ঋতুচক্রে বাংলায় আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে আজকাল আর ঋতুচক্র তার সময়ের মধ্যে থাকছে না। বর্ষা শুরুর আগের শুরু হয় বর্ষা। আবার সময় চলে গেলেও অনেক সময় বর্ষার দেখা মেলে না। তারপরেও বাংলায় মেঘের আগমন ঘটে। শ্রাবণধারায় আন্দোলিত হয় প্রকৃতি। সে নতুন ভাবে সাজতে থাকে বৃষ্টির স্পর্শে। নদীর কোল জুড়ে চলে আসে নতুন শিশুর মতো নতুন পানি। মাছেরা অপার স্বাধীনতায় খেলা করে নতুন পানিতে। প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্নতার কালিমা।
পৃথিবী বদলে গেছে। আধুনিক জীবনে নেমে এসেছে সময়হীনতা। বর্ষা যাপনের ফুসরত করে উঠতে পারছে না নাগরীক মন। কিন্তু বর্ষা তার আগের রূপ নিয়ে হাজির হয় পৃথিবীতে। মেঘে মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যায় নাগরিক রাজপথ। কংক্রিটের নিচে মাটি থেকে ভেসে আসে সোদা মাটির গন্ধ। যে বীজ অঙ্কুর উদ্গম হতে পারছিল না এক ফোঁটা পানির জন্য সেও জেগে উঠার জন্য প্রার্থনা করে প্রভুর কাছে। আল্লাহ মেঘ দে, আল্লাহ পানি দে। প্রভু তার অপার কৃপায় বর্ষা জাপনের সুযোগ করে দেয়। বৃষ্টিতে ভিজে যায় পৃথিবী। জেগে উঠে নতুন প্রাণ। এই সময় বাংলার লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা সবাই নতুন উদ্যোমে তাদের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরে জনমানুষের সামনে। বাংলার এই আদি প্রকৃতির আগমনকে উদযাপনের জন্য ‘মোলাকাত’ আয়োজন করেছে ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭’। লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ হবে এই সংখ্যাটি আমরা সেটাই আশা করি। লেখকদের ব্যাপক আগ্রহে আমরা যার-পর-নাই আনন্দিত। আজকে আমরা প্রকাশ করলাম ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৭ : পর্ব-৬’।
আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত

সূ চি প ত্র
বৃষ্টি : বন্ধু শত্রু উভয়ত :: হাসান হাফিজ
সপ্তর্ষির জন্য :: মুহম্মদ নূরুল হুদা
তাকে আমি বৃষ্টি বলি :: ওবায়েদ আকাশ
বৃষ্টিমধু :: মুস্তাফা ইসলাহী
বর্ষা :: শিব প্রসাদ খাঁ
বৃষ্টি ও কবিতা :: তূয়া নূর
ঝুমবৃষ্টির স্বাদ :: নাহিদ
বৃষ্টিতে তোমার স্মৃতিগুলো :: নেহাল মাহমুদ
বর্ষার নৌকা :: গোবিন্দ মোদক
ভরাডুবি :: সুভান
ভ্রমণ :: অনন্ত সুজন
আয়নাবাচক :: নুসরাত নুসিন
বর্ষার কবিতা :: অদ্বৈত মারুত
না বর্ষার কবিতা :: প্রহেলিকা
বৃষ্টিদিনে :: রাজীব সিংহ
ঘাতক :: ইব্রাহিম বিশ্বাস
বৃষ্টি :: কমল কুজুর
ঝড় বৃষ্টি :: আফজাল সুয়েব
বিষ্টি পড়ে মনিটরে :: আফসার নিজাম
বর্ষার কবিতা :: সুকুমার রায়
…………………………………………..

