বাংলা সাহিত্যের বিষয় প্রকরণ নির্ভর সৃষ্টি দিয়ে যে ক’জন কবি সাহিত্যিক নিজেকে আপন মহিমায় স্বপ্রভিত করেছেন পল্লী কবি জসীম উদ্দীন তাদের মধ্যে যে অন্যতম তা আর পুনোউল্লেখ না করলেও চলে। কবি জসীম উদ্দীন ১৯০৩ সালের ১৪ মার্চ ফরিদপুর শহরের ১২ কি.মি. দূরবর্তী তাম্বুলখানা গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। অবশ্য কবির পিতৃালয় ফরিদপুর শহরের মধ্যেই ছিল। নিজস্ব বাড়ি ফরিদপুর শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে গোবিন্দপুরে। তার পিতার নাম মৌলবী আনসার উদ্দীন আহমেদ এবং মাতার নাম আমেনা খাতুন।
কবি জসীম উদ্দীনের শিক্ষা জীবন শুরু হয় গোবিন্দপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রামে শোভারামপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে অম্বিকা মাষ্টারের কাছে। পরে ফরিদপুর হিতৈষী স্কুলে ভর্তি হন যেখানে তার পিতা শিক্ষকতা করতেন। এখান থেকে চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অতঃপর ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে আই,এ এবং ১৯২৯ সালে বি,এ পাশ করেন। ১৯৩১ সালে কবি বাংলা সাহিত্যে এম,এ পাশ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মান সূচক ডি-লিট ডিগ্রী লাভ করেন ১৯৬৮ সালে। কবি ১৯৪৩ সালে শিবচর থানার নলগড়া গ্রামের মমতাজ বেগমকে বিবাহ করেন। মমতাজ বেগমের ডাকনাম মনিমালা।
কবি জসীম উদ্দীনের কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৩১ সালে ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে তিনি ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৫ সালে কবি প্রাদেশিক সরকারের প্রচার বিভাগেsong publicity অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬২ সালে প্রচার বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টর পদে থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন।
কবি জসীম উদ্দীন একাধীকবার বিদেশ সফরে যান। ১৯৫০ সালে তিনি আমরেকিায় যান আন্তর্জাতিক লোক সংগীত সভায় যোগ দিতে। এই উপলক্ষে তিনি ইন্ডিয়ান, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক প্রভৃতি স্থানে যান। আমরিকা থেকে ফেরার পথে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা পি.ই.এন কংগ্রেসে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর ১৯৫১ সালে যুগোস্লোভিয়ায় আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সভায় যোগ দেন। কবি জসীম উদ্দীনের বাংলাদেশের লোকসংগীত সম্পর্কে জার্মানী, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, প্রভৃতিদেশে বক্তৃতা করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান থেকে Good will Mission এর সদস্য হয়ে মধ্য এশিয়ায় বিভিন্ন দেশে সফর করে তুরস্ক যান। ১৯৫৬ সালে মায়ানমার সাহিত্যে সম্মেলনে লোক সাংস্কৃতির সভাপতি হিসেবে যোগ দেন।
কবি জসীম উদ্দীন সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পদাচারণা করেন। কবিতা গান, ভ্রমণ কাহিনী, স্মৃতিকথা, হাসির গল্প, গীতিনাট্য, রূপক নাট্য রচনা করেন। স্কুল জীবন থেকে তিনি সাহিত্য চর্চা করেন। কবি নজরুলের প্রচেষ্টায় কবি জসীম উদ্দীনের লেখা সমূহ প্রথম কলকাতার মাসিক পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। মোসলেম ভারতের যে সংখ্যায় কবি নজরুলের বিশ্বখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ছাপা হয় সেই সংখ্যাতে কবি জসীম উদ্দীনের ‘মিলন গান’ কবিতাটিও ছাপা হয়। পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা প্রথম ছাপানো হয় ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। কবিতাটি তিনি রচনা করেন ১৯২৪-২৫ সালের দিকে যখন তিনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম-দশম শ্রেণিতে পড়েন। এই কবর কবিতাটি নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্য বইতে সংযুক্ত করা হয় ১৯২৮-২৯ সালে যখন কবি নিজেই বি.এ. ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় একজন কবির কবিতা পাঠ্যসূচির অর্ন্তভূক্ত হওয়ার নজির আর কোন কবির আছে কিনা জানা নেই।
