বৃষ্টিস্নাত সকাল বিকাল রাত। চারপাশে থই থই পানি। এমন সময় বাইরে কেউ নেই। কাকভেজা মানুষ উম খোঁজে প্রিয়ার হৃদয়ে। প্রকৃত প্রভু প্রেমিক ইবাতদে মশগুল হয়। কবি শিল্পী সাহিত্যিক আনমনা হয়। তাদের চিন্তায় খেলা করে নতুন সৃজন। বর্ষা মানে প্রকৃতির নতুন শিশু জন্মানোর কাল। বর্ষা শুরুর আগের শুরু হয় বর্ষা। আবার সময় চলে গেলেও অনেক সময় বর্ষার দেখা মেলে না। তারপরেও বাংলায় মেঘের আগমন ঘটে। শ্রাবণধারায় আন্দোলিত হয় প্রকৃতি। সে নতুন ভাবে সাজতে থাকে বৃষ্টির স্পর্শে। নদীর কোল জুড়ে চলে আসে নতুন শিশুর মতো নতুন পানি। মাছেরা অপার স্বাধীনতায় খেলা করে নতুন পানিতে। প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্নতার কালিমা।

বর্ষা যাপনের জন্য যে হৃদয় উচাটন। সেই বর্ষা যাপনের সময় খুব একটা পায় না নগরবাসী। কংক্রিটের পাথর নগরী তখন জীবন ও জীবিকার অন্বেশনে বেতি ব্যস্ত। এবার বর্ষার সময় প্রাকৃতিক মহামারীতে বন্দি মানুষ। জীবিকার তাগিতে বাইরে যেতে হচ্ছে না। ঘরে তাদের বন্দি জীবন। লকডাউন তাদের বন্দি করে দিয়েছে। এই সময় বর্ষা এসে হাজির। সে তার হৃদয় খুলে ঢেলে দিচ্ছি পানি। মানুষ আজ প্রকৃতির দুই অবস্থানে দেখে সেজদাবনত হয়ে আছে। প্রকৃতির কাছে অসহার হয়ে প্রভুকাছে ধর্না দিচ্ছে। নিশ্চয় বর্ষার মতো একদিন আসবে করোনা মুক্ত সুন্দর দিন। তখন সৃজন ক্রিয়া হবে ভয় মুক্ত নতুন সৃজন। এতো বিষাদ জীবন নিয়েও লেখকরা বসে নেই লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা সবাই নতুন উদ্যোমে তাদের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরে জনমানুষের সামনে। বাংলার এই আদি প্রকৃতির আগমনকে উদযাপনের জন্য ‘মোলাকাত’ আয়োজন করেছে ‘বর্ষা সংখ্যা ১৪২৮’। লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ হবে এই সংখ্যাটি আমরা সেটাই আশা করি। লেখকদের ব্যাপক আগ্রহে আমরা যার-পর-নাই আনন্দিত। আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত
……………………………………………

সূচীপত্র

রোদেলা দিন :: তমসুর হোসেন
বর্ষা ও নন্দিনী কাহন :: এ কে আজাদ
এই বর্ষায় :: হরেকৃষ্ণ দে
বৃষ্টি আসুক :: আহমাদ কাউসার
বর্ষায় বর্ষায় :: মনিরুজ্জামান প্রমউখ
বাদল দিনের গান :: উমর ফারুক
বর্ষাটি বহিয়া যায় :: আশিস মিশ্র
বর্ষা :: মুন্সি আব্দুল কাদির
দুঃখ পেলে কাঁদতে যাই শ্রাবণ বৃষ্টিজলে :: রুদ্র সাহাদাৎ
বৃষ্টি :: হোসাইন মুহঃদেলোয়ার
বর্ষার জল :: শেখ একেএম জাকারিয়া
বরিষার গান :: আর. কে. শাব্বীর আহমদ
এ-ই আষাঢ়ে মেঘমালার গল্প :: রুদ্র রাকিব
কুমারী বৃষ্টি :: সোহেল মাহবুব
একটু যদি বুঝতে তুমি :: মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন
গাছ লাগাও :: মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ
সে জল আমায় অভিধান পড়ে শুনিয়েছিলো :: জসীম উদ্দীন মুহম্মদ
কমল কুজুর :: স্বপ্নভূক
বৃষ্টির শব্দে :: বদরুদ্দোজা শেখু
বর্ষা সুন্দরী :: গোবিন্দ মোদক
……………………………………………

