বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাঙলার স্বাধীনতা এক কিনা সেটার মীমাংসা করেই আমাদের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ কথাটিতে আসতে হবে। ১৯৪৭-এর পূর্বের ‘বাংলা’ এবং ‘বাংলাদেশ’ আর আজকের ‘বাংলাদেশ’ এক নয়। সে সময়ের ‘বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ গোটা বাংলাদেশের যে ভৌগোলিক মানচিত্র আমাদের সামনে যে রূপে অস্তিত্বময় হ’য়ে উঠত আজকের বাংলাদেশের মানচিত্র তেমনটি নেই আর। সে-জন্যেই পূর্বের বাংলা ওরফে বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ ভিন্ন দু’টি দেশই ভিন্ন দু’টি সত্তার দেশ। একদা বাংলা ও বাংলাদেশ একই ভৌগোলিক মানচিত্রের দেশ ছিল। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সে-জন্যে ‘কোন দেশে’ কবিতায় লিখেছিলেন-
কোন দেশেতে তরুলতা-
সকল দেশের চাইতে শ্যামল?
কোন দেশেতে চলতে গেলেই
দলতে হয়রে দুর্বা কোমল?
কোথায় ফলে সোনার ফসল
সোনার কমল ফোটে রে?
সে আমাদের বাংলাদেশ
আমাদেরই বাংলারে !

এখানে বাংলা ও বাংলাদেশ একটি অভিন্ন সত্তার নাম। ১৯০৫ সালে লেখা এই কবিতা আর ১৯৩১-এ নজরুল যে গান লেখেন-
নম: নম: নমো বাংলাদেশ মম
চির মনোরম চির মধুর!
বুকে নিরবধি বহে শত নদী
চরণ জলধির বাজে নূপুর!
তার বাংলাদেশ তার পূর্ব পরিচিত অখন্ড রূপ। তারপর ইতিহাস চক্রের আবর্তনে সেই অখন্ড রূপের পরিবর্তন ঘটে গেছে। বলা প্রয়োজন ১৯৪৭-এর পূর্বে বাংলা ও বাংলদেশকে সমভাবে যে দেখা হ’ত নজরুল ইসলাম তাঁর আরো কয়েকটি গান ও কবিতায় তার স্বাক্ষর রেখেছেন। যেমন: ১. ‘আমার শ্যামলা বরণ বাঙলা মায়ের রূপ দেখে যা আয় রে আয়’, ২. ‘সেই আমাদের বাংলাদেশ!/ রাজধানী আজ ভিখারিনী কাঁদছে বনে লুটিয়ে কেশ!’ ৩. ‘বাঙলা মা তোর সোনার ক্ষেতে/ দেখা যায় কার আঁচলখানি/ কার রূপের আলোয় আকাশ-বাতাস, ভরে গেল শ্যাম বনানী!’ লক্ষ্য করার বিষয় বৃটিশ ভারতে বাংলা বা বাংলাদেশ অথবা বঙ্গদেশ দু’ভাগে বিভক্ত ছিল পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গ নামে। আর এই পূর্ববঙ্গ বা ‘পূরববঙ্গ’ নামে নজরুল একটি গান লিখেছিলেন ১৯৩৯-এ। গানটির কয়েকটি পঙক্তি এমন-
পদ্মা-মেঘনা-বুড়িগঙ্গা-বিধৌত পূর্ব-দিগন্তে
তরুণ অরুণ বীণা বাজে তিমির বিভাবরী অন্তে।
ব্রাক্ষ্ম মুহূর্তের সেই পূরবাণী
জাগায় সুপ্ত প্রাণ জাগায়- নব চেতনা দানি’
সেই সঞ্জীবণী বাণী শক্তি তার ছড়ায়
পশ্চিমে সুদূর অনন্তে।।
ঊর্মিছন্দা শত নদী স্রোত-ধারায় নিত্য পবিত্র
সিনান শুদ্ধ পূরববঙ্গ
ঘন বন-কুন্তলা প্রকৃতির বক্ষে সরল সৌম্য
শক্তি-প্রবুদ্ধ পূরববঙ্গ।
বলা বাহুল্য সেদিনের সেই পূর্ববঙ্গ আজকের বাংলাদেশ। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর যার ভূ-মানচিত্র পাকিস্তানের অন্তর্গত পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। সেই মানচিত্র পরিচিত স্থানই বর্তমান বাংলাদেশ। সংবিধানে যে দেশ বাংলা বলে অভিহিত হয় নি- ‘বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত হ’য়েছে। আমার বর্তমান প্রবন্ধ এই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেন্দ্রিক। এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে নজরুলের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? থাকলে তা কি-ভাবে আছে?
