ঋতুচক্রে বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আজকাল আর ঋতুচক্র তার সময়ের মধ্যে থাকছে না। বর্ষা শুরুর আগের শুরু হয় বর্ষা। আবার সময় চলে গেলেও অনেক সময় বর্ষার দেখা মেলে না। তারপরেও বাংলায় মেঘের আগমন ঘটে। শ্রাবণধারায় আন্দোলিত হয় প্রকৃতি। সে নতুন ভাবে সাজতে থাকে বৃষ্টির স্পর্শে। নদীর কোল জুড়ে চলে আসে নতুন শিশুর মতো নতুন পানি। মাছেরা অপার স্বাধীনতায় খেলা করে নতুন পানিতে। প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্নতার কালিমা।
পৃথিবী বদলে গেছে। আধুনিক জীবনে নেমে এসেছে সময়হীনতা। বর্ষা যাপনের ফুসরত করে উঠতে পারছে না নাগরীক মন। কিন্তু বর্ষা তার আগের রূপ নিয়ে হাজির হয় পৃথিবীতে। মেঘে মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যায় নাগরিক রাজপথ। কংক্রিটের নিচে মাটি থেকে ভেসে আসে সোদা মাটির গন্ধ। যে বীজ অঙ্কুর উদ্গম হতে পারছিল না এক ফোঁটা পানির জন্য সেও জেগে উঠার জন্য প্রার্থনা করে প্রভুর কাছে। আল্লাহ মেঘ দে, আল্লাহ পানি দে। প্রভু তার অপার কৃপায় বর্ষা জাপনের সুযোগ করে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজে যায় পৃথিবী। জেগে উঠে নতুন প্রাণ। এই সময় বাংলার লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা সবাই নতুন উদ্যোমে তাদের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরে জনমানুষের সামনে। বাংলার এই আদি প্রকৃতির আগমনকে উদযাপনের জন্য ‘মোলাকাত’ আয়োজন করেছে ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭’। লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ হবে এই সংখ্যাটি আমরা সেটাই আশা করি। লেখকদের ব্যাপক আগ্রহে আমরা যার-পর-নাই আনন্দিত। আজকে আমরা প্রকাশ করলাম ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭ : পর্ব-৪’।
আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত

সূ চি প ত্র

বৃষ্টি, বৃষ্টি :: শহীদ কাদরী
বৃষ্টি চিহ্নিত ভালোবাসা :: আবুল হাসান।
প্রেম ও বর্ষার কবিতা :: সৌরভ সিকদার
এসো বরং ক্রিকেট খেলি :: সুধাংশু চক্রবর্তী
শ্রাবণ :: লিপি চৌধুরী
বর্ষা :: রাসু বড়ুয়া
জলছায়া :: আমির হোসেন
বর্ষা :: তমসুর হোসেন
বরষা :: মাহফুজা রহমান অমি
পদ্মাবতীর রতিক্রিয়া :: রাজু ইসলাম
অশ্রুফুলের আকাশ :: শুভঙ্কর দাস
জলনগরের জীবন :: সবুজ আহমেদ
দিবস বিরহিণীর গান :: আফরোজা নীলা
আহ্বান :: কৃপা বিশ্বাস
বৃষ্টি ধারা :: এম মতিন
মেঘের বাড়ি :: স্বপঞ্জয় চৌধুরী
অদেখা শ্রাবণ :: দিপংকর ইমন
শ্রাবণোৎসব :: আবু আফজাল সালেহ
বৃষ্টিকুটুম :: শ্রীজিৎ জানা
বৃষ্টিভেজা চোখ :: অভীককুমার দে
…………………………………………..

বৃষ্টি, বৃষ্টি
শহীদ কাদরী

সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর-ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভীড়ে
যারা তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটলো, চৌদিকে
ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মত যেন বা মড়কে
শহর উজাড় হবে, – বলে গেল কেউ – শহরের
পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে খুব ঠাণ্ডা এক ভয়াল গলায়
এবং হঠাৎ
সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে
বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম!

বজ্র-শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি : শ্রুতিকে বধির ক’রে
গর্জে ওঠে যেন অবিরল করাত-কলের চাকা,
লক্ষ লেদ-মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন!
নামলো সন্ধ্যার সঙ্গে অপ্রসন্ন বিপন্ন বিদ্যুৎ
মেঘ, জল, হাওয়া–
হাওয়া, ময়ুরের মতো তার বর্ণালী চিৎকার,
কী বিপদগ্রস্ত ঘর-দোর,
ডানা মেলে দিতে চায় জানালা-কপাট
নড়ে ওঠে টিরোনসিরসের মতন যেন প্রাচীন এ-বাড়ি!

জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় জনারণ্য, শহরের জানু
আর চকচকে ঝলমলে বেসামাল এভিনিউ
এই সাঁঝে, প্রলয় হাওয়ার এই সাঁঝে
(হাওয়া যেন ইস্রাফিলের ওঁ)
বৃষ্টি পড়ে মোটরের বনেটে টেরচা,
ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নীচু
ত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে
দ্যাখে– জল
অবিরল
জল, জল, জল
তীব্র, হিংস্র
খল,
আর ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় শোনে
ক্রন্দন, ক্রন্দন

নিজস্ব হৃৎপিণ্ডে আর অদ্ভুত উড়োনচণ্ডী এই
বর্ষার ঊষর বন্দনায়
রাজত্ব, রাজত্ব শুধু আজ রাতে, রাজপথে-পথে
বাউণ্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদের, উন্মূল, উদ্বাস্তু
বালকের, আজীবন ভিক্ষুকের, চোর আর অর্ধ-উন্মাদের
বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ। রাজস্ব আদায় করে যারা,
চিরকাল গুণে নিয়ে যায়, তারা সব অসহায়
পালিয়েছে ভয়ে।

বন্দনা ধরেছে– গান গাইছে সহর্ষে
উৎফুল্ল আৎধার প্রেক্ষাগৃহ আর দেয়ালের মাতাল প্ল্যাকার্ড,
বাৎকা-চোরা টেলিফোন-পোল, দোল খাচ্ছে ওই উৎচু
শিখরে আসীন, উড়ে-আসা বুড়োসুড়ো পুরোন সাইনবোর্ড
তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি
কেননা সিপাই, সান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,
পালিয়েছে ভয়ে।

পালিয়েছে, মহাজ্ঞানী, মহাজন, মোসাহেবসহ
অন্তর্হিত,
বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন
ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে
কেবল করুণ ক’টা
বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে
বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো
নর্দমার ফোয়ারার দিকে–
ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন
ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন
মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি
লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপশন, শাদা বাক্সে ওষুধের
সৌখীন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার
ভবিতব্যহীন নানাস্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি

এইক্ষণে আঁধার শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে
নগ্নপায়ে ছেৎড়া পাৎলুনে একাকী
হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে
ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকার মতো একমাত্র আমি,
আমার নিঃসঙ্গে তথা বিপর্যস্ত রক্তেমাংসে
নূহের উদ্দাম রাগী গরগরে গলা আত্মা জ্বলে
কিন্তু সাড়া নেই জনপ্রাণীর অথচ
জলোচ্ছ্বাসে নিঃশ্বাসের স্বর, বাতাসে চিৎকার,
কোন আগ্রহে সম্পন্ন হয়ে, কোন শহরের দিকে
জলের আহ্লাদে আমি একা ভেসে যাবো?
…………………………………………..

বৃষ্টি চিহ্নিত ভালোবাসা
আবুল হাসান

মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল?

একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল
আমাদের ইস্টিশনে সারাদিন জল ডাকাতের মতো
উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল তারা;
ছোট-খাটো রাজনীতিকের মতো পাড়ায়-পাড়ায়
জুড়ে দিয়েছিল অথই শ্লোগান।

তবু কেউ আমাদের কাদা ভেঙে যাইনি মিটিং-এ
থিয়েটার পণ্ড হলো, এ বৃষ্টিতে সভা আর
তাসের আড্ডার লোক ফিরে এলো ঘরে;
ব্যবসার হলো ক্ষতি দারুণ দুর্দশা,
সারাদিন অমুক নিপাত যাক, অমুক জিন্দাবাদ
অমুকের ধ্বংস চাই বলে আর
হাবিজাবি হলোনা পাড়াটা।

ভদ্রশান্ত কেবল কয়েকটি গাছ বেফাঁস নারীর মতো
চুল ঝাড়ানো আঙ্গিনায় হঠাৎ বাতাসে
আর পাশের বাড়ীতে কোনো হারমোনিয়ামে শুধু
উঠতি এক আগ্রহী গায়িকা
স্বরচিত মেঘমালা গাইলো তিনবার!

আর ক’টি চা’খোর মানুষ এলো
রেনকোট গায়ে চেপে চায়ের দোকানে;
তাদের স্বভাবসিদ্ধ গলা থেকে শোনা গেল :
কী করি বলুন দেখি, দাঁত পড়ে যাচ্ছে তবু
মাইনেটা বাড়ছেনা,
ডাক্তারের কাছে যাই তবু শুধু বাড়ছেই ক্রমাগত বাড়ছেই
হৃদরোগ, চোখের অসুখ !
একজন বেরসিক রোগী গলা কাশলো :
ওহে ছোকরা, নুন চায়ে এক টুকরো বেশী লেবু দিও।

তাদের বিভিন্ন সব জীবনের খুঁটিনাটি দুঃখবোধ
সমস্যায় তবু
সেদিন বৃষ্টিতে কিছু আসে যায়নি আমাদের
কেননা সেদিন সারাদিন বৃষ্টি পড়েছিল,
সারাদিন আকাশের অন্ধকার বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে
আমাদের পাশাপাশি শুয়ে থাকতে হয়েছিল সারাদিন।
আমাদের হৃদয়ে অক্ষরভরা উপন্যাস পড়তে হয়েছিলো।
…………………………………………..

