বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ স. মহান স্রষ্টার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তিনি সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল। মানুষ হিসাবে তিনি ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত। মানবিক সকল দোষ-ত্রুটি-দুর্বলতার উর্ধ্বে এক অসাধারণ ব্যক্তি। তাঁকে মানবজাতির মডেল বা নিখুঁত আদর্শ হিসাবে পয়দা করা হয়েছে। স্বয়ং স্রষ্টা তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে আল-কুরআনে বিভিন্নভাবে তাঁর অসাধারণ গুণাবলীর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
“বল, ‘হে মানুষ আমি তোমাদের সকলের জন্য (অর্থাৎ, সমগ্র মানবজাতির জন্য) আল্লাহর রাসূল।” (সূরা-আ’রাফ, আয়াত-১৫৮)।
“হে রাসূল আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সারা জাহানের জন্য রহমত স্বরূপ।” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত-১০৭)।
“আপনার (রাসূলুল্লাহর) খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা ইনশিরাহ্, আয়াত-৪)।
“আমি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি, যিনি আমার আয়াতসমূহ তোমাদের নিকট আবৃত্তি করেন, তোমাদের পবিত্র করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন এবং তোমরা যা জানতে না তা শিক্ষা দেন।” (সূরা বাকারা, আয়াত-১৫১)।
“তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত-১৩২)।
“তুমি (রাসূলুল্লাহ) অবশ্যই সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা কালাম, আয়াত-৪)।
এভাবে স্বয়ং স্রষ্টা আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহকে স. নানা গুণের সমাহার বলে উল্লেখ করে তাঁকে অনুসরণ করার জন্য মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন : “এবং তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং সতর্ক হও, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, স্পষ্ট প্রচারই আমার রাসূলের কর্তব্য।” (সূরা মায়িদা, আয়াত : ৯২)
রাসূলকে স. সর্বগুণে গুণান্বিত করে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হলো মানবজাতির সামনে এক আদর্শ পেশ করা। যে আদর্শ অনুসরণ করে মানবজাতি সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারে। এজন্য তাঁকে আল-কুরআনের অন্যান্য স্থানে ‘সিরাজাম মুনীরা’ অর্থাৎ ‘আলোকবর্তিকা’, ‘মানবজাতির শিক্ষক’ ইত্যাদি ভাবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মানবজাতির যিনি আলোকবর্তিকা এবং শিক্ষক তাঁর চরিত্রে অবশ্যই কোন কলংক থাকতে পারে না এবং যিনি শিক্ষক তিনি অবশ্যই সুবিজ্ঞ ও নিখুঁত জ্ঞানের অধিকারী। তা না হলে তাঁর পক্ষে সমগ্র মানবজাতিকে সঠিক পথ-প্রদর্শন করা সম্ভব নয়।
এ কারণেই রাসূলের স. যুগেই তাঁর গুণে ও চরিত্রে বিমুগ্ধ সাহাবায়ে কিরাম রাসূল-প্রশস্তিমূলক কবিতা রচনার সূত্রপাত করেন। ইসলামের চার প্রধান খলিফা আবু বকর রা., ওমর ফারুক রা., ওসমান রা. ও আলী রা. থেকে শুরু করে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, কাব ইবনে যুহায়র, হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, আয়েশা সিদ্দিকা, ফাতেমাতুয্ যোহরা, হাস্সান বিন সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, কাব ইবনে মালিক প্রমুখ সাহাবা-কবিগণ রাসূল-প্রশস্তিমূূলক কবিতা লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে হাস্সান বিন সাবিত সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ স. তাঁকে ‘শায়িরির-রাসূল’ অর্থাৎ, ‘রাসূলের কবি’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। রাসূলুল্লাহ স. তাঁর জন্য মসজিদে নববীতে একটি মিম্বরও তৈরি করেছিলেন, যেখানে বসে তিনি খোদ রাসূলের সামনে তাঁর শা’নে কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করতেন। রাসূলুল্লাহ স. স্বয়ং তা শুনতেন ও তা’রিফ করতেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর স. সমসাময়িক বহু কবি, উপরে যাঁদের অনেকেরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা রাসূল-প্রশস্তিমূূলক অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। এ সিলসিলা অদ্যাবধি চালু রয়েছে।
নিবন্ধের শুরুতে আল-কুরআনের কতিপয় আয়াতের উল্লেখ করা হয়েছে, অনুরূপ বিভিন্ন আয়াতই সাহাবা-কবিদের রাসূল-প্রশস্তিমূূলক কবিতার মূলভিত্তি। রাসূলের ইন্তিকালের পরেও রাসূল-প্রশস্তিমূূলক কবিতা রচনার ধারা অব্যাহত রয়েছে। জগৎ-বিখ্যাত বিভিন্ন কবি ও ব্যক্তিগণ যেমন শেখ সাদী, আব্দুল কাদির জিলানী, ওমর খৈয়ম, জালালুদ্দীন রুমী, ফরিদ উদ্দীন আক্তার, হাফিয, আকবর এলাহাবাদী, আমির খসরু দেহলবী, আলতাফ হোসেন হালী, ইসমাইল শহীদ, কাশেম নানতুবী, জহির উদ্দীন বাবর, জোশ মালিহাবাদী, নবাব মীর ওসমান আলী খান, নবাব মোহসীন-উল-মূল্ক, মীর্যা আসাদুল্লাহ গালীব, মুহম্মদ ইকবাল, শাহ আব্দুল আজীজ দেহলভী, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী প্রমুখ। এঁদের মধ্যে শেখ সাদীর নিম্নোক্ত নাতে-রাসূল স. সর্বাধিক বিখ্যাত ও বিশ্বের সর্বত্র মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও জনপ্রিয় :
