‘ব্রিটিশের প্রচারণার বদৌলতে কিনা জানিনে, বাঙালির হিন্দুরা যখন ইংরেজি শিক্ষার আলো পেয়ে মৃত মুসলিমের মরা-হাতি তুর্কি মুঘলের নিন্দাবাদে মুখর ও বিদ্ধেষ বিষ ছড়িয়ে কৃর্তাথমন্য, তুর্কি মুঘলের জ্ঞাতিত্ব গৌরব গর্বী স্বল্পশিক্ষিত মুসলিম লিখিয়েরা তখন হীনমান্যতার লজ্জা গোপন করবার অপচেষ্টায় ভারতের সীমা অতিক্রম করে মরুভূ-আরব, ইরান ও মধ্য এশিয়ার গলি গুঁজিতে অতীত কৃতি ও কীর্তি সন্ধান সুখে আত্মগ্লানি মোচনে নিষ্ঠ। হিন্দুরাও তখন আত্মমহিমার সন্ধানে প্রাচীন আর্যবর্তে, উত্তর ভারতে, রাজপুতনার মরুতে এবং মারাটা অঞ্চলে মানস পরিক্রমায় নিরত। তখন কেউ সুস্থ ছিল না। যে মাটির লালনে তারা মানুষ, সে মাটির দিকে, তার মানুষ ও প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি দেবার প্রয়োজন চেতনা যেন ছিল না কারো।’ এ কথাগুলো বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আহমদ শরীফের। অর্থাৎ সময়টি এমন ছিল যে এ দুই সম্প্রদায় যেন নিজের অস্তিত্বকে, ইতিহাসকে দূর প্রাচ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। বিশেষকরে বাংলার মুসলমানদের ধারণা ছিলো তারা এ বাংলার মানুষ নয়। তাদের আদি নিবাস ঐ আরব দেশে। তাই এই বাংলার কোন কিছুই তাদের নয়। তারা ভাবতো এই বাংলা ভাষাও তাদের ভাষা নয়। এটা হিন্দুদের ভাষা। আর ইংরেজদের সাথে তাদের বনিবনা হচ্ছিল না। ফলে মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষায়ও পিছিয়ে ছিল খ্রিষ্টানের ভাষা বলে। ফলে বাঙালি সমাজের অর্ধেক অংশে শিক্ষার আলো পৌছালেও বাকী অর্ধেক অংশ পড়ে যায় পিছনে। এমনি এক ঘোর লাগা সময়ে জন্ম আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ।

১৮৭১ সালের ১১ই অক্টোবর চট্টগ্রামের পরিচিত জনপদ পটিয়া উপজেলার সুচক্রদন্ডী গ্রামের এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। পিতা মুনশী নুরউদ্দীন ও মাতা মিসরীজান। জন্মের পূর্বেই তাঁর পিতা মারা যান। আর সতের বছর বয়সে হারান মাকে। পরিবারের মধ্যে ছিল শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ। তাই তিনি সবার উৎসাহে সুচক্রদন্ডী মধ্য স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একমাত্র ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমান পটিয়া আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ১৮৯৩ সালে এন্ট্রান্স পাশ করেন। উল্লেখ্য যে,তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম পাশ করা মুসলমান। এ থেকে বুঝা যায়, তৎকালীন মুসলমান সমাজ শিক্ষার আলো থেকে কতটা দূরে ছিল।

সাহিত্যবিশারদের দাদার আগ্রহে, তাঁদের বাড়ির উঠানেই বসত পুথি পাঠের আসর। সুর করে পাঠ হতো পুথি। সুর করা পুথি পাঠ শুনতে শুনতেই তিনি পুথির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। পড়ে যান তার প্রেমে। সেই প্রেম তাঁর আমৃত্যু বর্তমান ছিল। সেই প্রেম বাংলার মুসলমানদের পথ দেখাল, মান বাঁচাল।

পুথির নেশা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসল যে তিনি আর সব ভুলে এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। বাংলার হিন্দুরা যখন রেঁনাসার সময় পার করছিল, তখন মুসলমানদের মধ্যে হীনমান্যতা দেখা যায়। সেই হীনমান্যতা ছুয়ে যায় সাহিত্যবিশারদকেও। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন মুসলমানরা এতিম নয়। তারা এদেশের বুকেই জন্ম নিয়েছে। এদেশই তাদের ভাষা, সাহিত্য- সংস্কৃতি জুগিয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকে তিনি শুরু করেন খোঁজ। রাত দিন তিনি খুঁজতে থাকেন মানুষের বাড়ি বাড়ি পুথি। তিনি হিন্দু মুসলিম সবার বাড়িতে খুঁজতে থাকেন পুথি। আর বের করে আনতে থাকেন আমাদের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস।

