সব কবি নিজের দেশের মানুষের কাছে ‘আমাদের লোক’ হতে পারেন না, কেউ কেউ পারে। তারাই পারেন, যারা মাতৃভাষা-মাতৃভূমি-মাতৃসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তারাই ইতিহাসে অনন্য হয়ে যান। তাকে স্মরণ করা আর নিজের উত্তরাধিকারকে মনে করা অভিন্ন মনে হয়। হুইটম্যান বলতে যেমন আমেরিকার কথা মনে আসে, তেমনি ডাব্লিউ. বি. ইয়েটস মানেই আয়ারল্যান্ডের ছবি ভেসে ওঠে আমাদের মনে। আধুনিক বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে এ-রকম কবির সংখ্যা হাতে গোনা কয়েক জন মাত্র। রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাঙলার চিরায়ত প্রকৃতি ও জীবনের অন্তর্জগত ও বহিরাঙ্গণের চলচ্ছবির প্রাণরূপ দিয়েছেন, ফলে তিনি আমাদের প্রতিদিনের সূর্যাবর্ত হয়ে আছেন আজও। অন্যদিকে বাঙালির অনাবিষ্কৃত পৌরুষ-দ্রোহ-আমিত্বের সাথে প্রেমিক সত্তার দ্বৈতরূপের ঝংকার তুলে নজরুল সকলের মাঝে অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বরূপে বিরাজমান। জীবনানন্দ দাশ সময়জর্জর নাগরিক মানুষের অন্তর্জগৎসহ বাঙলা-প্রকৃতির চিত্ররূপময় সৌন্দর্য ও রূপকথা নিয়ে আমাদের একেবারে মনের দুয়ারে হাজির হয়েছেন- যাকে কবি ‘রূপসী বাংলা’ না বলে পারেননি। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই রাখালি সুরে মেঠো পথের বাঙলাকে তার আবহমান প্রকৃতি ও সংস্কৃতিসহ জসীমউদদ্ীন উপস্থিত করেছেন; এককথায় যাকে পল্লী-বাঙলার চিরায়ত সংস্কৃতির রূপকার বলা যায় অনায়াসে। এই প্রবাহের ধারাবাহিকতা বর্তমানে কার মধ্যে বহমান? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দুই বাঙলার কবিসভায় হাজির হলে একমাত্র আল মাহমুদকেই (১৯৩৬-২০১৯) পাওয়া যায়। তাহলে কী এই কবি বাঙলার সত্যিকার প্রতিনিধিত্বকারি কবিপুরুষ? উত্তর: অবশ্যই হাঁবাচক।

আল মাহমুদ কবিতাকে জীবনেরই অন্য ধরনের এক প্রকাশ ভেবেছেন; যে জীবন সত্যে ও সুন্দরে বিম্বিত নয়; বরং তা বাঙলার গ্রামছাড়া এক প্রতারিত জীবন- শকুনওড়া নগর ভাগাড়ে যার গন্তব্য। তাই ‘ফেরার পিপাসা’ জাগে সেই আবাল্যলালিত গ্রামে। ‘দেশত্যাগী কবির হৃদয়’ প্রত্যাবর্তন করতে চায় ‘মাছ পাখি নাও নদী মাটির পুতুল’ পেতে; ‘বহমান মানুষের অনিবার্য প্রতীকের কাজে’ আবার সংলগ্ন হতে, যেখানে কবির শেকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ শতকে নাগরিক সংস্কৃতি কবিকে উন্মূল করে ছেড়েছে। নিজের ঠোঁটের ‘সবুজ লতা’ অর্থাৎ আপন ঐতিহ্য হারিয়ে কবি আপন সমাজের মানুষের সাথে মিশতেই পারছেন না। এই উপলব্ধিতে কবি ‘মানুষের বাসস্থান, লাউমাচা, নীলাম্বরী নিয়ে’ থাকতে চান। আর শহরে যাবার ট্রেনফেল করে ঘরে ফেরার আনন্দে প্রত্যাবর্তনের সমস্ত লজ্জাকে মায়ের আচঁলে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন; সঙ্গে সঙ্গে বাঙলার হারানো অতীত ঐশ্বর্যের আক্ষেপে কবিকে বেশ উত্তেজিত এবং তেজী মনে হয়। আবার কবি যা পেয়ে হারিয়েছেন তাকে পুনরুদ্ধারের জন্য রীতিমত ব্যাকুল হতে দেখা যায়: ‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেলো শেষে/ হেথায় খুঁজি হোতায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে’।