প্রেম ও বর্ষার কবিতা
সৌরভ সিকদার

১.
অরুণা যেওনা তুমি, এই বর্ষায় যেওনা তুমি
তোমার শাড়ির সবুজ ঘাসে আজ
বসেছে রঙিন প্রজাপতি, ওর বড় উড়াউড়ি শখ
তোমার দীর্ঘ রেভলোন নখ
ছুঁয়ে যায় মহানগর থেকে মফস্বল
কৈশোরের প্রেমে আহত পুরুষ আজো ভয়ে নত
মনের গভীরে যে গভীর ক্ষত–
অরুণা, তাকে তুমি নতুন করে করো না আহত।
অরুণা যেওনা তুমি, যেওনা আমার সাথে
তোমার ডাইকরা চুল আজ উড়বে না মেঘের রাজ্যে,
বৃষ্টি আসবেই এবেলা নিশ্চিত জেনো
তোমার চিবুকে মেঘে মেঘে জমেছে অনেক ধূলো।

২.
অরুণা, তুমি কি শুধু একাই বেসেছো ভালো
হতে পারে আমার অপুষ্ট মনের ভুলও–
তবু তোমার কাজলে ঢাকা টলটলে চোখ
আমি সেখানেও পড়ি অনাগত শ্লোক।
অরুণা আমি জানি, তোমার বর আছে
বাইশ বছরে হয়নি নিজের ঘর।

অরুণা, মনে কি আছে? কুয়াশা মোড়া জানুয়ারি এলেই
নীরবে কবি হতে পারে খুন-
অরুণা, পাথরের কি আছে কোনো গুণ?
আকিক পাথর তামার তাবিজ
যতই পরো না পারে না ভাগ্য ফেরাতে
তাহলে তো তুমি অনেক আগেই রাজরানি হতে।

৩.
অরুণা প্লিজ, যেওনা তুমি এই বর্ষায়
যেওনা আমার সাথে,
অরুণা যেওনা তুমি, যেওনা পাহাড়ে
ওখানে তোমার গোলাপি ত্বক রোদে পুড়ে
কেমন কালচে সবুজ-সবুজ হবে, আহারে-
আইফোন-মন আয়নায় দেখে ছটফট করে।
অরুণা তুমি চেওনা প্লিজ, যেতে চেওনা-
তুমিতো জানোই পাহাড়ে
মোবাইলের নেটওয়ার্ক বড় দুর্বল, তাছাড়া
তুমিতো কখনোই যাওনি নেটওয়ার্কের বাইরে
নাগরিক যাতনা ভুলে কজনই বা পারে
বর্ষাকে ভালোবেসে নেটওয়ার্ক ছেড়ে যেতে?

৪.
অরুণা, তুমি তো জানো, আমি কোমল ঘাসের কাছে যাবো
দুহাতে মাখবো দারুণ সবুজ
আকাশে নীলে ঠেসে ধরে চুমু খাবো
বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ের ঠোঁটে আর
ঝরনার জলে স্নান করবো জন্মদিনের পোশাকে।
অরুণা তুমি খুব লজ্জা পাবে
প্লিজ যেওনা তুমি, আমার সাথে এই বর্ষায়।
অরুণা, চুপি চুপি আমি সাজেক যাচ্ছি মেঘের অভিসারে
প্রিয় সবুজ, সজীব পাহাড়ে-
অরুণা, তুমিতো জানো সেন্টমার্টিন পরিবহনে
আর কোনো সিট খালি নেই আজ রাতে
তাছাড়া বাসে তুমি চড়োনি কখনো ।
এবার তুমি যেওনা প্লিজ-

৫.
অরুণা, এ বয়সে ভালোবাসাবাসি ছেলেমানুষি
সেকি পারবে তুমি দিতে?
আমার নষ্ট নাকে এখনো এক কিশোরীর
চুলের রঙ্গিন ফিতে।
আর করুণা? ও আমি চাইনি কখনো
অরুণা, ঢের হয়েছে। দূরে ছিলে সেই বেশ ভালো
প্রেমের প্রদীপ এই বেলা আর না-ই জ্বালো।
অরুণা এই বর্ষায় ভরা মন নিয়ে
আমি আর চাইনা পুড়তে। অরুণা—
আবার ঝুম বৃষ্টি। এই যাহ !
ভেবেছো তোমার মেক-আপের কি হবে?
অরুণা মন খারাপ করো না- প্লিজ।

