নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের গণমানসের কবি, তিনি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রূপকার। একই সঙ্গে, তাঁর কবিতা সব মানবের কবি-কণ্ঠ, তাঁর গান চির-মানুষের প্রাণের সুর। সাধারণ মানুষের, সকল আশা-আকাক্সক্ষা, বেদনা-বিক্ষোভকে তিনি নিজের জীবনে আরস্থ করেছেন, নিজের কণ্ঠে ধ্বনিত করেছেন। তা করতে গিয়ে তিনি প্রতিভাত হয়েছেন একই সঙ্গে বিদ্রোহীরূপে এবং প্রেমিকরূপে। বিদ্রোহী ও প্রেমিক মূর্তির মধ্যে ভাব ও মেজাজের যে আপাত বিরোধিতা তা সাধারণ মানুষের চেহারাতেই অলক্ষ্য থাকে। এই অলক্ষ্যের প্রকাশ-মূর্তিই ধারণ করেন তার কবি, তার জীবনশিল্পী। নজরুল ইসলাম সে জন্য সাধারণ মানুষের সত্যিকার প্রতিনিধি, তার সার্থক বাণী-মূর্তি।
কেবল অসাধারণ ব্যক্তিত্বই এভাবে সর্ব মানবের অন্তরসত্তাকে নিজের মধ্যে অঙ্গীভূত করতে পারে।
নজরুল ইসলাম নেমে এসেছেন জীবনের রুক্ষ্ম কঠিন মাঠে, উঠে গিয়েছেন তাঁর অধ্যায়ের ঊর্ধ্বলোকে, প্রবেশ করেছেন তাঁর রোমান্টিকতার নির্জন প্রদেশে। কিন্তু তাঁর এসব যাত্রার, সব অবস্থানেরই সঙ্গী চিরন্তন মানুষ। নৈর্ব্যক্তিক অনুভূতির তুরীয় মার্গে আররতি-মগ্নতা তাঁর স্বভাবে ছিল না। তাই তার হাতছানি তাঁকে চরিত্রভ্রষ্ট করেনি। তার আক্রমণ থেকে তিনি বারবার পালিয়ে এসেছেন। মানবতার বেদিতে সব অর্ঘ দিয়ে আপন চরিত্র-লগ্ন অতি মানবতাকে তিনি বিমুখ করেছেন। নিয়তি তাঁকে সর্বকালের মানবতার কবিকণ্ঠ করে রাখতে চেয়েছে বলেই হয়তো এমনটি ঘটেছে।
বাংলাভাষা ও বাঙালির ভাগ্য যে, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই মানবতাবাদী কবি তাদের মধ্যে জন্মলাভ করেছেন। অসামান্য প্রাণৈশ্বর্যে নজরুল স্বদেশে নিজের মহিমাকে চিহ্নিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বটে, তবে তাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার আয়োজন বা সঙ্গীত তাঁর নিজের করায়ত্ত ছিল না। আর এখন পর্যন্ত বাংলাভাষা ও বাঙালির লজ্জা এই যে, তারাও তাদের এই অনন্য ঐশ্বর্যকে বিশ্বসভায় পরিপূর্ণভাবে উপস্থিত করতে পারেনি।
নজরুল নিজের অবদানে ধন্য করেছেন তাঁর দেশকে, দেশের সমগ্র মানুষকে। তাঁর গুণমুগ্ধ ও প্রেমসিক্ত বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়। বাঙালি হিসেবে তাদের যে ঐক্যবদ্ধ ও মিলিত সত্তা, নজরুল তার একমাত্র প্রতিনিধি। আবার উভয়ের স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক মানসেরও তিনিই একমাত্র দরদি রূপকার। ইসলামের ঐতিহ্য, আদর্শ ও মূল্যবোধকে নতুন কালের প্রেক্ষাপটে স্বমহিমায় উপস্থাপিত করে তিনি যেমন বাংলার মুসলিম সমাজকে আরবিস্মৃতি ও হীনম্মন্যতার অন্ধকার থেকে গৌরবোজ্জ্বল নবজীবনের পথে তুলে দিয়েছেন, তেমনি আপন অলোকসামান্য প্রতিভার অকৃপণ স্পর্শ দিয়ে হিন্দু সমাজকেও তিনি তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঞ্জীবনী প্রেরণার উদার মানবতার পথে উদ্দীপিত করেছেন।
