সময়টা ছিলো গোধূলী লগ্ন। পবিত্র রমজান মাস। ২০১২ সাল। সেগুনবাগিচার একটি হোটেলে কবির সাথে দেখা হবে। খুশির একটা অদৃশ্য ঝিলিক বুকের মধ্যে বারবার ঝলকাচ্ছে। কাছে থেকে কবিকে দেখার ইচ্ছে সেই ছোট বেলার। যখন কেবলমাত্র সাহিত্য পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং দৈনিকের সাহিত্য পাতাগুলোর সাথে পরিচিত হচ্ছি। কিশোর বেলা থেকেই আমি আল মাহমুদের ছড়ার ভক্ত ছিলাম। ‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসে না/ কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে/ আমার কেবল ইচ্ছে জাগে/ নদীর কাছে থাকতে,/ বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে/ পাখির মত ডাকতে। কি অসাধারণ শব্দের গাথুনি। এরকম ছড়া পড়ার জন্য অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম দৈনিকের পাতাগুলোর দিকে। সেই স্বপ্নের কবির সাথে আজ দেখা হবে। আমিতো ছোট মানুষ। কবি কি আমার সাথে কথা বলবেন? আমিই বা কি বলবো তাঁকে? এসব ভাবছি অডিয়েন্সে বসে। তারপর নিজেকে শান্তনা দেই এই বলে, কথা বলুক আর নাই বলুক চোখের দেখাতো দেখতে পাবো।
ঢাকার একটি সুস্থধারার সাংস্কৃতিক সংগঠনের ইফতার মাহফিল ওই দিন। কবি প্রধান আকর্ষণ ওই আয়োজনের। আমি তখন সবে মাত্র বছর খানেক আগে ঢাকায় এসেছি। খুব ভালো করে তখনও ঢাকাকে বুঝে উঠতে পারিনি। অপেক্ষা করছি বসে বসে। আরো শতাধিক আমন্ত্রিত মানুষ সামনের চেয়ারে বসে আছে। আমি আয়োজক কমিটির এক সদস্য’ কবি আফসার নিজাম ভাই এর আমন্ত্রণে এসেছি। তিনি অনুষ্ঠানস্থলে সাড়ে তিনটায় এসেছেন। আমিও তখন থেকেই আছি। সময় গড়িয়ে যায়। একে একে আলোচকবৃন্দ সবাই চলে আসে। হোটেলের হল রুমটা সাড়ে চারটার মধ্যেই ভরে যায়। অনুষ্ঠান শুরু হয়। কবি আসে না। কারো আলোচনাতেই আমার মন বসছিলো না। ঠিক ঘড়ির কাটা পাঁচটা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে দুই যুবকের হাত ধরে মঞ্চে উঠলেন কবি। কবির শরীর খুব দুর্বল তখনো। লাল ফর্সা শরীরের চামড়াগুলো জড়োসড়ো হয়ে গেছে। কবিকে দেখে আমি তৃপ্ত। সময় মত কবির হাতে মাইক্রোফোন চলে আসে। কথা বললেন। আমার পুরো মনোযোগ তার দিকে। ফরমালি কথা শুরু করলেন। আমি শুনছি। সামনে বসা হল রুম ভরা দর্শক তাঁকে শুনছে। পুরো হল সুদ্ধ পিনপতন নিরবতা। শুরু কবির কথাগুলোই লাউডে শোনা যাচ্ছে। বয়সের ভাড়ে অনেকটা নুয়ে পড়া কবি কষ্ট করে শব্দগুলো ভেতর থেকে বের করছেন। অল্পতেই হাফিয়ে উঠছেন তিনি। কবি নিজেকে উপস্থানপন করলেন ‘আমি বিশ্বাসী মানুষ। আমি বিশ্বাস করি। অস্তিত্ববোধ আমার মধ্যে দৃঢ় ভাবে আছে। আমি লেখি আমার আত্মার চাহিদা মেটানোর জন্য। সেখানেও বিশ্বাসকেই প্রধান্য দেয়ার চেষ্টা করেছি’। মিনিট দশেক কথা বললেন সেদিন তিনি। সবগুলো কথাই ছিলো তার জীবনবোধকে নিয়ে। তিনি কি পেলেন আর কি পেলেন না তা নিয়ে কখনো হতাশ হননি। তবে কি নিয়ে মহান প্রভুর দরবারে তিনি ফিরে যাবেন সেই চিন্তা তার মধ্যে ছিলো। সেদিন