কবি জসীম উদ্দীন সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে পদাচরণা করেছেন। তার মোট ১৯টি কাব্য গ্রন্থ আছে ১. রাখালী-১৯২৭, ২. নকশী কাথার মাঠ-১৯২৯, ৩. বালুচর-১৯৩০, ৪. ধানক্ষেত-১৯৩২, ৫. সোজন বাদিয়ার ঘাট-১৯৩৩, ৬. রঙিলা নায়ের মাঝি-১৯৩৫, ৭. হাসু-১৯৩৮, ৮. রূপবতী-১৯৪৬, ৯. এক পয়সার বাঁশি-১৯৪৯, ১০. পদ্মাপাড়-১৯৫০, ১১. মাটির কান্না-১৯৫১, ১২. গাঙের পাড়-১৯৫৪, ১৩. সকিনা-১৯৫৯, ১৪. সূচয়নী-১৯৬১, ১৫. মা যে জননী কান্দে-১৯৬৩, ১৬. হলুদ বরনী-১৯৬৬, ১৭. জলের লেখন-১৯৬৯, ১৮. পদ্মা নদীর দেশে-১৯৬৯, ১৯. মাগো জ্বালায়ে রাখিস আলো-১৯৭৬।
তিনি ৬টির মতো নাটক লিখেছেন, ১. পদ্মাপাড়-১৯৫০, ২. পল্লী বধু-১৯৫৬, ৩. মধুমালা-১৯৫৬, ৪. বেদের মেয়ে, ৫. গ্রামের মায়া-১৯৫৬, ৬. ওগো পুষ্পধর-১৯৬৮।
উপন্যাস লিখেছেন একটি বোবা কাহিনী-১৯৬৪। ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন দু’টি, সেদেশে মানুষ বড়-১৯৬৮, জার্মানীর শহরে বন্দরে-১৯৭৫।
শিশুতোশ বই, ডালিম কুমার-১৯৬০, বাঙ্গালীর হাসির গল্প-প্রথম খ- ১৯৬০, বাঙ্গালীর হাসির গল্প- ২য় খ- ১৯৬৪। স্মৃতি কথা মূলক রচনা, যাদের দেখেছি-১৯৫২, চলো মুসাফির-১৯৫৭, বন্ধুর বাড়ির আঙ্গিনায়-১৯৬১, জীবন কথা-১৯৬৪, স্মৃতিপট-১৯৬৮, স্মরণের সরণি বাহি-১৯৭৮। কবি জসীম উদ্দীন সংগ্রহের দু’টি সংকলন প্রকাশ করেন, জারিগান-১৯৬৮, মুর্শীদা গান-১৯৭৭।
১৯৩৯ সালে কবির ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্য গ্রন্থটি ইংরেজি অনুবাদ The field oF the Embroidered Quilt করেন মিসেস মেরী মিল ফোর্ড। ১৯৬৯ সালে ইউনোস্কোর উদ্যেগে কবির ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট ইংরেজি অনুবাদ হয় The Gypsy Whark এই দুটি গ্রন্থের অনুবাদ কবিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও মর্যাদা এনে দেয়। অনুবাদ করেন, B Painter is Allan and Wnarin, জসীম উদ্দীনের বাঙালির হাসির ইংরেজি অনুবাদ করেন Barbara painter Of Hasna Jasimuddin তার ‘মাটির কান্না’ কাব্য গ্রন্থটি ১৯৫৯ সালে রুশ ভাষায় অনূদিত হয়। তার কিছু রচনা চেক ভাষায় অনুবাদ করেন চেক সাহিত্যিক দুশন জবা ভিতেল।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার সৃষ্টির কারণে ছাত্রজীবন থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সাহিত্যিক হিসাবে নানা জন ও প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশংসিত হয়েছেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্ট পদক ‘গাইড অব পারফরমেন্স’ লাভ করেন। ঐ বছরই রবীন্দ্র ভারতী থেকে তাকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্যে পুরস্কার পেলেও কবি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৬ সালে একুশে পদক এবং ১৯৭৬ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার পান। ‘হলদের পরীর দেশ’-এর জন্য ইউনোস্কো পুরস্কার পান।
বাংলাদেশ ও মাটির এই কিংবদন্তি কবি ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ ভোর রাতে শ্বাস-কষ্ট জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা পি.জি হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। কবির কবর কবিতার মাঝে তার ইচ্ছানুযায়ী ফরিদপুরের গোবিন্দপুরের দাদির কবরের পাশে ডালিম গাছ তলায় তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

লেখক:
সভাপতি
নজরুল গবেষণা পরিষদ, খুলনা।