৬.
অরুণা, একদিন নিশ্চয় সাজেক যেতে হেলিকপ্টার সার্ভিস হবে
একদিন নিশ্চয় পাহাড়ে নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকবে না
একদিন নিশ্চয় বৃষ্টিরা মেক-আপের সাথে করবে না দুষ্টুমি
একদিন নিশ্চয় আকিক পাথর ভাগ্য ফেরাবে
একদিন নিশ্চয় আমি আর জন্মদিনের পোশাকে স্নান করবো না
পাগলের মতো পাহাড়ে-টাহাড়ে চুমু খাব না
ঈদের ছুটিতে মেঘের সাথে কোলাকুলির জন্য
চিম্বুক যেতে অস্থির হব না।
অরুণা, সেই দিন তোমাকে নেবো
বর্ষা ১৪২৫ কে স্বাক্ষী রেখে বলছি—
ভালোবাসতে যদি নাও পারি- দেখো
হুমায়ুন ফরিদীর মতো দারুণ অভিনয় করে যাব।

৭.
অরুণা, সেই দিন তোমাকে নেবো।
সেই দিন তোমাকে নেবো।
…………………………………………..

এসো বরং ক্রিকেট খেলি
সুধাংশু চক্রবর্তী

ভাবছে সবাই এবার হবেই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
ব্যাটবলের খেলা নয় গো, চলবে গুলীগোলা।

তারের বেড়ার ফোঁকর গলে সবার আড়ালে
হাতে হাত মেলানোর খেলা দু’পক্ষতেই চলে।

শোনো ভাইসব, এই ব্যাপারে থাকুক সবার হুঁশ
জংলীপ্রাণী নই গো কেহ, আমরা যে ভাই মানুষ।

খুনোখুনির রাজনীতিতে দ্বিখণ্ডিত দেশভূমি
তোমার রক্ত চাইছি আমি, আমার রক্ত তুমি।

গুলীগোলা দিয়ে যে কারও যায় না মন জেতা
এই কথাটা বুঝবে কবে সকল দেশের নেতা।

যুদ্ধ করে কতটা কি লাভ হচ্ছে বলতে পারো
এসো বরং ব্যাটই করি তুমি বাউন্সার ছোড়ো।
…………………………………………..

শ্রাবণ
লিপি চৌধুরী

রাতের আকাশ ইষ্টি কুটুম
বৃষ্টি ভেজে আলসে
মাথার ওপর শামিয়ানা
শ্রাবণ মেঘে ভাসছে।
মনকে আমি নগ্ন করি
ঘাসের মতো সবুজ
একা আমি একলা না
সহবসেই তুমুল।
বৃষ্টি ছাট আদর মেখে
চাতক মেটায় তেষ্টা
মেঘ চিরে আগুন নামে
সলতে পাতে বুকটা।
খেয়ালি তানে মল্লার সুর
প্রকৃতির কনসার্টে
হারমোনিকায় চুমুর স্বাদ
উষ্ণ শরীর জুড়ে।
শ্রাবণ তুমি আমায় ভাসাও
নদীর বাঁকে বাঁকে
এক পৃথিবী প্রেম লিখেছি
নির্বাসনের ফাঁকে।
…………………………………………..

বর্ষা
রাসু বড়ুয়া

মেঘলা দিনে একলা আকাশ
কাঁদলে অঝোর ধারায়,
বৃষ্টি নেমে বন্যা এলে
নদী দু’কূল হারায়।

শান্ত নদীর অশান্ত রূপ
দু’চোখ ভাসায় জলে,
উপচে পড়া ঢল নামিয়ে
কাঁদার কথা বলে।

বিরামহীন এ কাঁদার মাঝে
পাহাড়ে ঢল নামে,
ঘরবাড়ি মাঠ বিলীন হলে
কান্না বুঝি থামে।

রিমিঝিমি কান্না শুনে
ফোটে কদম কেয়া,
অবারিত রূপের শোভা
বর্ষা থেকে নেয়া।
…………………………………………..

জলছায়া
আমির হোসেন

নিস্তব্ধ দুপুর কিংবা পড়ন্ত বিকেলে
চায়ের কাপে চুমুকে চুমুকে
যখন উড়ে অপেক্ষার অস্থির প্রহর
স্নানাগারের প্রপাতে তখন
স্রোতস্বিনী নদীর জলকল্লোল কানে বাজে
মহাকালের অধরা ধ্বনি হয়ে

সরোদ সুরের মূর্ছনায় মূর্ছিত হতে হতে
জলছায়ার দৃশ্য বন্দি করি ফটোগ্রাফির দিব্য কারিশমায়

মুখোমুখি হতেই তুমি তোমার অলক্ষে
ছড়াও তৃষ্ণার উষ্ণ লোবান
হয়ে উঠো সাধের কাঞ্চিধাম।