“বালাগাল উলা বি-কামালিহি
কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি
হাসুনাত জামিয়া খাসালিহি
সাল্লু আলায়হি ওয়া আলিহি।”
মহাকবি য়োহান উলফগং ফন গ্যেটে (Johann Wolfgang von Goethe, 1749-1832) রাসূলুল্লাহর জীবনী পড়ে মুগ্ধ হয়ে গড়যড়সবঃ নাটক লিখেছিলেন। নাটকটি অসমাপ্ত ও বিলুপ্ত হলেও তাঁর একটি গান Mohomet’s Gesang- ‘মুহম্মদের গান’টি রক্ষা পায়- যাতে গ্যেটে এ মহামানবের প্রশস্তিমূলক-গীতি রচনা করেন।
রাসূলুল্লাহর জীবদ্দশায় সাহাবা-কবিদের মাধ্যমে রাসূল-প্রশস্তির যে ধারা সূচিত হয়, সারা বিশ্বে ইসলাম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে সর্বত্র মুসলিম সমাজে তা বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশেও ইসলাম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে রাসূল-প্রশস্তির ধারাটি সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষে রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’-এ সর্বপ্রথম ‘মুহম্মদ’ প্রসঙ্গ লক্ষ্য করা যায়। বাংলা কাব্যে রাসূলের নামাঙ্কিত বিভিন্ন কবিতা কীভাবে রচিত হয় সে প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কবি ও গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেন ঃ
“মধ্যযুগে হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি-কবিরা প্রায়ই একই সঙ্গে (একটু আগে-পরে) লিখতে শুরু করেন। হিন্দু-রচিত কাহিনী কাব্যগ্রন্থগুলি ছিলো দেব-দেবী-নির্ভর। মুসলমান-রচিত কাহিনী কাব্যগুলি স্বাভাবিকভাবেই দেব-দেবীদের বর্জন করে নির্ভর রাখে মুসলিম পুরাকাহিনী, কিংবদন্তী, ইতিহাসের উপরে। এই রোমান্স কাব্যগ্রন্থগুলিতেই প্রথম দেখা দ্যায় মানবিকতা-দেব-দেবী-নির্ভরতার পরিবর্তে মানবীয় সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা; যদিও অলৌকিকতা বা অবাস্তবতার কথা কম ছিলো না। হিন্দু কবিরা কাব্যগ্রন্থের সূচনায় দেব-দেবীদের বন্দনা করতেন, মুসলমান কবিরা কাব্যগ্রন্থের শুরুতে ‘হামদ’ ও ‘নাত’-এ আল্লাহ ও রাসূলের প্রশংসা কীর্তন করতেন। উল্লেখ্য, ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই আরবি-ফারসি গদ্য-পদ্যে সমস্ত গ্রন্থের শুরুতেই এই রীতি অনুসৃত হয়ে এসেছে। বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিকেরা বাংলা সাহিত্যে সেই রীতিই অনুসরণ করেছেন। এইভাবে মুসলমান কবির হাতে প্রথম থেকেই রসুল-প্রশস্তি শুরু হ’য়ে যায়।” (দ্রষ্টব্য ঃ ইশারফ হোসেন সম্পাদিত ‘রসূল (স) কে নিবেদিত কবিতা’-এর ভূমিকা)।
বাংলা সাহিত্যে শুরু থেকেই প্রায় প্রত্যেক মুসলিম কবিই রাসূল-প্রশস্তিমূলক কবিতা, গান, কাব্য ইত্যাদি রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন : শাহ মুহম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, আমির জৈনুদ্দীন খান, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ, সৈয়দ আলাওল, আব্দুল হাকিম, হেয়াত মামুদ, ফকির গরিবুল্লাহ, সৈয়দ হামজা, তাজউদ্দীন, মুনশি মালে মোহাম্মদ, খোন্দকার শামসুদ্দীন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, লালন শাহ, হাসন রাজা, মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, মুনশি মেহেরুল্লাহ, মোহাম্মদ দাদ আলী, শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, বেনজীর আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, আ.ন.ম. বজলুর রশিদ, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, ব’নজীর আহমদ, মুফাখ্খারুল ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ, আজিজুর রহমান, মনিরউদ্দীন ইউসুফ, আ.ক.শ. নূর মোহাম্মদ, আব্দুর রশিদ খান, আব্দুর রশিদ ওয়াসেকপুরী, আব্দুল আজীজ আল-আমান, আব্দুস সাত্তার, আশরাফ সিদ্দিকী, ফজল শাহাবুদ্দীন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ওমর আলী, আল মাহমুদ, আফজাল চৌধুরী, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, মতিউর রহমান মল্লিক, মোশাররফ হোসেন খান, আসাদ বিন হাফিজ, হাসান আলীম, মুকুল চৌধুরী, বুলবুল সরওয়ার, তমিজউদ্দীন লোদী, আহমদ আখতার, গোলাম মোহাম্মদ প্রমুখ।
মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১১), দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬), কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১), মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর) (১৮৬০-১৯৩৩), মুনশি মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭) এঁদের রাসূল-প্রশস্তিমূলক রচনা বা মৌলুদ শরিফ এককালে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরপর কবি গোলাম মোস্তফার (১৮৯৫-১৯৬৪) বিভিন্ন না’ত ও মিলাদশরিফ বাংলাভাষী সকল মুসলমানের নিকট অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এখনো সর্বত্র মিলাদশরিফে তাঁর জনপ্রিয় না’তগুলি গাওয়া হয় এবং বিভিন্ন সময় তা বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়ে থাকে। মধ্যযুগের বিভিন্ন কবির কবিতা থেকে রাসূল প্রশস্তিমূলক কবিতার কয়েকটি চরণ নিচে উদ্ধৃত হলোঃ
নির্ভয় হইয়া সব হরিষ হইল।
সবের মনেতে বহু বিক্রম বাড়িল।।
ধরিয়া নানান অস্ত্র রহিলা রুষিয়া।
তবে নবী মন ভাবি নিজ সৈন্যগণ
বিচক্রিয়া দিলা নবী নিজ সৈন্যগণ।।
(রসুল বিজয় কাব্য ঃ আমির জৈনুদ্দীন খান)
নূর মোহাম্মদ হৈলা যার হোন্তে পয়দা হৈলা
সৃষ্টি কৈলা এ তিন ভুবন।
যার হেতু নিরঞ্জন দুনিয়া করিল সৃজন
আকাশ পাতাল মর্তস্থান।।
আউয়ালে আদম হৈলা খাক হোসেন্ত পয়দা কৈলা
আদম হোন্তে জাহের হৈলা।
যা হোন্তে সিফৎ হৈলা মোহাম্মদ নাম থুইলা
দোস্ত বুলি পয়দা করিলা।।
(হানিফার দিগি¦জয় : সাবিরিদ খান)
আল্লার দোস্ত মোহাম্মদ মানহে তাহান পদ
দরুদ সালাম বহুতর।
তাহার চরণধূলি সর্বাঙ্গে চন্দন মলি
জুড়াউক পরানী কাতর।।
(সতী ময়না-লোর চন্দ্রাণী : দৌলত কাজী)
আরব সহরে প্রভু মোহাম্মদ স্থান।
নিযুজে আরবী বাক্য মুছাফ ফোরকান।।
উরিয়ান সহরেত বাক্য উরিয়ান।
পাঠাএ তৌরাত প্রভু মুছা নবীস্থান।।
ইউনান সহরেত ইউনান ভারতী
নিযুজে জব্বুর প্রভু দাউদের প্রতি।
ছুরিয়ান সহরেত বাক্য ছুরিয়ান
পাঠাএ ইঞ্জিল প্রভু ইছা নবীস্থান।
(আবদুল হাকিম)
আদি অন্তে মহাম্মদ পুরুষ অতুল।
স্থল শূন্য না আছিল, আছিল রসুল।।
আকাশ পাতাল মর্ত্ত্য এ তিন ভুবন।
যার প্রেম রস হন্তে হইতেছে সুজন।।
(দৌলত উজীর বাহরাম খান)
মহাম্মদ আল্লার রসূল সখাবর।
যাঁর নূরে ত্রিভুবন করিছে প্রসর।।
শ্যাম তনু জ্যোতির্ময় সর্বাঙ্গ দাপণি।
নবুওত পৃষ্ঠে যেন জ্বলে দিনমণি।।
(দৌলত কাজী)
প্রথমে প্রণাম করি প্রভু নিরঞ্জন।
দ্বিতীয়ে প্রণাম করি রসূল চরণ।।
তৃতীয়ে প্রণাম করি ফিরিস্তাগণ।
চতুর্থে প্রণাম করি এ তিন ভুবন।।
(খোন্দকার শামসুদ্দিন মোহাম্মদ সিদ্দিকী)
প্রথমে প্রণাম করি প্রভু নিরঞ্জণ।
যাঁহার সৃজন হয় এ তিন ভুবন।।
তৎপরে বন্দনা করি নবীর চরণ।
যাঁহার প্রভাবে হবে অন্তিমে তরণ।।
রছুল বিহনে গতি নাহিত মুক্ত হতে।
সে পদ ভাবহ সবে কায়মনো চিতে।।
(নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী)
দীনের মধ্যে প্রধান হোল মোহাম্মদের দীন
সেই দীনের দীন করলে একিন
সুখে রবে চিরদিন।
(পাগলা কানাই)
আল্লা আল্লা বল ভাই দেলে জানি গাথি।
যে নামের বরকতে হবে আখেরে নাজাতি।।
তাহার মহিমা লিখে সাধ্য আছে কার।
ফেরেশতা আদম জ্বীন সকলে লাচার।।
যত পয়গম্বর আছে আল্লার মকবুল।
আখেরী নবীর হবে শাফায়াত কবুল।।
(সয়ফলমুল্ক বদিউজ্জামাল ঃ মুন্সী মালে মোহাম্মদ)
বন্দো নবী মহাম্মদ যে হইল আহাম্মদ
আহাদ হইতে উপাদান।
একনূর দুই ঠাঁই কইল পরম সাঁই
নূর মহাম্মদ সেহি জান।।
(হেয়াত মামুদ)
তাহার হবিব নবী মোহাম্মদ রছুল।
কেয়ামতে আরজ যার হইবে কবুল।।
লওহ কলম যার এতেক তারিফ।
তার পরে উতারিল কোরান শরিফ।।
সত্তার হইয়া যেবা গেল লামাকান।
নুরে পয়দা করে যারে আপে ছোবহান।।
যার পরে খতম করিল নবুওত।
কেয়ামত তক যার হইবে উম্মত।।
পয়দা করে বাতুনেতে রাখে ছপোইয়া।
আব্দুল্লার ঘরে শেষে দিলেক ভেজিয়া।।
(মোহাম্মদ দানেশ)
যেই দুখে থাকি হে দিনের বেলা
নিশি আসি বাড়ায় দ্বিগুণ জালা
শত মুখ হলে নাহি যায় বলা
চুমি পদে মোহাম্মদ রাসুলোল্লা।
(দাদ আলী)
মদিনায় রসূল নামে কে এল রে ভাই
কায়াধারী হয়ে কেন তার ছায়া নাই।।
কি দিব তুলনা তারে
খুঁজে পাই না এ সংসারে
মেঘে যার ছায়া ধরে ধূপের সময়।।
ছায়াহীন যাহার কায়া
ত্রিভুবনে তারো ছায়া
এ-কথার মর্ম নেওয়া অবশ্য চাই। ।
কায়ার শরীর ছায়া দেখি
যার নাই লা-শরিকি
লালন বলে তার ওয়াকিব বলতে ডরাই।।
(লালন শাহ)
আমি হৈতে
আল্লাহ্ রসুল,
আমি হৈতে ফুল।
পাগলা হাসন
রাজা বলে
তাতে নাই রে ভুল।।
(হাসন রাজা)
আধুনিককালে প্রায় সব মুসলিম কবিই রাসূল প্রশস্তিমূলক কবিতা লিখেছেন। উপরে তাঁদের অনেকেরই নাম উল্লেখিত হয়েছে। নিচে বিশিষ্ট কয়েকজন কবির কবিতা থেকে কতিপয় চরণ উদ্ধৃত হলো ঃ
বর্ষিল বিধি শীর্ষে তোমার আশিস-জাগাতে বিশ্বপ্রাণী
(তাই) কণ্ঠে তোমার ঝঙ্কৃত হল গম্ভীরে পূত কোরান-বাণী।
সুপ্ত ধর্ম উঠিল জাগিয়া জনমে তোমার ধরার তীরে,
কল্যাণ মহাস্বর্গ হইতে আসিল আবার নামিয়া ধীরে।
ধর্মজগতে কর্মীপুরুষ সাধন পথের অগ্রগামী,
জগন্নরের শীর্ষভূবন সর্ব জীবের মুক্তিকামী।
(শাহাদাৎ হোসেন)
হাতে তার দুর্জয় শক্তির যন্ত্র,
জালিমের ক্ষমা নাই-এই তার মন্ত্র,
ত্যাগ, সেবা, সদাচার, মুখে তার স্ফূর্তি,
মহিমায় আলোকিত সৌম্য সে মূর্তি।
(হযরত মোহাম্মদ স. ঃ গোলাম মোস্তফা)
নাই তা-জ
তাই লা-জ?