তাঁর পুথি সংগ্রহের ইতিহাস বড়ই বেদনাদায়ক ইতিহাস। সে কথা আজ কারো অজানা নয়। এই পুথি সংগ্রহের কারণে তাঁকে কত অপমাণ সইতে হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পুথি সংগ্রহের বিজ্ঞাপন পত্রিকায় প্রকাশ করার কারণে তাঁর চাকরিচ্যুত হয়েছে সেটাও আজ কারো অজানা নয়। তবুও তিনি সব অপমাণ, অভাবকে জয় করে সংগ্রহ করে গেছেন পুথি। কারণ পুথিকেই তিনি সাত রাজার ধন মনে করতেন। এই পুথিই দামি রত্নের মতো তাঁর বাড়িতে সংগৃহিত ছিল। এই পুথির পাতায় পাতায় ছড়ানো হাজার বছরের ইতিহাস তিনি দিন রাত জেগে উদ্ধার করেছেন। এই পুথি তাঁর কাছে কঙ্খালের মত। এদের মাঝে তিনি ইতিহাসের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের প্রবাহধ্বনি শুনতে পেতেন।

তাছাড়া তিনি পুথি সংগ্রহ করেছেন হিন্দু মুসলিম অভেদে। তাঁর মাঝে সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল না। আর তাই হয়তো বা আজ আমরা বাংলা সাহিত্যের সঠিক ইতিহাস পড়তে পারছি। তাঁর পূর্বে কেউ এমনভাবে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার পুথি সংগ্রহ করেছে বলে জানা যায়নি। মুসলমানদেরও যে কোন সাহিত্যকর্ম থাকতে পারে তাঁরা হয়ত তা ভাবতেই পারেনি। সাহিত্যবিশারদ এসে চোখে আঙ্গুল দিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিলেন কী এক অমূল্য রত্ন সবার অগোচরে রয়ে গেছে। তৎকালীন সময়ে যাঁরা পুথি সংগ্রহ করত, তাঁরা কোন না কোন প্রতিষ্ঠানে সহায়তা নিয়ে একাজ করতেন। অর্থাৎ তাঁদের পেছনা আর্থিক সহায়তা করার কোন প্রতিষ্ঠান ছিল। যা সাহিত্যবিশারদের ক্ষেত্রে ছিল না। তিনি স্বউদ্যোগে, নিজের খরচে পুথি সংগ্রত করে গেছেন। তাঁর মত এমন পুথি পাগল আর দ্বিতীয়টি আছে বলে জানা নেই।

আনোয়ারা স্কুলের শিক্ষক থাকাকালে সাহিত্যবিশারদের দিন কাটত খুজাঁখুজির মধ্যে। একদিন তিনি এক চাষীর ঘরে একটি পুথি আবিষ্কার করেন। এ পুথি পেয়ে তিনি যেন সাত রাজার ধন পেয়ে গেলেন। ড. এনামুল হকের ভাষ্যমতে, ‘আহার নেই, নিদ্রা নেই, পুথিটির পাঠোদ্ধারের চেষ্টা অবিরাম গতিতেই চললো, এক সপ্তাহের অদম্য চেষ্টায় জানা গেল, পুথিটি কবি আলাওলের ‘পদ্মাবতী’র।’ এ পুথি যেন তাঁর সবকিছু পাল্টে দিল। পাল্টে দিল বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস। যে মুসলমান হীনমান্যতায় ভুগছিল, তাদের রক্ষার পথ যেন তিনি পেয়ে গেলেন। যে মুসলমান ভাবতো এই বাংলায় তারা পরবাসী, আজ সে মুসলমান গর্ব করে তাঁদের অতীত সাহিত্যকর্ম নিয়ে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে যখন হিন্দু সাহিত্য রচয়িতার জয়জয়কার। যখন মুসলমানদের কোন সাহিত্যকর্ম পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন সাহিত্যবিশারদ আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিলেন হিন্দুদের মতো বাংলার মুসলমানদের প্রাচীন সাহিত্য ইতিহাস সমৃদ্ধ। এমন কী কোন কোন ক্ষেত্রে তারা অন্যসবাইকে ছাড়িয়ে যাই।

