প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ-স্পর্শের রেণু যখন আপন হৃদয় রসে স্ফুরিত হয় তখন অনিবার্যভাবেই কবিকে লিখতে হয় কবিতা। কবির ক্ষেত্রেও সর্বাগ্রে কবিতা বেরিয়ে আসে। এতেই কবির আনন্দ। প্রত্যেক কবি জানেন কবিতার প্রসব বেদনার কথা। একজন মা যেমন ধারাবাহিকতার একপর্যায়ে প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করে কাঙক্ষিত সন্তান লাভ করেন, কবিও তেমনি অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে চির চাওয়ার কবিতা সৃষ্টি করেন। প্রাচীনকালে সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মশিা ও নীতিশিা দেয়া হতো। এমন কি দার্শনিক তত্ত্বকথাও শেখানো হতো উপনিষদের শোকে, ঈশপের কল্পকাহিনীতে, রুমীর মসনবীতে, ফেরদৌসির শাহনামায় ও প্লেটোর ডায়ালগ- এ।
ইদানিং রাজনৈতিক প্রয়োজনে সাহিত্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্রেণী-চেতনা, শ্রেণী সংগ্রাম, সমাজ বিপ্লব ইত্যাদির উপযুক্ত মনোভূমি তৈরী করা এবং বিপ্লবের পর শ্রেণীহীন সমাজ গঠনে অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনা জাগানো- এমনতর সব মহৎ কাজের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সাহিত্যিকগণ। কোথাও স্বেচ্ছায়, কোথাও বা রাষ্ট্রবিধাতার আদেশে। জবরদস্তি বল প্রয়োগী আদেশ অবশ্য নিন্দনীয় এবং শেষ পর্যন্ত অফলপ্রসু। কিন্তু স্বেচ্চায় ও সোৎসাহে যদি সাহিত্যিকগণ তাদের বহুযত্নে গড়া এ শক্তিশালী কর্মটি সম্পাদন করেন তবেই সোনায় সোহাগা। সর্বকালীন আধুনিক কবিতা বলতে কিছু নেই। উত্তর আধুনিক চিত্রশিল্পের মতো উত্তর আধুনিক কবিতা সহজলভ্য না হলেও একেবারে অস্তিত্বহীন নয়। আধুনিক বিমান বা ইঞ্জিন আবিষ্কারের প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে আঁকা লিউনারদো দ্যাঁ ভিঞ্চির বিমান বা ইঞ্জিনের স্কেচগুলো সে যুগের উত্তরাধুনিক চিত্রকর্ম বৈ অন্য কিছু নয়। শক্তিমান কবির উত্তরাধুনিক কবিতা নতুন সভ্যতার দ্বার উন্মোচনের যাদুর কাঠি।
একজন কবির ভেতরে কবিসত্ত্বা ও ব্যক্তিসত্ত্বা উভয়ই বিদ্যমান। রাজনৈতিক সত্ত্বা তার ব্যক্তিসত্ত্বার অঙ্গ। দ্বান্দ্বিক কারণে নিজে কবি হয়েও পেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে কবিকে নির্বাসন দিতে চেয়েছেন। গণসম্পৃক্ত নতুন ‘থিম’ এর মশাল উঁচিয়ে চলার পথটি কণ্টকাকীর্ণ হয় বলে কবির উপর বার বার আঘাত আসে। রাষ্ট্র বা প্রতিক্রিয়াশীলতার অস্ত্রের আঘাত যখন কবির মাথায় এসে পড়ে তখন স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। এই স্ফুলিঙ্গ কবিকে দিয়ে রাজনৈতিক কবিতা লিখিয়ে নেয়। অন্যদিকে রাষ্ট্র বা প্রতিক্রিয়াশীলতার দুধ-রুটি গ্রহণ কবিতার পূর্ণতা আনয়নের পথে বড় বাঁধা। কোনো প্রতিভাবান কবির ভেতরে নিরন্তর ভাঙচুর হতে থাকে। কবিতায় কল্পনার স্থান খুবই প্রশস্ত। কল্পনার তুলি দিয়ে আঁকা চিত্রের সঙ্গে চিত্র যোগ করে কবি যে চিত্রকল্প নির্মাণ করেন তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য অবশ্য কবির হৃদয় ভাব ও ভাবনারই প্রকাশ। কিন্তু সে ভাব ও ভাবনা নিরাবলম্বন নয়। অবলম্বন তার মানসিকতা প্রাকৃতিক বা জাগতিক বিশ্ববোধ। আর রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির কবিতা কবিকে দলের সেবাদাস পর্যায়ে নামিয়ে আনে।