ওরে মুসলিম, খর্জুর-শীষে তোরা সাজ!
করে তসলিম হর কুর্নিশে শোর আ-ওয়াজ
শোন্ কোন মুঝদা সে উচ্চারে ‘হেরা’ আজ
ধরা-মাঝ।
উরজ য়্যামেন নজদ হেজাজ, তাহামা ইরাক শাম
মেসের ওমান তিহারান স্মরি-কাহার বিরাট নাম
পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি সাল্লাম।’
(ফাতেহা-ই-দোয়াজ্দহম ঃ কাজী নজরুল ইসলাম)
রাসূল নামে
কে এল মদিনায়
আকাশের চাঁদ কেড়ে
ওকে আনল দুনিয়ায়।
(জসীম উদ্দীন)
হাজারো ছালাম লও নবী মুহম্মদ
দুনিয়া জাহান জপে এ নাম-শহদ।
(বে-নজীর আহমদ)
আল্লার আলো-রশ্মি তাঁহার ললাট সহসা চুমে,
বেহেশত হ’তে সে বিদায় মাগে মক্কার মরুভূমে।
জন্মে রাসূল আমিনার ঘরে, তাই হেজাযের পথে
জলসা করিতে জিব্রীল আসে জৌলুস-রাঙা রথে।
(জাগে মানুষের নাম ঃ আবদুল কাদির)
হে মরু সুন্দর, তোমাকে সালাম
নক্ষত্রে আকাশে মেঘে তোমার জীবনের প্রতিচ্ছবি
তুমি কোন চিত্র রেখে যাওনি পশ্চাতে
শিল্পীকে দাওনি আঁকতে, পাছে পূজা করে,
কেননা জীবন্ত তুমি, মূর্তিমান মর্তে ও আকাশে।
(হে মরু সুন্দর ঃ মহীউদ্দীন)
অনন্য পৌরুষে যাঁর সারা বিশ্বে গতির সঞ্চার
চরণে অঙ্কিত যাঁর ফেরশতার সশ্রদ্ধ প্রণতি।
চরিত্রের ভাষ্য তাঁর, কর্মভূমি পৃথিবী আমার,
ছড়িয়ে রয়েছে যেথা চারদিকে অনেকান্ত কাজ।
(মুহাম্মদ : আল্লাহর রাসূল- মনিরউদ্দীন ইউসুফ)

মা আমিনার কোলে এলেন
মুহাম্মদ রাসুল
আরবের মরু বুকে
ফুটলো আলোর ফুল।
(বন্দে আলী মিয়া)
বালাগাল্উলা বি-কামালিহি
হে নবী! শ্রেষ্ঠ তুমি,
সন্দেহ তায় একটু নেহি।
মারহাবা আল আরাবী
খোস লকবি কমলিওয়ালা
জিবরাইল যার কাছেতে
আনল ওহি রোজ নিরালা।
(কাজী কাদের নওয়াজ)
কত যে সুন্দর ছিলে আজো তুমি তেমনি অম্লান
চিরকাল ভক্ত মনে অনুপম নবীজী আমার।
সে-রূপ দেখেছি স্বপ্নে বিমোহিত স্মৃতি বারবার
দুঃখে দৈন্যে আনন্দে ও সান্ত্বনায় পূর্ণ করে প্রাণ।
(কত যে সুন্দর ছিলে ঃ আ.ন.ম বজলুর রশীদ)
করুণার মেঘ আনো চেতনার ঊষর প্রান্তরে
যুগের ক্রন্দন শোন, রাহমাতুল্লিল আলামীন!
সমুদ্র নিখোঁজ হলো আদিগন্ত এই বালুচরে
মৃগতৃষ্ণিকার চক্রে কণ্ঠে জাগে তৃষ্ণা অন্তহীন।
(তালিম হোসেন)
পূর্বাচলের দিগন্ত নীলে সে জাগে শাহানশাহের মত
তার স্বাক্ষর বাতানের আগে ওড়ে নীলাভে অনবরত।
ঘুম ভাঙলোকি হে আলোর পাখী? মহানীলিমায় ভাম্যমাণ
রাত্রি-রুদ্ধ কণ্ঠ হতে কি ঝরবে এবার দিনের গান?
(সিরাজাম্ মুনীরা ঃ ফররুখ আহমদ)
হে পরমাশ্চর্য পুরুষ, হে আমার শিক্ষাদাতা,
আমার আশ্রয়, অবস্থান এবং অবলম্বন
তুমি আমার পরম অভীষ্ট, তুমি প্রবক্তা সকল সত্যের!
