“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি” কী রূপ, কেমন রূপ কবি জীবনানন্দ দাশ দেখেছিলেন এই বিস্ময়ে প্রথম বয়সের কয়েকটা বছর কেটে গেছে নানা পথে-প্রান্তে, বনে-জঙ্গলে, নদীতে-সমুদ্রে, রাত্রিতে-জ্যোৎস্নায়, কুয়াশায়-গাঢ়-অন্ধকারে। নানা বোধের অবিমিশ্র গুঞ্জন উঠেছে আর স্বপ্ন থেকে স্বপ্নান্তরে বেজে গেছে সময়। স্থির হয়েছে দৃষ্টি। দৃষ্টির পশ্চাতে দৃশ্য। আর দৃশ্যের ভিতর এক-একটি মহিমার গান শুনেছি। অনুভূতিলোকের চিরন্তন এই সৌন্দর্য, এই অমোঘ রূপ আমাকে বার বার ডেকে নেয়। সে ডাক অন্তরের অন্তরে পৌঁছে যায়। ঘুমোতে পারি না। চারিদিকে মোহময় চাঁদ ভেঙে পড়ে। ছায়া হয় শরীর। ছায়ায় জীবনের হিম পড়ে আছে। জীবনের জট খুলে খুলে সমস্ত কল্পজগৎ ঘ্রাণ নেয় । ইতিহাস হয় জীবন্ত। মঙ্গলকাব্যের বাংলা-মাটি-মা সব ফিরে আসে। দেখা হয় সুচিক্কণ ভোর। ভালবাসা এমনই এক ছবি। এমনই মায়াময়। এমনই বিষণ্ণ ভূমি।
এমনই উদ্দীপ্ত চরাচর। রূপ নেই। রূপের অন্তরালে ধুলোপথ। ক্লান্ত পা। শিশির । হলুদপাতা। ঝরে যাওয়া বসন্ত। মুগ্ধতা মানে এই সবকিছু। আশা; আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জীবন। এই খেলা। একটা নদী। দুইপারে মৃত্যু আর মৃত্যুর পরের জীবন। অজস্র ঢেউ বনানী এবং বনাঞ্চল। লক্ষ্মীপেঁচা। কাঁঠাল গাছ। জাম-বট-হিজল অশ্বথ… কতকী। মৃত্যু শুয়ে আছে। মৃত্যুর পাশে ঘুমন্ত কবি এইসব দেখে যাচ্ছেন। চেনা আকাশের নরম স্নিগ্ধতা। নক্ষত্র-রাত। ঘাসের নিচে শয্যা কবিকে বিহ্বল করে।…এই মাঠ ঘাটের ভিতর কবি থাকবেন না একদিন।
একদিন ঝরে যাবে
বেতের ফলের মতন…
কবি জীবনানন্দের শেষ পর্যায় আত্মমগ্ন যাত্রা। প্রকৃতিতে নিবিড়ভাবে নিজেকে ছড়ানো। এখানে কবি আরও শব্দ সচেতন। কবিতার বিষয় নেই —আছে জীবনের রং। এই রং মৃত্যুশীল উজাগর চাঁদ। আপাত প্রাত্যহিক জীবনের নানান হালচাল আর ব্যস্ততায় কবি আপন সত্তার গোপন নিলয়ে দুর্ভেদ্য জগতের সন্ধান করেছেন। যা তাঁকে নিরবচ্ছিন্নকাল বাংলার সচেতন প্রবাহে নিষিক্ত করবে। হৃদয় হয়ে উঠেছে এক মরমি স্বপ্নাতুর। তবু বেদনার।
তাপ পড়েছে তাতে। ছাত্রজীবনের নিষ্পাপ দিনগুলি মৃত্যুর কথা ভাবতে পারত না। শুধু অপূর্ব সৌন্দর্যটুকু হৃদয়ে ব্যঞ্জিত হত। এক একটি কবিতা মনে হত এক একটি দর্পণ। তখন মৃত্যুর কালো দাগ, শীতের নিষ্ঠুর আগমন এ-ভাবে আক্রান্ত করতে পারত না। যতই সমুদ্রের টানে তৃষ্ণার্ত হৃদয় ঝলসে উঠেছে, যতই জীবনের তল খুঁড়তে শুরু করেছি —ততই আর এক জগৎ, আর এক জীবনানন্দ আবিষ্কৃত হয়েছে। বোধের সীমায় আজ যে “মৃত্যু” শব্দটি এসে বুকে বেধে… আসলে “মৃত্যু”মানে মৃত্যু নয়। শেষ নয়। তার পারে আর এক জীবন। আর এক বিস্তৃত, অচৈতন্য জগতের সন্ধান দেয়। তাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অন্তরে বাজে… বাজতে থাকে তার আশ্চর্য রাগ-রাগিনী।অবক্ষয়ী মূল্যবোধের বাহ্যিক জগৎ হতে সম্পূর্ণ ক্রমমুক্তি —আত্মসমাহিত আত্মদর্শনের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হন কবি। চলে যাওয়া নয়, পরাজয় নয়, পলায়ন নয় —শুধু থেকে যাওয়া। “থেকে যাওয়া” মানে :
১. তোমরা যেখানে সাধ চ’লে যাও —আমি এই বাংলার পরে রয়ে যাব;
২. একদিন ধানসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে র’ব ;
৩. জীবন অথবা মৃত্যু চোখে রবে —আর এই বাংলার ঘাস রবে বুকে ;
৪. ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে —

এই “থেকে যাওয়া” মানে প্রেম। “প্রেম” শব্দটি গভীরতর কোনো বাস্তবের প্রবৃত্তিরেখায় সীমায়িত নয়। কারণ এর মধ্যে কোনো লোভ লালসা হিংস্রতা লুকিয়ে নেই। আছে জীবনচর্চার প্রয়াস। আত্মরতির প্রবল অনুরাগ রঞ্জিত উচ্চারণ, আর গোপন প্রার্থনার অবলীলায় মরণোত্তর গান :

“আমি শেষ হব শুধু, ওগো প্রেম, তুমি শেষ হ’লে!