বৃষ্টি : বন্ধু শত্রু উভয়ত
হাসান হাফিজ

বৃষ্টি তুমি বিরহজ্বালার চোরা প্রতিশব্দ
মেঘে মেঘে প্রিয়াকে পৌঁছাতে পারো না চিঠি
এই দুঃখ পুষি মনে মনে
অন্তরঙ্গে নিরজনে
‘আইল্যা’র আগুন হয়ে নিভু নিভু জ্বলো
তোমাকে কী ক্ষমা করা যেতে পারে, বলো?
বৃষ্টি তুমি বন্যা আনো ডেকে
দীর্ঘকাল জলবন্দি থেকে
কাব্যগাথা সৌরভ ছন্দের দ্যুতি মনকে আরো
বেশি বেশি দগ্ধায় পোড়ায়
অঝোর বর্ষণে কেন হারানো দিনের কথা
অনিচ্ছায়ও মনে পড়ে যায়!
আহা বৃষ্টি, তারপরও ভালোবাসা আকাক্সক্ষা তোমার জন্য
তুমি ঝরলে ব্যথা পাই, তাও হই গোপনে গোপনে ধন্য!
…………………………………………..

সপ্তর্ষির জন্য
মুহম্মদ নূরুল হুদা

গীতগোবিন্দের জলে ভেজে বালি হাঁস
স্বরচিত মেঘদূতে মজে কালিদাস
পদ্মায় রবীন্দ্রনাথ সজল তাকায়
কাদম্বরী ভেজা চুলে ফিরে ফিরে চায়
জল পড়ে পাতা নড়ে বনে আর মনে
সপ্তর্ষির বজ্রবাঁশি গগনে গগনে
চকিতে তোমার রূপ দেখি আনমনে
…………………………………………..

তাকে আমি বৃষ্টি বলি
ওবায়েদ আকাশ

ওখানে ভাঙছে, সুবর্ণ পরিখা- তাকে যে বেষ্টন করে
ফলের উপমা হয়ে- উড়ে এসে বসেছ শস্যের শোভা
মেঘের ফলনে যদি বহুদূরে বৃষ্টি নামে এই-
এমন নিপুণ জলে কাকে দেখো- ভেসে চলে যায়…

এভাবে ভেসেছে, দলিত মেঘেরা- ভেবেছে প্রখর চাঁদে
দুটি কথা বলা যদি হয়, অগোচরে ফিরে দেখা
চতুর পালক- তোমার জন্মের মাসে
এই মেঘে ঝরে গেল যদি
দুটি কথা কিছু নয়- তাকে আমি বৃষ্টি বলি
…………………………………………..

বৃষ্টিমধু
মুস্তাফা ইসলাহী

রিমঝিম বৃষ্টির কণা
কবিমন করে আনমনা।
ভাবনার রংধনু দোলে
খসে পড়ে কাগজের কোলে।
কতো ভাবি নেই কোনো মানা
মনে মেলে কবিতারা ডানা
ভাব ভাষা ছন্দের ঘ্রাণ-
দিয়ে আঁকি কবিতার প্রাণ।

কবিতারা প্রিয়তমা, বধূ
তাই বলি, বৃষ্টিটা মধু।
…………………………………………..

বর্ষা
শিব প্রসাদ খাঁ

মেঘ কলসে জল এনেছে
বীজ পোয়াতি সময়।
উঠোন জুড়ে কাদামাটির দাগ
আলপনাতে ঐশ্বর্য্যময়।

মাটির উপোস দিচ্ছে বতর ক্ষিদে
নদীর সীমা টপকে যাওয়া বান,
জলকে ছুঁয়ে কথাকলির নাচ
মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাণ।
নাচমুদ্রায় মানুষ লেগে থাক।

এসব কথা বাস্তু কথা
বর্ষা কথা নয়।

বর্ষা চোঁয়ায় কদম তরু ডালে
বর্ষা ভেজে ব্যাঙের ছাতায়।
বর্ষা ছোড়ে চকমকি ওই মেঘ
বর্ষা জমে খাতার পাতায়
শহুরে রাজপথ।

এসব কথাও কল্পকথা
বর্ষা কথা নয়।

বীজ পোয়াতি সময়
পুণ্য স্নানের জল এনেছে
মেঘ কলসী ভরে।
…………………………………………..

