন ও তোমার কথা ভাবি
একাকী নির্জন ঘরে
এই পৃথিবীর অনন্ত আকাশ জুড়ে
ভালোবাসার বৃষ্টি ঝরে!
…………………………………………..

তোমাকে দেখি না বলেই
সুশান্ত হালদার

তোমাকে দেখি না বলেই বৃষ্টিকে করেছি আহবান
ভিঁজে যাওয়া দিনে তাই পেতেছি বানভাসি সংসার
যদি আসো প্রশান্ত দিন হবে মেঘমল্লার
ভেসে যদি যাই দূর,বহুদূর ; সঙ্গী করিও পরবাসী জীবনে তোমার

তোমাকে দেখি না বলেই গাছে গাছে উড্ডীন পতাকা আমার
পথ হারা পথিক চেনে যদি বাস্তুহারা আবাস
অতিথি বলে সম্ভাষণ জানাবো অপার
রেখে দিলাম স্বদেশী গোলাপের একচ্ছত্র অধিকার

তোমাকে দেখি না বলেই নিভে যাওয়া আগুনে বৈষ্ণবী হয়েছে বাতাস
মৃত হাড়ে তাই ক্ষয়ক্ষতির জমাটবদ্ধ হিসাব
ধর্মঘটী হয় যদি বাতাস
পাথর হয়ে কাটাবো আমি কাল থেকে মহাকাল

তোমাকে দেখি না বলেই রাজার রাজ্যে অনধিকার প্রবেশ আমার
রণভেরী বাজায় যদি সৈন্য সামন্ত আবার
শান্তির পতাকায় লিখে যাবো
‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বেঁচে থাকে শুধু পিষ্ট হওয়া মরাল’!
…………………………………………..

দুষ্ট ছেলে
কবির কাঞ্চন

বৃষ্টি এলে দৃষ্টি মেলে
কে হারাতে চায়
টাপুরটুপুর শব্দ মাঝে
আনন্দ যে পায়।

বৃষ্টি এলে জলের স্রোতে
নাইতে নামে কে
পাড়ার লোকে ‘দুষ্ট ছেলে’
বলে যে তাকে।

বৃষ্টি এলে দুষ্ট ছেলে
যায় ছেড়ে যায় ঘর
ভয় করে না অসুখ বিসুখ
লাগে না তার ডর।

বৃষ্টি এলে জলের মাঝে
নৌকা ভাসিয়ে
জলকেলিতে মেতে ওঠে
ভুবন হাসিয়ে।
…………………………………………..

এখানে অমৃত
নার্গিস পারভীন

এই যে সুদর্শন!
হবে নাকি ঘনঘোর প্রেমভরা মেঘবর্ষণ?

আমি হবো কেয়া!
খুলে খুলে দেব অনঙ্গ যৌবন বেশরম বেহায়া!

জল থরোথরো পাপড়ি!
ঝাপটা বাতাসে আলুথালু বিভঙ্গ বিমূঢ় কিশোরী!

এসো জলজ প্রেমিক!
তোমায় দেব বলে সযতনে রেখেছি যৌবনমুক্তোমানিক!

দোলাও হিল্লোলে হিল্লোলে!
বাজাও মেঘমল্লার বাদল বাতাসে দুরন্ত কল্লোলে!

এসো অতল ডুবুরী!
নাচে জলতরঙ্গ পেতে মাতাল সঙ্গ খুলে অমৃতনগরী!
…………………………………………..

আষাঢ় মাসে বৃষ্টি ঝরে
রানা জামান

আষাঢ় মাসে বৃষ্টি ঝরে
সকাল হতে দুপুর
বৃষ্টির তালে বাজছে শোন
খুকুর পায়ের নুপুর

খুকু সাথে নাচছে দেখো
খাঁচার টিয়ে পাখি
ওদের নাচন দেখে আমরা
কেমনে বসে থাকি

বৃষ্টির সাথে নাচন কুদন
চলছে বাড়ির সবার
আষাঢ় মাসে খায়েশ জাগে
সবার বৃষ্টি হবার।

আষাঢ় মাসে কদম ফুল

আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে
ফুটলো কদম ফুল
ছোট হলুদ ফুলটা চিনতে
হয় না কারো ভুল

বর্ষাকালে আকাশ কালো
বৃষ্টি ঝরাঝর
স্কুলে যাওয়া শিকেয় তুলে
আটকে থাকি ঘর

জানলা দিয়ে চেয়ে দেখি
কদম গাছের গায়
গোটা গোটা কদমের ফুল
আমার দিকে চায়

ঝড়ো বৃষ্টি বায়ে রেখে
কদম তলায় যাই
ডালটা ধরে টেনেটুনে
একটা কদম পাই

কদমের ফুল শুঁকতে শুঁকতে
চেতন হলে গুম
অমনি মায়ের কিলটা পিঠে
পড়ে ধুমাধুম!
…………………………………………..