মধ্যবিত্তের কবিতা বিষাদ নির্লিপ্ত ও নির্বেদের য়িষ্ণু মূল্যবোধে কণ্ডুয়ানরত। অন্যদিকে ঘৃণা, প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, স্বপ্ন ও বেড়ে ওঠার তাগিদে স্পন্দিত। স্বস্তি নয়, সম্ভোগ নয় বরং এ দ্বন্দ্ব সঙ্কুল উচাটন পরায়নতাই আমাদের কবিতার বিধিলিপি। কবি সর্বাঙ্গে এই কিশে নাগরিকতাকে অনুভবে ধারণ করেছি। বাগ্মীতার কোলাহল আর বিলাস বৈভবের শক্তিমত্তার ভান নেই তার অঙ্গীকারে। কবি নগরবাসী না হলেও নগর নীতির এই কিশে চিত্রকে মেনে নেন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। কেননা সভ্যতা আর নগর পরস্পর অবিচ্ছিন্ন। মিশরীয়, গ্রীক, ব্যাবিলনীয় বা অন্য কোনো নগর সভ্যতাকে কবি যদি মোম অস্ত্ররূপে ব্যবহার করেন তবে তাতে দোষের বা নিন্দার কিছু নেই।
কালজয়ী সাহিত্যিক নিশ্চয়ই সাহিত্য নিয়ে বাণিজ্য করতে উদ্যোগী হন না। কবির বেনিয়া বৃত্তিরবোধ তার সত্ত্বাকে সমাজ তথা রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করে। সমাজ বা রাষ্ট্রের করণীয় কিছু না থাকলেই কবি খুশী হব। কারণ কবির অধিকারের মূলকথা হল লেখার স্বাধীনতা। কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র কলমের স্বাধীনতা সেই পর্যন্ত অবারিত করে, যে সীমা পর্যন্ত কবি সংবিধিবদ্ধ কালানুকানুন অতিক্রম না করেন। কিন্তু সৃষ্টিশীলতা ও প্রগতির জন্য শেকড় সন্ধানী কবিকে বাউন্ডারী অতিক্রম করতে হয়। তাই তার উপর রাষ্ট্রের খড়গ নেমে আসে। পরিণামে কবিকে অনিবার্যভাবেই ট্রাজেডির নায়ক হতে হয়। আধুনিক কবিতার কোনো সংজ্ঞা দিতে যাওয়া দুঃসাহসের কাজ। এ কথা ভুলে না গিয়েও বলা যায় বিশ শতকের বাংলা কবিতা বহুমাত্রিকাতায় ঋদ্ধ হয়েছে, যার প্রধানতম স্থপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা কবিতায় আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, কিংবা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের কবিগণ বাংলা কবিতার প্রচলিত তিনটি ছন্দ অনুসরণ করে চালের প্রকরণে নানাবিধ নতুনত্ব আরোপ করেছেন। নতুন কোনো ছন্দের প্রবর্তন করেননি।
ত্রিশ ও ত্রিশোত্তর কালের কবিরা এ বিষয়ে আরো বেশি প্রথাসিদ্ধ। অর্থাৎ ছন্দ প্রকরণে সবাই ছিলেন প্রাক্তনের অনুগামী। তবু নিজ নিজ উপায়ে এঁরা কবিতায় বিপব সাধন করেছেন। বাংলা কবিতায় ছন্দের তিন রীতি অনুশাসনকে মান্য করেই আধুনিক কবির পে আধুনিক হওয়া সম্ভব হয়েছে। কেবল পঙ্ক্তির সংকোচন প্রসারণে নিজস্ব কালোয়াতিকে সম্বল করে, শব্দ চয়নে সব ধরণের সুচিবায়ু পরিহার করে এবং ক্রিয়াপদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিকতর স্বাভাবিকতাকে আলিঙ্গন করে। রূপকল্প ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উপমা আহরণ করেই আধুনিকেরা আধুনিক হয়ে উঠছেন। সাম্প্রতিক অনেক পাঠকের এমন কি নবীন কবিতা কর্মীদেরও ধারণা কবিতা মানেই গদ্য রীতিতে রচিত পঙ্ক্তিমালা। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতই ত্রিশোত্তর কালের সব বড় কবিই গদ্য রীতির ছিটেফোঁটা চর্চা করেছেন কেবল কবি হিসেবে পূর্ণস্বীকৃতি লাভের পর।