তুমি প্রজার প্রমুক্তি,
তুমি আলোর প্রদীপ্ত নিরন্ধ্র অন্ধকারে,
তীর্থযাত্রীদের তুমি পথ নির্দেশক
আকাশের সর্বোজ্জ্বল চন্দ্রাতপ তুমি!
(হে পরমাশ্চর্য পুরুষ ঃ সৈয়দ আলী আহসান)
শাফায়াতের সনদ নিতে
খোদার তরফ হ’তে
দাঁড়ায় এসে আমার মুখ্তার
মুবাহালার পথে।
(মুফাখ্খারুল ইসলাম)
রাসূল নামের দীওয়ানা ভাই
দিল আমার মশগুল।
তাঁহার প্রেমের গজল গেয়ে
প্রাণ আমার বুলবুল।
(আবদুল হাই মাশরেকী)
ঊষর ধূসর আরবের বুকে লক্ষ হায়েনা দল-
হিংস্র কুটিল চক্ষু মেলিয়া করে চলে কোলাহল!
দুগ্ধ পোষ্য শিশুর শোনিতে রাঙায়ে পাষাণ কর-
পথে পথে ফেলে লক্ষ হাজার আজাজিল অনুচর।
(হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঃ আশ্রাফ সিদ্দিকী)
হে সত্যজয়ী
তোমার দরবারে আজ প্রবেশের অধিকার দাও
হে মিথ্যা বিলুপ্তকারী
তোমার মঙ্গলকক্ষে আজ করুণাকিরণ আশ্রয় দাও
হে রাহমাতুল্লিল আলামীন
অন্তর্দ্বন্ধে বিক্ষুব্ধ সমস্ত পথচারীর হৃদয়ের উপর
তোমার রহমত কওসর বর্ষণ কর।
(মদিনার উদ্দেশ্যে ঃ সৈয়দ আলী আশরাফ)
পিতা-পিতামহদের গড়া পুরাতন পথে
সকলে মেলায় যায়, যায় অশ্লীল হল্লায়
পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে হাত ধরে ধরে
রঙ তামাশার তীর্থে যন্ত্রণার উপশম খোঁজে
তুমি এক পিতৃহীন মাতৃহারা
নিংসঙ্গ যাত্রিক
সত্যের সন্ধানী।
(আত্মার আলোকে দীপ্ত ঃ আতাউর রহমান)
তোমার দেখানো পথে
সব ছেড়ে বারবার শুধু ফিরে আসা;
অন্ধকারে ফিরে এসে আলোর প্রত্যাশা।
নাস্তির রঙিন নেশা কেটে গেলে অলক্ষ্যে কখন
অলৌকিক আলো এসে ধরা দেয় হেসে
অস্তির অপার তেজে হেরার আভাস।
(তোমার দেখানো পথে ঃ আবদুর রশীদ খান)
‘পড় তোমার প্রভুর নামে’
নির্জন ান্ধকার হেরা গুহায় উচ্চারিত অমোঘ সে বাণী
প্রথম শুনেছিলেন যিনি থর থর কম্পিত হৃদয়ে-
বাঁধ-না-মানা হৃদয় নিয়ে ছুটে এসেছিলেন
সবচেয়ে আপন জন-প্রিয়তমা পত্মীর কাছে
যাঁর কাছে উন্মুক্ত হলো মহালগ্নের মহাসত্যের
পরম সে প্রথমক্ষণ।
(হে প্রিয় রাসূল আমার ঃ জাহানারা আরজু)
নূরনবী মোহাম্মদ সাল্লুআলা শুয়ে আছেন মদিনায়
কে যাবিরে মদিনাতে দেখবি নবীর রওযায়।
(কে যাবিরে মদিনাতে ঃ আবদুর রশীদ ওয়াসেকপুরী)
সারা মুখমণ্ডলে একটি বিশ্বাসের
অলৌকিক উদ্ভাসন নিয়ে
পা বাড়ালেন তিনি রৌদ্রদগ্ধ প্রান্তরে।
মুহূর্তে চকিত হয়ে উঠলো চারপাশের মৌন পর্বতমালা।
(বিশ্বাসের শিখা ঃ সানাউল্লাহ নূরী)
আতপ্ত মরুতে কবে অন্তঃশীলা স্নিগ্ধ ওয়েসিস
প্রাণ-প্রবাহের স্রোতে বয়ে গেছে আপন লীলায়,
সঞ্চারিত করেছে সে কস্তুরী-সৌরভ মর্মমূলে
রক্তি হয়েছে ফুল ফোটার আনন্দে সাহারায়।
(একটি ফুলের স্মৃতি ঃ মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্)
যে ধর্ম জ্ঞানচিন্তাকে প্রশয় দিয়েছে অবিরাম
বিশ্বাসকে গ্রথিত করেছে অন্তরাত্মায়
যে ধর্মের অন্য নাম শান্তি
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটি ক্রমাগত সংগ্রাম, অবিচ্ছিন্ন উচ্চারণ
যে অঙ্গীকার মানুষের পতাকাকে উড়িয়েছে
কেবল উড়িয়েছে সব কিছুর ঊর্ধ্বে
যে শপথ মানুষ এবং মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখেনি।
(আমার জীবন, আমার অন্তরাত্মা ঃ ফজল শাহাবুদ্দীন)
‘আলিফ হে মি দাল’ এই চার অক্ষরে যে নাম
সে নাম তো আসমানী, অলৌকিক জ্যোতির তারিফ।
স্রষ্টা ও সৃষ্টির এক সমন্বয় সেই নামে, দীপ
যেমন প্রোজ্জ্বল থাকে জায়তুনে তেমনি সে নাম।
(আহমদ ঃ আবদুস সাত্তার)
সভ্যতার ইমারতে শবলুব্ধ শকুনির পাখা
রাত্রির প্রচ্ছায়া আনে। পৃথিবীর চোখে ঘুম নেই-
সূর্যের পতাকাবাহী অতলান্ত অন্ধকারে খেই
হারায়েছে। এ আকাশে কবে সেই সুরংগীন বাঁকা
চাঁদের স্বাক্ষর ছিলো, আজ তারা শুধু প্রবচন-
রাত্রির প্রান্তরে কাঁপে দুর্ভিক্ষ ও ঘৃণ্য মহামারী,
অন্ধকারে স্বার্থ নিয়ে শ্বাপদের মতো কাড়াকাড়ি,
দীর্ঘশ্বাস ফেলে একা প্রলুব্ধ এ-পৃথিবীর মন।
(ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম ঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল)
গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠে আলোর গোলক,
সমস্ত পৃথিবী যেন গায়ে মাখে জ্যোতির পরাগ;
তাঁর পদপ্রান্তে লেগে নড়ে ওঠে কালের দোলক
বিশ্বাসে নরম হয় আমাদের বিশাল ভূভাগ।
(হযরত মোহাম্মদ ঃ আল মাহমুদ)
আমার নিজের ভেতরেই লাখ লাখ আবাবিল পাখি
লাখ লাখ প্রত্যেক চঞ্চুতে এক…দুই…তিনটি পাথর
একটি আবাবিল পাখি এক একবার উড়ছে আর পাথর
ছুঁড়ে মারছে…।
(অপার্থিব কবিতার আবৃত্তি ঃ ওমর আলী)
ইয়া রাসূল সালাম আ’লাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আ’লাইকা…।
যাত্রা হয়েছে শুরু কতকাল আগে
পণ করে ঝুঁকি নিয়ে পথ খুঁজে চলা।
(অনন্ত ধূ ধূ ঃ কে. জি. মোস্তফা)
হে দরদী, সৃষ্টির গৌরব অনুপম!