ড. আহমদ শরীফ লেখেন, ‘তখন হিন্দু মুসলিম সবাই সবিস্ময়ে দেখল এবং বুঝল দু’দশ পরিবার ছাড়া বাঙালিরা দেশজ মুসলমান। তাদের মাতৃভাষা চিরকালই বাংলা, পাঁচশ বছর ধরে অর্থাৎ যখন থেকে বাংলায় লিখিত সাহিত্য সৃষ্টির শুরু, তখন থেকেই হিন্দুর মতো মুসলিমরাও তাদের মনের কথা, ভাবের কথা, রসের কথা বাংলায় রচনা করেছে ও পড়ে শুনে আস্বাদন করেছে। এই প্রথম একালের বাঙালি মুসলিম চোখ তুলে তাকাল নিজের দিকে ও নিজের সভ্য মানব কাম্য সবকিছুই রয়েছে তার।’ ড. এনামুল হক লিখেন, ‘আজ বাঙালি মুসলমান দেখতে পেয়েছে, জানতে পেয়েছে বাংলার প্রাচীন সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তারা এতীম নয়। তাদের সাহিত্যিক ঐতিহ্য আর কারো চাইতে হীন তো নয়ই বরং কোন কোন বিষয়ে শ্রেষ্ঠ।’

আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ আবিষ্কার সাহিত্যবিশারদের জীবনে যেমন এক যুগান্তকারী ঘটনা, তেমনি বাংলার সাহিত্য ইতিহাসের এক পটপরিবর্তনকারী বিষয়। তিনি এমন করে শুধুমাত্র মুসলমানদের সহস্রাধিক পুথি সংগ্রহ করেছেন। তাঁর এই সংগ্রহের উপরই আজ বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের সৌধ নির্মিত হয়েছে।

বাংলার মুসলমানরা যখন বাংলা ভাষাকে বর্জন করছিল তখন সাহিত্যবিশারদ বিভিন্ন সভা সম্মেলনে বাংলার মুসলমানদের বুঝাতে চেয়েছেন এই বাংলা ভাষা তাদের পূর্ব পুরুষের ভাষা। ১৯০৩ সালে নবনূরে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ‘বঙ্গভাষার মুসলমানী সাহিত্য’ তিনি লিখেন, ‘পৃথিবীর সভ্য ও অসভ্য সকল জাতিরই এক একটা নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্য আছে। দেশ প্রচলিত ভাষাই কোন জাতির মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষা হওয়া উচিত এবং স্বাভাবিক। কিন্তু বাঙালী মুসলমানদের সকলের মধ্যে কোন একটা নিদিষ্ট ভাষা ‘মাতৃভাষা’ স্থানাধিকার করিয়া নাই। বাঙালার ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিভিন্ন ভাষা মুসলমান সমাজে চলিয়া আসিতেছে। ইহার ফল এই দাঁড়াইয়াছে যে, বাঙালার অন্যতম অধিবাসী হিন্দুগুণের সহিত একতার কথা দূরে থাকুক, বাঙালী মুসলমানদের মধ্যেও একটা ভাষাগত একতা সংস্থাপিত হইতে পারিতেছে না।’ তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন মুসলমানদের জাগরণ সম্ভব একমাত্র তাদের মাতৃভাষা দ্বারাই, আর সেই মাতৃভাষা অবশ্যই বাংলা। তিনি বলেন যারা বাংলা ভাষায় মুসলমানদের কিছু নাই! নাই! বলেন, শুধু নাই নাই বললেই কী সব হয়ে যাবে? কিছু করার জন্য কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। একথা তিনি বার বার বাংলার মুলসমানদের বলেছেন।

আবার ১৯১৮ সালে ‘আল এসলাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় তিনি বলেন, ‘প্রাচীনকালে আমাদের পূর্বপুরুষগন (মুসলমান) বাঙালা ভাষা ও সাহিত্যকেই আপনাদের মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে বরণ করিয়া লইয়াছিলেন। বাঙালার বিরাট প্রাচীন মুসলমান সাহিত্যের যে অংশ আবিস্কৃত হইয়াছে, তাহা হইতে সহজেই প্রমাণিত হইতে পারে যে, বাঙালী মুসলমানের বাঙালা ভাষাই আবহমান কাল মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষা ছিল।’ তিনি আরেকটি প্রবন্ধে লিখেন, ‘হিন্দু কবিগন যেমন রামায়ণ, মহাভারতাদি প্রভৃতি সংস্কৃত গ্রন্থরাজি রাঙ্গালায় ভাষান্তরিত করিতেছিলেন, মুসলমান কবিগনও তেমনি তাঁহাদের পূর্ব্বাচার্য্যগণের গ্রন্থাবলী বাঙালায় নিবন্ধ করিতে প্রদত্ত হইয়াছিলেন। একমাত্র এই অকৃতীর চেষ্টায় এ পর্যন্ত ৮০ জন মুসলমান কবি আবিষ্কৃত হইয়াছেন। এই হিসাবে সমগ্র বঙ্গে কত কবির আবিভার্ব হইয়াছেন, তাহা আপনারাই অনুমান করুন। বহুশত বৎসর বাঙালায় আধিপত্য করিয়া মুসলমানগণ যে বাঙালা ভাষাকে নিজের বলিয়া বরণ করিয়াছিলেন, তাহাদের রাজ্য মহিমার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বাভাবিক ও সুন্দর ‘আত্মভাব’ বিলুপ্ত হইয়া না গেলে, আজ বাঙ্গালী মুসলমানের ইতিহাস অন্য আকার ধারণ করিত, সন্দেহ নাই।’