তাঁর সাধনা ছিল- ক্ষুদ্রতা ও ভেদবুদ্ধির কবল থেকে উদ্ধার করে উভয় সম্প্রদায়কে একদেহ একপ্রাণে স্বাধীনতা, শান্তি ও প্রগতি পথের অভিমুখী করা। অখ- মানবতার প্রেমিক ছিলেন বলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তিনি উৎসাহবোধ করেননি। তাই সাম্প্রদায়িক উপদ্রবের ঝড়ের লগ্নে প্রশ্ন করেছেন, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন।’ কিন্তু তাঁর ব্যাকুল প্রশ্ন সদুত্তর খুঁজে পায়নি। বাংলাদেশের হিন্দু আর মুসলমান পৃথক পৃথকভাবে তাঁকে ভালোবাসলেও তাদের রাজনৈতিক মানস একযোগে তাঁর মিলনের বাণীকে উপেক্ষা করেছে। উপমহাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত তাঁর অদম্য মানবিক মিশনের জন্য আপাত-ব্যর্থতার শয্যা রচনা করেছেন।
কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার মতো কৃতির পশরা নিয়ে নজরুল আসেননি। তিনি সেই জাতের এক অমর ব্যক্তিত্ব, সমকালীন মানুষের গ্রহণ-বর্জনে যাঁর মূল্য ও উপযোগী নিঃশেষ হয়ে যায় না। ‘পরোয়া করি না বাঁচি বা না বাঁচি/ যুগের হুজুগ কেটে গেলে-’ তিনিই বলতে পারেন, যার হাতের মুঠিতে থাকে কালের বেয়াড়া ঘোড়ার ঝুঁটি। তারই জোরে তিনি ঘোষণা করেন- ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহবিপ্লব হেতু!’ সেই ‘মহাবিপ্লব’ কি অতিক্রান্ত হয়েছে? হবে কখনো? ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না’- সেদিনের আগে তো তাঁর ছুটি নাই! সেদিন আসবে? কবে আসবে? মানুষের এই পৃথিবীতে সেদিন তো চিরায়ত, অথবা মহাপ্রলয়ের কাল পর্যন্ত প্রসারিত। কাজেই ব্যর্থতার মালা গলায় দিয়ে কে তাকে বিদায় জানাতে পারে! তিনি যে বলেছেন, তিনি ‘বর্তমানের কবি’ সে বর্তমান তো অনন্ত! বিগত কাল, সমকাল ও অনাগত কালে প্রসারিত সে বর্তমান। সেই চির-বর্তমানকে তিনি ভাষা দিয়ে মুখর করেছেন, সুর দিয়ে জাগর করেছেন। যে অতীত অনিঃশেষ স্বপ্নে ঝলকিত, তারই বাণীবাহক নজরুল, যে বর্তমান চিরন্তন সংগ্রামে আন্দোলিত তারই তুর্য বাদক নজরুল; যে ভবিষ্যৎ চিরায়ত আশায় উচ্চকিত তারই দিক নির্দেশক নজরুল। নজরুলের নিজের ছিল সেই অকল্প প্রত্যয়। তাই বুঝি রোগ-ক্লিষ্ট চেতনার প্রদোষেও তাঁর কম্পিত কলমে রেখায়িত হয়েছিল- ‘চির কবি নজরুল’- এই অহঙ্কারী আর ঘোষণা। শ্রী অন্নদাশঙ্কর রায় একদা ছড়া কেটে সুন্দর করে বলেছিলেন :
ভুল হয়ে গেছে বিলকুল-
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে,
ভাগ হয়নিকো নজরুল।
এই ভুলটুকু বেঁচে থাক,
বাঙালি বলতে একজন আছে-
দুর্গতি তার ঘুচে যাক্।
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেলেও ‘নজরুল’ যে কেনো ভাগ হয়নি তার কারণ তিনি বলেননি। কারণ এই যে, ‘চির কবি’ কখনো ভাগ হয় না। শ্রীরায় বলেছেন ‘বাঙালি বলতে একজন আছে।’ তাঁকে আমার বলতে ইচ্ছা করে- ‘আছে নয়, বাঙালি বলতে ছিলই মাত্র একজন; তিনি নজরুল। দেশ ভাগ হওয়ার পরে নয় বা তাঁর অমন আন্তরিক ছড়া লেখার কালেই শুধু নয়; অভগ্ন, অখ- দেশেও নজরুল ছাড়া সে বাঙালি কখনো আর দ্বিতীয়টি ছিল না। সে জন্যই তো নজরুল না চাইলেও ভারত ভাগ হয়েছে, বাংলাদেশও ভাগ হয়েছে। বস্তুত দেশ ভাগ হওয়া দেখে নয়, তার অনেক আগে, দেশের বিভক্ত হৃদয়ের চূড়ান্তরূপ দেখেই কবি স্তব্ধ, মূক হয়ে গিয়েছিলেন।
তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।
অবশ্যম্ভাবী আসন্ন পরিণতির রূপ দেখেই কি তাঁর নিজের বাণী নিজের কাছেই ‘কোলাহল’ মনে হয়েছিল? এবং তাই কি এই মরণপণ অভিমান?