আল মাহমুদের সামগ্রিক কবি-ভাবনার মূল উৎস এখনেই সংগুপ্ত। এই কবি বাঙলাদেশের কবি, বাঙালির কবি। বাঙলাদেশ, বাঙলার প্রাকৃতজন, বাঙলার ইন্দ্রিয়ময় অপরূপ প্রকৃতি ও বাঙালি জীবনের প্রতিদিনের জীবনালেখ্যই তাঁর কবিতার প্রধান ভাষ্য। জীবনানন্দ দাশের মত তিনিও বাঙলার রূপসী মুখ দেখেছেন। শুধু দেখেননি, অনুভব করেছেনও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। সে কারণে তাঁর উপমা, চিত্রকল্প বা উৎপ্রেক্ষা একদম প্রকৃতির নিকটতম দূরত্ব থেকে সংগৃহিত ও বিন্যস্ত। যেমন: ‘পিঠার মতো হলুদ মাখা চাঁদ/যেন নরম কলাপাতায় মোড়া’, ‘কাঁখে টিল¬াভরা পানি’, ‘কালো বাউশী যেন কলমী বনে’, ‘সামনে দেখি ভরা ভাতের থালা’, ‘ঝাঁলের বাটি উপচে পড়ে ঝোলে’, ‘পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ’, ‘মাছের আঁশটে গন্ধ’, ‘উঠোনে ছড়ানো জাল’ আর ‘বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর’। এইসব চিত্রকল্প কোন পল্লী-কবির নয়, আধুনিক ঐতিহ্যবাহী কবির দরদমাখা পঙ্ক্তি। এখানেই অন্যান্য কবি থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য। বর্তমান বাঙলার প্রতিনিধি কবি ব্যক্তিত্বের আধুনিক উৎসারণ।

তবে আল মাহমুদ জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদদীনের গ্রামীণ নিসর্গ, জনপদ ও জীবন চিত্রণের ভঙ্গি অনুসরণ করেননি এবং গ্রামীণ বাংলায় তাদের পথে ফিরে আসেননি। বরং তিনি জয়নুল, কামরুল ও সুলতানের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি অনুসরণ করেন। বিশেষভাবে সুলতানের মতো তাঁর প্রকৃতি কৃষকের কর্ষণের জায়গা, জীবিকার আয়তন এবং উত্তরাধিকারের ভবিষ্যৎ; আর তাঁর মানুষ আবহমান কৃষক, যে গাঁয়ের মাঠে কাজ করে, শস্য উৎপাদন করে এবং তার সন্তান ফিরে আসে নগর সভ্যতায় মার খেয়ে, প্রত্যাখ্যাত হয়ে। আল মাহমুদ সুলতানের মতো কৃষকের উপস্থিতিকে বাস্তবতা দিয়েছেন। কৃষকেরা মৃত নয়, অতীতের একটা অংশ নয়, তারা বিদ্যমানতা এবং বর্তমানতার মধ্যে জীবন্ত। তাই তাঁর কৃষক আধুনিক ঐতিহ্যের অংশ। কবির ফিরে আসা সেই কৃষকসন্তান তাই আবারো মিশে যেতে চায় নিজের গ্রামসমাজে ও ঐতিহ্যে। কেননা কবি গ্রাম বলতে ‘যূথবদ্ধ আদিম মানবজীবনকে’ না বুঝিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় যে সব নরনারী ধনতান্ত্রিক নগর সভ্যতার বিরুদ্ধে গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলছেন তাঁদেরকে বুঝিয়েছেন। তাই গ্রামীণ সভ্যতাই কবির অন্বিষ্ট।

কবি যেমন ফিরে এসেছেন আপন জগতে, তেমনি তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন পুঁজিবাদী তথাকথিত আধুনিকতা। ফলে তাঁর প্রতীক হয়ে উঠেছে কৃষক, পশুপাখি, মাছগাছ, হালবলদ, নৌকা। এইসব প্রতীক ফিরে যাওয়ার; প্রত্যাখ্যান এবং নির্মাণ করার। আল মাহমুদের মৌলিকতা সেই আবহমান বাঙলায় ফেরার পিপাসায় এবং প্রত্যাবর্তনের লজ্জায়। তবুও তিনি গাঁয়েই ফিরে এসেছেন; গাঁয়ের জমিনে, নদীতে ও নিসর্গে। কারণ ঢাকার সায়েদাবাদের বিষণ্ন দালানে তেমন কোনো জানালা নেই- যেখান থেকে প্রিয় তিতাস দেখা যায়। তাই বারবার ফিরে যেতে সাধ জাগে।

