সমকালীনতা আর আধুনিকতা এক নয়। উভয়ে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। একটা সাময়িক অপরটা চিরন্তন। সমকালীনতা মানে সীমাবদ্ধতা অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে ঘটে যাওয়া প্রবহমান জীবনের ভাষ্য। সমকালীনতা অনেকটা সাম্প্রতিকতা। আর সাম্প্রতিকতা মনেই ক্ষণিকতা। ক্ষণিক জীবন কখনোই আধুনিক নয়। আধুনিকতা মননজাত বিষয়। আধুনিক শব্দটির মধ্যে সমকালীনতা মিশে থাকতে পারে কিংবা সমকালের আভাস থাকতে পারে। আপন হৃদয়ে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার স্বীকারোক্তির সাহস এবং চৈতন্যের নিরঙ্কুশ বিবৃতি রচনা অধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য তথা অধুনিকের বৈশিষ্ট্য।

আধুনিকতা হচ্ছে অন্তর্বয়ন অর্থাৎ মানবের মনোধারা বিকাশের পদ্ধতি। সমকালীনতায় প্রকাশ মূখ্য, আধুনিকতায় বিকাশ মূখ্য।
সমকাল মানে বর্তমান আর আধুনিক মানে বর্তমানের হৃদয়ে ঘটে যাওয়া চিরঞ্জিব ঘটনার নান্দনিক সৌকর্য।

সর্বাঙ্গীন জীবনের জন্য মানবের যে চিরন্তন অন্বেষণ তাই আধুনিকতা। অন্তরের নিগূঢ় রহস্যের দিকে আধুনিকতার অভিসার বলে অনেক সময় আধুনিক কবিতা বোঝা দূরুহ হয়ে পড়ে। যদিও দুর্বোধ্যতা আর আধুনিকতায় সাপে-নেউলে সম্পর্ক তবুও মাঝে মাঝে উভয়ে সমান্তরালে চলে।আধুনিকতা হলো জীবনের অপার উৎসারণ আর সমকালীনতা হলে জীবনে ঘটে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। সমকালীনতা মানে চলমানতা আর আধুনিকতা হলো ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিচার্য ঘটনার বিবৃতি। সমাজ সভ্যতা ভব্যতা ও ইতিহাসের ক্রমবিকশিত অধ্যায়ের যে বর্ণিল বিভূতি তার সঙ্গে মানব মননের যে অন্তর্গূঢ় সম্পর্ক তার প্রকাশই সাহিত্যে আধুনিকতা হিসেবে বিবেচ্য।

সময়ের বেসাতি হলো সমকালীনতা আর সময়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত আলোকের প্রোজ্জ্বল উৎসারণই আধুনিকতা। সময়ের ভেতরে আরেক সময় বসবাস করে। সময়টা হলো সমকালীনতা আর ভেতরের সময়টা হলো আধুনিকতা। সমকালীনতা আপন বেগে চলতে থাকে। আধুনিকতায় বিচিত্র ছোঁয়া লাগে। বাংলা কবিতায় আধুনিকতা এসেছে প্রথমত ফরাসি সাহিত্যের হাত ধরে; মূলত ইংরেজি সাহিত্য বাংলায় অনয়নের মাধ্যমে।

তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রকাব্যের বিরোধিতাকেই আধুনিকতা মনে করেছিলো। তাই তিরিশের কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ ছাড়া অন্যরা প্রকৃত আধুনিকতার স্বাদ আস্বাদ করতে পারেনি। রবীন্দ্র বিরোধিতা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা রবীন্দ্র মহা সমুদ্রে সলিল সমাধি লাভ করেছে। এদিকে নজরুল প্রথম থেকেই রবীন্দ্র বিরোধিতা না করে বরং আপন সুরে গান গেয়ে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেও তিনি কখনোই রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ বা অনুসরণ করার চেষ্টা করেননি। নিজস্ব স্টাইল তৈরিতেই মত্ত ছিলেন নজরুল। আপন হৃদয়ের ভাষার জন্য আপন রীতি তৈরির নীতিই ছিলো তাঁর অারাধ্য। যার জন্য নজরুল সমকালের হৃদয়ে চিরকালের ভাস্বর টিকা এঁকে দিয়েছেন।

আর এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে নজরুল নামটি উচ্চারণ না করলে আধুনিক শব্দটি ম্লান হয়ে যায়। আধুনিকতা আর সমকালীনতা ভিন্ন কিন্তু আধুনিকতা আর নজরুল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। অন্যভাবে বললে, আধুনিকতা আর নজরুল মিলে-মিশে একাকার। একজনের হৃদয়ে আপরজনের বসবাস। একজনকে ছাড়া অপরজনকে বিশ্লেষণ করা যায় না। একজনকে বাদ দিয়ে আপরজনকে আলোচনা করলে তা যৌক্তিক মানদণ্ডে টেকে না। এজন্য বাংলা কবিতায় আধুনিক মানেই নজরুল। নজরুল মানেই আধুনিক।

নজরুলকে বাদ দিয়ে আধুনিক কবিতা আলোচনা করা অবান্তর। এটা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
এখনো পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি নজরুল।