ভালবাসা তনুমনে দেখেছ মহত্ত্ব মানুষের
সৃষ্টির সকল ভাল, শুভ উপাদানে
বনি আদমের পদার্পণ এ মাটিতে
আশ্বাসের উদ্বেল প্রাণ, সুপ্ত তার দিক নির্দেশনা।
(অনন্য দয়ার শিক্ষা ঃ নুরুল আলম রইসী)
ইয়াসরিবের দুর্গ থেকে জন্মের তারকা আহমদের
ওই দ্যাখো হতবাক হয়ে দেখছে ইহুদী সমাজ।
পৃথিবীর যুগ-যুগান্তের আশা পূর্ণ হলো আজ।
‘সালাম! সালাম!’ ধ্বনি ছেয়ে গেলো সমস্ত জগতে।
(হজরত মুহম্মদ স. ঃ আবির্ভাব – আবদুল মান্নান সৈয়দ)
রাহমাতুল্লিল আলামীনের শহর-মদিনাতুন্নবী (সা)
নাতি উঁচু পাহাড় ও শৈলমালায় শোভিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল
এক প্রশান্ত নগরী, পুরুষ্ট পাতার প্রিয়দর্শী খেজুর বৃক্ষ সর্বত্র
আর বেশি কিছু নেই, সারি সারি খেজুরের ঘন সন্নিহিত উদ্যান
ধূলি ধূসর ও সবুজাভ, খোলা ময়দানে কিছু চাষবাস
আর সকল প্রাচীন ও আধুনিক হর্ম্যরাজির উচ্চতা ছাড়িয়ে
হেরেম শরীফের চারকোণের চারটি মিনার।
(মদিনাতুন্নবী সা. ঃ আফজাল চৌধুরী)
‘আমার সালাম পৌঁছে দিয়ো নবীজির রওজায়’
না, এ ধ্বনি উচ্চারিত হয়নি একবারও।
যাঁরা হাত নেড়ে বিদায় জানালেন
দীর্ঘ প্রবাসে তাঁরাই হয়ে উঠেছিলেন আপনজন।
(সবুজ গম্বুজের নিচে ঃ আসাদ চৌধুরী)
বিগত হয়েছে যেই কাল, এবং বর্তমান কাল
এবং যে-কাল আসবে, অনন্তকাল ব’লে চিহ্নিত
তার যে শ্রেষ্ঠ মানুষ, আল্লাহর বন্ধু যিনি
আমি প্রায়শ কল্পনায় দেখি তাঁর অভাব-গ্রস্ত মুখ।
(মহামানবের মুখ ঃ সিকদার আমিনুল হক)
সূর্যোদয়ের তখনো কিছু বাকি।
আরব-মরুর দিগন্ত-বিস্তৃত প্রান্তর জুড়ে
তখনো অন্ধকারের প্রগাঢ় হাতছানি।
বিশ্ব-প্রকৃতি তখনো গভীর নিদ্রামগ্ন।
(মা আমিনা ঃ মুহম্মদ নূরুল হুদা)
জিব্রিল এলেন।
তুমিই প্রথম উচ্চারণ করলে, ‘পাঠ করো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’
আর আমরা অমনি পাঠ করতে শুরু করলাম। পাঠ করলাম
পৃথিবীকে। পৃতিবীমণ্ডলকে। পাঠ করলাম নীলিমা নক্ষত্র।
(মহা পৃথিবীমানব ঃ আল মুজাহিদী)
আমার প্রথম ঋণ তোমার কাছেই, হে প্রিয় নবী!
তোমারি আলোয় গড়া আমি আমার সবি।
তোমাকে পাবার, তোমারি হবার দুর্বার সাধনা আমার।
(আমার প্রথম ঋণ ঃ সৈয়দ শামসুল হুদা)
সকল শ্রদ্ধার শীর্ষে যে নামের প্রদীপ্ত মহিমা
বিনম্র আমার অশ্র“ খুঁেজ পায় যেখানে আশ্রয়
অবক্ষয় ছিন্ন করে ভেঙে ক্ষুদ্রতার পরিসীমা
আত্মার মিনার জুড়ে তোমার আযান ধ্বনিময়।
(সকল শ্রদ্ধার শীর্ষে ঃ আবদুল মুকীত চৌধুরী)
আমাকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিলে না কেনো
আমার রসূলের রোযার খেজুরে?