তুমি যদি বেঁচে থাক, জেগে র’ব আমি এই পৃথিবীর ‘পর
যদিও বুকের পরে রবে মৃত্যু, মৃত্যুর কবর!”

প্রিয়ার মতো, বন্ধুর মতো রবীন্দ্রনাথও মৃত্যুকে ডেকে ছিলেন। জীবনানন্দের মৃত্যুও প্রাণের দোসর হ’য়ে উঠেছে। এক বেদনার ফল্গু স্রোত আর তারই অভিব্যক্তি রূপসি বাংলা। তাই সমগ্র রূপসি বাংলা মৃত্যু চেতনার কাব্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি কবি মৃত্যুকে ডিঙিয়ে যেতে পেরেছেন? এ প্রশ্ন আজও আমাদের ধাক্কা দেয়। রূপসি বাংলার ভূমিকাতে অশোকানন্দ দাশ লিখেছেন :
“কবির কাছে এঁরা প্রত্যেকে আলাদা-আলাদা। স্বতন্ত্র সত্তার মতো নয় কেউ। অপরপক্ষে সার্বিক বোধে এক শরীরী ; গ্রাম বাংলার আলুলায়িত প্রতিবেশ প্রসূতির মতো ব্যক্তিগত হয়েও পরিপূরকের মতো পরস্পর নির্ভর।” এই কথাগুলির মধ্যে দিয়েই আমরা সমস্ত কবিতাগুলিতে একটা ভাবের সামঞ্জস্য খুঁজে পাই। নিভৃত মনের একান্ত আলাপন এগুলি। ঘাস ফড়িং শালিক চিল প্রভৃতি শব্দগুলিতে আমাদের চেনা জগৎকে কাছে আনে, তেমনি ভিতরের দিক দিয়ে একটা প্রতীকী সেতু হয়ে ওঠে। যার দ্বারা কবি হৃদয়ের আকুলতা, ভালবাসা আর অন্তহীন বেদনার পরিভাষায় এগুলির নিহিতমর্ম উপলব্ধ হয় । যে ৠতুগুলি বার বার প্রকৃতির কোল ভরে দেয় —রিক্ত করে ; যে কুয়াশায় কবি হারিয়ে যান ; যে কুয়াশায় জীবনের ছবি মুছে যায় —সেই ৠতু এবং কুয়াশার ছবি দর্পণে ফুটে ওঠে। মগ্নতার বিমূঢ় জিজ্ঞাসায় কাতরধ্বনির মতো অব্যক্ত সুর বাজে :
“তবুও আঁধার ঢের মৃত কুকুরের মুখ —মৃত—বিড়ালের ছাপ ভাসে ;
কোথায় গিয়েছে তারা? অই দূর আকাশের নীল লাল তারার ভিতরে
অথবা মাটির বুকে মাটি হ’য়ে আছে শুধু —ঘাস হ’য়ে আছে শুধু ঘাসে!