আপাদ-মস্তক সদ্যস্নানের পরিতৃপ্তি আর স্নিগ্ধতার মাখামাখি
দু‘চোখের জোনাকি রং শৈলিতে নাচে প্রগৈতিহাসিক প্রজাপতি

মসৃণ কাঁধে চুমু খেয়ে খেয়ে লোভাতুর ইঙ্গিতে
শিশির বিন্দুগুলি গড়িয়ে পড়ে
শীতল শিহরণে ছড়িয়ে পড়া স্নিগ্ধ জলরেখায়
ঐশ^র্যের মানচিত্র আঁকে
জল নিংড়ানো খোপাচ্যুৎ একটি কালো কেশ
আমি তখন দৃষ্টির সীমানা জুড়ে মহকাব্যের নৈবদ্য সাজাই
তোমার জলছায়ার সকাসে।

সে রাতে-শুশ্রুষার শয্যাপাতে

শুশ্রুষার শয্যাপাত নয় কেবল
নীড় খুঁজে পাওয়া জোড়া শালিকের মতো
নৈবদ্যে ভরে উঠেছিল সোহাগী সংসার

রুগ্ন শিয়রের পাশে নির্ভরতার প্রতীক
যেন তোমারই অঙ্গশোভার সমঅংশিদার

আলোছায়ার শয্যাপাতে জোছনা-চন্দন মুখে
তুলতুলে কানের ক্যানভাসে
বিলিকাটা আঙুলের উষ্ণতা

শঙ্খরং গ্রীবা, চিবুকের মধুচাক পেরিয়ে জোড়াঠোঁটে
ঢালতে স্পর্শের মাখন
তুমি ফুটেছিলে নক্ষত্রের কেচকিতারা হয়ে তখন
প্রতি পাপড়িতে আলোর আলয়ে
আমিও ছিলাম সমান্তরাল

পোড়া আঁখিতে-সেই জ্যোতিমাখা মুখ
অনুক্ষণ দেখেও বৃষ্টিস্নাত তৃপ্তিতে জুড়ায় না তৃষ্ণার্ত চোখ

ভরা বর্ষায় নদীর ঢেউয়ের বঙ্কিম ভাজে
রাতচরা পাখিদের শিস-কলস্বরে
পাশের বাতয়নে ফুলের জলসায় মিশে
বিলিকাটা আঙুল নেচেছিল নিপুণ তালে

আর শুশ্রুষা শয্যাপাতের সেই রাত মিশেছিল
অন্তহীন রাত্রীর উন্মুল দিগন্তে।

…………………………………………..

বর্ষা
তমসুর হোসেন

বানডোবা মাঠের মাঝখানে জেগে থাকা উঁচু টিলার ধারে
ঢেউ খলকান সারিবদ্ধ গাব আর গিলা গাছের শেকড়ে
অভিমানী বর্ষাকে করুণ সুরে কাঁদতে দেখেছি
ভেজা বাতাসের অন্ধকারে পথ হারানো নৌকার বাদাম মাস্তুলে
বেজে উঠেছিল তার মর্মভেদী কান্নার গুঞ্জন।

এ কেমন অগ্নিবর্ষী দাম্ভিক নির্দয় আকাশ !
উপদ্রুত লোকালয়ে ক্ষুধার চিতায় জ্বালে বৃষ্টির আগুন
বানভাসি ললনার ভীতিময় ফ্যাকাশে চিবুকে ফোঁশ ফোঁশ
শব্দ তুলে দংশন করে অসংখ্য কেউটে-গোক্ষুর ক্রোধমত্ত ভয়াল গর্জনে।

সন্দেহ হয়, মেঘের দরজা ভেঙ্গে আর বুঝি আসবেনা রোদের সকাল
অশুভ পাহাড়ি ভূত বিশ্বখেকো ক্ষুধা নিয়ে জলের তরঙ্গে
শান্তিপূর্ণ লোকালয়ে ছুটেছে দল বেঁধে সোল্লাসে
ধারাল খড়গে কেটে উজাড় করছে তারা নিরুপায় মানব বসতি।

অনেক উত্তাল পথ পার হয়ে বিচিত্র বনানির স্বপ্নময় কোলে
মৃত্যু,মহামারি, দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগে ক্লান্ত হয়ে ঠাঁই খোঁজে
রুগ্ন,রুক্ষ বর্ষা; মৃত্তিকার শ্রবণে সুখের সংগীত পরম যতেœ সেই দেয় ঢেলে
নিবিড় বৃষ্টিছন্দে সেই ভরে তোলে বিশুষ্ক মনের ভূবন।

একদিন প্রশান্ত সকালে উঠোনের পরিপাটি সতেজ স্নিগ্ধতায়
বর্ষাকে জীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী করে নিতে বড় ভালো লেগেছিল।
…………………………………………..