রোদেলা দিন
তমসুর হোসেন

সারা বর্ষায় একবারও এলে না
রোদেলা দিন হয়ে
তোমার দৃষ্টির সুধায় প্রসন্ন হল না
বৃষ্টিভেজা আকাশ
এভাবে থাকব কতদিন, কতকাল
অদেখা অজানা ।

সন্ধ্যার লালিমা গায়ে মেখে
প্রান্তরে বাজে বাউল বাঁশি
মৃত শিশুর কৃষ্ণ কফিন হয়ে ওড়ে গগণের ব্যথিত মেঘ
বানভাসি মানুষের ভেজা উনুনে
শুয়ে থাকে ঝরঝর বরষার অভুক্ত দিন
দমকা বাতাসে কেঁপে ওঠে সন্তান সম্ভবা রমণির পুষ্টিহীন ক্ষুধাকাতর তনু
নিরাশ্রয় কুকুর ক্রন্দন করে প্রতিটি রাত্রির শেষে
তুমি তার জান না কিছুই ।

অন্তত একবার এসে দেখে যাও
দূরন্ত বর্ষায় নির্মল আকাশ ঢেকে দিয়ে
আঁধারে লুকিয়ে কাঁদে থমথমে রাত
ভয়াল মেঘের আঁধারে হারায় গাঁয়ের বিস্তৃত প্রান্তর
তোমার সোহাগ আমার অপেক্ষার প্রহর ছুঁয়ে যাবে এই প্রত্যাশায়
রাতের নির্জনে জোনাকীর আলো মেখে
শুনছি পতঙ্গের যতিহীন গান ।
……………………………………………

বর্ষা ও নন্দিনী কাহন
এ কে আজাদ

মেঘের চাদরে ঢাকা বর্ষার দিন শেষে
কার্নিসে নেমে আসে অশ্রুসিক্ত রাত।
রাত্রির দীর্ঘাশ্বাস বাড়ে,
আর বালিশের দহলিজে বাড়তে থাকে
পোড়া মাটির ঘ্রাণ।
মনে পড়ে – কতদিন যে কারফিউ জারি করা দরজার কপাটে টোকা দিয়েছে এই উড়ন্ত আঙুল!
রাত যত গভীর হয় ততই তুমি হয়ে ওঠো নিষিদ্ধ গন্ধম।
এভাবে আর কতদিন জাহান্নামের আগুনে
ছড়াবে পুষ্পের সুবাস, নন্দিনী!
বেহুদা রাত্রির ঘুম কেবলই রাতজাগা পাখি হয়ে
উড়ে যায় তোমার ঘরের বারান্দায়,
সারা রাত ধরে পাখা ঝাপ্টায় তার বাড়ন্ত শরীর।
এভাবে বর্ষাময় দিন-রাত্রির কাহন শেষ
দহনে জ্বলে ওঠে ভোরের সূর্য!
আর কত দিন-রাত্রি এমন বর্ষার জলে
ভিজবে নন্দিনী?
-বল, তুমিই বল।
নন্দিনী, বল, তুমিই বল।
……………………………………………

এই বর্ষায়
হরেকৃষ্ণ দে

এই বর্ষায় তোমার ভরসায় ভিজবো বলে করেছি মস্ত প্ল্যান,
সব মেঘ ভাঁজ করে লিখে দিয়েছি এক বাদল ব্যস্ত প্রেম লেন৷

প্রেম দিয়ে ঝরাও এবার বৃষ্টি তুমুল আষাঢ় কিম্বা শ্রাবণ,
অঝোর বৃষ্টি গিলে প্রেমের কবিতায় ভিজিয়ে যেও মন৷

এই বর্যায় হৃদয়ের দরজায় দমকা জলের ঝাপট,
উড়িয়ে আকাশ মনের কার্পাস যেন পেঁজা তুলোর পট৷

এই বর্ষায় জীবন নৌকায় লেখা থাক আষাঢ় গগন,
ভরা গাঙে ভেকের সুরে বৃষ্টিলতায় বেজে উঠুক হৃদয় সদন৷
……………………………………………

