আমরা বাংলাদেশ নামের এ ভূখন্ডের অধিবাসীরা বর্তমানে এক চরম সঙ্কটকাল অতিক্রম করছি।এ সঙ্কট নিরসনের জন্য আমাদেরকে ইতিহাসের আলোকে শিকড় সন্ধানের এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাঠ নেয়া প্রয়োজন। স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বয়স মাএ চার দশক।ঐক্যবদ্ধ জনসমাজ হিসেবে বাংলাদেশের বয়স কিন্তু চার হাজার বছরেরও বেশী।সমুদ্র সৈকতে বালুকারাজ্বির মধ্যে তিল থিল করে যেমন সঞ্চিত হয় মহামূল্যবান রত্নভান্ডার, সমুদ্রের বেলাভূমিতে,সমুদ্রের আকর্ষনে,অসংখ্য স্রোতস্বীনি বাহিত পলি হাজার হাজার বছর সঞ্চিত হয়ে তেমনি সৃষ্টি করে উন্নত উপযোগী স্বর্ণদ্বীপ। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি,স্বর্ণালি দ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম এভাবেই হয়েছে।সৃষ্টির এই প্রক্রিয়া কখন যে শুরু হয় তা কেউ জানিনা বটে, ইতিহাসবিদদের ধারনায় কিন্তু এই জনপদে মানুষের বসবাস শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালেরও বহু আগে।

ইতিহাস সাক্ষী, দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্ত সীমায় অবস্থিত এ জনপদের রাজনৈতিক ভাগ্য সবসময়ছিল উওর-পশ্চিম ভরতে প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে। কিন্তু এজনপদ দীর্ঘদিন কোন সা¤্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকেনি।খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষদিকে কিংবদন্তীর সেই গঙ্গারিডাই সা¤্রজ্যের আমল থেকে শুরু করে,মৌর্য রাজাদের রাজত্ব পার হয়ে , দিল্লীর সালতানাত ও মোঘল সা¤্রাজ্যের অবসানের পর ব্রিটিশ-ভারত পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিবৃও একই রকম,অনেকটা সরলরৈখিক। শুধু তাই নয় ,বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুন্ডু ইত্যাদী গোএগোষ্ঠীর আবাসভূমিরুপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদের এই খন্ড ছিন্ন রাজনৈতিক একক হিসেবে সর্বপ্রথম ইতিহাসের আলোকে এলেও,সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে , পর্যায়ক্রমে তা বঙ্গ, বাঙ্গালা, বাংলাদেশরুপে আবির্ভূত হয়েছে সগৌরবে। ছোট ছোট লোকালয় সর্বপ্রথম পরিচিত হয় সদাসিক্ত বৃষ্টিধৌত বন্স অথবা বং রুপে। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৭) এসব জনপদকে ঐক্যবদ্ধ করে সর্বপ্রথম বাঙ্গালা রুপে অভিহিত করেন।তিনি নিজেও শাহ-ই-বঙ্গালা উপাধি ধারন করেন।পরবর্তি সময়ে বাঙ্গালা হয়ে ওঠে বাংলা।ব্রিটিশ ভারতে বাংলা ও বঙ্গ রুপান্তরিত হয় বেঙ্গলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের কালে তা হয় বাংলাদেশ।

বঙ্গোপসাগরের উপকন্ঠে, একদিকে দক্ষিন এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব-এশিয়ার প্রান্তসীমায় অবস্থিত বাংলাদেশে বসবাস করেছেন কয়েক হাজার বছর ধরে বহু নৃতাত্বিক গোষ্ঠীর জনসমষ্টি।সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অন্তত ৫৭ টি নৃতাত্বিকগোষ্ঠীর মানুষ এ দেশে এখন বসবাস করছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন কিছু আদিবাসী। অন্যরা এই উর্বর জনপদে এসেছেন বিভিন্ন কারণে। কেউ এসেছেন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য, কেউবা এসেছেন সেখানকার শাসকদের অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে আত্বরক্ষার তাগিদে। বিজয়ের বেশে এসেও কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বসবাস করে হয়ে গেছেন স্থানীয়। এসেছেন উওর দিক থেকে , উওর-পশ্চিম ও পশ্চিম থেকে। আবার কেউ কেউ এসেছেন দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব দিক থেকে।হাজার হাজার বছরের ব্যাপনকালে আদিবাসী ও বাইরে থেকে আগত জনসমষ্টি মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠির ভাষা, প্রথা, জীবনাচারের হাজারো প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও উপাদানের মিথস্ক্রিয়ায় এ অঞ্চলে জন্ম লাব করে এক নতুন সংস্কৃতি।