বরষা
মাহফুজা রহমান অমি

ওগো বরষা,
খুলে দিয়েছি কাঁচের জানালা,
তুমি মুছে দাও আমার জমাট বাঁধা যত যন্ত্রণা।
মিশে যাও তুমি দু’চোখ ভিজে গড়ানো জলে,
তুমি মুক্তি হয়ে আসো আমার হৃদয় ভাঙ্গা ক্রন্দনে।

ওগো আকাশ,
মেঘ জমেছে আমার মনের কোণে,
বিজলী চমকায় জেগে ওঠা স্মৃতির বিচরণে।
আমি হাতড়ে খুঁজি পালানোর যত বাহানা,
ধূসর গোধূলি জানান দেয়, বরাদ্দ নেই কোনো ঠিকানা।

ওগো দমকা হাওয়া,
প্রকৃতিতেই তোমার বিস্তার,
কেন আসো আমার নিঃশ্বাসে হয়ে দীর্ঘশ্বাস!
বরষার ফোঁটারা দেখতে বেজায় সুন্দর,
অথচ চোখ বেয়ে নামা জলের কণারা ব্যথায় প্রখর।

ওগো আষাঢ়ের বর্ষা,
আমি হাত বাড়িয়ে দিয়েছি তোমার পাণে,
তুমি প্রশান্তি মিলিয়ে দিয়ে যাও আমার হৃৎস্পন্দনে।
ভিজিয়ে দাও যত ব্যথাতুর গোপন অনুভূতি,
শূণ্যতায় কেঁদে মরে আমার যত গুমোট আকুতি।

ওগো বৃষ্টির ফোঁটা,
তুমি ঝরে পড় আমার এলোকেশে,
জমুক জল রাস্তায় আর গাছে ফোটা কদমে।
ভিজুক পরনের শাড়ি আর পুরো শহর,
সে ফিরবে বলে অপেক্ষাতেই কাটুক আরেকটা প্রহর।

ওগো শ্রাবণ,
তুমি আমায় দিয়ে যাও এক টুকরো সুখের খবর,
ফিরিয়ে দেও ফেলা আসা শৈশব আর কৈশোরের আনন্দের যত পরশ।
ভুলিয়ে দাও যত গ্লানি, দুঃখবোধ এবং না পাওয়ার ক্ষোভ
চাপা দেওয়া অতীতের তিক্ত সকল যন্ত্রণা তুমি এবার করো মোচন।
…………………………………………..

পদ্মাবতীর রতিক্রিয়া
রাজু ইসলাম

নদীর বুকে অসংখ্য অসংখ্য অবারিত জলধারা
কলকল আনন্দে খেলা করে
খেলা করে যৌবনের আরতি ভেঙে সারথীর সুখ আহ্বানে
আর দূরে আরো দূরে মিলিত হয় বিস্তীর্ণ আকাশ
এ দৃশ্য দেখবার আশে ভীড় জমায় হাজারো অভিলাষ
এবার পদ্মাবতীর অনবদ্য রতিক্রিয়ায় মত্ত হবার অভিষেক
এরকম দৃশ্য পদ্মাবতীর লীলাপদ্মে—
লিখিত হবার আগেই দৃশ্যমান হয় তীরবর্তী
কংক্রিটের মানুষ
আর সেই আক্রোশে হায়েনার হিংস্র ছোবল নিয়ে আসে পদ্মা
আগ্রাসিত হয়ে তলিয়ে যায় তার অতল গহ্বরে
গলাধিকৃত হতে থাকে একটার পর একটা জনপদ

এবার ভেবে দেখুন এ দৃশ্য দেখবেন, নাকি পালাবেন?
…………………………………………..

অশ্রুফুলের আকাশ
শুভঙ্কর দাস

মাছরাঙাটি বসে আছে উদাসবিন্দুর ওপর,তার চোখে শিকারের চকচকে বিদ্যুৎ
মনের তরঙ্গে একটি মৎসচক্ষু দেখা দিলেই চোখের পলকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে দিগন্তে

যেখানে রূপনারায়ণ ও মেঘনা জমাট বেঁধে স্থির,এমনভাবে ঝরে পড়বে মাটির ওপর অসংখ্য কাঁটাতার ধুয়ে যাবে
যেভাবে ধুয়ে যায় জন্মান্তরের ধান-দুব্বা থেকে ধুলো!

মাছরাঙার মুখ মায়াবী হরিণের মতো চমকায়

এত তীর কোথা থেকে নেমে আসে! নাকি কোনো অদৃশ সহস্র চোখের অশ্রু!