কেন দাঁড় করিয়ে রাখলে না আমাকে
সেই কিশোর রাখালের ক্লান্তি ও স্বপ্নের পাশে
মরুদ্যানের দিক থেকে ছুটে আসা হাওয়ার মতো?
(আমার রসূল ঃ আবিদ আজাদ)
আমার সমস্ত বিশ্বাস যেনো একটি বৃক্ষ;
মাটির গভীর অবধি ছড়িয়ে আছে তার মূল;
আর আকাশের বিশালত্বে পল্লবিত তার অজস্র শাখা।
কেউই তাকে এক চুল পারবে না সরাতে।
(আমার বিশ্বাস ঃ মুশাররফ করিম)
স্বপ্নগম্বুজের পাদদেশে তোমার স্মৃতি সত্ত্বা
আজো ইলিক ঝিলিক নৃত্যে ও গানে মশগুল,
আজো তোমার রক্তিম অধর মুগ্ধ এই গোধূলিকে করে
বিমোহিত; তোমার প্রেম স্পর্শে আজো আমার
প্রেমিক হৃদয় উদ্ভাসিত হয়।
(স্বপ্নগম্বুজের পাদদেশে ঃ শাহাদাত বুলবুল)
‘মুহাম্মদ’ এ পৃথিবীতে সবচে সুন্দর নাম,
তাঁর অছিলায়ই তো বেড়ে গেছে সবার দাম।
সুন্দর হয়েছে ধরার ধুলিকাদা রাতের কালো,
চন্দ্র সূর্য হয়েছে ধন্য পেয়ে তাঁর অফুরান আলো।
(হযরত মুহাম্মদ সা ঃ আবদুল হালীম খাঁ)
একটি ছেলের মনের ভিতর অনেক কথা
ঝড়ের মতো উঠতো ফুঁসে ভাঙতো নিরবতা।
যোজনব্যাপী উধাও পাহাড় ফুল-পাখী আর নদী
কার ছোঁয়াতে এমন করে আসছে নিরবধি!
(সব মানুষের সেরা ঃ সাজ্জাদ হোসাইন খান)
আমার নবীর মোবারক নাম অন্তরে তোলে ঢেউ
ছয় লতিফায় যিকির করতে গলদ করোনো কেউ
ওই নামেতে পড়তে দরূদ হৃদয় হয় বুলবুল
নিখিল জগত পায় খুঁজে পায় বেহেশতেরই গুল।
(ঘুচাও সকলে অতীতের অভিশাপ ঃ জাহাঙ্গীর হাবীবউল্লাহ)
সমুদ্রের উদর থেকে লাফিয়ে ওঠা একটি গোলক অথবা
বৃক্ষের আড়াল থেকে দ্রুত ধাবমান
লৌকিক কোন আলোর গম্বুজও
চিনে নিলো একজন উজ্জ্বল শিশু।
(আর এক সূর্যের গান ঃ মতিউর রহমান মল্লিক)
মুহাম্মদ মানুষের নিত্যদিনের বাতাস পানি এবং
মৃত্তিকা সংলগ্নতার মতো
কেন এতোটা অনায়াসে অধিকার করে আছেন
আমাদের আঙিনার সবটুকু আকাশ
আপনি এমন কেন?
এখন আমি এই আকাশর আশ্রয় পরিত্যাগ করি কিভাবে।
(জ্যোতিষ্ক মেঘের বাতিঘর ঃ আবদুল হাই শিকদার)
আমি চাবিটা হাতের মুঠোয় পুরে আনন্দে চিৎকার করে উঠলামঃ
মুহাম্মদ, জীবন ও জগতের সব ক’টি দরোজা খোলার হে অলৌকিক
চাবির বাহক, তুমিই কি তবে তামাম পৃথিবীর সম্রাট প্রেরিত মহান
পুরুষ আর আমি সত্য সরোবরে সঞ্চরণশীল কোন আদিম প্রাণীর
অনিবার্য অধঃস্তন।
(অলৌকিক চাবির বাহক ঃ আসাদ বিন হাফিজ)
এমন অস্থির কালে কে এলো আলোর পথে একা,
কেউ নেই, শূন্য মরু, দু’একটি স্বপ্ন শুধু দোলে।
সত্যের আকাশে সেই অনির্বাণ স্বপ্নের ইঙ্গিত,
খর্জ্জুর বীথির সাথে ফিসফাস বাক্যালাপ করেঃ
অন্ধকার ভেদ করে এইবার এসেছে সৈনিক,
অবারিত আরাফাতে বজ্রকণ্ঠে বিশাল পুরুষ-
প্রতিনিধি, ভয়হীন মুষ্ঠিবদ্ধ সাম্যের শপথ।
(এমন অস্থির কালে ঃ রেজাউদ্দিন স্টালিন)
উৎসারিত জলাধার প্রেমের প্রাবল্যে যদি মুক্তি পায় প্রণয়ীর কাছে
শূন্য নয় এ আকাশ-মেঘের অতলে জাগে তারা
দৃষ্টি যদি মেলে ধরে আত্মায় সন্ধানী চোখঃ সে আছে, সে আছে।
(মুহাম্মদ স. ঃ বুলবুল সরওয়ার)
তোমার শুভ্রতার বিতানে প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে
বিদায় করি অগণিত প্রতীক্ষার বসন্ত
ছুঁতে পারিনে তবু তোমাকে; কী যেন এক বেদনার অনন্ত
মর্মাদহে পুড়ে পুড়ে খাঁক হই ভস্ম করি অনন্তর।
(ধবল জোছনার প্রার্থনায় ঃ মোশাররফ হোসেন খান)
কেটে গেছে কিছুদিন তোমার রওযা মোবারকে
প্রতিক্ষণে প্রতিপলে জ্বলেছিলে আমার হৃদয়ে।
ক্ষতমন হতমন ভিজিয়েছি প্রেমের আরকে
তোমাকে নিবিড়ভাবে হে রাসূলঃ মৃন্ময় চিন্ময়ে।
সবুজ গম্বুজতলে প্রতিদিন জমায়েত হয়ে
অসংখ্য ভক্ত প্রেমিক জ্বালিয়েছে হৃদয়ের মোম
কবুতর বক্ষ কেটে কেউ কেউ আন্দ হৃদয়ে
হয়েছে তোমার প্রেমে অনুপম অনঘ রূপম।
(তোমার রওযা মোবারক ঃ হাসান আলীম)
আজ তোমার আশিকের কোনও অভাব নেই
বক্তৃতায় সমাবেশে বর্ণাঢ্য মিছিল-সারি সারি পাগলপারা
কণ্ঠে আওয়াজ তোলে-হে রাসূল, হে রাসূল
আজ তোমার মাহফিলে অগুণতি মানুষ কাতারে কাতার
হাসে কাঁদে, শ্লোগান তোলে-হে রাসূল হে রাসূল!