শুধালাম… উত্তর দিল না কেউ উদাসীন অসীম আকাশে।”

আমাদের চর্মচক্ষু আর মানসচক্ষু এক হয়ে আসে এখানে। শেষ পর্যন্ত মানস-চক্ষের মধ্যেই এর ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি। একদিন সেইসব কুকুর বিড়ালেরা ছিল, আজ নেই। আমরা সচরাচর কতই না কুকুর বিড়াল দেখি —কবি সেগুলির কথাই কি বলেননি? যে মানুষটি জীবনের অবিরাম ভার বহন করতে পারেননি ; যে মানুষটিকে নারীর হৃদয় —প্রেম —শিশু —গৃহ কোনোকিছুই ধরে রাখতে পারল না —সেই মানুষটিই কি আমাদের চোখের সামনে ঘোরে না? সেই তো একদিন লাশকাটা ঘরে পৌঁছে গেল। আর সেইসব বিড়াল কুকুরেরা ছায়াময় হয়ে ঘোরে আজ। মনে পড়ে “ঘোড়া” কবিতায়ও কবি নিজের অচরিতার্থ জীবনচারী কামনাকে পরিস্ফুট করেছেন। যা অবচেতনে ঘোড়ায় রূপান্তরিত হয়ে কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে ঘাস খায়।
বনলতা সেনকে বাস্তবের ভূমিতে স্থাপন করতে চান। কেন না তার মধ্যেই জীবনের লেনদেন চলে। সমস্ত আলোচনার মধ্যে দেখা গেল, কবি মৃত্যুকে ডিঙিয়ে যেতে পারেননি। মৃত্যু আমাদের জীবনে অনিবার্য পরিণতি । বন্ধুর মতন, প্রিয়ার মতন সে আসুক ; তবু এক অজানার আশঙ্কা কবিকে বিহ্বল করে। কবি ক্লান্ত হন। শেষে তাই এই শেষ সমর্পণ:
“আমারে কুড়ায়ে নেবে মেঠো ইঁদুরের মতো মরণের ঘরে।”
শেষ আকাঙ্ক্ষার বিন্দু বাংলায় বাংলার রূপে অপরূপ হয়ে আছে। যার আবেদন আমাদের বৌদ্ধিক জগতে, অনুভূতির আলোকে ভাসমান। এ যুগের সাহিত্যিক উজ্জ্বলকুমার মজুমদার জীবনানন্দ দাশের রূপসি বাংলা সম্পর্কে এক নিগূঢ়তর আলাপনের কথা লিখতে গিয়ে বলেছেন : “The mellifluous Sonnets of Rupasi Bangla in which an eminent Poet notices in pure emotions, diluted Poesy and artistic flaccidity.” যখন তুলনা করা হয় “আট বছর আগের একদিন” have Mythical forms of physical beauty fading fast into death.” —এইভাবে মৃত্যুচেতনার পদসঞ্চার ঘটেছে। এখন প্রশ্ন হল, রূপসি বাংলার রূপ কই? এই মৃত্যু প্রচ্ছায়াকেই কবি লালন করেছিলেন? হয়তো তা-ই। এ প্রশ্নের উত্তর সহজে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর আগে মানুষ তার প্রিয়জন, সন্তান-সন্ততি, ঘর-দুয়ার একবার ভালো করে দেখে যেতে চায়। মায়ার বাঁধন সহজে ছিন্ন হয় না। লৌকিকতার বশেই সে সবাইকে চোখের সামনে রাখতে চায়। যে মায়ার বাঁধন দিয়ে চারিদিক ঘেরা —তারই প্রতিটি মুহূর্ত সে আঁকড়ে ধরে থাকে। কবি জীবনানন্দ দাশও জীবনের শেষ পর্যায়ে মৃত্যুকে বুঝেছেন আর এই জন্যই বেশি করে ভালবাসতে চান। তাঁর ভালবাসা শুধু সংসার ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়; এই বাংলার বিশাল হৃদয়ে তিনি সংসার পেতেছিলেন। তার প্রতিটি জীবজন্তু, গাছপালা, জল-বাতাস, পাথর-চাঁদ, আকাশ-সূর্য তাঁর সংসারের উপাদান। এসব ছেড়ে কবি কোথাও যেতে চান না। আর যদিও কবির মৃত্যু হয় হোক, তবু তিনি এখানে যেন শুয়ে থাকেন। গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ তাঁর চোখে মুখে বুকে লেগে থাকবে।
অন্তরের তাগিদ আর ভারাক্রান্ত ব্যথায় তাঁর আবেগ স্তিমিত হয়ে এসেছে। বাহুল্যবর্জিত কোলাহল-বর্জিত আকণ্ঠ প্রাণলগ্ন উচ্চারণ —নিজেকে কবি নিঃশেষে শব্দবন্ধে সমাধিস্থ করে কালস্রোতে গেঁথে ফেলেছেন। প্রকৃতির কোলে এই আশ্চর্য সেতুটি রচনার মধ্যেদিয়ে কবির জীবনদেবতা মুক্তির সুর খুঁজে পেয়েছে। সেখানে ভালবাসা আছে। বাংলার ছন্দে নিজেকে মেলানোর আকুল প্রার্থনা আছে। মৃত্যুর পরে যেভাবে কবি বাংলার রূপ দেখবেন, মৃত্যুর আগে কবি যেভাবে বাংলাকে ভালবেসেছেন তারই খসড়া এই কবিতাগুলি। সান্ত্বনা আর সহানুভূতির আদ্রতায় ভাস্বর হয়ে ওঠে চিত্রকল্পগুলি। জন কীটস যেমন ওড্ টু এ নাইটিঙ্গেল কবিতায় বলেছেন :
“Darkling I listen; and, for many a time
I have been half in love with easeful Death,
Call’d him soft names in many a mused rhyme,
To take into the air my quiet breath;”
এখানে কবি মৃত্যুর সঙ্গে অর্ধেক প্রেমে পড়ে ছন্দোবদ্ধ কত মধুর নামে তাকে ডেকেছেন। কবি জীবনানন্দ দাশও মৃত্যুর কাছে ধরা দিয়েছেন। কবির মাথার মধ্যে যে বোধ কাজ করে তাকে কখনো এড়াতে পারেননি। মৃত্যুকে বুকে নিয়েই তিনি বলেছেন :
“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি”