প্রথমে বলা প্রয়োজন যে, আমি রসায়নের ছাত্র এবং অর্গানোমেটালিক আমার গবেষণার ক্ষেত্র। এজন্য সাংবাদিকতা কিংবা সংবাদ সম্পর্কে কিছু বলা আমার পক্ষে সহজ নয়। তবে আমি এটা বলতে পারি যে, আমি একজন সংবাদমনস্ক ব্যক্তি। একজন আধুনিক ব্যক্তির পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে কলাম লেখার মাধ্যমে সংবাদপত্র এবং সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আমার চেনা জানা এবং সংবাদ ও সংবাদ সম্পর্কিত বিষয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদকর্মীদের প্রতিনিয়ত যে সকল প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, ওইসব অভিজ্ঞতা থেকে আলোচ্য নিবন্ধ লেখা।
আমি একজন সাংবাদিককে সব সময় ‘সাংবাদিক’ হিসেবেই সম্বোধন করতে চাই। গণমানুষের সামগ্রিক কল্যাণে আত্মনিয়োগকৃত সমাজকর্মী কাজের ঝক্কিঝামেলা সত্ত্বেও তাঁরা সমাজ সমস্যার গভীরে পৌঁছে যান। একজন সাংবাদিক সর্বদাই সৎ হবেন। এটা স্বাভাবিক যে, একজন সাংবাদিক মেধা ও পাণ্ডিত্যেও তিনি সমাজে বসবাসকারী অন্যদের চেয়ে অগ্রসর হবেন, আলোকিত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবেন।
সংবাদপত্রকে বলা হয় ‘সমাজের প্রতিচ্ছবি’ এ সত্য বিনির্মাণের কারিগর হচ্ছেন সাংবাদিক। সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করেন এমন ব্যক্তি সকলের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নাও পেতে পারেন। কারণ এ ধরনের একজন মানুষ সর্বদাই অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করেন। কাজেই এ ধরনের একজন মানুষকে পছন্দ করা তো দূরের কথা, তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখতেই অনেকে কুণ্ঠাবোধ করেন। আবার সব সাংবাদিক যে অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করেন, তা নয়। দু’একজন আছেন যাঁরা সাংবাদিকতা পেশাকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করেন। অবৈধ টাকায় গাড়ি-বাড়ির মালিক হন। আমি মনে করি এ নিয়ে বেশি চিন্তিত হবার কিছু নেই। শত শত সাংবাদিকের মধ্যে দু একজন সাংবাদিক দেশ ও জাতির কল্যাণের চেয়ে নিজের কল্যাণের কথা একটু বেশি ভাবতেই পারেন। বোধকরি হলুদ সাংবাদিকতার বিষয়টি সেখান থেকেই এসেছে। সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দ বা শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই। সেখানে সাংবাদিককে অবশ্যই একটি নির্মোহ জায়গায় থেকে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করতে হয়। দু’একজন যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন তারা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে সাধারণ মানুষের সর্বনাশ করেন। অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত আদর্শ বিচ্যুত কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সঙ্গে হলুদ সাংবাদিকদের কোনো তফাৎ নেই। গণমানুষের নিকট তারা অশ্রদ্ধেয়। তাদের কারণে সৎ সাংবাদিক গণমানুষের নিকট পূর্ব মর্যাদা হারাচ্ছে।
এ কথা স্বীকার্য যে, একজন সাংবাদিক জাতির বিবেক, জাতির কণ্ঠস্বর। তিনি হিংসা বিদ্বেষ কিংবা অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ন করতে পারেন না। কোনো দেশের সংবিধান অহেতুক কাউকে অসম্মানিত করা কিংবা কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর অধিকার কোনো সাংবাদিককে দেয়নি। কাজেই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কিংবা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান কিংবা জনৈক অমুক বলেন এ ধরনের স্বকৃত শব্দ ব্যবহার করে যারা সংবাদ পরিবেশন করেন তাঁরা কি হলুদ সাংবাদিকের অন্তর্ভুক্ত নন? এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে একজন সাংবাদিক যে কোনো মানুষের চরিত্র হরণ করতে পারেন। এ জাতীয় সাংবাদিকগণ নিজেই সংবাদের সূত্র। অর্থাৎ কেউ তাঁকে কিছু বলেনি। সাংবাদিক নিজেই তাঁর স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি সংবাদ তৈরি করেন মাত্র। একজন সাংবাদিক যখন কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করেন তখন তাঁর হাতে অবশ্যই উপযুক্ত প্রমাণাদি থাকতে হবে। শুধু তাই নয় অভিযোগকারীর নামও প্রকাশ করতে হবে। আমি মনে করি এটাই সুস্থ সাংবাদিকতা। আমার এই অভিমতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে কোনো কোনো সাংবাদিক বলতে পারেন, ‘একজন সাংবাদিক তথ্যসূত্র বা অভিযোগকারীর নাম প্রকাশ করতে বাধ্য নয়। তথ্য প্রদানকারীর নাম ও পরিচয় গোপন রাখা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব।’ এই মতের ওপর আমারও শ্রদ্ধা আছে। তবে পরিবেশ, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সর্বদাই একজন সাংবাদিক এই নীতির অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ করবে আমি তার বিপক্ষে। প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রিপোর্ট লেখার জন্য একজন সাংবাদিক ফোন করে জানতে চাইল যে, অমুক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি জনৈক প্রার্থীর কাছে ৫ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছেন অথবা অমুক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে আপনি এতো লাখ টাকা ঘুষ বা কমিশন নিয়েছেন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি? আমি এ ধরনের অভিযোগ ও সাংবাদিকতার পুরোপুরি বিরোধী মত পোষণ করি। এ ধরনের রিপোর্টের ক্ষেত্রে অবশ্যই অভিযোগকারীর নাম প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় এ অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের যে মনগড়া তা বুঝতে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। সুতরাং সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার জন্য নেতিবাচক বা মন্দ খবরের তথ্যসূত্র উল্লেখ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি কাইয়ানী’র বক্তব্য তুলে ধরা যায়। তিনি প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন আদালতে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সংবাদপত্র স্বাধীনতা ভোগ করবে, তবে যাদের সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশন করবে (আধেয়) তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেই।’ বাস্তবে যদিও কোনো কোনো পত্রিকায় আমরা এর প্রতিফলন লক্ষ করি না। তবে আমরা বিশ্বাস করি, এই ধরনের সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি নয়। আমি বরং বলতে চাই, অধিকাংশ সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকজাতির বিবেক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছেন। গণমানুষের অধিকার রক্ষা, প্রশাসনকে জনমুখী করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমাদের সংবাদকর্মীগণ প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন। চলতি শিক্ষাবর্ষে ‘সাংবাদিকতা ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ’ নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি বিভাগ খোলা হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি সাংবাদিকতা শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীরা হলুদ সাংবাদিকতার বিপরীতে সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মূল্যবোধ সমুন্নত রাখবে। বিগত শতকের ষাটের দশকে ফিলিপিন্স থেকে উন্নয়ন সাংবাদিকতার যে ধারার সূচনা হয়েছিলো, গত এক দশক ধরে বাংলাদেশে তার অনুশীলন শুরু হয়েছে। আমরা মনে করি আমাদের তরুণপ্রজন্মের সাংবাদিকরা এই উন্নয়ন সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, রসায়নের ছাত্র হিসেবে সাংবাদিকতা বিষয়ে কিছু বলার আমার যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আলোচ্য নিবন্ধ লেখার উদ্দেশ্যে খানিকটা জানার চেষ্টা করেছি। তাতে জেনেছি Journalism হলো work for writing for news papers, television or radio. Journalist person whose profession is journalism. ডেভিড ওয়েনরাইট-এর মতে Journalism is information. It is communication. It is the events of the day distilled into a few words, sounds or pictures, processed by the mechanics of communication to satisfy the human curiosity of a world that is always eager to know what’s new. আমাদের চারদিকে যা ঘটে তাই হচ্ছে সংবাদ। আবার ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই সংবাদ নয়। ঘটনার মধ্যে নতুনত্ব বা অভিনবত্ব থাকতে হবে। যেমনটি জন বোগার্ট বলেছেন, ‘কুকুর মানুষকে কামড়ালে সংবাদ হয় না, কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সংবাদ হয়।’ আমার মনে হয়, এখানে নেতিবাচক ঘটনাকে সংবাদ উপাদান হিসেবে অধিক জোর দেয়া হয়েছে। তবে আমরা লক্ষ করছি সংবাদের এই বহুল প্রচলিত উদাহরণটির সাম্প্রতিক বেশ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে ভালো কিছুও সংবাদ উপাদান হিসেবে পাঠকের কাছে সাদরে গৃহীত হচ্ছে। একজন সাংবাদিক সমাজেরই অংশ হলেও সমাজে বসবাসকারী অন্য দশজনের চেয়ে তিনি কিছুটা হলেও পৃথক এবং অগ্রসর। তাঁর নাক, কান, চোখ সব সময় খোলা থাকে। সংবাদের গন্ধ শোঁকার মতো তাঁর নাক Nose for news কাজ করে। এজন্য খারাপ খবরের অনুসন্ধানের পাশাপাশি ভালো খবরও সাংবাদিককে খুঁজে বের করতে হবে।
এবার একটি ভালো খবর জানাতে পারি। আমরা জানি সাংবাদিকতার সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পর্ক ওতপ্রোত। তাই সংবাদপত্রের উদ্ভবের পথপরিক্রমায় সাংবাদিকতার উদ্ভব এবং বিকাশ ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধীনে সাংবাদিকতা বিষয়ে এক এম.ফিল গবেষণায় সাংবাদিকতার সূচনাকাল সম্পর্কে যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে তা আমাদের জন্য অনেক গৌরব বহন করে। ওই গবেষণা থেকে জানা যায়, ইউরোপ থেকেও প্রায় সাড়ে তিন’শ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে সাংবাদিকতা ধরনের কর্মকা- শুরু হয়। এখানে জানা যায়, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ‘প্রতিবেদক’ শব্দটিই ভারতীয়। মৌর্য যুগেই এক শ্রেণীর রাজকর্মচারী ছিলো, যাদের বলা হতো ওভারশিয়ার বা প্রতিবেদক। রাজ্যের যাবতীয় খবর সংগ্রহ করে আনাই ছিলো তাদের কাজ। একে যদি সাংবাদিকতা বলা হয়, তবে সে সাংবাদিকতা ছিলো সেই প্রাচীনকাল থেকেই, খ্রিস্টের জন্মেরও আগে।’ তাই বলা যায় যে, পৃথিবীর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশেই সর্বপ্রথম সাংবাদিকতার আদলে ওভারশিয়ার বা প্রতিবেদকগণ কাজ শুরু করেন। এ তথ্য যে এখনও পৃথিবীব্যাপী গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি তাও অভিসন্দর্ভে উল্লেখ করা হয়। আমরা যদি সাংবাদিকতার আদি প্রচলন এ উপমহাদেশে শুরু হওয়ার তথ্য বিশ্বব্যাপী জানাতে পারি তবে অনেকেই যে মনে করেন Acta-diurna নামে সাংবাদিকতার একেবারে আদিরূপটি প্রবর্তিত হয়েছিলো জুলিয়াস সিজারের আমলে সেই তথ্যের স্থলে নতুন তথ্য যুক্ত হবে।
আমরা জানি, গণমাধ্যম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এটা হতে পারে ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক। এজন্য গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার বিকল্প নেই। এই দায়িত্বশীলতার যথার্থতা বুঝানোর জন্য বলা হয়, গণমাধ্যমের একটি রিপোর্ট একজনের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে। সেটাকে তখন ‘আত্মহত্যা’ না বলে ‘খুন’ বলা যেতে পারে। আবার এটাও ঠিক যে, সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসনের দাবি দীর্ঘদিনের। গণমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয়, পশ্চিমা বিশ্বের গণমাধ্যমের ওপরও সরকারের প্রচ্ছন্ন খবরদারি রয়েছে। গণমাধ্যমের কাজের ধরন পর্যালোচনা করে আমরা বলতে পারি প্রকৃত গণতন্ত্রে স্বাধীন গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণমাধ্যমকে পুরোপুরি মুক্ত করে দিতে হবে। অন্যথায় মুখে যতোই গণতন্ত্রের কথা বলা হোক না কেনো, গণতন্ত্র ‘শো পিস’ হয়েই থাকবে।
পরিশেষে এ কথা বলতে চাই যে, সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হলে হলুদ সাংবাদিকতার ছড়াছড়ি কমে আসবে। সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা যারা জানে তাদের পক্ষে স্বপ্রণোদিত হয়ে খারাপ না হলে তাদের মধ্য থেকে ভালো সাংবাদিকতাই বেরিয়ে আসবে। প্রশ্ন হতে পারে, বর্তমানে দেশের ব্যাপকসংখ্যক প্রিন্ট ও ভিজ্যুয়াল মিডিয়া সাংবাদিকতায় শিক্ষিত এতো লোকবল কোথায় পাবে? এ জন্য ইতোমধ্যে যারা এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্বউদ্যোগে পড়াশোনা করতে হবে।