এ সংস্কৃতি ছিল বৈরি প্রকৃতির দাপট সহ্য করে সবাই মিলে টিকে থাকার, ঝড়-ঝঞ্ঝা-বন্যা-জলোচ্ছাসের উদ্যত ফণা জাপটে ধরে আত্মরক্ষার এবং পূর্ব পশ্চিম ওউওর থেকে আসা দখলদারদের প্রতিহত করে নিজেদের স্বাতন্ত্র সংরক্ষণ করার। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, যে অঞ্চল আজ স্বাধীন বাংলাদেশ রুপে চিহিৃত , তারঅবয়ব খ্রিষ্টের জন্মের পরবর্তী শতাব্দীতেও সম্পূর্ণ হয়নি। প্রথম শতাব্দীতে খুলনার বি¯তীর্ণ অঞ্চল এবং ফরিদপুরের কোটালিপাড়া ও তৎসংলগ্ন এলাকা সবেমাএ মাথা উঁচু করে জনবসতির উপযোগী হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানি তার পরের ২০০ বছর পর্যন্ত যশোর-কুষ্টিয়ার বৃহৎ এলাকা তো বটেই, এমনকি রাজধানী ঢাকার আশপাশ পর্যন্ত বিধৌত করেছে। উর্বর ও শ্যামল এই নতুন মাটি অল্পায়াসে যেমন কৃষকদের গোলা ভরিয়েছে সোনালী ফসলে , তেমনি রোগব্যাধি-মহামারি কেড়ে নিয়েছে হাজারো প্রাণ অকস্মাৎ, অনেকটা বিনা নোটিশে।

তাই এই ভূখন্ডে বসবাসকারীদের মন যেমন কোমল ,উদার, সবাইকে আপন করার মত আবেগঘন, তেমনি বৈরি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য দূর্জয় সাহসে ভরা। একদিকে প্রকৃতির দুন্ডমনীয় তান্ডবলীলা মানুষকে করেছে ভাববাদী, অন্যদিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং চারপাশে সবুজের ঘন আন্তরণে ঢাকা দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ সবাইকে করে তোলে স্বভাবকবি। তাই এই জনপদের জনগনের কাছে প্রবাদ-প্রবচন যে প্রাত্যাহিক চলন-বলনের মতোই, তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রাণপন করে নিজেদের স্বাতন্ত্র সংরক্ষনে দৃঢ়সংকল্প এ দেশের জনগণকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়েছে বলে একদিকে তারা নির্ভীক, অন্যদিকে ছলে-বলে-কৌশলে লক্ষ অর্জনের ক্ষেএেও ভীষন দক্ষ। দক্ষ তারা কথার পাশে কথা সাজিয়ে গান রচনায়। দক্ষ গ্রামীণ জীবনের অনেক সত্যকে সুরেলা কন্ঠে মন মাতানো ঢঙ্গে উপস্থাপনে। প্রবাদ-প্রবচনে তাই প্রতিফলিত হয়েছে জীবনের বিচিএ অভিজ্ঞতা এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের নিকট হস্তান্তরযোগ্য মূল্যবান অভিজ্ঞান।

অনেক সময় বলেছি, বাংলাদেশকে ভালোভাবে জানতে হলে গ্রামে যেতে হবে, কেননা গ্রামেই বাংলাদেশের হৃদয় স্পন্দিত। এখন বলতে চাই,গ্রামীণ জীবনের ঝদ্ধি ও সৌকর্স সম্পর্কে অবহিত হতে হলে দৃুষ্ট ফেরাতে হবে আমাদের সনাতন প্রবাদ-প্রবচনের দিকে। কোন কোন ক্ষেত্রে এদের অবয়বে কারুকার্য নেই বটে, কিন্তু সমাজজীবনের বৈচিত্র ভরা দিকনির্দেশনা এবং নিখাদ অভিজ্ঞতার পসরায় আমাদের প্রবাদ-প্রবচন ভীষনভাবে সমৃদ্ধ। এসবের মধ্যেই মিলবে সমাজ হিসেবে বাংলাদেশের এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশের শিকড়ের সন্ধান। বাংলাদেশের প্রবাদ-প্রবচন কয়েকটি কারণে এ সমাজের জ্ঞান-অভিজ্ঞান, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক অবস্থা, জনগনের পারস্পারিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রবাদ-প্রবচন আমাদের সমাজের প্রাচীনত্বের নিদর্শন। এসব প্রবাদ-প্রবচন লোকজ্ঞানের গভীরতার পরিচায়ক। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবণ যে ভয়ঙ্কর জীবন্ত এসব প্রবাদ-প্রবচন তার স্মারকতুল্য। এই সম্পদকে জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করতে পারলে এবং এর সঠিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হলে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে যাব বেশ কয়েক শ’ যোজন।