(আকুতি ঃ সোলায়মান আহসান)
জীবন মধ্যাহ্ন। শান্ত, চিন্তামগ্ন এক মানুষ। শুভ্র ও লোহিত বর্ণের,
যেন পূর্ণিমার চাঁদ। হাঁটছেন রাজপথে। দৃঢ় পদক্ষেপে।
ন্যুজ অথচ স্বচ্ছন্দে। আয়ত নয়নে-যেন উপর থেকে নীচে অবতরণ করছেন।
চারপাশে ধ্বনি জেগে ওঠে ঃ ‘আল-আমীন’, ‘আল-আমীন’!
ঐ তো আমাদের ‘আল-আমীন’ যাচ্ছেন।
(অভিষেক ঃ মুকুল চৌধুরী)
তোমাকে ধারণ করলেই
লাফিয়ে ওঠে সমুদ্র, পর্বতের সানুদেশ খলখল হাসে
পিপাসার্ত বেদুঈনদের তৃষ্ণা নিবারিত হয় নিমেয়ে
আকাশের অদৃশ্য প্রাচীর ভেদ করে নেমে আসে নক্ষত্রের আলো।
(তোমাকে ধারণ করলেই ঃ তমিজ উদ্দীন লোদী)
প্রতিপক্ষে কেউ নেই-সূর্য কিংবা চাঁদ
নক্ষত্রপুঞ্জ আর সাত সমুদ্রের স্রোতধারা
রাত্রির গহীন থেকে উজ্জ্বল দিনের উপমা
চেতনা নিবিড় হলে শুধু শুনি মুহাম্মদ সালাম
গরীয়ান শব্দাবলী ঝংকৃত ইথারে ইথারেঃ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
(ভালোবাসা অন্তহীন ঃ আহমদ আখতার)
একবার চেয়ে দেখো!
বসনিয়ার শান্তির ঘরে এখন দাউ দাউ আগুন
বিশ্বাসী মানুষের করোটি এবং কঙ্কালের স্তুপ ডিঙিয়ে
রক্ত পিপাসু হায়েনার দল ছড়িয়ে দিচ্ছে
নতুন নতুন যুদ্ধ
আর জাতিসংঘের ভূমিকা ধূর্ত শেয়ালের মত।
(চেয়ে দেখো ঃ গোলাম মোহাম্মদ)
বাংলা সাহিত্যে রাসূল-প্রশস্তিমূলক রচনায় কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) অবদান সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। তাঁর অসংখ্য গান ও কবিতায় রাসূল-প্রশস্তির যে পরিচয় পাওয়া যায় তা ভাব, কবিত্ব, ভাষা ও ছন্দ সুষমায় অনবদ্য। এখানে উদ্ধৃত তাঁর ফাতেহা-ই-দোয়াজ্দহম কবিতাটি বিশালত্বে, ভাবগাম্বীর্যে এবং ভাষা ও বর্ণনার লালিত্যে বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ ও মূল্যবান কবিতা। নজরুলের পরে এক্ষেত্রে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কবি হলেন ফররুখ আহমদ। ফররুখ আহমদের ‘সিরাজুম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। রূপক-উপমা প্রতীকের ব্যবহারে, ভাষা ও বর্ণনার মাধুর্যে, ভাব ও আবেদনের অতলস্পর্শী দ্যোতনায় তাঁর এ কবিতাটি কালোত্তীর্ণ এক অমর কবিতা হয়ে উঠেছে। বাঙালি মুসলিম কবিদের প্রায় সকলেই রাসূল-প্রশস্তিমূলক কবিতা লিখেছেন। অনেকে রাসূলের উপর পূর্ণাঙ্গ কাব্য রচনা করেছেন। এছাড়া, রাসূলের পূর্ণাঙ্গ জীবনী ও তাঁর সংগ্রামময় জীবনের অসংখ্য ঘটনা, কাহিনী ও অমূল্য উপদেশমূলক বিষয়াদি নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। আরবি, ফারসি, ইংরাজি, উর্দু, ফরাসি, তুর্কি ইত্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এ জাতীয় অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বাংলা ভাষায়ও এ জাতীয় গ্রন্থের সংখ্যা নিরূপণ করা সুকঠিন। এককথায় বলতে গেলে, পৃথিবীতে এককভাবে এত বেশি গ্রন্থ দ্বিতীয় কোন মহামানবকে নিয়ে রচিত হয়নি।
সংক্ষেপে বলা যায়, রাসূলে করিম স. পৃথিবীর সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর সম্পর্কে রচিত গ্রন্থাবলীও অন্য যেকোন মহামানবের উপর রচিত গ্রন্থসংখ্যার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এককভাবে কোন মহামানবের উপর বাংলা ভাষায় রচিত এ জাতীয় কবিতা, কাব্য ও গ্রন্থের সংখ্যা সর্বাধিক। এরদ্বারা রাসূলের শান ও উচ্চ মর্যাদার বিষয় আমরা সম্যক অবগত হতে পারি।