শরতের কাশফুলে মুগ্ধ হয় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কাশফুল নদী তীরে বনের প্রান্তে অপরূপ শোভা ছড়ায়। গাছে গাছে শিউলির মন-ভোলানো সুবাসে প্রকৃতি হয়ে উঠে মায়াময়। শরৎকালে কখনো কখনো বর্ষণ হয়, তবে বর্ষার মতো অবিরাম নয়। বরং শরতের বৃষ্টি মনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে তোলে রূপময়। ভাদ্র-আশ্বিন এ দু’মাস শরৎ ঋতু। বর্ষার পরের ঋতু শরৎ। তাই শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতি থাকে নির্মল স্নিগ্ধ।শরতের্ আকাশের মতো আকাশ আর কোন ঋতুতে দেখা যায় না।শরৎ কালের রাতে জ্যোৎস্নার রূপ অপরূপ। মেঘ মুক্ত আকাশে যেন জ্যোৎস্নার ফুল ঝরে। চাঁদের আলোর শুভ্রতায় যেন আকাশ থেকে কল্পকথার পরীরা ডানা মেলে নেমে আসে পৃথিবীতে। অপরূপ বিভাও সৌন্দর্যের কারণে শরৎ কাল কে বলা হয়ে থাকে ঋতু রাণী। মানুষ মাত্রই শরৎ কালে প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য দেখে মোহিত না হয়ে পারেনা। ভাবাতুর করে তোলে কবির ভাবুক মনকে। কবি মন আনন্দে নেচে উঠে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। প্রবল আবেগ আর উৎসাহ এসে জমা হয় কবি-সাহিত্যিকের মনোজগতে। সৃষ্টি করে চলে তারা অমীয় সুধা, সৃষ্টি করেন নতুন নতুন সাহিত্য কর্ম।

চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম কবির রচনায়ও শরৎকাল তার নান্দনিক ব্যঞ্জনা নিয়ে উদ্ভাসিত। বৈষ্ণব সাহিত্যেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ভাদ্র মাস কে নিয়ে বৈষ্ণব পদাবলীর এই পদটি সম্ভবত বিদ্যাপতি রচিত রাধা বিরহের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ।

“এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/শূন্য মন্দির মোর।।” বাঙলা সাহিত্য জগতে ‘মেঘদূত’ কাব্যের জন্য বিখ্যাত মহাকবি কালিদাসও শরৎ বন্দনায় ছিলেন অগ্রবর্তী। তিনি বলেন- “প্রিয়তম আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎ কাল সমাগত।” কবি ‘ঋতুসংহার’ কাব্যে শরৎ কাল বিষয়ে লিখেছেন, ‘কাশ ফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালি ধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নব বধূর মতো শরৎকাল আসে।’ কবি কল্পনায় শরতের সাথে প্রকৃতি ও নারীর এই উপমা দেখে বিস্ময়াভিভূত না হয়ে উপায় নেই। আবার বাংলা সাহিত্যের আদি মধ্যযুগের কবি চণ্ডী দাস তার কবিতায় বলেন, “ভাদর মাঁসে অহোনিশি অন্ধকারে।/শিখি ভেক ডাহুক করে কোলাহলে/তাও না দেখিবোঁ যঁবে কাহ্নাঞ্চির মুখ।/চিন্তিতে চিন্তিতে মোর ফুটি ফুটি জায়িবে বুক।/আশিন মাসের শেষে নিবিড়ে বাবিধী/ মেঘ বাহিআঁ গেলেঁ ফুটিবেক কাশী।”

মধ্যযুগের ধারাবাহিকতা শেষে আধুনিক যুগের কবিদের কবিতায়ও শরতের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ও গানে শরতের বন্দনা লক্ষণীয়। তিনি শরৎ নিয়ে প্রচুর কবিতা-গান রচনার মধ্যদিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও সুবাসিত করেছেন। তিনি বলেছেন – “শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি /ছড়িয়ে গেলছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি। /শরৎ,তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে /বনের পথে লুটিয়েপড়া অঞ্চলে /আজ প্রভাতের হৃদয়ওঠে চঞ্চলি।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশিরভাগ রচনায় যেমন রয়েছে অধ্যাত্মবাদের ছোঁয়া তেমনি রয়েছে প্রকৃতির জয়গান। তিনি পদ্মায় বোটে ভ্রমণকালে শরতের ময়ূরকণ্ঠী নীল নির্মল আকাশে শিমুল তুলার মতো শুভ্র মেঘেদের দলবেঁধে ছুটে বেড়ানো দেখে লিখেছিলেন, “অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া…’ তাঁর উল্লেখযোগ্য শরৎ পঙক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা’, ‘ওগো শেফালি বনের মনের কামনা’,‘সকল বন আকুল করে শুভ্র শেফালিকা’, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ’, ‘শিউলি সুরভিত রাতে বিকশিত জ্যোৎস্নাতে’, ‘শরৎ প্রাতের প্রথম শিশির প্রথম শিউলি ফুলে’, ‘হৃদয় কুঞ্জবনে মঞ্জুরিল মধুর শেফালিকা’। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের হাতেই শরৎকালীন প্রকৃতির অমেয় রূপ কাব্য- সাহিত্যে চিরন্তন হয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরই শরৎ বন্দনায় এগিয়ে রয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ‘বিদ্রোহী কবি’র তকমা কপলে আঁকা লৌহমূর্তিরূপ এ কবিও শারদশ্রী দেখে আপ্লুত হয়ে শরৎবন্দনায় রচেনÍ“এল শারদশ্রী কাশ-কুসুম-বসনা/রসলোক বাসিনী/লয়ে ভাদরের নদী সম রূপের ঢেউ/মৃদু মধূহাসিনী।/যেনো কৃশাঙ্গী তপতী তপস্যা শেষে/সুন্দর বর পেয়ে হাসে প্রেমাবেশে।”

বাঙলার প্রকৃতিতে শরৎ মানেই নদীর তীরে তীরে কাশফুলের সাদাহাসির প্লাবন। মাঠে মাঠে সবুজের মেলা। সত্যিকার অর্থে শরতের মন মাতানো প্রকৃতি তেমন কি যে খুঁজে ফেরে, তা বোঝা বড়ই মুশকিল! প্রকৃতির মতো রোদ-বৃষ্টির দোদুল্য মানতায় মনের মধ্যেও যেন অভিমানের মেঘ জমে।আবার কখনও হয়ে ওঠে রৌদ্র করোজ্জ্বল। কবি জসীম উদ্দীন শরৎকে দেখেছেন ‘বিরহী নারী’ হিসেবে। তিনি বলেন “গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস,/বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস।/আজকে আসিবে কালকে আসিবে, হায় নিদারুণ আশা,/ভোরের পাখির মতন শুধুই ভোরে ছেয়ে যায় বাসা।”

রূপসী বাংলার কবি, নির্জনতার কবি, বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে বাঙলার প্রকৃতি, যেখানে শরতের সার্থক উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। তিনি ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের ‘এখানে আকাশনীল’ কবিতায় বলেন-
“এখানে আকাশ নীলÑনীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল/ফুটে থাকে হিম শাদা রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;/আকন্দ ফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ/রৌদ্রের দুপুর ভ’রেÍ বারবার রোদ তার সুচিক্বণ চুল/কাঁঠাল জামের বুকে নিঙড়ায়ে; দহে বিলে চঞ্চল আঙুল/বুলায়ে বুলায়ে ফেরে এইখানে জাম লিচু কাঁঠালের বন,/ধনপতি, শ্রীমন্তের, বেহুলার, লহনার ছুঁয়েছে চরণ;/মেঠো পথে মিশে আছে কাক আর কোকিলের শরীরের ধূল,”