১৯১৪/১৫ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সংস্কৃতি সম্মেলনে প্রদত্ত অভিভাষণে তিনি ৭৭ জন হিন্দু কবির নাম উল্লেখ করেন, সাথে সাথে তিনি ৯০ জন মুসলিম কবির নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন মুসলমান কবিগনের মধ্যে অমরকবি সৈয়দ আলাওল, দৌলত কাজী, সৈয়দ সুলতান, মোহাম্মদ খাঁ ও দৌলত কাজির সমকক্ষ কবি বড় বেশি নাই। এমন কি আলাওল ও দৌলত উজির মত উচ্চ কবি হিন্দুদের মধ্যেও নাই বলে সাহিত্যবিশারদ মনে করেন। তাছাড়া আলাওলকে মধ্যযুগের রবীন্দ্রনাথ বলে মনে করেন সাহিত্যবিশারদ।

তিনি আবিষ্কার করেন এমন অনেক মুসলমান কবিকে যাঁরা ‘বৈষ্ণবপদাবলি’ রচনা করেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, সে সময় মুসলমানরা সাহিত্যক্ষেত্রে কত শক্তিশালী ছিল।

১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে প্রদত্ত অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেন, ‘একমাত্র এই দীন অভাজনই আপনার অযোগ্যতা ও অক্ষমতা সহকৃত ক্ষুদ্র শক্তির বিনিয়োগে একান্ত সহায় সম্বলহীন ভাবে আজ ২৫ বৎসর যাবৎ প্রাচীন সাহিত্যের রত্নরাজি সংগ্রহে ব্যাপৃত রহিয়াছে। তাহার গবেষণার ফলে হিন্দু কবি ছাড়া এ পর্য্যন্ত শত শত মুসলমান কবির কীর্তি আবিষ্কৃত হইয়াছে।’

তিনি আলাওলকে বাংলার মুসলমান সাহিত্যের গুরু বলতেন। তাই শিষ্য হিসেবে গুরুকে অনুসরণ করা উচিত বলতেন। তাইতো আলাওল যেমন বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন তেমনি আমাদেরও উচিত বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করা, এটা তিনি মনে প্রাণে চাইতেন। তিনি আরো বলতেন মুসলমানরাই বাংলা ভাষার জন্মদাতা। মুসলমানদের আদরে, অনুগ্রহে এ ভাষা লালিত পালিত। বঙ্গভাষার অঙ্গে অগণিত মুসলমানি শব্দ প্রবেশ করেছে। এখন যদি মুসলমানরা সেই ভাষা ত্যাগ করে, সেই শব্দ বিছিন্ন করতে যায় তবে তা লোম বাছিতে কম্বল উজারের মত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলার যে যুগে মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক বাংলা সাহিত্য চর্চার উন্মেষ হয়, তিনি সেই যুগেই উদয় ও সেই যুগেই অস্ততারা ছিলেন। তিনি বলতেন তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে আধুনিক মুসলিম বাংলা সাহিত্যের উন্মেষের যুগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তাতে সন্ধেহ নাই। তাঁর অন্য সহকর্মীরা যখন কবিতা, সাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনায় ব্যস্থ, তখন তিনি বাংলা ভাষায় মুসলমানদের প্রাচীন অবদানের খোঁজে ব্যস্থ। তিনি বলতেন বাংলার বর্তমান মুসলমানরা তাঁদের সাহিত্যকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চাইলে, তাঁদেরকে প্রথমে প্রাচীন মুসলমান সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। সেগুলোকে হৃদয় দিয়ে ধারণ করতে হবে।