বৃষ্টি ও কবিতা
তূয়া নূর

কিছু কিছু মেঘে বৃষ্টি হয় না
মন ভার করা কাল টিপ হয়ে আসে
আকাশে ভাসতে ভাসতে মিলায়ে যায়
টুকরো টুকরো মেঘ।
চাওয়ার সব রং তূলিতে আসে না
সব কথায় কবিতা হয় না
দরজায় ভীষণ শব্দে কড়া নাড়ে
বুকের ভেতর গুমরে ওঠা সব কষ্ট কথা হয়ে উঠে না।
কবিতার খসড়া খাতার পাতার ভাজে কালিতে লেখা শব্দগুলো চাপা পড়ে থাকে।
অনেক গড়াতে গড়াতে সেই টুকরো টুকরো কথা গুলো
জোড় বেঁধে হয়তো ভাষা পায়।
হয়তো পায় না
কখনো
কোনদিন।
মেঘের মতই মনের কথা মিলায় মহাশূন্যে।

…………………………………………..
ঝুমবৃষ্টির স্বাদ
নাহিদ

ভিন্ন ভিন্ন যুগগুলো স্বপ্নস্মৃতির দপ্তরে পড়ে থাকে, লালসুতোয় বাঁধা
আপত্তিকর বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের স্তূপ নাকি মর্জিমাফিক ধাঁধা—
প্রায়ই ভাবায় দিনের শুরুর খুশবুদার উঠোনে, যেন চৌঘুড়ি আমার
আবাদিজমির মতোই চাষ করে মগজের ক্ষেতখামার
গাড়িয়াল নিয়ে চলে কাদামাটি মাড়িয়ে সবুজপ্রাণে
তোয়াজ-তদারকে আড়মোড়া ভেঙে তোলে সূর্য রহস্যগানে

বৃষ্টিদেখা ভোরের আলোটুকু মেখে নত হই তোমার ছায়ায়
জন্মগত আর্তনাদ কখনও যে বুদ্ধু বানায় তাও বুঝি মায়ায়
শরীরের বিশাল সাগরে রক্তের নুড়িগুলো মাঝেমধ্যে তড়পায়
ঘর্মাক্ত বৈশিষ্ট্যে অস্থিরতার স্বাদ দেয় ঝুমঝুমবৃষ্টির সহযাত্রায়
…………………………………………..

বৃষ্টিতে তোমার স্মৃতিগুলো
নেহাল মাহমুদ

এখান থেকে তোমার ঘরটি দেখা যায় না
কিন্তু মন দিয়ে দেখা যায়, ছোয়াঁ গেলেও তা বারণ।
আজ এই বৃষ্টির কান্নার উৎসব দেখে
আমি নিশ্চিত তুমি উপভোগ করছো।
তোমার সুরেলা কন্ঠে হয়তো বেজেছে নতুন কোন সুর।
জানি,সেই সুরের কোন রাগেই আমার অস্তিত্ব নেই
তা একান্তই তোমার, তোমার ভালোবাসার।

আমাকে ভাবার, মনে করার
ব্যর্থ চেষ্টাও এখন তোমার দ্বারা অসম্ভব।
আমার সাথে অতীতটা হয়তো
তোমার শতজন্ম আগের কাহিনী।
আমার পরে তোমার বাগানে হয়তো
ফুটেছে অনেক ফুল, তাদের গন্ধ নিয়েছে আবার
কত অজানা,অচেনা বিপরীত লিঙ্গের মানুষ।
সে রাতের পর নিশ্চয় তোমার আকাশে
উড়ে গেছে অগণিত ভিনদেশি,অতিথি পাখি।
কেউ কাউকে পোষ মানিয়ে রেখেও দিয়েছ নিজের কাছে।
আমার প্রস্থানের পর তোমার বন্দরে হয়তো
এসে থেমেছে শত দূরের জাহাজ, সেখানে
নাবিকেরা তোমার পছন্দের নানা উপহার বোঝাই করে এনেছে।

সত্যিই তো, আমি তোমাকে কি ই বা দিয়েছিলাম?
জন্মদিনের প্রথম উপহার
বসন্তের প্রথম ফুল
একটা বৃষ্টির শহর
একজোড়া রঙ্গিন চুড়ি
না একটা বেনারসি
কিছুই দিতে পারিনি, শুধু ভালোবাসা ছাড়া।
আমি সত্যিই জানতাম না ভালোবাসা পেতে হলে
এসবের খুব প্রয়োজন।