বৃষ্টি ভেজা শৈশব
মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ

মেঘের পালকি চড়ে;
বৃষ্টি যখন নামত এসে সবুজ ঘাসের পরে
বইয়ের পাতায় বসত না মন কেমন কেমন করে
টিনের চালে ঝম ঝমা ঝম শব্দ শুনি কানে
বাতাস এসে ভুলিয়ে দিত ঘুম পাড়ানি গানে।
বই খাতা সব ফেলে;
বাড়ির উঠোন বেয়ে বেয়ে দুষ্ট যতো ছেলে
বৃষ্টি কাদায় মাখামাখি দারুণ হেসে খেলে
ভিজতে বেশি থাকলে বারণ কচুপাতা মেলে
নিতাম করে সবুজ ছাতা হাতের কাছে পেলে।
খেকশিয়ালের বিয়ে;
রোদের সঙ্গে বৃষ্টি এলে ইয়ে মানে ইয়ে
দুরের বনে হচ্ছে না কি খেক শিয়ালের বিয়ে!
সেই খুশিতে নাচছে বুঝি বনের সবুজ টিয়ে
লাল ঠোঁটে তার অনেক দামি পাতার নোলক নিয়ে।
পাখির কলরব;
ঝির ঝির ঝির বৃষ্টি হাওয়ায় পাখির ডানা সব
ভিজেই কেমন চুপসে যেত যেমন ফুলের টব
ফোটাত ঠিক গন্ধরাজের পাপড়ি যে ধব ধব
ফুলের গন্ধে মিলিয়ে যেত পাখির কলরব।
…………………………………………..

বৃষ্টির কৃষ্টি
জাফর পাঠান

কষ্টে সৃষ্টে- ধরার বায়বীয় পৃষ্টে
অদৃশ্য আসে দৃশ্যে- মেঘপুঞ্জ দৃষ্টে,
জানেনা মেঘ- কি লেখা তার অদৃষ্টে
তবু ক্ষণে ক্ষণে- ক্ষয়ে পড়ে ভূপৃষ্টে।

জন্ম যার, করা মানব উপকার
সৃষ্টি সুখের উল্লাস- শুধু-ই তার,
ফলে ফুল, ফলে ফল, শস্য এন্তার
খেলে যায় অন্তরীক্ষে, ঐ অবতার।

কখনো ফিরি ফিরি- কখনো নির্ঝর
যেন নর্তকীর নূপুর- ঝরঝর,
কখনো অষ্টপ্রহরের- সপ্তস্বর
কবি ঘোরে চারুকলার-চরাচর।

আসে যায়- দূর গগন নিলীমায়
রেখে যায় চিহ্ন- লালীত্য লালিমায়।
…………………………………………..

বৃষ্টি ভেজা
বনশ্রী বড়ুয়া

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, সূর্য গেল বাড়ি;
মেঘের দলে গা ভাসিয়ে,
সোনা রোদের আড়ি।

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,ভিজে সবুজ পাতার ঘর,
ভিজে তনু, ভিজে ধেনু,
ভিজে মনের দোর।

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, চল, ঘর পালিয়ে যাই;
হাতের পরে হাত রেখে,
চল, দূরে কোথাও পালাই।

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,সখা,কোথায় আছিস বল?
বৃষ্টি সুখে ভাসবো মোরা,
প্রেমে ভাসি আনি চল।

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,আমায় ডাকছে খুব,
বৃষ্টি ফোঁটা নীলচে সাদা,
অন্যরকম সুখ।
…………………………………………..

টিপ টিপ বর্ষায়
মজনু মিয়া

ঘোমটা পড়া বধূর মতো
ঘোমটা দিয়ে থাকে,
থেকে থেকে ঝরঝরিয়ে
বৃষ্টি সহ ডাকে।

কদম ফুলের গা ভিজিয়ে
মাটির বুকে নামে,
অধৈ জলের সমারোহ
ডানে কিংবা বামে।

মেঘ রানী তার মুখ করে ভার
বিজলী হাসি হাসে,
নায়িয়ে দিয়ে যায় প্রকৃতির
বুকটা জলে ভাসে।

চারিদিকে টইটম্বুর জল
করে নিত্য থইথই,
মাছ হাঁস জাতীয় আনন্দ পায়
ছেলে-মেয়ের হইচই।
…………………………………………..

সেই আষাঢ়ের কথা
রবীন বসু

তোমাকে বলিনি আগে, পুরোটা আষাঢ় মাস
গ্রামদেশে কার সাথে সারাবেলা ভিজেছি জলে?
কার সাথে রাজারানি খেলা?
কচুপাতা হাতে নিয়ে জল-মানিক ধরার আগ্রহ!