কবি বিনয় মজুমদার তার শরৎ বন্দনায় শ্বেতশুভ্র শরতের মেঘমালার চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে – “শরতের দ্বি-প্রহরে সুধীর সমীর-পরে জল-/ঝরা শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায়; ভাবি,/একদৃষ্টে চেয়ে, যদি ঊর্ধ্ব পথ বেয়ে শুভ্র অনাসক্ত প্রাণ অভ্র ভেদি ধায়!” কবি শামসুর রহমান তার কবিতার চরণে শরৎকে তুলে ধরেছেন- “ জেনেছি কাকে চাই, কে এলে চোখে ফোটে/নিমেষে শরতের খুশির জ্যোতিকণা।”
‘স্মৃতিময় শারদীয় হাওয়া’ কবিতায় সৈয়দ শামসুল হক শরতের প্রতি তার অসীম মুগ্ধতা আর বিস্ময় প্রকাশ করতে গিয়ে লিখেছেন –
“সে কী বিস্ময়! কী যে বিস্ময়! কী করে ভুলি!/আকাশের নীল ঘন শাদা মেঘ, কবেকার গ্রামপথে ডুলি!/নাইওরে যাচ্ছে বউ! একদিন চুল তার দেখি নাই কারও চুল দীর্ঘ এতটা/আজ এই নগরের অ্যাভেনিউয়ে এসে যেই দাঁড়ালাম/সেদিনের কিশোর বেলাকার এই আমাকে বললাম/ওরে থাম! থাম!”

কবি নির্মলেন্দু গুণের কাশফুলের কাব্যে শরৎ এসেছে সরাসরি। কোথাও কোনো ভণিতা নেই। কাশবনের নয়নাভিরাম দৃশ্যে কবি মুগ্ধ । কাশবনের ধারে কবি এক কাশকন্যাকে দেখতে পান; কালো খোঁপায় গোঁজা সাদা কাশফুলে কাশকন্যাকে শরতের রাণী মনে হয়েছে কবির কাছে। তাই কাশকন্যার ক্রীতদাস হতেও দ্বিধা নেই কবির। কবি বলেন- সবে তো এই বর্ষা গেল/ শরৎ এলো মাত্র,/এরই মধ্যে শুভ্র কাশে/ ভরলো তোমার গাত্র।/ক্ষেতের আলে মুখ নামিয়ে/ পুকুরের ঐ পাড়টায়/হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে/ বাঁশবনের ঐ ধারটায়/আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে/ মাটির দিকে নুয়ে/দেখি ভোরের বাতাসে কাশ/ দুলছে মাটি ছুঁয়ে।/পুচ্ছ তোলা পাখির মতো/ কাশবনে এক কন্যে,/তুলছে কাশের ময়ূর চূড়া/ কালো খোঁপার জন্যে।/প্রথম কবে ফুটেছে ফুল/ সেই শুধু তা জানে/তাই তো সে তা সবার আগে/ খোঁপায় বেঁধে আনে।/ইচ্ছে করে ডেকে বলি/ ‘ওগো কাশের মেয়ে,/আজকে আমার চোখ জুড়ালো/ তোমার দেখা পেয়ে।/তোমার হাতে বন্দী আমার/ ভালোবাসার কাশ,/তাই তো আমি এই শরতে/ তোমার ক্রীতদাস।”

শরতের রূপবৈচিত্র্যের কথা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। শরতের শিউলি ঝরা ভোর আমাদের অন্তরজুড়ে স্নিগ্ধতার প্রলেপ বিছিয়ে দেয়। ক্ষণিকের অতিথি এই শরৎ। শরতের এ সময়টা শস্যপূর্ণা। ধানক্ষেত এ সময় ফল সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। মাস দু-এক পরেই কৃষকের গোলা ভরবে ধানে। কিষাণীর নোলক দোলানো হাসি বলে দেবে পরিতৃপ্তির কথা। শরৎ আনন্দের ঋতু। শরৎপূর্ণতার ঋতু, প্রাচুর্যের ঋতু। এমনি ঋতুকে কি ভুলে থাকা যায়?

পরিশেষে বলা যায়, শরত প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় যার আবেশে অতি সাধারণ মানুষ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়। শরত অবসাদগ্রস্ত মনেও নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। তাই তো আমরা প্রকৃতিতে দেখি, এই ঋতুতে কি অপূর্ব রঙের খেলা, কি অপরূপ রঙিন ভুবন সাজায় প্রকৃতি। শরতে প্রাণবন্ত রূপ নিয়ে হেসে ওঠে গ্রাম বাংলার বিস্তৃত দিগন্ত । তাইতো রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হয়- “শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে, আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে।।”