তাকে বলতে শুনেছি ‘পৃথিবীর জীবন শেষে অন্য একটা জগৎ আছে সেখানে ভালো থাকতে হলে এখান থেকে ভালো কিছু সাথে নিয়ে যেতে হবে। সবার উচিৎ পরের জগৎকে নিয়ে ভাবা। তারপর ইফতার হয়। হল রুমেই মাগরিবের নামাজ পড়া হলো। কবিও আমাদের সাথে নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষে কবিকে চেয়ারে বসানো হলো। আয়োজক কমিটির সদস্যরাই তাকে আবার বাসায় পৌছে দিয়ে আসবেন। আফসার নিজাম ভাই এই ফাঁকে আমাকে নিয়ে কবির পাশের চেয়ারে বসলেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। উত্তর দিতে দিতে কবি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হাতে হাত মেলালাম। আমি সত্যি আল মাহমুদের হাতে হাত রেখে কথা বলছি? অনেকটা অবিশ্বস্য মনে হচ্ছিল তখনও। আমি আপনার লেখার ভক্ত। আপনার লেখা চোখের সামনে পড়লেই পড়ে ফেলি। আপনার নতুন লেখার জন্য অপেক্ষা করি। দৈনিকের সাহিত্য পাতাগুলো কেবল মাত্র আপনার জন্যই নিয়মিত দেখি। এসব বলতেই কবি আমাকে উল্টো জিজ্ঞেস করলেন বলোতো তুমি আমার কি কি বই পড়েছো? নামগুলো আমাকে বলো। আমি অনেকটা অপ্রস্তু ছিলাম। কারণ সবগুলো বইয়ের নাম হঠাৎ করেই মনে থাকার কথা নয়। তার পেড়েও আমি উল্লেখযোগ্য বইগুলোর নাম বললাম। সোনালী কাবিন, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘কাবিলের বোন’, প্রিয় পঞ্চমী, চার পতার প্রেম, জীবনী ‘যে ভাবে বেড়ে উঠি’ ছড়ার বই ‘ পাখির কাছে ফুলের কাছে, কালের কলস, বিবি মরিয়মের উইল, বখতিয়ারের ঘোড়া, ছায়ার সঙ্গে মায়ার লড়াই, জলবেশ্যা ও তাহারা, পোড়ামাটির জোড়া হাঁস। এই নামগুলো থেমে থেমে বললাম। কবির চোখে মুখে তখন খুশির আভা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমাকে তার কাছে টেনে নিয়ে বললো তুমি পড়েছো আমি বুঝতে পেরেছি। আমাকে তখন তিনি বললেন, আমার কিকি বই পড়েছো এটা জিজ্ঞেস করার কারণ হচ্ছে আমাকে তোমার মতই অনেকেই এসে বলে আমি আপনার লেখার ভক্ত। তাদের অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে যেভাবে করলাম সেভাবে। তাদের অনেকেই সোনালী কাবিন ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারেনি। তাদের হয়তো অনেকেই আমার বইগুলো পড়েই নি। তখন আমি তাদের বলতাম তোমার আমার এমন ভক্ত আমার লেখা বইগুলোর নাম বলতে পারছো না। এই বলে তিনি হাসলেন। আমরাও হাসলাম। তার পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি সাজ্জাদ বিপ্লবকে চেনো? আমি বললাম হ্যা চিনি। উনি আমাদের বড় ভাই। ও এখন কোথায় আছে কেমন আছে কেছু জানো? বললাম হ্যা জানি। উনি আমেরিকায় আছেন। ভালো আছেন। ফেসইবুকের কল্যাণে তার সাথে যোগযোগ হয় নিয়মিত। বগুড়ার কবি সাজ্জাদ বিপ্লব দেশে থাকতে আল মাহমুদের ঘনিষ্টজন হয়ে উঠেছিলেন। আল মাহমুদ যে কয়জনকে আত্মার আত্মীয় করেছিলেন সাজ্জাদ বিপ্লব তাদের অন্যতম একজন। তাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরেই কথা হলো। আমি টুকটাক