আল মাহমুদ আবহমান বাঙলার প্রতিনিধিত্ব করেন। শুধু বর্তমান নয়, প্রাচীন বাঙলা, সেই বাঙলার বীরত্ব, নারীপ্রেম, জীবনাচার, প্রকৃতি, সাম্যবাদ, জমিন-ফসল ইত্যাদির বাক্সময় রূপায়ণ তাঁর কবিতাকে দিয়েছে বিশেষত্ব। ‘স্বদেশ ভূমি, তুমি, তোমার নাম/ শুনেছিলাম মাংস থেকে মা’র/ ফাটিয়ে দিয়ে শহর ঘর গ্রাম/ আমরা কটি পুত্র কানু পা’র’- ইতিহাস থেকে জারিত এই পঙক্তি আর টি. এস. এলিয়টের বক্তব্য একই রেখায় এসে মিলেছে: ইতিহাসচেতনার সঙ্গে জড়িত থাকে এক ধরনের উপলব্ধি যা শুধু অতীতের অতীতকালীনতারই নয়, বর্তমানেরও। যে লেখক ইতিহাসচেতনায় উদ্বুদ্ধ, তিনি তার অস্থিমজ্জায় শুধুমাত্র নিজের প্রজন্মকে লালন করেই লেখেন না; বরং তিনি তার দেশের সম্পূর্ণ সাহিত্যকে প্রাধান্য দেন। এই ইতিহাসচেতনাই একজন কবিকে ঐতিহ্যিক করে তোলে। আল মাহমুদও ইতিহাসচেতনায় অনুপ্রাণিত হয়েই জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতির ভেতরদেশে ওতপ্রোত হয়েছেন। তিতাস নদীতে বায়ুভরা পাল তুলে পাড়ি দিয়েছেন আপন ঠিকানায়: আমারও নিবাস জেনো লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশে/ পূর্বপুরুষেরা ছিলো পাট্রিকেরা পুরির গৌরব..। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারায় তাই তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙলা ও বাঙলাকাব্যের উত্তরাধিকার আত্মস্থ করেন। পুন্ড্র, পুরীর গৌরব, গৌতম, শ্রীজ্ঞান, কাহ্নপা, মহাস্থানগড়, মহালিঙ্গ, শীলভদ্র, মুকুন্দরাম, ব্যাধের আদমি সাজ, আলাওল, রোসাঙ্গের অশ্ব, লালন, বাউল, বেহুলা, মঙ্গলকুলোয় ধান্য ইত্যাদির সমন্বিত ধারা এসে অতীত ও বর্তানের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেছে।

তিরিশোত্তর কবিদের প্রতি আল মাহমুদের প্রধান অভিযোগ হলো: জীবনানন্দ ও বিষ্ণু দে ছাড়া অন্যান্য কবির কবিতায় স্বাদেশিকতা অনুপস্থিত। তিনি শুধু অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হননি; দেশমাতৃকার জন্যে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। প্রিয় নারী এবং জননীর সাথে দেশের সাদৃশ্য কল্পনা করেন বারবার। বাঙলা মায়ের ঐশ্বর্য ও শত্র“র প্রতি কবির দৃষ্টিপাত অত্যন্ত তীক্ষ্ণ: ‘চির দুঃখিনী মা আমার/ তোমার ঐশ্বর্যই তোমার শত্রু। যেমন আপন মাংসে/ হরিণী বৈরী’। দেশজননীর সূত্র ধরে কবি চর্যাপদের কবি ভুসুকুর প্রবাদপ্রতিম চরণ স্মরণ করেন।

বাঙলার প্রতিনিধিত্বকারি কবি আমরা যাদের বলছি তাদের মধ্যে বর্তমানে আল মাহমুদের নাম সন্দেহাতীতভাবে অগ্রগণ্য। প্রথমত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির রূপায়ণ, দেশজতা ও দেশপ্রেমের অকৃত্রিম অভিব্যক্তি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সার্থক প্রকাশ এবং নিজ জাতিরাষ্ট্রের বিশ্বাস-বোধ-স্বাধীনতার কাছে দায়বদ্ধতার উচ্চারণ আল মাহমুদের কবিতায় শিল্পসম্মতভাবে আমরা পাই বলেই তিনি বারবার স্মরণীয়। বারবার স্মরণযোগ্য ‘আমাদের লোক’ বলে।