শুধু এটুকুই জানি আমাকে তুমি ভুলে গেলেও
আমার মন থেকে নিজেকে মুছে নিতে পারবেনা তুমি।
কারণ বৃষ্টি একদিন না একদিন নামবেই
তুমি কি জাননা,বৃষ্টিতে তোমার স্মৃতিগুলো
নতুন জীবন পায়, নতুন করে আমাকে কাদাঁয়।
তুমি কি জাননা, বৃষ্টিতে তোমার স্মৃতিগুলো
নতুন জীবন পায়, নতুন করে তোমাকে ভালোবাসতে শেখায়।

…………………………………………..
বর্ষার নৌকা
গোবিন্দ মোদক

বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে খুব,
মাঠে-ঘাটে বনে-বাদাড়ে টাপুর টুপর টুপ্ !
দিনের বেলায় ঘোর সন্ধ্যা আকাশ কাজল কালো,
সূর্যিমামা মেঘের নিচে লুকিয়েছে তার আলো!
মাঠের মাঝে ভিজছে গরু, ভিজছে রাখাল ছেলে,
ডিঙি চড়ে টোকা মাথায় মাছ ধরছে জেলে!
মাঠের থেকে ফিরছে চাষী সাঙ্গ করে কাজ,
কচি-কাঁচা-পুঁচকেরা সব ঘরবন্দী আজ!
উঠোনেতে জল জমেছে থই ! থই !! থই !!!
হাঁসরা করে ছুটোছুটি- চই ! চই !! চই !!!
একলা বসে ঘরের কোণে মানছে নাকো মন,
ভীষণ শব্দে চমকে উঠি, মেঘ ভরা গর্জন !
অংক খাতার পাতা ছিঁড়ে করি তাকে চৌকো,
ভাঁজ করে তাই বানিয়ে ফেলি কাগজের নৌকো!
সেই নৌকো ভাসিয়ে দিই বৃষ্টি-ঘোলা জলে,
বৃষ্টি ফোঁটা মেখে নৌকো চলে হেলে দুলে !
মনে আশা সেই নৌকো আসবে আবার ফিরে,
ততক্ষণই বৃষ্টি ঝরুক, ধীরে ! ধীরে !! ধীরে !!!
…………………………………………..

ভরাডুবি
সুভান

১.
জলের ভিতর কথারা তলিয়ে যাচ্ছে,
অথচ তুমি স্থির দাঁড়িয়ে দেখছো বৃষ্টি মাথায়,
তবু হাত বাড়িয়ে দিচ্ছো না। এত অভিমান…

সম্পর্কের ভরাডুবি, ভাঙা পাড় লিখে রাখতে নেই।
তাই লিখছি না। নৌকার তলদেশে ছোট্ট ফুটো।
সেই ছিদ্র দিয়ে জল যে কতদূর ঢুকে পড়বে এবার…

এই ঘোরবর্ষা হেঁটে পার হতে হবে আমাদের,
সাঁকো তো একটি, কিন্তু হৃদয় তো দুটো।
জল এখন আর আমাদের আগের মতো
আয়না দেখায় না। শুধু যেতে যেতে
জলে ডুবে যেতে থাকা কথাদের
জল থেকে তুলে রাখো৷

২.
ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছি বর্ষায়,
দেখি, কত দূর ভেসে যাওয়া যায় এই ভাবে।

জলে ডুবে যাওয়া ঘর থেকে আর কি কি টেনে
বের করা যায়। নদী পাড় ভেঙে খায়ে জীবনের।

আসবাব যা ছিল তা গেছে। কাগজপত্র ভিজে কাচ।
স্মৃতিদের টেনে আনা গেল? তোমার আমার সংসার?

৩.
দূরের মেঘের রঙ দেখে আমরা এখনি
ঘর ছাড়া হয়ে যেতে পারি।
আল ধরে কিছু দূর চলে যেতে পারলেই
উঁচুজমি। বন্যায় ঘর ভেসে যায়,
ডুবে মরে মাঠের ফসল।
এত জল কোথা থেকে আসে মনের ভিতর?