বৃটিশ ভারতে- যা এখন উপমহাদেশ নামে খ্যাত- নজরুল যে কলমী স্বাধীনতা যুদ্ধে আবির্ভূত হন তা ছিল তদানীন্তন ভারতবর্ষে বৃটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। বৃটিশ পরাধীনতা থেকে মুক্তির যুদ্ধ শুধু বাংলা বা বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ নয়। তিনি যে লিখেছিলেন-
প্রার্থনা করো, – যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেনো লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!
১৯২৫-এর সেই ‘তেত্রিশ কোটি’ মানুষ ছিল ভারতের তথা আজকের উপমহাদেশের তেত্রিশ কোটি হিন্দু-মুসলিমের দেশ- শুধু সেদিনের বাংলা ওরফে বাংলাদেশ নয়। নজরুল তাই এমন গানও লিখেছেন-
জননী মোর জন্মভূমি, তোমার পায়ে নোয়াই মাথা
স্বর্গাদপি গরীয়সী স্বদেশ আমার ভারত মাতা।
কারণ তিনি জানতেন ভারতের প্রদেশ হিসাবে বাংলা ওরফে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাবে; একই সঙ্গে পূর্ববঙ্গ যুক্ত পশ্চিম বঙ্গও স্বাধীনতা পাবে। অতএব জ্যামিতিক নিয়মে বা আঙ্কিক নিয়মে সে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধ হবে না তা হবে বাংলাদেশেরও স্বাধীনতা যুদ্ধ। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ভারতের স্বাধীনতা সূর্যের অস্ত যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাংলা থেকে। তাঁর বিখ্যাত ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় তার তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত আছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন-
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙ্গিয়া পুনর্বার !
আমরা জানি পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর থেকে ভরতবর্ষের পতনের শুরু হয় এবং মীর কাশিম, হায়দার আলী ও টিপু সুলতানের দুর্দম চেষ্টা সত্ত্বেও সে পতন ঠেকানো সম্ভব হয় না। সে জন্যে নজরুল তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় আক্ষেপ করে লিখেছিলেন- ‘বৃথাই গেল সিরাজ, টিপু, মীর কাশিমের প্রাণ বলিদান!’ অতএব ধ’রে নেয়া যায় বাংলা থেকেই শুরু হয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার অস্তগামিতা; এবং বাংলাদেশ থেকে শুরু হয় তার স্বাধীনতা আন্দোলন। ইতিহাসের পাতা উল্টালে এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। অবশ্য সেদিনের সেই বাংলা মিলিত হিন্দু-মুসলমানের বাংলা ছিল। আজকের বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ নয়। ইতিহাসের বক্র চক্রের আবর্তনে প্রাকৃতিক বিবর্তনের পথ ধরে নতুন যে বাংলাদেশ সৃষ্ট হ’য়েছে পুরনো বাংলার রূপ-চরিত্রের সঙ্গে তার মিল নেই আর। অনেক চেষ্টা করেও সেই সংযুক্ত বাংলাকে টিকিয়ে রাখতে পারা যায়নি। নজরুল ইসলাম জানতেন সে মিলন চেষ্টার অন্তরায় কি? ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে নজরুল যখন লেখেন-
‘কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর আচকান চায় না। চায় মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে। ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।’
তখনই বোঝা যায় অবিভাজ্য একটা চারিত্রিক স্বাতন্ত্র্য সংযুক্ত বাংলার ভাবরূপকে অখন্ড মানচিত্রের মধ্যে প্রাচীর সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অথবা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ধর্ম মিলন সেতু এখানে বাধার সৃষ্টি করছে। ঐ যে নজরুল তাঁর ‘প্যাকট্’ কবিতায় ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন-
আঁটসাট করে গাঁটছড়া বাঁধা হল টিকি আর দাড়িতে
বজ্র আঁটুনি ফস্কা সে গেরো তা হয় হোক তাড়াতাড়িতে।
একজন যেতে চাহিবে সমুখে অন্যে টানিবে পিছনে
ফস্কা সে গাঁট হ’য়ে যাবে আঁট- সে টানাটানি ভীষণে।
এক পর্যয়ে তা তুঙ্গে ওঠে। কৃষ্ণ নগরে ১৯২৬ সালের ২২ ও ২৩ মে কংগ্রেসের যে প্রাদেশিক সম্মেলন হয়। নজরুল দেখতে পান সেই সম্মেলনে সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা তার সে স্বপ্নকে, হিন্দু-মুসলিম মিলনের স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ঐ সম্মেলনের জন্যে তাঁর রচিত গান ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’-এর সেই বিখ্যাত প্রশ্ন ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? -ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’ জবাবহীন হ’য়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের নির্মম ‘প্যাক্ট’ ধূলিসাৎ করার আন্দোলন। নজরুল লিখতে বাধ্য হন-
‘সারা রারা রারা’ সহসা অদূরে ছুটিল হোরির হররা!