বাংলাসাহিত্যের আর এক মহান দিকপাল রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘কালান্তর’-এর প্রবন্ধে এই পরিণতির হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন বটে, কিন্তু আদর্শ বাঙালি সত্তার রূপায়ণে সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নজরুলের মৈত্রী সাধনার যে পথ তা তাঁরও চরণ স্পর্শ পায়নি। পায়নি মধুসূদন বা বঙ্কিমচন্দ্র বা তাঁদের পূর্ব বা উত্তরসূরি অন্য কোনো মহাপ্রাণের। তাই সমান্তরাল পথে পদচারণা করে হিন্দু বাঙালি এবং মুসলমান বাঙালি, তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছেছে। আর অসম্ভবের সাধনা নিয়ে নজরুল ইসলাম হারিয়ে গিয়েছেন এক অনস্তিত্বে- যার নাম ‘আদর্শ বাঙালিত্ব’।
কিন্তু নজরুলের অস্তিত্ব তো শুধু আদর্শ বাঙালিত্বের সাধনায় অনুভব নয়, তাঁর সাধনা মূলত মানবতারই সাধনা। নজরুল হিন্দু-মুসলমানদের স্বতন্ত্র সত্তাকে অস্বীকার করেননি, তাদের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মানবিক মহিমায় উপস্থাপিত করে তিনি তাদের অমানবিক বৈরি সম্পর্কই শুধু অস্বীকার করতে চেয়েছেন। তবু তাঁর কি এমন কোথাও ভুল হয়েছিল, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ভুল হয়নি, ইকবালের ভুল হয়নি? সম্ভবত তাই। অন্তত ক্রান্তির ইতিহাস তাই প্রমাণিত করেছে। নজরুল তাঁর একক ব্যক্তিত্বে রবীন্দ্রনাথ ও ইকবালের দ্বৈত-স্বরূপকে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। সেটা ছিল সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতি-চেতনার দিক থেকে ব্যক্তিসত্তার এমন এক সংকট সন্ধি, যার উত্তরণের সীমানা বিস্তৃত ছিল বাঙালিত্বকে ছাড়িয়ে সঙ্কর ভারতীয় জাতিসত্তার মধ্যে। তাই, যখন ভারত বিভক্ত হলো তার ফলে ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গও দু’ভাগ হয়ে তার অনুগামী হলো। আর বিবর্তিত দুই নতুন দেশের দুই পৃথক জাতিসত্তা ভাগ করে নিল রবীন্দ্রনাথ ও ইকবালকে আপন আপন মুখপাত্র রূপে। নজরুল কার অথবা কিসের মুখপাত্র, সে মীমাংসা রইল মুলতবি।
কিন্তু মাত্র সিকি শতাব্দীর ব্যবধানে উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আর একবার পটপরিবর্তন ঘটল। উমহাদেশের ভাঙাগড়ার মূলতবি ইতিহাস আজ আবার নতুন এক ভৌগোলিক জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে- যার নাম বাংলাদেশ। এ এক নতুন বাংলাদেশ, যা রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষ থেকে এবং ইকবালের পাকিস্তান থেকে এক নতুন অবস্থানে নিজেকে চিহ্নিত করেছে এবং এক স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট সত্তায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ সত্তার বিবর্তনের ধারাই বলে দেয় কে তার মুখপাত্র।
উপমহাদেশের ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতির যে চতুরাশ্রমের পরিক্রমায় নব-অভ্যুদিত বাংলাদেশের উত্তরণ, তারই আদর্শিক প্রতিনিধি নজরুল। সবার নজরুল আজ বাংলাদেশের জাতীয় মানসের অভ্রান্ত দিশারী। এ কথাটা আমাদের বুঝতে হবে যে, আন্তঃমানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বৈতসত্তার সাগর সঙ্গম বাংলাদেশ। নিয়তি কর্তৃক সেই ভূমিকাই তার নির্দিষ্ট হয়েছে। তাই নজরুলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ও ইকবালের দ্বৈত-স্বরূপের যে প্রতিনিধিত্বকে এককালে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছিল, তাই আজ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এক নতুন সত্যের মহিমা লাভ করেছে। বাংলাদেশ মুসলিম-গণপ্রধান, তাতে কি? আমাদের সাংস্কৃতিক মানসের পটভূমিতে আছেন রবীন্দ্রনাথ ও ইকবাল। কিন্তু নজরুল যদি থাকেন আমাদের নতুন জীবনায়নের মুখপাত্র ও আলোক-দিশারীরূপে, ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছেই অভেদ মানবিক সম্পর্কের পাঠ গ্রহণ করবে।