বৃষ্টি আসুক
আহমাদ কাউসার

বৃষ্টি আসুক বৃষ্টি নামুক
আসুক সবুজ গায়ে
মেঘ বালিকা নেচে উঠুক
নুপুর দিয়ে পায়ে।
জেগে উঠুক সবুজ পাতা
হাসুক কদম ফুল
জলের পিঠে ঢেউ খেলে যাক
কলমি লতায় দুল।
উঠোন জুড়ে বান বয়ে যাক
বৃষ্টি ফোটা জলে
ডানা মেলে করে খেলা
দেখবো হাসের দলে।
বৃষ্টি আসুক বৃষ্টি নামুক
বইচি বনের পরে
সব কোলাহল থেমে পাখি
থাকুক আপন ঘরে।
……………………………………………

বর্ষায় বর্ষায়
মনিরুজ্জামান প্রমউখ

আষাঢ়ে’র পূর্ব-পশ্চিম নিয়ে, দিল শান্ত তাঁজা ৷
ভেতরে’র অঙ্গে, তার যতো থাক- ভেজা ভেজা ৷

ফাঁক দিয়ে, রোদ্দুর যদি- উঁকি মারে আকাশে জ্বারা ?
ভালো লাগে, তার- অলি গলি আর- ক্লান্তি সারা ৷

কে আছে রঙ্গীন, কে আছে প্রবীণ সুখ-তারা ?
মুছে দেবে- স্যাঁতসেঁতে জমিন আর- বৃষ্টি’র পিপাসা ?

ঘর-কুনো হয়ে থাকা- বছরে’র কোনো এক ঋতু-বেলা ৷
স্বাস্থ্য, মেধা আর- মননে’র উত্তম বীজ বিত্ত-বাড়া ৷

কে দেখে- ভূমি, কে দেখে- রবি শীতল পারায় ?
মন-বৃদ্ধি আর- ধ্যান-বৃদ্ধি উষর বানে, বর্ষায় বর্ষায় ৷৷
……………………………………………

বাদল দিনের গান
উমর ফারুক

প্রভাত হল রবি মামা আজ কোথায়?
ঘুম ভেঙে যায় চায়ের কাপে চুমুক
পুব আকাশে বাঁশের আড়ের মাথায়
আজকে কেন রবি মামা বিমুখ…
হোসেন চাচা আবু বকর পথে
ছাতার সিকে বাদল ভায়ের কান্না
অতি মাত্রাই বৃষ্টি এই প্রভাতে _
দুখের দিনে কুল-কিনারা পায়না

পাড়ার ছেলে রাখবে কোথায় খুশি
রাখলো ধরে ছূটলো সদায় সাঁকো
ওপার থেকে জল ছুটার এক হিরিক
এই সময়ে কেউ ফিরবে নাকো ।
নদীর জলে মিলিয়ে গেছে ডোবা
মিশে গেল তাইতো ওপার বাংলায়।
নদীর মত যেই নিয়েছে এক বাঁক
বসির ভাইয়ের মাছ ধরবার ভেলা।

বাদল ঝরে পাড়াটা আজ ভিজে
রজনী হতে সকাল টা বেশ মন্দ
উজান হাওয়ায় প্রতিটা সুর বাজে
ঝরনাটা তাই মিলিয়েছে খুব ছন্দ।
…………………………………………

বর্ষাটি বহিয়া যায়
আশিস মিশ্র

বর্ষাটি বহিয়া যায় যমুনা পদ্মায়
চারিদিকে কোলাহল কে যায় কে যায়।
সে কি তোমার হৃদয় গোপন কামিনী
তার সঙ্গে কবে হবে মধুর যামিনী।
বর্ষাটি বহিয়া যায় এপার ওপার
মেঘ এসে দাঁড়িয়েছে খুলে দাও দ্বার।
মোহ ঘন হয়ে আসে রূপের বিভায়
ভিজিয়ে দিয়েই সে তো আগুন নিভায়।
বর্ষাটি কেমন ছিলো কিশোরী সময়
শাড়িতে শরীর এলে কাব্য জন্ম হয়।
ডুব দিয়ে খুঁজে আনো তার অঙ্গজল
কামাত্মায় ঢুকে দেখো অতল অতল।
বর্ষাটি বহিয়া যায় পৃথিবীর বুকে
কবি তো তোমার কাছে ভেসে যায় সুখে।
……………………………………………

বর্ষা
মুন্সি আব্দুল কাদির

বর্ষা এসেছে সাগর নদে
জোয়ার ভেসে
মেঘের ভেলা আকাশ নীলে
চলছে হেসে।

হঠাৎ সে যে রিমঝিমিয়ে
ঢালছে পানি
তার বিরহের দুখ যাতনা
ক’জন জানি।

মাঠ ঘাট সব দেয় ভাসিয়ে
উজার করে
খোকা খুকি আর সব জনা
আপন ঘরে।

সে যে বহায় পানির নহর
শ্যামল দেশে
গাছ পালা আর তরু লতা
উঠছে হেসে।

মেঘের সাথে জোয়ার ভাসে
নাচছে মাছে
ঝরা পাতা যায় হারিয়ে
সবুজ গাছে।

তার আগমন তার আয়োজন
রহম মায়া
প্রভুয় নিরাশ দুখের প্রকাশ
শোকের ছায়া।
……………………………………………

দুঃখ পেলে কাঁদতে যাই শ্রাবণ বৃষ্টিজলে
রুদ্র সাহাদাৎ

সুখী মানুষের ভিড় দেখি শুধু মানুষ দেখি না
মানুষগুলি মুখোশের ভিতর হাঁটে অহর্নিশ

ঘড়ির কাঁটায় টিক টিক শব্দে সময় হারিয়ে যায়

মানুষ কখন কি খুঁজে মানুষই বুঝে না
স্বার্থে অন্ধ দু-চোখ, স্বজন চিনি না

বিবেক, মনুষ্যত্ববোধ ওড়ে গেছে কালবৈশাখী ঝড়ে
দুঃখ পেলে কাঁদতে যাই শ্রাবণ বৃষ্টিজলে…

সুখী মানুষের ভিড় দেখি শুধু মানুষ দেখি না
সোনাদিয়ার উলঙ্গ বালিচরে ঘুমহীন জেগে থাকি
স্বপ্নভঙ্গ তারাপদ মন।
……………………………………………

বৃষ্টি
হোসাইন মুহঃদেলোয়ার

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
বৃষ্টি পড়ে টাপুর,
বৃষ্টি এলে ঘরে যে আর
মন থাকে না আপুর।

বৃষ্টি এলে খুশির চোটে
ইচ্ছে মতো ভিজবে,
উঠোন জুড়ে নেচে নেচে
বৃষ্টি পানি হিঁচবে।

আপু ভিজে করি কি যে
মন বসে না ঘরে,
আপুর মতো আমার ও
ভিজতে ইচ্ছে করে।

অবশেষে নেমে পড়ি
সাথী হই আপুর,
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
বৃষ্টি পড়ে টাপুর।
……………………………………………

বর্ষার জল
শেখ একেএম জাকারিয়া

বর্ষাকালে রিনিঝিনি
বৃষ্টি পায়ের নূপুর
ঘরের ভেতর সময় কাটে
সকাল সন্ধ্যা দুপুর৷

মেঘে মেঘে গর্জে ওঠে
বিজলিবাতি চমক
বৃষ্টি দিনে ভিজতে গেলে
মায়ের শুনি ধমক৷

ঝিরি-ঝিরি বৃষ্টি পড়ে
মনটা থাকে উদাস
ফুল বাগিচায় ফোটে কত
বকুল বেলি পলাশ৷

হাওর নদী উপচে পড়ে,
দেখতে টলমল
টিপটিপাটিপ সুরে বাজে
বর্ষাকালের জল৷
……………………………………………

বরিষার গান
আর. কে. শাব্বীর আহমদ

প্রভু হে তোমায় মনে পড়ে
এই ঘনঘোর বরিষায়।।

কদম-কেতকীর অমীয় ঘ্রাণে
ডাহুক শ্যামার মধুর তানে
শেফালী বকুল ঝরা
ভোর-বিহানে
প্রভু হে তোমার সমীপে
পড়ে রই পরম সিজদায়।।