অন্যদিকে আল মাহমুদের কবিতায় কবিপুরুষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একেবারে সরল বা দ্বিধামুক্ত নয়। গাঁয়ের ছেলে যখন অনিবার্য প্রতিকূলতা জয় করে নিজ গ্রামে ফিরে আসে, তখন ‘শস্যের শিল্পীরা’ অবাক হয়ে যায়। সে যে গাঁয়েরই সন্তান, সকলের লোক, তাঁর স্বজনের মেলে দেয়া বিচালিতে বসতে লজ্জা থাকার কথা নয়। কিন্তু গাঁয়ের লোকের আন্তরিক আহ্বানে প্রত্যাগত পুরুষের বাধা আসে কৃত্রিম-নাগরিক পোষাকের কারণে। গ্রামীণ সংস্কৃতির বিপরীতে নয়া উপনিবেশবাদের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের জন্যে সে ‘স্বজনের সাহচার্য’ আর ‘দেশের মাটির বুকে’র আত্মীয়তা থেকে বঞ্চিত। সে বন্দী ‘নিভাঁজ পোষাকে’র ‘এক নির্মম সেলাইয়ে’। কিন্তু প্রত্যাগত পুরুষকে এই প্রতিবন্ধকতা জয় করতেই হবে, এবং যে জনপদকে কবি নির্মাণ করেছেন আধুনিক মানচিত্রের অন্তরালবর্তী অনুপ্রেরণায়, সেখানে পৌঁছার জন্য একটা বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অন্তরঙ্গভাবে। আপন কাব্যরীতির উৎস, প্রকাশ ও বিকাশের ক্ষেত্রে এই জীবনাচরণ ও তার অন্তর্গত বিষয়গুলোকে ধারণ করতে চেয়েছেন নিবিড়ভাবে। এই জন্যেই কবি সকল অসহায়তা ও দ্বিধাকে অতিক্রম করে স্বাপ্নিক জগৎ থেকে বাংলাদেশের বিশাল আঙিনায় ফিরে আসে আত্মপ্রত্যয়ের ব্যঞ্জনায়।
তোমাকে বসতে হবে এখানেই
এই ঠাণ্ডা ধানের বাতাসে।
আদরে এগিয়ে দেওয়া হুঁকোটাতে সুখটান মেরে
তাদের জানাতে হবে কুহলি পাখির পিছু পিছু
কতদূর গিয়েছিলে পার হয়ে পানের বরজ!
[‘খড়ের গম্বুজ’, সোনালী কাবিন]
নিজস্ব আশ্রয়ে ফিরে এসে প্রত্যাগত যুবককে কৈফিয়ত দিতে হয় আপন স্বজনের কাছে নগর সভ্যতার প্রতীক যে নিভাঁজ পোষাক, ছদ্মবেশী কোকিল আর শকুন তাদের প্রতারণায় কীভাবে গ্রামীণ সভ্যতার প্রতীক ‘সবুজ লতা’ সে হারিয়ে এসেছে। ছায়া ও পল্লবের ঘ্রাণহীন নগর থেকে অকৃত্রিম বিশাল বাংলাদেশে কবির প্রত্যাবর্তন তাই বিশেষ তাৎপর্যের দাবীদার। আল মাহমুদের স্বদেশের প্রতিনিধি হওয়া ও স্বদেশ ফেরার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করা যায় নিম্নক্তভাবে:
ক. তিরিশোত্তর নাগরিক কবিতার বিপরীতে কবি আবহমান স্বদেশ আবিষ্কার, প্রত্যাবর্তন এবং তাকে ঘিরে গভীর এক বোধে উজ্জীবিত হয়েছেন।
খ. বাংলার জনজীবনলগ্ন প্রকৃতির ভেতরে এবং প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানÑ নদী, মাটি, বৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে কবি প্রকৃতির মধ্যে স্বদেশ নির্মাণ করেন। বাঙালি নারীর মধ্যেও কবি আপন দেশ খুঁজে পেয়েছেন।
গ. বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক ও কৃষিভিত্তিক গ্রামজনপদের রূপকল্প সৃষ্টি, নগরসংস্কৃতির বিপরীতে লোকসংস্কৃতি স্থাপন, গ্রামীণ সমাজে ফিরে যাওয়ার তৃষ্ণা ও তাগিদের মাঝে কবি স্বদেশ অঙ্কন করেন।
ঘ. জাতীয় আন্দোলন-সংগ্রাম-অভ্যুত্থান-মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জনমানসে বিরাজমান স্বদেশ কবি আপন আঙ্গিকে প্রকাশ করেন।
ঙ. কবি স্বাদেশিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গজননী বা দেশজননীর প্রতিমা নির্মাণ করে তার কাছে আত্মনিবেদন করেন। সাথে সাথে দেশের শত্রুশক্তি সম্পর্কে কবি হুঁশিয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আহ্বান করেন।
চ. আবহমান লোকঐতিহ্যের বিভিন্ন রূপকল্প সৃষ্টির মাধ্যমে কবি স্বাদেশিক বোধের পরিচয় তুলে ধরেন।
আল মাহমুদের কবিতায় স্বাদেশিক বোধ নিজ দেশের মৃত্তিকা, জল, হাওয়া, কৃষক, কৃষিব্যবস্থা, নদী-নৌকা-জেলে, পশুপাখি এবং মানুষ, মানুষের সমাজ, রাজনীতি, লোকসংস্কৃতি, অর্থনীতি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত-শান্তি, সমকালীন বাস্তবতা থেকে উত্থিত। আবার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্রে এই মনোভাব প্রকাশিত। উপনিবেশিক চিন্তা-চেতনার শৃঙ্খলের বাইরে এসে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সৃজন ও প্রকাশে তাঁর স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়।