শম্ভু ছুটিল বম্বু তুলিয়া, ছকু মিঞা নিল ছোররা!
লাগিল হেঁচকা হেঁইয়ো হাঁইয়ো টিকি দাড়ি উড়ে শূন্যে-
ধর্মে ধর্মে করে কোলাকুলি নব-প্যাক্টেরি পুণ্যে।
বদনা-গাড়–তে পুন: ঠোকাঠুকি, রোল উঠিল ‘হা হন্ত’
ঊর্ধ্বে-থাকিয়া সিঙ্গি মাতুল হাসে ছিরকুটি দন্ত!
মসজিদ পানে ছুুটিলেন মিঞা মন্দির পানে হিন্দু!
আকাশে উঠিল চির-জিজ্ঞাসা,-করুণ চন্দ্রবিন্দু।
মিলন সম্ভব নয় জেনেও নজরুল হিন্দু-মুসলিম মিলনে অবিশ্বাসী হতে পারেননি। ইব্রাহীম খাঁর কাছে লেখা চিঠিতে সে স্বপ্নের কথা তিনি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন- ‘আমি হিন্দু মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী’। তিনি এর রাজনৈতিক কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। ১৯২৯-এ চট্টগ্রামে মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে তাঁর বিখ্যাত অভিভাষণ ‘মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা’তে বলেছিলেন-
‘ভারত যে আজ পরাধীন এবং আজো যে স্বাধীনতার পথে তার-যাত্রা শুরু হয় নি- শুধু আয়োজনেরই ঘটা হ’চ্ছে এবং ঘটাও ভাঙছে- তার একমাত্র কারণ আমাদের হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি হিংসা ও অশ্রদ্ধা।’
কিন্তু সম্প্রীতি সৃষ্টির সেই নজরুলী চেষ্টা সফলতা অর্জন শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয় নি। সেটা নজরুলও জানতেন। সে-জন্যে ১৯২৯-এর ডিসেম্বরে সমগ্র বাঙালী জাতির পক্ষে থেকে নজরুলকে যে সংবর্ধনা দেয়া হয় সেই সংবর্ধনার অভিনন্দনের উত্তর দিতে গিয়ে নজরুল বলেছিলেন-
‘কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দুটোর কিছুই নয়। আমি মাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে-হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়েও অশোভন হ’য়ে থাকে, তা হ’লে ওরা আপনি আলাদা হ’য়ে যাবে। আমার গাঁট্-ছড়ার বাঁধন কাট্তে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না।’
নজরুলী সেই প্রচেষ্টা সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল এবং প্রমাণিত হ’য়েছিল অন্তত: ভারতবর্ষে এক জাতির মধ্যে দুই জাতির অবস্থান আছে। ভারতের মধ্যে আছে ‘মোসলেম ভারত’। ১৯৪৭-এ তার বাস্তবায়িত রূপ ‘পাকিস্তান’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। যার পূর্বাঞ্চল বাংলাদেশ নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। সেটা নজরুলের স্বপ্ন ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু একেবারে ছিল না বললে সেটা সম্ববত: এক শ’ ভাগ সত্য হবে না। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে নজরুল যে ভাষণ দেন সেখানে যে ইঙ্গিতময় কথা ছিল তাতে বোধ হয় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ একটা অস্পষ্ট রূপ লাভ করেছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন-
‘আপনাদের শিক্ষা সামিতিতে এসেছি আমি আর একটি উদ্দেশ্য নিয়ে। সে হ’চ্ছে আপনাদের সমিতির মারফতে বাঙ্লার সমগ্র মুসলিম সমাজের, বিশেষ ক’রে ধনী ও শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কাছে,- আমি যে মহান স্বপ্ন দিবা রাত্রি ধ’রে দেখেছি,- তাই বলে যাওয়া। এ স্বপ্ন যে একা আমারই, তা নয়। এই স্বপ্ন বাংলার তরুণ মুসলিমের; প্রবুদ্ধ ভারতের; এ স্বপ্ন বিংশ শতাব্দীর নব-নবীনের। আমি চাই, আপনাদের এই পার্বত্য উপত্যকায় সে স্বপ্ন রূপ ধ’রে উঠুক।