তাকে বিদ্ধ ততক্ষণই করতে থাকে যতক্ষণ না মুখ থেকে মৎসচক্ষুটা পড়ে যায় চাষীর কপালে- খরায়- ঘামে

এরপর তো বীজধানের গন্ধ
মুষলধারে ভুবন জুড়ে মাছের চোখের মতো বৃষ্টি নামে…

…………………………………………..
জলনগরের জীবন
সবুজ আহমেদ

লোকালয়ে না দেখলে ধরে নিও আমি আর নেই
জলনগরে ষোলগুটি খেলে রেখে এলাম ব্যথার প্রলেপ
নীলিমার নীচে তৈরি রোদ ও রোদনের একাকী মঞ্চে
জীবন এখানেই শেষ; ঝরে পড়ে থাকা পাতার নিচে
বহু বিঘ্নে,বেদম ক্রন্দনে মাটির প্রিজমে বন্দি হয়ে….
না আছি স্থবির স্বপনে-না নেই কবিতা লেখার উৎসবে।

একাকী শব্দহীন শহরে,না নেই শংকিত শর্তের শাসন ?
সত্যি পরাজিত হয়ে রেখে এসেছি জিওল মাছের আশ্রম।
…………………………………………..

দিবস বিরহিণীর গান
আফরোজা নীলা

ভোরের কাঁচা রোদের
হলুদ রং দিয়ে ধুয়ে ওঠে
দিনের দাবিদার সূর্য,
প্রভাত তার নরম শরীর দিয়ে
ধুয়ে মুছে দেয় অন্ধকারের ছায়া
ফিরে পায় আলোর যৌবন,
দুপুরের তপ্ত তৃষ্ণার ক্লান্তিতে
ভিজে ওঠে তৃষ্ণায় ব্যাকুল প্রকৃতি।
সময়ের গেলাসে সবুজ ফলের রসের
শরবত খেয়ে ক্লান্তির আয়েস করে
ঐ শ্রাবণের অশ্রুমাখা মেঘ,
একাকী পুড়ে যায় মানবিক প্রকৃতি
মেঘের কোল ঘেঁষে উড়ে যায়
কতো বৃষ্টির ফোঁটা।
সবুজ অরণ্য আশায় বসতি গড়ে
যদি ঝরায় মেঘ বেদনার বৈভবে বৃষ্টি
কোন বর্ষা পীড়িত রাতের আঁধারে
নিঃশব্দে উড়ে যায় ভেজা শরীরের পাখি
আজও সে অতৃপ্ত জলের পরশে।
দুপুরের তীব্র আলোর তোড়ে হাত ধরে
বেয়ে ওঠে নরম লতানো বিকেল,
সে কেবলই চায় শান্ত স্নিগ্ধ সন্ধ্যার বর্ণিল ছটা
ডুবে যাওয়া আলোর লুকোচুরি
সোনালি বেদনার ঐ আকাশ
গলে গলে পড়ে রাত্রির নিয়ন আঁধারে
আপন ঘরে, আপন মনে তোমায় তৃপ্ত করে
মহাসাগরের নিজের অতলান্তে
এরই খেলা, খেলছে সে
আপন মনে,
মহাজগতের সাথে।
…………………………………………..

আহ্বান
কৃপা বিশ্বাস

তোমার অনুমিত ছাড়াই,
এই ঋতুমতীকে নব রূপ দিতে,
বর্ষার কণাগুলো দিয়ে আজ
শুরু করে ফেলছি তোমায় আকাঁ।
আমার অঙ্কনহীন জলসা ক্যানভাসে।

কারণ আমি যে বর্ষাকে কথা দিয়ে ফেলছি,
আজ থেকে আর একাএকা ভিজে,
তার ছন্দ তোলা সুরের সাথে
বিরহের কণা মিশিয়ে ছন্দহীন করবো না।
রাখবো না তারে আর যৌবনহীন,
আর করবো না তারে নির্জনতাপ্রিয়।

এবার রূপার নূপুরধ্বনি তুলে,
রূপায়িত করে সুরের ধারা নামাবো।
মেঘলা রঙের শাড়ী দিয়ে আহ্বান করে, আনবো ফিরিয়ে বারবার এই বর্ষাকে।

আমি জানি তুমি আসবে আমার সঙ্গী হয়ে
কদম কলিতে সাজিয়ে সজ্জিত করতে।
আসবে বর্ষার ধারাতে মাতিয়ে
এই অদম্য ছন্দের সাথে তাল শেখাতে আমায়।
আর আমি সেই এক এক ফালি স্মৃতি নিয়ে,
ডাইরির পাতাগুলো কবিতাগুচ্ছতে সাজাবো।
আর চিৎকার কন্ঠে বলতে থাকবো অবিরত,
আমি পেরেছি -পেরেছি আমি বর্ষাকে নবীন রূপে রূপাশ্রিত করতে।
…………………………………………..