বরিষার বজ্রনিনাদে
ঝড়-তুফানের মহাদুর্যোগে
দরিদ্র মানবতার তুমিই সহায়
খড়-কুটোর মতো উড়িয়ে দিওনা
মোদের ছোট্ট এই আঙিনা
ওহে মহামহীয়ান ওহে দয়াময়।।

বৃষ্টিস্নাত শুচি-সবুজ শরৎ প্রভাতে
কী অপরূপ মহিমা ছড়াও নীল আভাতে
উড়ো উড়ো মেঘলার শ্রাবণ নীলিমায়
সোনালি রোদের সোনালি আভায়
মনটি আমার ছুটে যায় প্রভু
তোমার ওই আরশ-আঙিনায়।।

বরষার বরিষণে ধুয়ে মুছে
সাফ করে দাও মনের কালিমা
করোনার ছোবল থেকে বাঁচাও ওগো
তাবৎ পৃথিবীর তাবৎ মানবতা
ওহে অসীম ওহে গাফুর মহান
তুমিই যে শুধু সবহারাদের সহায়।।
……………………………………………

এ-ই আষাঢ়ে মেঘমালার গল্প
রুদ্র রাকিব

এ-ই আষাঢ়ে মেঘের যৌবন সৌন্দর্য
কোন এক রমণীর ছদ্মবেশে;
কখনো বিষণ্ণতা; কখনো আবেগে;
কখনো আক্ষেপ; কখনো অনুরাগে;
শ্যামের প্রেমে পড়ে আষাঢ়-শ্রাবণে
ঝিরিঝিরি শব্দে ধীরে ধীরে
বৃষ্টি হয়ে; ছন্দে ছন্দে ঝরে।।
শ্যাম আকুল হয়ে…
বাতাসে হেলেদুলে বৃষ্টির প্রার্থনা করে;
আষাঢ় শ্রাবণে শ্যাম মেঘের প্রেমে।।
কি এক অপরূপ রূপে সৌন্দর্য্যে
ও এক নৈসর্গিক ভুবন গড়ে!
যে অন্ধ চোখেও উপলব্ধি করে;
পুষ্পিত ঘ্রাণে আর বৃষ্টির স্পর্শে-
না-হয়; বৃষ্টির নীরব শব্দের অনুভবে।।
প্রকৃতিও মানুষ ও প্রকৃতির প্রেমে পড়ে;
ক’জন মানুষে বা তা বুঝে…!!
……………………………………………

কুমারী বৃষ্টি
সোহেল মাহবুব

বৃষ্টি পড়ার শব্দে সম্মোহিত হয় মন
বৃষ্টি থামলেই হৃদয় ভেঙ্গে যায়
মনে হয় হাজার বছর ধরে কষ্টে আছি

কালো কালো মেঘের সাঁড়াশি অভিযানে
যখন সাদা সাদা বৃষ্টি নামে
তখন আধাফোটা কলির মত ঝাপসা হয়ে আসে চোখ
কুমারী বৃষ্টির ঝাপটায়
ফুটে ওঠে আমার অজানা গোলাপ,
কিন্তু বেহিসেবী খরারা আজ
আমার সবুজভূমে উত্তাপ চড়াচ্ছেÑ
গনগনে রোদ্দুরের ভাঁজে ভাঁজে

যখন বৃষ্টি নামে তখন
জলমহালের সাদা মাংসে চুমুক দেয়
পিপাসায় নেতানো ডাহুক
মৎস্য উৎসবে কবিতা পড়ে প্রজাপতিরা
বটের ঝুড়িতে ঝুল মারে নতুন শেকড়,
অথচ নতুনের আহলাদে বৃষ্টিরা আজ
ডুবে আছে উত্তাপের অন্ধকারে
বৃষ্টিহীন উত্তাপে খরায় পুড়ে
কত প্রিয় মুখ অচেনা

হে বৃষ্টি, তুমি আমার হওনা !
তুমি আমার হওনা !
তুমি আমার হওনা !
……………………………………………

একটু যদি বুঝতে তুমি
মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন

একটু যদি বুঝতে মেয়ে
আমার হতে তুমি,
ভালোবাসার মানুষ হয়ে
অধর দিতে চুমি।
হৃদ কাগজে লিখা আমার
উঠতো চোখে ভেসে,
ভালোবাসার মানুষ হতে
আমার অবশেষে।