আমি চাই, এই পর্বতের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসুক তাজা তরুণ মুসলিম; যেমন করে শীতের শেষে বেরিয়ে আসে জরার খোলস ছেড়ে বিষধর ভুজঙ্গের দল। বিশ্বের এই নব অভ্যুদয়-দিনে সকলের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে চলুক আমার নিদ্রোথিত ভাইরা।
আপনাদের সমিতির উদ্দেশ্য হোক: আদাওতি করে আসন জয় নয়- দাওত দিয়ে মনের সিংহাসন অধিকার করা।
আপনাদের ইসলামাবাদ [চট্টগ্রামের পূর্ব নাম] হোক ওরিয়েন্টাল কালচারের পীঠস্থান- আরাফাত ময়দান। দেশ বিদেশের তীর্থ-যাত্রী এসে এখানে ভিড় করুক। আজ নব জাগ্রত বিশ্বের কাছে বহু ঋণী আমরা; সে ঋণ আজ শুধু শোধই করব না- ঋণ দানও করব, আমরাও আমাদের দানে জগৎকে ঋণী করব- এই হোক আপনাদের চরম সাধনা। হাতের তালু শূন্য পানেই তুলে ধরেছি এতদিন, সে লজ্জা আজ আমরা পরিশোধ করব। আজ আমাদের হাত উপুড় করার দিন এসেছে। তা যদি না পারি, সমুদ্র বেশী দূরে নয়, আমাদের এ লজ্জার পরিসমাপ্তি যেন তারি অতল জলে হ’য়ে যায় চিরদিনের তরে! আমি বলি রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের মত আমাদেরও কালচারের সভ্যতার জ্ঞানের সেন্টার বা কেন্দ্রভূমির ভিত্তি স্থাপনের মহৎ ভার আপনারা গ্রহণ করুন- আমাদের মত শত শত তরুণ খাদেম তাদের সকল শক্তি আশা আকাক্সক্ষা জীবন অঞ্জলির মত করে আপনাদের সে উদ্যোমের পথে অর্ঘ্য দেবে।
প্রকৃতির এই লীলাভূমি সত্যি সত্যি বুলবুলিস্তানে পরিণত হোক- ইরানের শিরাজের মত। শত শত সাদি, হাফিজ- খৈয়াম, রুমী, জামি শামশী-তাবরেজ এই শিরাজবাগে- এই বুলবুলিস্তানে জন্মগ্রহণ করুক। সেই দাওয়াতের আমন্ত্রণের গুরুভার আপনারা গ্রহণ করুন। আপনারা রুদাকির মত আপনাদের বদ্ধ প্রাণধারাকে মুক্তি দিন।’
আমরা যদি এই চট্টগ্রামকে বাংলাদেশেরই প্রতীক হিসেবে দেখি তাহ’লে আজকের বাংলাদেশকে মুসলিম কালচারাল সেন্টার হিসেবে দেখতে পারি যেখানে নজরুল রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের বিপরীতে বুলবুলিস্তান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে ব্যাস, বাল্মীকী, কালীদাস, বিভূতির স্থানে উচ্চারিত হ’য়েছে- সাদি, হাফিজ, খৈয়াম, রুমী, জামি প্রমুখ অমর কবিদের নাম।
না, নজরুল কখনও স্থানিয় চিন্তাকে বা সাম্প্রদায়িক চিন্তাকে তাঁর অমর চিন্তায় স্থান দেন নি। কলতার এলবার্ট হলে তাঁর দেয়া অভিভাষণে তিনি যে বলেছিলেন-
‘যাঁরা আমার নামে অভিযোগ করেন তাঁদের মত হলুম না বলে- তাঁদেরকে অনুরোধ, আকাশের পাখিকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তাঁরা যেন সকলের করে দেখেন। আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের, সুন্দরের ধ্যান তাঁর স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠ্তে পেরেছি বলেই কবি।’