বৃষ্টি ধারা
এম মতিন

বাদল দিনের বৃষ্টি ধারা
মন আমার নেয় লুটে
মেঘেরা সব পাখা মেলে
আসছে এবার ছুটে।

বৃষ্টি ফোঁটা পেয়ে দেখি
সাজছে সবুজ মাঠ
উজান জলে মাছ থৈ থৈ
ভরা পুকুর ঘাট।

ভিজে ডালে দোয়েল শালিক
ভিজে ময়না ফিঙে
বৃষ্টি ভিজে মনের সুখে
টানছে মাঝি ডিঙে।

বৃষ্টি মেখে উঠান সাজে
টগর বেলি ফুলে
বৃষ্টি মেখে লাউয়ের ডগা
লুটায় দুলে দুলে।

বৃষ্টি পড়ে দিঘির জলে
হাঁসে শালুক পদ্ম
বৃষ্টি তানে পাই খুঁজে পাই
বেঁচে থাকার ছন্দ।

বৃষ্টি ভিজে খেলতে মাঠে
কার না ভাল লাগে
সোঁদা মাটির গন্ধ মেখে
নতুন পুলক জাগে।
…………………………………………..

মেঘের বাড়ি
স্বপঞ্জয় চৌধুরী

মেঘের বাড়ি যাবো আমি
ছাতা মাথায় দিয়ে
বাধ সেধেছে ছোট্টচড়ুই
তার সাথেও টিয়ে।
বৃষ্টি হলে আমরা সবাই
ভিজবো আনন্দে
পাঠশালাকে ছুটি দিয়ে
নাচবো সানন্দে।
সূর্য্যিমামা মেঘের তলে
লুকিয়ে যদি থাকে
মেঘ সখাকে বলবো যেন
ঢেকেই রাখে তাকে।
আমায় যদি সঙ্গে না নাও
তোমার সাথে আড়ি
বাধ সেধেছে ছোট্টসোনা
যাবেই মেঘের বাড়ি।
…………………………………………..

অদেখা শ্রাবণ
দিপংকর ইমন

বৃষ্টির মগ্নতায় বড় ভয় পায় কবিতা,
কৃষকের ক্ষুধার্ত হাসি মরে গেছে
বেকার কদম ফুলের অচেনা নিরবতা
যান্ত্রিক কৈশোর ক্রমাগত দিশেহারা নিমেষেই।
প্রেমিকার সময় কোথায় চোখে চোখ রাখবার?
বৃষ্টি ভেজার দিন হারিয়েছে ইতিহাস।
শুধু কৃষাণীর চোখ অবিরাম ভিজে যায়
শ্রমের সস্তা বাজারে,
শ্রাবণ কে ধরে রাখে চোখের গভীরতায়।
…………………………………………..

শ্রাবণোৎসব
আবু আফজাল সালেহ

বৃষ্টি নামে মধ্যরাতে ঝরঝর ঝর।
তোমার চোখে আমার চোখ
নীলিমার চেয়ে বেশি নীল
আকাশের চেয়ে বেশি উদার।

চতুর্দিকে ঝুমকোজবা বকুল বীথি
সুবাসিত হাসনাহেনা কদম কেতকী
ঝুলবারান্দা, চাঁদনি আলোর লুকোচুরি, মচ্ছব,
শুধু একটি কবিতা সৃষ্টি হবে তাই
এমন বৃষ্টিমুখর জ্যোৎস্নারাতে
বইছে শ্রাবণোৎসব।
…………………………………………..

বৃষ্টিকুটুম

শ্রীজিৎ জানা

বৃষ্টিকুটুম ছুটুম ছাটুম
ছিটকিনিতে ধাক্কা
যতই বলো জানলা খোলো
শুনছি না বায়ানাক্কা।

ইলশেগুঁড়ি হীরের কণা
পদ্মপাতায় আর্শি
জলের রেখায় হরেক ছবি
আঁকন খাতা শার্সি।

হাওয়ায় ভেসে দেশ বিদেশে
বান ডাকবে এক নিমেষে
এসব তো তার নস্যি,

বৃষ্টিকুটুম ছুটুম ছাটুম
মেঘমুলুকের দস্যি!
…………………………………………..

বৃষ্টিভেজা চোখ
অভীককুমার দে

আমার শৈশব জানে, বর্ষার মানে
ঘুম ভাঙানো মেঘ পাখি
ডানা মেলে দিলেই, আকাশের
কালো ছায়া জমাট বাঁধে বাবার মুখে।

তার আগে, কালবৈশাখীর ঝড়ো বাতাস
যে ঘরের ছাউনি এলোমেলো করে দিয়ে গেল
অনাথ শিশুর মতোই
বৃষ্টি এলে অসহায়, বাবা
খুব কথা বলা মানুষটি চুপ হয়ে যায়,
চোখের জল জমা হয় বুকের ভেতর।

আকাশের বৃষ্টি তখন শত্রুর মতো
ফুটো চাল বেয়ে ঘরে ঢোকে,
মা বাসনপত্র ছড়িয়ে পা গুটিয়ে বসে থাকেন ঘরের কোণে,

বছরের পর বছর, ঘরের ভেতর বৃষ্টিভেজা চোখ
বুকের বাঁধ ভাঙে জীবনের বর্ষা নদী।