একটু যদি হাসতে তুমি
দিনটা যেতো ভালো,
একটু যদি আসতে কাছে
হতে খুশির আলো।
ভাবছো আমি মিথ্যা বলি
তোমায় খুশি দিতে,
একটু যদি বুঝতে তুমি
হৃদয় মনে নিতে।

যাও এড়িয়ে তবু আমায়
ভেঙে খুশি শতো
দাও তাড়িয়ে তাও যাবো না
তুমি মনের মতো।
হৃদয় পেলে চাই না কিছু
অবুঝ আমি মনে,
ডাকলে রাধা তোমার হবো
যাবো বৃন্দাবনে।

ভালোবাসার মানুষ গুলো
কষ্ট নিয়ে বাঁচে,
সারা জীবন দূরে থেকেই
হৃদয় খুশি যাচে।
দূরেই থাকি দূরেি আছি
দেখলে বুকে লাগে,
তবুও তুমি হৃদয় জুড়ে
আছো মনের বাগে।

সুখের পারা হৃদয় তারা
যায় না কভু ভোলা,
মনের ঘরে বসত করো
দাও যে মনে দোলা।
……………………………………………

গাছ লাগাও
মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ

বর্ষাঋতু এলো রে ভাই
গাছ লাগাও
শুদ্ধ বায়ুর চিন্তা করে
দেশ আগাও।

বনজ ফলজ ও ওষুধি
গাছ লাগাও
পরিবেশকে ঢেলে সাজাও
দেশ আগাও।

তবেই ভালো থাকবো আমরা
গাছ লাগাও
উৎসাহ আর উদ্দীপনার
সুর জাগাও।
……………………………………………

সে জল আমায় অভিধান পড়ে শুনিয়েছিলো
জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

এখানে ক’দিন আগেও ঈশ্বর এসেছিলেন
শ্রাবণ-বরষার হাসি হাসি মুখ
সে মুখে উঠতি যৌবনের নামাংকিত সীলমোহর ছিলো
আজ সন্ধ্যে পাটে নামার এক হাত আগে
সেখানে একটি শব্দের জলছবি এঁকে রেখেছি!
সেই ছবি—যে ছবিতে ব্রহ্মপুত্রের নিরাক পড়া বুকের
অব্যক্ত ধ্বনির হাহাকার ছিলো!

স্বরসন্ধির দিন নেই, সে আমি ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছি
শেফালির প্রেমপত্রটা অনেক খাটুনি দিয়েও
পাঠোদ্ধার করতে পারিনি
ভুলেই গিয়েছিলাম একদিন কাশফুলও আমাকে ভালোবেসেছিলো!
শরত আমার সাথেই আছে,
সেও কাশফুলের নিরব ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারেনি!

সেও ব্রহ্মপুত্রের মতো বর্ণ বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে
তার বুকের গভীরেও যক্ষ প্রিয়া বসত করে—
সে কথা জেনেও ঈশ্বর বরাবরই নিরব ভূমিকার মুখ রক্ষা করে এসেছেন
তবুও নিজেকে ভাগ্যবান অনুভব করছি, পাদানিতে মুখরক্ষা জল ছিলো!
সে জল আমায় ব্রহ্মপুত্রের হারানো যৌবনের
অভিধান পড়ে শুনেছিলো!!
……………………………………………

কমল কুজুর
স্বপ্নভূক

মনে যখন কালবোশেখী বাইরে তখন বর্ষা নামে
বৃষ্টির অঝোর ধারায় ডুবে যায়
ক্রমে পাহাড় বন জঙ্গল আর
সমুদ্রের নোনা জল ভাসে সমতল
চাতক চোখে চেয়ে থাকে তবু
তৃষ্ণার্ত ডাহুক
নিঃঙ্গ সূর্য অনাহারে রয়েছে বহুদিন
জলের বন্যা যেন সব দিকে
তৃষ্ণা মেটেনা তবু
বিষণ্ণ পৃথিবীর বয়স বাড়ে শুধু
ভেজা ভেজা রোগ আর শোকে
সাদা কালো স্বপ্নের হয় নিশ্চিত ক্ষয়…
……………………………………………