এই বৈশ্বিক চেতনার জন্যে তাঁর বুলবুলিস্তান নির্মাণের স্বপ্নকে স্ববিরোধী বলে মনে হ’তে পারে; কিন্ত যেহেতু ইসলামী চিন্তাদর্শনে তিনি মানবিকতা প্রতিষ্ঠার বা প্রচারণার চিন্তাধর্ম বলে মনে করতেন সে জন্যে তাকে হয়ত স্বরিবোধী বলে মনে করা অনুচিত হ’তে পারে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই পূর্বে উল্লেখিত ও উদ্ধৃত উক্তির মধ্যেই নিহিত আছে বর্তমান বাংলাদেশ মহীরুহের বীজ। বর্তমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তাই তাঁর বৈশ্বিক মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আমরা জানি তিনি তেত্রিশ কোটি মানুষের মুক্তির জন্যে যে প্রার্থনা করতে বলেছিলেন তার অন্তর্ভুক্ত এই বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষও ছিল। তিনি সেই কবি ১৯২৬-এর উপমহাদেশের তেত্রিশ কোটি মানুষের সঙ্গে দেড়শ’ কোটি বিশ্ব মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন। আর ঐ বিশ্বের উৎপীড়িত, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ বন্ধ না করার যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার অন্তর্ভুক্ত ছিল ১৯৪৭-এর সাড়ে তিন কোটি বাংলাদেশীও।
রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় নিরাপত্তার কারণে তাঁর চিন্তা বিশ্বসীমা পেরিয়ে বাংলা সীমায় উত্তরিত হয়। ১৯৪১-এর এপ্রিল [৩রা বৈশাখ, ১৩৪৯] তাঁকে দৈনিক নবযুগে ‘বাঙালীর বাংলা’ নামে একটি উপ-সম্পাদকীয় লিখতে দেখি। বাঙালীর চরিত্র পর্যালোচনা করে বাঙালীর মেধার গুণ-কীর্তন করে, বাঙালী চরিত্রের ঐশ্বর্যের উদাহরণ দিয়ে তিনি অবশেষে লিখেছিলেন-
‘আজ আমাদের আলস্যের, কর্মবিমুখতার পৌরুষের অভাবেই আমরা হ’য়ে আছি মানের চেয়ে দীর্ণ। যে বাঙলী সারা পৃথিবীর লোককে দিনের পর দিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে পারে তারাই আজ হ’চ্ছে সকলের দ্বারে ভিখারী। যারা ঘরের পাশে পাহাড়ের অজগর বনের বাঘ নিয়ে বাস করে, তারা আজ নিরক্ষর বিদেশীর দাসত্ব করে। শুনে ভীষণ ক্রোধে হাত মুষ্টিবদ্ধ হ’য়ে ওঠে, সারা দেহ-মনে আসে প্রলয়ের কম্পন, সারা বক্ষ মন্থন করে আসে অশ্রুজল। যাদের মাথায় নিত্যস্নিগ্ধ মেঘ ছায়া হ’য়ে সঞ্চরণ করে ফিরে, ঐশী আশীর্বাদ অজস্র বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়ে, শ্যামায়মান অরণ্য যাকে দেয় স্নিগ্ধ-শান্ত-শ্রী, বজ্রের বিদ্যুৎ দেখে যারা নেচে ওঠে,- হায় তারা এই অপমান এই দাসত্ব বিদেশী দস্যুদের এই উপদ্রব নির্যাতনকে কি করে সহ্য করে? ঐশী ঐশ্বর্য- যা আমাদের পথে ঘাটে মাঠে ছড়িয়ে পড়ে আছে তাকে বিসর্জন করে অর্জন করেছি এই দৈন্য, দারিদ্র, অভাব, লাঞ্ছনা। বাঙলী সৈনিক হ’তে পারলো না। ক্ষাত্রশক্তিকে অবহেলা করলো বলে তার এই দুর্গতি তার অভিশপ্তের জীবন। তার মাঠের ধান-পাট রবি-ফসল, তার সোনা, তামা, লোহা, কয়লা- তার সর্ব ঐশ্বর্য বিদেশী দস্যু বাটপাড়ি ক’রে ডাকতি ক’রে নিয়ে যায়, সে বসে বসে দেখে। বলতে পারে না ‘এ আমাদের ভগবানের দান, এ আমাদের মাতৃঐশ্বর্য। খবরদার যে রাক্ষস একে গ্রাস করতে আসবে, যে দস্যু একে স্পর্শ করবে- তাকে ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’ দিয়ে বিনাশ করবো, সংহার করবো।’
বাঙালীকে, বাঙালীর ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও:
‘এই পবিত্র বাংলাদেশ
বাঙালীর আমাদের
দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’
তাড়াব আমরা করি না ভয়
যত পরদেশী দস্যু ডাকাত
‘রামা’দের ‘গামা’দের।’
বাঙলা বাঙলীর হোক! বাঙলার জয় হোক। বাঙালীর জয় হোক!