৪.
সীমানা ডুবে গেছে ঘরোয়া পাঁচিলের।
আসবাব আসলে সম্পর্কের মতো জলে ভাসে।
ঘরে একটি মাত্র খাট। তার ওপরে জগৎসংসার।
খিদের চিহ্ন ক্রমশ বদলে যাওয়া জলের দাগ।
আমাদের দেশে জলে যত না দেহ ডুবে মরে,
মনে ডুবে মরে তার বেশি।
জল তো মনেরও বেড়ে যায় এমন বর্ষায়।

৫.
যত দূর হাওড়ের জল দেখা যায়
ততদূর আমাদের গ্রাম ভেসে গেছে,
তারও দূরে ভেসে গেছে ছেঁড়া বর্ষাতি।
গোপন ডিঙা।
শহরের পানি তাও ভালো,
উঁচু দেওয়ালের নীচে
অকেজো কথারা শুধু ডোবে,
বাকিটা সাঁতরে পেরিয়ে যায়
কাদা ও জীবন।
…………………………………………..

অনন্ত সুজন
ভ্রমণ

অপ্রত্যাশিত অথচ অবিরাম বৃষ্টির আদরে আদরে
আমরা পৃথিবীর বাইরে চলে গিয়েছিলাম!

বিসর্পিল ছায়াপথ ধরে, ব্রহ্মাণ্ডের অসম্ভব-অনধীত
জংশনে, বন্দরে, রঙধনু বিছানো পথের উপর—
নামিয়ে দিয়েছি ব্যথার প্রপাত,
নিভৃতের অশ্রুপাত কোনো!

যন্ত্রযানে উড়ছি অলৌকিক, অধরা নির্জনে
পেছনে শোভান্বিত তুমি, ধরে আছো কল্প-পারিজাত।
স্কন্ধের মধ্যভাগে আছড়ে পড়ছে প্রশ্বাসের উষ্ণ হিল্লোল
স্ফুরিত ছোবল রক্তিম উদ্ভাসে বিমন্দ্রিত!

ঈর্ষাকবলিত গ্রহে গ্রহে শিহরন, গুচ্ছ গুচ্ছ ঝলক-ঝড়
বিরচিত চুমুর চাঁদমারি আসক্তির আয়াতে অফুরান বাজে!
মোহমগ্ন বিউগল যেন!

আমরা ততক্ষণে নেপচুনের হিমেল বনভূমিতে
বিলীন হচ্ছি একে অন্যের ভেতর!
…………………………………………..

আয়নাবাচক
নুসরাত নুসিন

এই প্রথম বৃষ্টি আয়নাবাচক হলো।
আর কোনো সাঁকো ছাড়াই
এপার-ওপার একাকার হলাম।
অথচ
আমরা কিন্তু আমি-তুমি একটাই বিম্ব হতে চাই নি।

বৃষ্টির সহজ হাওয়া কিছু পূর্বাভাস দিয়েছিল
আর মুখোমুখি জলের নিঃসরণ,
পলক রেখেই
অকস্মাৎ সরিয়ে ফেলি চোখের প্রমাণ!

বৃষ্টির স্ফীত সাদার উলম্ব আবরণে
আজ কোনো ঘনত্বই ছিল না।
…………………………………………..

বর্ষার কবিতা
অদ্বৈত মারুত

অন্ধকার হয়ে আছে আজ দিবসের আলো।
ঘরে, ঘরের বাইরে, বনাঞ্চলে তুমুল হাহাকারে
সুশোভিত চিত্রকুটির, হলঘর, প্রসুন রেস্তোরাঁ
ঠান্ডা বাতাবিলেবু, ভিজতে থাকা বর্ণিল গম্বুজ
তুলতুলে নরম শিশুর দুচোখও ঘন অন্ধকারে

ভিজে যাচ্ছে বর্ষায়। নিশ্চল ঠোঁটের অস্বীকার
যুগলবন্দি কামার্তের ঘাম, মাঝরাতের স্নানঘর
ভাগাড়ে কলহকারণ কুকুরের আর সব ব্যস্ততা
ধ্বনিত বৃষ্টিতে অনুজ্জ্বল বেলায় ভেসে যাচ্ছে-
কারও চুলের বুরুজ, স্তনমিনার, সরল দেহের ভাঁজ।

বর্ষায় আকাশ-ই দেখি। পাড়া মাথায় নিয়ে আছে!
…………………………………………..