বৃষ্টির শব্দে
বদরুদ্দোজা শেখু

রাত-দুপুরে ঝম ঝম ঝম নামলো হঠাৎ বৃষ্টি
ভেসে এলো ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ মিষ্টি,
এই বৃষ্টি এই সৃষ্টির আওয়াজ ঐশী মেহেরবানি
ঝিমুনিতে কখন্ যেন তন্দ্রা একটুখানি
ঘিরে ধরলো, ঘুমের মধ্যে দৌড়াচ্ছি গ্রামে
মাটির মায়া মাঠের মায়া যেখানে গিয়ে থামে
এক টুকরো ভিটেমাটির উঠোন চাতাল দাওয়ায়,
সব ভিজে যায় বৃষ্টি-ছাটে ঝাপটা হাওয়ায় হাওয়ায়
বারান্দার বাঁশের খুঁটি জড়িয়ে খাড়া আছি
রম্য মধুর বৃষ্টিপতন আরো আরো যাচি
মনের মধ্যে, মাঠ যেন হয় অথৈ কুলুকুলু ।
মায়াময় এই রজনী-সভা ঝিমোয় ঢুলুঢুলু
জমিন আসমান বৃষ্টির গান গাইছে ঐকতানে
দিগ্বালারা নূপুর পায়ে নাচছে কি আসমানে ?
মেঘবালারা পাগলপারা ঢালছে বারি ধারা ?
আনন্দে আজ বান ডেকেছে ব্যাঙেরা আত্মহারা !
কা’রা যেন কোদাল হাতে যাচ্ছে ছায়া ছায়া
মাঠের পথে ভোর না হ’তেই, হায়রে মাঠের মায়া !
হারিয়ে যাচ্ছি আমি এখন চাষার মনোভূমে —
সুন্দর এই শব্দরাজির বর্ষার মৌসুমে
ঢেউ তুলে যায়, মন দুলে যায়, প্রাণ খুলে আজ হাসি
ঘুমের মধ্যে স্মৃতির বাদ্যে আমি আজ মনভাসি।
কেউ যেন ক’য় এমন সময়- এতো বৃষ্টি এতো
পথঘাট সব ডুবে যাচ্ছে, আমি তো আত্মগত
শুনছি কেমন ঘোরের মধ্যে মায়াবী আড়ষ্টতায়
তামাম বসুন্ধরা হাসছে শব্দময়তায়।।
……………………………………………

বর্ষা সুন্দরী
গোবিন্দ মোদক

বর্ষা নামের একটি মেয়ে নাচ-গানে খুব ভালো,
দোষের মধ্যে দুরন্ত খুব, গায়ের রংটা কালো !

বর্ষা খুবই আত্মবিশ্বাসী, বুকজোড়া তার বল,
অনেক ভেবেচিন্তেই গড়লো নৃত্যনাট্যের দল !

তারপরেতে গ্রীষ্মঋতু যেই না নিলো বিদায়,
অমনি বাংলায় দস্যি মেয়ে বর্ষার হলো উদয় !

প্রথমেই সে ঢাকলো আকাশ চুল-রাশি তার খুলে
নৃত্যনাট্যের কুশীলবদের মনটা উঠলো দুলে !

দিকে দিকে নাচে বাদল হাওয়া, হুহু-হুহু শন্ শন্
নির্বাক সব নদী, নালা, মাঠ; নির্বাক ত্রিভুবন !

তালে তালে নাচে দস্যি বর্ষা, ক্কড় ক্কড় ক্কড় বাজে,
নায়ক বৃষ্টি আসরেতে আসে অপরূপ এক সাজে !

যুগল-নৃত্যে শোঁ-শোঁ হাওয়া নাচে, নাচে সব গাছপালা,
বর্ষা-বৃষ্টির গলায় তখন যূথিকা ফুলের মালা !

তাতা থৈথৈ নাচের দমকে ভরে ওঠে খাল-বিল,
জলপানেতে তৃপ্ত চাতক, শঙ্খডানার চিল !

বর্ষার নাচে হেসে ওঠে মাঠ, যতেক ফসল তার,
প্রকৃতি রানী ঋতুমতী হয়- বর্ষার উপহার !

যুগে যুগে তাই মানুষ গেয়েছে কতো বর্ষার গান,
কবির ছন্দে গানের সুরে-তে জীবনের সাম্পান !!