লেখি এই কথা বলার পড়েই কবি আমাকে বললো যেহেতু তুমি লেখো যেহতেু তোমাকে ভালো বই ভালো লেখা সব সময় পড়তে পড়তে হবে। সমসাময়ীক বিষয়গুলো ভালোভাবে অধ্যায়ণ করতে হবে। কারণ অনেকেই লেখেন। অনেক লেখেন। কয়জন লেখক হয়ে ওঠে বলো? তুমি এমন কিছু লেখো না যেটা পাঠকের কাজে আসবে না। আর পাঠকের কাজে না আসলে ওই লেখার কোন দাম নেই। মানুষের কথা চিন্তা করে লিখতে হবে। তাহলেই তুমি, তোমার লেখা এক সময় লেখা হয়ে উঠবে।
ওই দিন কবির সাথে আমার প্রথম সাক্ষত। প্রথম কথা। তার পর আর তার সাথে কখনো কোন দিন দেখা হয়ে উঠেনি। আমি ঢাকা থেকে আবারো বগুড়ায় চলে একবারে চলে আসি ২০১৩ সালের মাঝের দিকে। তারপর ২০১৬ সালেল পর থেকে কবির শরীরের অবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। অনেকবার তাঁর কাছে যাওয়ার প্লান করেছি। কিন্তু আর সময় সুযোগ কোনটাই হয়ে উঠেনি। অসুস্থ হলে পত্রিকার পাতা থেকেই জেনে নিয়েছি। তাঁর কাছের মানুষগুলো থেকে খবর নিয়েছি। দ্বিতীয় বার তাঁর সাথে দেখা হওয়ার আগেই তিনি ওপারের অতিথি হিসেবে চলে গেলেন।
আল মাহমুদের দেশপ্রেম ছড়া কবিতায়: ‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসে না/ কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে/ আমার কেবল ইচ্ছে জাগে/ নদীর কাছে থাকতে,/ বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে/ পাখির মত ডাকতে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে/ কর্ণফুলির কূলটায়, / দুধ ভরা ঐ চাঁদের বাটি/ ফেরেশতারা উল্টায়। তখন কেবল ভাবতে থাকি/ কেমন করে উড়বো, / কমন করে শহর ছেড়ে/ সবুজ গাঁয়ে ঘুরব!/ তোমরা যখন শিখছো পড়া/ মানুষ হওয়ার জন্য,/ আমি না হয় পাখি হবো/ পাখির মত বন্য। (পাখির মতো)। একটি দুরন্ত কিশোরের মনে কথা আল মাহমুদ এই কিশোর কবিতায় তুলে ধরেছেন। যদিও কবি তার কিশোর কালের নিজস্ব স্বভাব, নিজের দুরন্তপনা সব কিছুকেই নিজের মত করে তুলে ধরেছেন। কবির সেই দুরন্তপনা গ্রাম বাংলার কোটি কিশোরের দুরন্তপনার প্রতিচ্ছবি মাত্র। ঘরকুনো মানুষ নিজের জন্য কিছু করা ছাড়া দেশ জাতির জন্য তেমন কিছু করতে পারে না। করার কক্ষমতা থাকে না। যত ত্যাগ শ্রম দেশের জন্য প্রয়োগ হয়েছে তার বেশির ভাগই দুরন্তপনাদের। পাড়ার সব চেয়ে বেশি আড্ডাবাজ, ভবঘুড়ে যারা তাদেরকেই সব সময় মানুষের বিপদে সবার আগে দেখা যায়। এরা কখনো নিজের চিন্তা আগে করে না। কবির মধ্যে এই দুরন্তনা ছিলো বলেই তিনি দেশের জন্য ভেবেছেন। সমাজের জন্য ভেবেছেন। তাঁর অসংখ্য লেখায় দেশের ছবি, সমাজের ছবি ফুটে উঠেছে।