না বর্ষার কবিতা
প্রহেলিকা

এখন আর আমি আষাঢ় শ্রাবণের কোনো পিছুটানে নেই
ভালবাসার কফিন ধরে শেষ কবে কেঁদেছিলাম তাও ঠিক মনে নেই
বুঝতেই পারছো, এখন কারো কোনো খোঁজে-
আমার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই।
কার ঘরে অথবা কোন প্রহরে কে টোকা দিয়ে যায়,
দূরে বসে বাজায় বাঁশির সেই চিরচেনা সুর;
এসবে এখন আর আমার কিছুই যায় আসে না।

আমি যেহেতু আর কাউকে ভালবাসি না, তখন
কার চোখের জল খেলে শিশিরের সাথে
চন্দ্ররোদে জ্বলে দেহ রাতের শয্যায়
ঝাপিয়ে পড়ে গভীর জলের প্রেমপাঠে;
তাতে আমার গণ্ডারের চামড়ায় একটা ফোস্কাও পড়বে না।

আমি যেহেতু আর মেঘ বৃষ্টির ধারেকাছে নেই, তখন
শ্রাবণের কোনো বনে বা আষাঢ়ের কোনো স্বরে
আমাকে কেউ খুঁজে পাবে না,
জড়ো হবে না কেউ আর রাতঘুমের চিৎকারে।
ভালবাসা আমাকে বড়ো বাঁচিয়ে দিয়েছো গো!

মিথ্যে বলবো না, বৃষ্টির দিনে বাইরে যখন জলতরঙ্গ সৃষ্টি হবে
রবি ঠাকুরের অতল সুরে তোমাকে আমার অনেক মনে পড়বে,
তবে আমি সেদিকে যাবো না, কাঁথা মুড়ি দিয়ে-
দীর্ঘ বিরহীর ঘুম একাই ঘুমাবো।

তবে হ্যাঁ, এ বাজারে যখন অনেক আগুন, যদি শুনি
সেই আগুনে কেউ পুড়ে পুড়ে মরিয়া হয়েছে
একের পর এক ব্যাংক লোন নিয়ে ডিফল্টার হয়ে পড়েছে কেউ,
তাকে জানিয়ে দিও, তার পরবর্তী ব্যাংক লোন গ্যারান্টি হতে
আমি বিনা বাক্যব্যয়ে রাজি,
শুধু মনের ঘরে জং ধরা তালাটি খোলা চলবে না;
বর্ষার তুচ্ছ কদম্বের ছল ছুঁতোয় তো নয়ই!
…………………………………………..

বৃষ্টিদিনে
রাজীব সিংহ

তোমারো তখন সত্যি হলো এই জীবনের শেষে
বাল্যকালীন অসুখ যতো মাঝবয়সের খ্যাতি
ভুবন মাঝে চোদ্দপুরুষ যেই প্রেমে আটখানা
খণ্ড খণ্ড প্রণয়গাথা সাজায়ে বাহিরদ্বারে
আজো মন তুমি কল্পতরুর খোয়াবে ম্গুল
জানতেম যদি এই বিরহের ছবি মানে ছায়াপথ
ভেসে চলে যাওয়া একা এক গ্রহ নৈরঋত পেরিয়ে
তবু মেঘ এসো পুলসরাতের আগুন পেরিয়ে এসো
আমার সকাল আমার দুপুর রাত্রি পেরিয়ে যাও
কবিতার খাতা ক্ষত ভরে দাও তুমুল বৃষ্টিদিনে
…………………………………………..

ঘাতক
ইব্রাহিম বিশ্বাস

অন্ধকারের ভিতরেই হাঁট ছি
একটা শব দেহ টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছি
বহু দিন ধরে টান ছি
রক্ত ঝরছে দেহ থেকে
গন্ধ ছড়াচ্ছে
কিন্তু কেউ পালাচ্ছে না ,নাকে কাপড় দিচ্ছে না
গন্ধ টা সবার সয়ে গেছে
আর কত দিন ?কত পথ টানতে হবে ?