রবীন্দ্রনাথের সাস্তিবাদী ও ঔপনিষদীয় দর্শন ও প্রসন্ন জীবনাবেগ থেকে সরে এসে ত্রিশের কবিরা নতুন এক জীবন বাস্তবতার শিল্পরূপ অংকনে উৎসায়ী ছিলেন। তাঁরা রাবীন্দ্রীক প্রসন্নতা এবং মাঙ্গলিক চিন্তার পরিবর্তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে সমাজের অবয়, নৈরাজ্য, অসুস্থতা, বিষণœতা, অবিশ্বাস, অভিশংকা ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশ্বনাগরিক হতে গিয়ে ত্রিশের কবিদের অনেকেই দেশজমৃত্তিকাকে ভুলে পশ্চিমাকাশে বিচরণ করেছেন। এ কারণেই সম্ভবত উত্তরাধুনিকতাবাদীদের খড়গ উঠেছে তাদের কবিতা শরীরে। মানুষের সদর্থক আন্তর্জাতিকতাবাদের বিপরীতে ত্রিশের কবিদের কবিতায় মূলত শিল্পীত হয়েছে পুঁজিবাদের অন্তঃতে আন্তর্জাতিকতাবাদ। পুজিবাদে অন্তঃতের আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রোপটে চলিশের কবিরা সংলগ্ন হলেন দেশ কাল পটভূমিতে জনতামুখীনতায়। এঁরা রুশ বিপ্লবের প্রভাবে ত্রিশের কবিদের পুঁজিবাদের অন্তঃতে বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কবিতা রচনা করেছেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব বাংলার কবিতাকে ইসলামীকরণে ঔপনিবেশিক শক্তির যে প্রয়াস তা পঞ্চাশ ও ষাট দশকে কবিদের প্রবল স্বজাত্ব্যবোধ ও মাতৃভাষা প্রতি সহজাত ভালবাসার কারণে ব্যর্থতায় পর্যবশিত হয়। এর মূলে ছিলো জনমূল সংলগ্ন স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি। ভারতীয় বঙ্গের সাথে বাংলাদেশের কবিতার মৌলিক পার্থক্য এখানে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কবিতায় রাজনৈতিক সচেতনতা বহাল থাকে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার প্রোপটে। পরবর্তীতে এটা আরও প্রকট হয় বার বার সামরিক শাসনের প্রেক্ষিতে। এ সময় মতার ছায়াতলে খেজুর তলায় আদৃষ্ট কবিতাও কমচর্চিত হয়নি। যার একটি উপধারা এখনো কানাগলিতে চলছে। সঙ্গশক্তির বিপরীতে প্রবলভাবে সোনা গেল ব্যক্তির উচ্চকণ্ঠ স্বরগ্রাম। সম্মিলিত প্রয়াসে কবিতার হতাশা অন্বয় ও অস্থিরতা প্রকট হলো।
আশি-নব্বইয়ের দশকে এসে এ সংকট থেকে উত্তরণের সাধনায় একদল নবীন কবি হয়ে উঠেছিলেন নিবেদিত প্রাণ। যাদের কুল লঙ্ঘনের যন্ত্রণায় নতুনত্ব অর্জন সম্ভব হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির ঝাপটায় কবিতা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে উপযুক্ততা অর্জন করতে পারছেনা। তাই কবিতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বা কবিতা শিল্প হিসেবে টেকসই নয়-এমনটি ভাববার কোন অবকাশ নেই। বরং বলা যায় যতদিন মানুষের মধ্যে দুঃখ-বেদনা, হর্ষ-বিষাদ, মা-প্রতিহিংসা, ঘৃণা-ভালবাসা, ভাল-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, শিল্প-অশিল্পের অস্তিত্ব থাকবে ততোদিন কবিতা পৃথিবীতে আপন মহিমায় টিকে থাকবে। কেননা কাব্যশিল্পকে ব্যবসায়িক মাপকাঠিতে বিচার এবং এর অস্তিত্ব পরিমাপ করা যায় না। এই ভাবনায় সম্পূরক হিসেবে বলা যায় কবিতাই একমাত্র উচ্চ শ্রেণীর শিল্প মাধ্যম নয়। আর কবিগণও একমাত্র চেতনালব্ধ উচ্চমার্গীয় মানব সন্তান নন। তাই কবিগণের উচ্চ আত্মশাঘার কোনো কারণ নেই। যদিও একটা আদর্শগত মহান অংহকার আনমনে প্রত্যেক কবিহৃদয়ে অভিষিক্ত থাকে। এর কারণ হিসেবে বলা যায় মানুষের মধ্যে উচ্চ মননশীলতা, নিবিড়-মহৎ শিল্পবোধ ও মানবিক উজ্জ্বল অনুভব কবিতায় সৃজনশীলতা গঠনের একটা বলিষ্ট ভূমিকা সবসময় ছিল এবং থাকবে। তাই সমাজের মানস ও মননস্রষ্টা কবিগণ নিজস্ব মাপকাঠিতে সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী সম্রাট।
কবিতার অন্তর তাই বাঁধা থাকে অনন্তের দোলনায়। কবির কবিত্ব কবিতা লেখার মতার উপর নির্ভরশীল। কবিতার কর্ষিত জমিনে উৎপাদিত ফসলের ভেতর কবির পরিচয় থাকে। একজন কবির কবিত্ব থেকে কবিতার কর্তৃত্ব আসে। কবি বা একজন মানুষ কবিতা লিখতে পারেন বলেই তিনি কবিতা লেখেন। এর মধ্যে কোনো দ্বিরুক্তি নেই এবং কবিতা কীভাবে তার মধ্যে আসে তা চিরকালই রহস্যময়। যেহেতু প্রকৃতির মধ্যে যে কোনো সৃষ্টি প্রক্রিয়া সবসময় রহস্যময় তাই বিশুদ্ধ কবিতাও প্রাকৃতিক। রহস্যময় বিশুদ্ধ কবিতা রচনায় ছন্দ একটি বিধিসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাপার। তার থেকে বিচ্যূতি, ছন্দের বিচ্যূতিই। কিন্তু বিচ্যূতি এবং পরীা-নিরীক্ষার মধ্যে একটা ব্যবধান আছে। কবি যদি বিধিসম্মত ছন্দেই নিজেকে দ্বিধাহীন সমর্পন করেন তাহলে নতুন পরীা সম্ভব হবে না এবং নতুন পরীক্ষা না হলে নতুন ছন্দ সৃষ্টিও অসম্ভব।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের যে স্বাধীনতা জীবনানন্দ নিয়েছিলেন আবহমান বাংলা কবিতার প্রায় সব কবি (রবীন্দ্র -নজরুল সমেত) এই স্বাধীনতা নিয়েছেন। তফাৎ এই জীবনানন্দ এটিকে প্রায় তাঁর একটি নিজস্ব নিয়মে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। মাপা বাধা ছন্দে আমাদের কান অভ্যস্থ বটে কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটিয়েও যদি ছন্দরণন থাকে তাহলে তাকে অস্বীকার করি কী করে? জীবনানন্দ তাঁর ছন্দ ব্যাপারে দুরকম স্বাধীনতা সব সময় নিয়েছেন। অরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত বা স্বরবৃত্ত যে ছন্দেই লেখেন না কেন কবি, প্রায় সবসময়ই লিখেছেন মুক্তকে। আবহমান বাংলা কবিতায় অক্ষরবৃত্তের এই স্বাধীনতা প্রায় সর্বব্যাপী রাজত্ব যেমন সত্য তেমনই সত্য জীবনানন্দের রচনাতেও। তাই মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের কিছু কিছু চর্চা করে থাকলেও কবির প্রধান ছন্দ মাধ্যম রয়ে গেছে অরবৃত্তই।
এমন কি জীবনানন্দ অরবৃত্তের টানা ও এলানো, অমলবিস্তারিত এমন একটি ভঙ্গি তৈরী করে নিয়েছিলেন, যা তাঁর কবিতার অমোঘ চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এমনকি জীবনানন্দ দাশ উত্তরকালীক মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের কবিতাও গ্রাস করতে চেয়েছেন তার নিজের শরীরাত্মায়। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতাগুচ্ছে প্রধান তিনটি বাংলা ছন্দই ব্যবহার করেছেন। গদ্য ছন্দও প্রয়োগ করেছেন কোনো কোনো কবিতায়। মিলে, স্তবক গঠনে ও কাব্য আঙ্গিকে কোনো কোনো কৌশলতায় তার একটি বিশিষ্ট ঝোঁক ছিল। তার কোনো কোনো গদ্য রচনাতেও ছন্দ চিন্তার পরিচয় মুদ্রিত আছে। জীবনানন্দ বলেছেন- মূল্যবোধহীন কাব্য শব্দের কঙ্কাল ছাড়া কিছু নয়। মূল্যবোধ সম্পর্কিত স্বচ্ছ ধারণা এবং মূল্যবোধগুলো রক্ষার প্রচেষ্টা ব্যতীত কালসত্যকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। পঙ্ক্তিতে আবশ্যকীয় ছন্দরত্ন কাব্যকে পাঠকের মনে গেঁথে রাখে। তাই কালসত্যকে নিরাপদ করে কাব্য সাম্রাজ্য সৃষ্টিপথে মূল্যবোধ সম্পন্ন পঙক্তিতে আবশ্যকীয় ছন্দরত্ন এক চিরঞ্জীব স্রোতস্বিনী।