নজরুলের এই হঠাৎ সম্পূর্ণ বাঙালী হওয়ার রাজনৈতিক কারণ আছে কি?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাংলাকে শোষণ করেই অনেক দিন ভারতবর্ষ পুষ্ট হ’য়েছিল। বাংলাকে শুধু ইংরেজ শোষণ করে নি- মোঘল-পাঠানরা, বিশেষ করে মোঘলরা, শোষণ করেছিল। ইংরেজ আমলে সে শোষণ শুধু ইংরেজরা করে নি, করেছিল সেদিনের- ভারতের অন্যান্য প্রদেশের আধিবাসী। যে জন্যে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বিংশ শতকের প্রারম্ভিক শতকে লিখে ছিলেন, ‘বিহার-বিহারীদের, উড়িষ্যা উড়িয়াদের, আসাম আসামীদের, পাঞ্জাব পাঞ্জাবীদের কিন্তু বাংলা সকলের। বাঙলী বড় পরমার্থিক জাতি।’ এই বক্তব্যটা আরও বৃহত্তর পরিসরকে কেন্দ্র করে নজরুল তাঁর ‘কুহেলীকা’ উপন্যাসে প্রমত্তের মুখ দিয়ে বলেছিলেন। বিপ্লবী প্রমত্তের অহিংসবাদী গান্ধীর সমালোচনার জবাবে একজন টলস্টয় ভক্ত যখন ‘মার খেয়ে মারকে জয় করবো’ বলে তখন প্রমত্ত বলে-
‘তা হ’লে আমরা বহুদিন হ’ল জয়ী হ’য়ে গেছি। কারণ, আমরা নির্বিকার চিত্তে এত শতাব্দী ধ’রে এত মার খেয়েছি যে যারা মেরেছে তারাই শেষে দিক পিক মেরে গেছে। আমাদের আর্য মেরেছে, অনার্য মেরেছে, শক মেরেছে, হুন মেরেছে, আরবী ঘোড়া মেরেছে চাট, কাবলী-ওয়ালা মেরেছে গুঁতো, ইরানী মেরেছে ছুরি, তুরাণী হেনেছে তলওয়ার, মোগল-পাঠান জাত, পর্তুগীজ, ওলান্দাজ, দিনেমার-ফরাসী ভাতে মারতে এসে মেরেছে হাতে, আর সকলের শেষে মোক্ষম মার মেরেছে ইংরেজ।’
আঙ্কিক নিয়মে তাহলে ঐ মার খাওয়ার অংশীদার বাংলা ওরফে বাংলাদেশ। কারণ ইংরেজ সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করতে প্রথম যুদ্ধ শুরু করে বাংলার পলাশীতে, সে যুদ্ধ ১৮৫৭ তে বাহাদুর শাহকে পরাজিত করে শেষ করে। মনে রাখতে হবে ভারতের ইতিহাস শুধু ভারতের নয় বাংলারও ইতিহাস। সে-জন্যেই ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধ বাংলারও তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ।
কিন্তু আজকের আমাদের এই প্রবন্ধ যে বিষয়কে কেন্দ্র করে লিখিত সে বাংলাদেশের সঙ্গে উপরে পর্যালোচিত বিষয়ের সঙ্গে কি সম্পর্ক আছে? ঐতিহাসিক ধারাক্রমে ঐ বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ব্যতিক্রমধর্মী হ’য়েও সমচারিত্রিক। সেখানে ভারত তথা উপমহাদেশের তথা বিশ্ব মানবমুক্তির নজরুলী যুদ্ধ-চিন্তা অনায়াসে আরোপ করা যায়। ইংরেজ বিতাড়ণে নজরুলের যে ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সে চিন্তাদর্শন এবং চিন্তাদর্শনকে কাজে লাগানো হ’য়েছে, নজরুলের কারার ঐ লৌহ কপাট, শিকল পরার গান, বন্দী বন্দনা, তূর্য-নিনাদ, বোধন, যুগান্তরের গান প্রভৃতি গান ও কবিতাকে।
আজ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। কিন্তু ১৯২৯-এ নজরুলকে বাংলার জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সেদিন সংবর্ধনা সভায় সভার সভাপতি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন-
‘আজ বাঙলার কবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করবার জন্য আমরা এখানে সমবেত হ’য়েছি। রবীন্দ্রনাথের যাদুকরী প্রতিভাকে বাংলাদেশ সম্মোহিত হ’য়ে আছে। তাই অন্যের প্রতিভা তেমন করে ধরা পড়ছে না। … … … রবীন্দ্রনাথের আওতায় নজরুলের প্রতিভা পরিপুষ্ট হয় নি। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কবি বলে স্বীকার করেছেন। আজ আমি এই ভেবে বিপুল আনন্দ অনুভব করছি যে, নজরুল ইসলাম শুধু মুসলমানের কবি নন, তিনি বাঙলার কবি বাঙলীর কবি। কবি মধুসূদন খ্রিস্টান ছিলেন। কিন্তু বাঙালী জাতি তাঁকে শুধু বাঙালী রূপেই পেয়েছিল। আজ নজরুল ইসলামকেও জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। কবিরা সাধারণত: কোমল ও ভীরু কিন্তু নজরুল তা নন। কারাগারের শৃঙ্খল পরে বুকের রক্ত দিয়ে তিনি যা লিখেছেন, তা বাঙালীর প্রাণে এক নতুন স্পন্দন জাগিয়ে তুলেছে।’
বলা প্রাসঙ্গিক যে কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে সেদিন ঐ সভায় যে অভিনন্দনপত্র পাঠ করা হয় তাতে শুধু এ-কথা বলা হয়নি- ‘বাঙালীকে চির-ঋণী করিয়াছ তুমি’ বলা হ’য়েছিল, ‘তুমি বাঙালীকে চির-ঋণী করিয়াছ, তুমি বাঙালীর ক্ষীণকন্ঠে তেজ দিয়াছ, মূর্ছাতুর প্রাণে অমৃত ধারা সিঞ্চন করিয়াছ,’ বাংলার মধুবনের শ্যাম-কোয়েলার কন্ঠে ইরানের গুলবাগিচার বুলবুলের বুলি দিয়াছ’, বাঙালীর শ্যামশান্ত কন্ঠে ইরানী-সাকীর গান শিরাজীর আবেগ বিহ্বলতা দান করিয়াছ।’
বলা বাহুল্য সভাশেষ হওয়ার আগে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আরও বলেছিলেন-
‘আমরা আগামী সংগ্রামে কবি নজরুল সংগীত কন্ঠে নিয়ে শ্রীমান সুভাসচন্দ্রের মতো তরুণ নেতাদের অনুসরণ করব। ফরাসী বিপ্লবের সময়কার কথা একখানি বই-এ সেদিন পড়েছিলাম। তাতে লেখা দেখলাম; সে সময় প্রত্যেক মানুষ অতি মানুষে পরিণত হ’য়েছিল। আমার বিশ্বাস নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধরেরা এক একটি অতি মানুষে পরিণত হবে।’
আর নেতাজী সুভাসচন্দ্র বলেছিলেন-
‘নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’ কবি বলা হয় এটা সত্য কথা। তার অন্তরটা যে বিদ্রোহী তা স্পষ্টই বোঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধে যাব- তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব- তখনও তাঁর গান গাইবো। … … … কবি নজরুল যে স্বপ্ন দেখেছেন, সেটা শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন নয়, বাঙালী জাতির স্বপ্ন।’
বাঙালী জাতির সেই স্বপ্ন বর্তমান বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গান তাই নজরুলের অমর যুদ্ধসংগীত। এ-কারণেই আজকের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগীতের নজরুলের বিশ্বমুক্তি যুদ্ধের গানের মধ্যে কোন গড়মিল নেই। সূর্যের বিচ্ছিন্ন অগ্নিকুন্ড থেকে যেমন পৃথিবীর জন্ম তেমনি নজরুলের স্বাধীনতার স্পৃহা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্খার জন্ম।