তোমাকে বলেছি কি আগে?
আষাঢ়ের দীর্ঘবেলা ছড়ি হাতে ঘাসফড়িং
মেরেছি কত?
হলুদ ঠ্যাং শালিকের খাদ্য হয়ে
তারা সব শুয়ে ছিলে মাঠে।

আমাদের যাত্রা পথ, আমাদের সবুজ শৈশব
কাদামাটি জলে ভাসে আষাঢ়ের নিমগ্ন সন্ধ্যা।
সারারাত বৃষ্টি ঝরে, সারারাত মেঘের গর্জন
রূপকথার ঘোড়াগুলো এইমাত্র মেঝেতে শুয়েছে।
সেই ফাঁকে স্বপ্ন আসে, জিয়নকাঠি মরণকাঠি
ঢলনামা কালোচুলের রাজকন্যা, আর
পক্ষীরাজ ঘোড়া থেকে নেমে আসে রাজপুত্র…

এভাবেই গল্পকথা সত্য হবে এই আষাঢ় মাসে!
…………………………………………..

বর্ষার নিমন্ত্রণ
ফারজানা সুবা

প্রিয়,
এই ছন্নছাড়া বর্ষার বিকেলে হঠাৎ মনে পড়লো আপনাকে,
হলুদ খামে চিঠি পাঠালাম— নিমন্ত্রণ রইলো।
আসবেন কিন্তু, একগুচ্ছ কদম হাতে,
এক বর্ষার বিকেল না হয় আমাদের হবে।

উত্তর এলো তার কিছুদিন পর- নীল খামে,
খামের ভেতর কদম ফুলের পাঁপড়ি—আর,
আর লেখা ছিলো,
কথা দিলাম এই বর্ষার সব বিকেল তোমার আমার।
লেখা ছিলো— নীল শাড়ি আর খোঁপায় কদম নিয়ে
এই বর্ষায় পাশাপাশি হাঁটবো দুজন
পিচ ডালা রাস্তায়।

কথা ছিলো এই বর্ষায় দেখা হবে আমাদের,
একগুচ্ছ কদম হাতে—
আচমকাই সামনে এসে দাঁড়াবেন।
অভিমানী প্রেমিকা হয়ে অহেতুক কিছু কথা
ছুঁড়ে দেব আপনার দিকে,
এত অপেক্ষা করানোর কারণ জানতে চেয়ে।

অতঃপর, সকল মান অভিমানের পালা শেষ করে,
আপনার হাতের কদমের ঠাঁই হবে আমার খোঁপায়।
নীল শাড়িটা পরবো আমি আনমনা আর কত ভাবনায় ,

অথচ,কই! আপনিতো আসলেন না!
এসে রাখলেন না আপনার দেয়া কথা।
ওই যে কথা দিয়ে নিখোঁজ হলেন,
সেই নিখোঁজই রয়ে গেলেন!
অথচ আমি নীল চুড়ি,টিপ আর নীল পাঞ্জাবি
কিনে রেখেছিলাম।

আপনার একগুচ্ছ কদমের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে,
আপনাকে বলা হয়ে উঠেনি,বর্ষাও আমার প্রিয় ঋতু।
বর্ষার এই আকাশটাও আমার বড্ড বেশি ভালো লাগে— বড্ড বেশিই নিজের লাগে।
যেমন করে নিজের লাগে আপনাকে।
…………………………………………..

বর্ষার কবিতা-২
লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

সকাল হতেই নেমেছে বৃষ্টি, আজকে সারাবেলা,
আকাশ জুড়ে কালো মেঘের, লুকোচুরি খেলা।
বৃষ্টির ধারা ঝরিছে অঝোরে,
নদী খেত মাঠ, জলে আছে ভরে,
বেড়ার ধারে, রাঙীগাই এক, বৃষ্টিতে ভিজে একেলা।
বাছুরীর কাছে নিয়ে এসো তারে, নিয়ে এসো এইবেলা।

বৃষ্টি ভেজা বাদল দিনে, মাঝিরা নাহিক খেয়াঘাটে,
বিজলী চমকায় আকাশের গায়, মেঘে মেঘে বেলা কাটে।
দূরে গাঁয়ের পথের বাঁকে,
এক হাঁটু জল জমে থাকে,
একটা সাপে ব্যাঙ ধরেছে, গাঁয়ের তালপুকুরের ঘাটে।
কালো জলে তার, রাজহাঁসের দল, বৃষ্টিতেও সাঁতার কাটে।

অজয় নদে বান ডেকেছে, উপছে পড়ে প্রবল ঢেউ,
মাঝি একা বসে ঘাটে, নাইকো কূলে আর কেউ।
মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ে,
পলাশ বনে পাতা নড়ে,
বর্ষায় ভিজে রাস্তার কুকুর, ডাক ছাড়ে ঘেউ ঘেউ,
আমি দেখি জানলা খুলে, আর দেখে না কেউ।

ঝম ঝমা ঝম বৃষ্টি পড়ে, গাঁয়ে ঢোকে জল,
বাসায় ভিজে পাখিরা সব, করছে কোলাহল।
বৃষ্টি পড়ে মুষলধারে,
মেঘ জমেছে আকাশপারে,
সকাল বিকাল অঝোর ধারায়, বৃষ্টি ঝরে অবিরল,
সকাল হতে আজিকে দেখি, নেমেছে বৃষ্টি বাদল।