ভাঙা ব্রীজের উপর দিয়ে হাঁট ছি
আমিই ঘাতক, আমাকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছি
শরীরের সব অবসাদ ভেঙে৷
…………………………………………..

বৃষ্টি
কমল কুজুর

সেদিন বৃষ্টি ছিল অনেক
ভিজেছিলাম দুজনে,
হাত দুটি ধরে ;
আমৃত্যু,
তুমি ভয় পেয়েছিলে –
যদি ঠান্ডা লেগে যায়!
যদি সর্দি কাশি হয়!

আমি বলেছিলাম- ভয় পাচ্ছ কেন?
আমি তো আছি।
সত্যি! সেদিন আমরা কেউই
অসুস্থ হইনি; সর্দি- কাশি
কিছুই নয়।

তবু কি এক অসহ্য যন্ত্রণার বীজ বোনা হয়েছিল সেই বৃষ্টির দিনে,
যতবার আকাশ ভেঙে
নামে শ্রাবণ ধারা;
ততবারই চোখের জলে বান ডেকে যায়,
আর পরান মাঝি
নাও বায় তায় ; আপনমনে।

কোন সুদূর হতে ভেসে আসা-
সাইরেনের শব্দে মন বিচলিত হয়,
তড়িত গতিতে ছুটে যায়
কোন মরীচিকায়!
আচ্ছা বিধাতা, বৃষ্টি দাও কেন?
…………………………………………..

ঝড় বৃষ্টি
আফজাল সুয়েব

আকাশের মন ভালো নেই
কখন জানি আসে বৃষ্টি,
বাদলার দিনে নবরূপে-
সাজছে বিধাতার সব সৃষ্টি।
উড়ছে পাখি ছুটছে নীড়ে
এসেছে দুরন্ত বাতাস,
বিজলি চমকে হুশিয়ারি দেয়
যেনো জলন্ত আকাশ।
তীব্র হাওয়ার অশান্ত গতি
ঝড়ের সাজসাজ রব
ভেঙ্গে ছুড়ে চুরমার
গাছপালা গুল্মলতা সব।
…………………………………………..

বিষ্টি পড়ে মনিটরে
আফসার নিজাম

বিষ্টি পড়ে
খোকার ঘরে
কমপিউটার মনিটরে
ঝম-ঝমা-ঝম শব্দ করে
স্পিকারে বিষ্টি পড়ে

বিষ্টি পড়ে- হাত ভিজে না
বিষ্টি পড়ে- পা ভেজে না
বিষ্টি পড়ে- গা ভেজে না
ভিজে খোকার চোখ
বাইরে গিয়ে ভিজতে খোকার
মন ছিলো উন্মুখ।

মা বলেছে- ভিজতে মানা
বাপ বলেছে- ভিজতে মানা
বোন বলেছে- ভিজতে মানা
ভিজলে হবে জ্বর
জ্বরের ভয়ে ভিজতে মানা
মানে না অন্তর।

তাইতো খোকন বাইরে বাড়ায় পা
বিষ্টি ভেজা কাক হবে সে
ভেজা পাখির ঝাঁক হবে সে
আজকে কারো নিষেধ মানবে না।
…………………………………………..

বর্ষার কবিতা
সুকুমার রায়

কাগজ কলম লয়ে বসিয়াছি সদ্য,
আষাঢ়ে লিখিতে হবে বরষার পদ্য।
কি যে লিখি কি যে লিখি ভাবিয়া না পাই রে,
হতাশে বসিয়া তাই চেয়ে থাকি বাইরে।

সারাদিন ঘনঘটা কালো মেঘ আকাশে,
ভিজে ভিজে পৃথিবীর মুখখানা ফ্যাকাশে।
বিনা কাজে ঘরে বাঁধা কেটে যায় বেলাটা,
মাটি হল ছেলেদের ফুটবল খেলাটা।

আপিসের বাবুদের মুখে নাই ফুর্তি,
ছাতা কাঁধে জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি।
কোনখানে হাঁটু জল, কোথা ঘন কর্দম
চলিতে পিছল পথে পড়ে লোকে হর্‌দম।

ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদ্‌গদ্,
গান করে সারারাত অতিশয় বদ্‌খদ্‌।।