আল মাহমুদের বেড়ে ওঠার গল্প অনেককেই জানেন। মাটির মাথে মানুষের সাথে প্রকৃতির সাথে বেড় ওঠা এই কবি মানব সব সময় নিজ দেশের জন্য চিন্তা করেছেন। ভালোবেসেছেন মানুষকে। এই নদীমাতৃক সবুজশ্যামল দেশে বেড়ে ওঠা সন্তানদের তিনি একজন। বাংলাদেশকে কবিতার কল্পনায় আল হামদুদ এভাবেই এঁকেছেন- ‘ আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে/ হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।/ নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে ?/ -হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।/ বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে/ শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছড়িয়ে থাকে।
জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক/ সবুজ বনের হরিণ টিয়ে করে রে ঝিকমিক।/ বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই,/ আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই।/ কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন/ আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।/ সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি নাতো !/ ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো/ বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক/ হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।/ এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা/ আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।
নোলক আবহমান বাঙালী মায়েদের নাকের অলংকার হলেও এ শুধু তার অর্থগত আর সৌন্দর্যের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নায়। কবি এখানে আক্ষরিক অর্থে নোলক খোঁজেননি, খুঁজেছেন বাংলাদেশের চিরচেনা ইতিহাস ঐতিহ্য ঐশ্বর্যকে। আমরা সংস্কৃতি বলতে যা বুঝি তার মধ্যে নিজস্বতা বলতে একটা কথা আছে। সেই সংস্কৃতির মূল্যবোধকে ভক্তিভরে দীর্ঘ চর্চায় মানুষ এক ধরনের বিশেষ অবস্থানে পৌঁছে যায়। নোলক গ্রাম বাংলার সাধারণ নারীর নাকের অলংকার, এটা যতটা না অলংকার তার চেয়েও বেশি অহংকার। নোলক নারী আগলে রাখে যতোটা না অলংকার হিসেবে তার চেয়ে বেশি পুরুষের উপযুক্ত হওয়ার গৌরব এবং পুরুষের অনুভব হিসেবে।
বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ এক সময় অনেক ছিলো। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু ছিলো। আম কাঁঠালের বন ছিলো। রাখালের কণ্ঠে গান ছিলো। নদী ছিলো। নদীতে পানি ছিলো। ঢেউ ছিলো। পালতোলা নাও ছিলো। মাছ ছিলো, জেলা মাঝি সব ছিলো। কালের আবর্তে প্রতিবেশীদের কালো থাবায় আজ নদী আছে পানি নেই। ঢেউয়ের বদলে বালি ওড়ে বাতাসে। দেশী প্রজাতির মাছ সেই কবে থেকেই নাই হয়ে গেছে। এসব নাই হয়ে যাওয়ার আগেই কবি তার লেখায় সতর্ক করেছিলেন। শৈশবের দেখা প্রিয় গ্রাম প্রিয় বাংলাদেশ খুঁজেছেন কবি লোনক খোঁজার ছলে।