তিনি ইতিহাস থেকে জানান যে, খ্রিষ্টিয় পঞ্চাদশ শতাব্দী হতে অর্থাৎ হোসেন শাহের রাজত্বকালে বাংলার স্বাধীন মুসলমান সুলতানগণ দেশীয় ভাষার প্রতি অনুরাগী হন। বিদ্যাপতির কবিতায়, বৈষ্ণবদের সাহিত্যে, প্রাচীন মহাভারত ও রামায়ণ বই হতে এ বিষয়টা প্রতিয়মাণ হয়। তারপর তারা ধীরে ধীরে পরোক্ষভাবে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। এবং আলাদা সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। মূলত ষোড়শ শতাব্দী হতে মুসলমানরা দেশিয় ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু করেন।
বিরহী জনের প্রতি শশী দয়াহীন।
এই পাপে প্রতিমাসে এক পক্ষ ক্ষীণ।
বিরহীজনের তনু দগধে কারণ।
প্রতিমাসে একবার বন্ধুর মরণ।

‘লাইলি মজনু’ নামক গ্রন্থে এমন সুনিপুণভাবে ভাষার ব্যবহার দেখান দৌলত উজীর। এটি ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত। সাহিত্যবিশারদের হাতে এর পূর্বে রচিত এমন কোন সাহিত্যকর্ম না আসায়, তিনি ধারণা করেন খ্রিষ্টিয় ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাংলার মুসলমানগণ বাংলা সাহিত্য রচনায় নিয়োজিত হন। তাঁর সেই ধারণা আজ আমাদের মুসলমানদের সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সত্য।

সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে মুসলমানদের ভাগ্য বিপযর্য় ঘটে। রাজ্য হারালে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে মুসলমানরা সাহিত্য থেকে দূরে সরে যায়। এ সময় যে মুসলমান কবির জন্ম হয়নি তা নয়, কিন্তু সাহিত্যচর্চার জন্য যেমন পরিবেশ থাকা দরকার তা মুসলমানদের মধ্যে ছিল না। ফলে মুসলমানরা তাদের পূর্বসূরীদের সাহিত্যকর্ম সর্ম্পকে ভুলে যায়। আর হয়ে পড়ে দ্বিধাগ্রস্থ।

সাহিত্যবিশারদ তাঁর দীর্ঘ জীবনে আড়াই হাজারেরও অধিক পুথি সংগ্রহ করেছেন। এসব পুথির উপর ভিত্তি করে পূর্ণরচিত হয় বাংলার ইতিহাস। একসময় যে মুসলমান সমাজ তাদের সাহিত্যকর্ম নাই বলে হা হুতাশ করত, সেই মুসলমানরাই আজ বুক ফুলিয়ে গর্ব করে তাদের প্রাচীন সাহিত্যকর্ম নিয়ে।

সপ্তদশ শতাব্দীর পল্লীকবি আবদুল হাকিমের ‘নুরনামা’ নামক পুথির কয়েকটা লাইন উল্লেখ করি:
যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশি ভাষা বিদ্যা যার মন ন জুড়ায়
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশে ন যায়।’

এ কবিতাটি পাঠ করেননি এমন মানুষ হয়ত এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাহিত্যবিশারদ প্রায় ছয়শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি সর্বধা চেয়েছিলেন বাংলার মুসলমানরা যেন আবার জেগে উঠে। তিনি জানতেন যে রেঁনেসা বাংলা সাহিত্যে ঘটেছিল বলে বলা হত, মূলত সেটা হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যদি সমাজের একটি অংশ পিছিয়ে থেকে অন্য অংশ এগিয়ে গেলে তা সমাজের চূড়ান্ত উন্নতিকে তরাণ্বিত করবে না। আর তাই তিনি বার বার মুসলমানদের জাগানোর চেষ্টা করেন। এ চেষ্টায় মধ্যে কোন সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল না। ‘হিন্দু মুসলমান একই পাদপের দুইটি প্রধান শাখা বা একই দেহের দুইটি অবয়ব ভিন্ন আর কিছুই নহে।’ (ইসলাম প্রচারক, জানু-১৯০৩) তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল একটাই ‘স্বদেশ ও মাতৃভূমির প্রাচীন পুণ্যময়ী গাথা গাহিতে গাহিতে আমার এ তুচ্ছ জীবন অতিবাহিত হইয়া যাউক।’

তাঁর সেই চাওয়া স্রষ্টা পূরণ করেছেন। আজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তাঁর সংগ্রহের উপর রচিত। আজ বাংলার মুসলমান সমাজ এগিয়েছে। আজ বাংলা সাহিত্যে মুসলমান জাগরণের মাধ্যমে রেঁনেসার পূর্ণতা এসেছে।