অপর দিকে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দৃশ্য কবি তার তৃতীয় নয়নে অনেক আগেই দেখতে পেয়েছিলেন। আমাদের সংস্কৃতির আমুল পরিবর্তনের আভাসও কবি আগেই পেয়েছিলেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত কবিতা কদর রাত্রির প্রার্থানয় গভীর ভাবে ফুটে উঠেছে এসব দৃশ্য। মহান রবের বের কাছে কদর রাত্রির গুরুত্ব অপরিসীম। এই রাতে বান্দার যেকোন আবেদন মঞ্জুর করার ওয়াদা দিয়েছেন। কবি মহান রবকে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন। ফলে কদর রাতে কবি নিজের জন্য কোন কিছুই চাইলেন না। দেশের অসংগতি, সামজিক অবক্ষয়, আমাদের চেতনার দিক পরিবর্তন সব বিষয়গুলো নিয়েই তিনি মহান রবের কাছে ফরিয়াদ করেছেন ঠিক এই ভাবে- ‘হে আল্লাহ,/ পবিত্রতম মহাযামিনীর অধিপতি,/ তুমি তো একের পাপ অন্যের ঘাড়ে বর্তাও না। পিতার পাপ পুত্রকে স্পর্শ না করার, হে প্রতিশ্রুতিদানকারী/ দ্যাখো সহস্রাধিক মানুষের লাশ নিয়ে আমরা পবিত্র কোরআন নজুলের/ পুণ্য রজনীতে এখন সিজদারত/ আমাদের রাজ-রাজড়াদের পাপে তুমি যেন আমাদের ধ্বংস করে দিও না।/ কেন এক প্রাচীন তৌহীদবাদী জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার রজ্জু/ তুমি পরাক্রান্ত পৌত্তলিকদের হাতে তুলে দিতে চাও?/ আমরা কি বংশানুক্রমে তোমার দাস নই?/ আমরা তোমার নামের কোনো জেহাদেই অতীতে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিনি।/ তোমার অনুগ্রহ থাকলে/ আমাদের সিজদারত সন্ততিরাও রক্ত ও বারুদের সমাধানই/ শেষ পর্যন্ত বেছে নেবে / এই পুণ্য রজনীতে আমাদের আবরিত স্ত্রী ও কন্যাদের সমস্ত গোনা প্রভু/ মাফ করে দাও।/ হে অনুকম্পার মহান অধিপতি,/ এই মহানগরীর ভদ্রবেশী বেশ্যা, লম্পট, হিরোইনসেবী ও ছিনতাইকারীর/ প্রাত্যহিক পাপের দেনায় ‘আমরা এমনিতেই অতিষ্ঠ, / এর সাথে যোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান প-িতেরা। / শিক্ষার প্রতিটি প্রাঙ্গণ কিশোর হত্যার মহাপাপে এখন রক্তাক্ত, পঙ্কিল।/ প্রকৃত পাপীদের বিনাশ ত্বরান্বিত করতে তুমি কি বাংলাদেশের/ প্রতিটি বিদ্যাপীঠকেই বিরাণ করে ফেলবে? / এমনিতেই গ্রামে গ্রামে ধসে পড়া স্কুলবাড়িগুলোর ভেতর থেকে/ শেয়াল আর পেঁচার ডাকে প্রাইমারি স্কুলের আবু মাস্টারের ঘুম নেই/ তার ওপর তারই একমাত্র শহুরে পড়ুয়া মেয়েটির গলার চেন ও হাতের বালা / জগন্নাথ হলের পাশের রাস্তা থেকে ছিনতাই হলো। বুকের ওপর ছুরি রেখে/ খুলে দে হারামজাদী, চুপ্।/ আমরা তো চুপ করেই আছি, তবু হে পরোয়ারদিগার/ জানতে সাধ জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?/ বাল্যে যেমন কোনো গাঁয়ের পাশ দিয়ে নাও বেয়ে ফিরতে গেলে/ মুরুব্বীরা বলতেন, ওপথে যেও না অমুকটা হলো ডাকাতের গ্রাম।/ প্রভু/ ডাকাত, ছিনতাইকারী, পন্ডিত ও বেশ্যাদের হাত থেকে/ তুমি কি ইলমকে রক্ষা করবে না? -রাব্বি যিদনী ইলমা-/ প্রভু, আমাদের জ্ঞানদান করো।
এখন অহরহ রাস্তা ঘাটে ডাস্টবিনে পাপের ফসল পড়ে থাকতে দেখা যায়। আল মাহমুদ এই কবিতায় শিক্ষার মানের অধপতনের হাত থেকে মহানপ্রভূর কাছে রক্ষা চেয়েছেন। আল মাহমুদ একটি সাহিত্যের উজ্জ্বল নাম। আল মাহমুদ একটি দেশের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। আল মাহমুদ এদেশের লাখো তরুণের হৃদয়ে বছরের পর বছর ধরে বেঁচে থাকবেন।