নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ বিভিন্ন দেশে প্রাচীনকাল থেকে চালু আছে। এর মধ্যে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বিধৃত। ‘নববর্ষ’ অর্থে বছরের প্রথম দিন বুঝায়। ঐদিন বিভিন্ন উৎসব-আনন্দের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়াকে নববর্ষ উদ্যাপন বলা হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সন-তারিখ চালু আছে। প্রত্যেক সন বছরের ঠিক একই দিনে শুরু হয় না। তাই বিভিন্ন সনের প্রথম দিন বা নববর্ষও সারা বিশ্বে একই দিনে পালিত হয় না। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সন অনুযায়ী সারা বিশ্বে বিভিন্ন দিনে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়।
ইংরাজগণ তথা বিশ্বব্যাপী খ্রীস্টান সম্প্রদায় ইংরাজি নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ ১লা জানুয়ারি নববর্ষ হিসাবে উদ্যাপন করে। ৩১শে ডিসেম্বরের রাত বারোটার পর থেকে তাদের নববর্ষ শুরু হয়। ইয়াহুদীদের নিকট নববর্ষ ‘রাশহাস্না’ নামে পরিচিত। প্রাচীন পারস্য তথা বর্তমান ইরান সাত দিনব্যাপী ‘নওরোজ’ উৎসব পালনের মাধ্যমে নববর্ষ উদ্যাপন করে। হিজরী সন শুরু হয় আরবি মাসের ১লা মহররমে। বাংলা নববর্ষ শুরু হয় ১লা বৈশাখে। এভাবে বিভিন্ন সন বছরের বিভিন্ন সময়ে শুরু হয়। ফলে তা উদ্যাপিতও হয় বিভিন্ন দিনে।
প্রত্যেক দেশ বা জাতিই তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান ও দেশীয় প্রথানুযায়ী নববর্ষ উদ্যাপন করে থাকে। প্রত্যেকের নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি-নীতি লক্ষ্য করলে এটা সহজেই বোঝা যায় যে, গোড়ার দিকে ধর্মীয় বিধি-বিধানই নববর্ষ উদ্যাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে একমাত্র হিজরী নববর্ষ ব্যতীত অন্য সকল নববর্ষ উদ্যাপনে দেশীয় রীতি-নীতি, প্রথা ও সংস্কৃতির প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মের বহিরাবরণে সাধারণ মানবিক আচার-আচরণ, প্রথা, সংস্কার ও সংস্কৃতিই এখন ক্রমান্বয়ে নববর্ষ উদ্যাপনের প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে।
একমাত্র হিজরী নববর্ষ এর ব্যতিক্রম। হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনে দেশীয় বা আঞ্চলিক রীতি-নীতি প্রথার কোন প্রভাব নেই। শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রেরণা থেকেই বিশ্বব্যাপী মুসলমানগণ আবেগ-অনুভূতির সাথে এ দিনটি পালন করে থাকে। অন্য ধর্মাবলম্বীরা যেভাবে তাদের নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে থাকে হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনের পদ্ধতি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনে তেমন কোন জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠান করার রেওয়াজ নেই। বড়জোর, ঐদিন ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে হিজরী সনের উৎপত্তি তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য আলোচনা করা হয়। কেউ কেউ দোয়া-দরূদ পড়ে, মিলাদ শরীফ পড়ে, নফল রোযা রেখে, নফল নামায পড়েও দিনটি উদ্যাপন করে থাকে। বাহ্যিক কোন অনুষ্ঠান বা আনন্দ-স্ফুর্তির ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বে ঐদিনে কেউ কখনো করে না। হিজরী সনের বিভিন্ন মাস ও তারিখ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগী ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। সেদিক থেকে হিজরী সনের একটি আন্তর্জাতিক রূপ রয়েছে। হিজরী নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্যেও এক ধরনের ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের পরিচয় পরিস্ফূট হয়ে ওঠে।
মুঘল আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে সরকারী সন ছিল হিজরী। এখনো বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় কাজে হিজরী সনকে মান্য করা হয়। মুঘল সম্রাট আকবর খাজনাদি আদায় ও অন্যান্য রাজকর্ম সম্পাদনের সুবিধার জন্য নতুন সন তথা বাংলা সন প্রবর্তন করলেও তারা ১লা মহররম বা ১লা বৈশাখ এ কোনটাতেই নববর্ষ পালন করতেন না। সম্রাট আকবর পারস্যে প্রচলিত সন অনুযায়ী ‘নওরোজ’ উৎসব পালন করতেন। মুঘল আমলে সব শাসকগণই মহা ধুমধামের সাথে ‘নওরোজ’ উৎসব পালন করতেন। পরবর্তীতে সম্রাট আকবর যেমন বাংলা সন প্রবর্তন করেন, তেমনি ‘এলাহি সন’ নামেও একটি নতুন সন প্রবর্তন করেন। এলাহি সনের প্রথম দিনে তিনি ‘নওরোজ’ উৎসব পালনেরও ব্যবস্থা করেন। নওরোজ উৎসব ছিল সম্পূর্ণ পারস্যের রীতি অনুযায়ী। এতে ইসলাম-পূর্ব পারসিক রীতি-রেওয়াজ অনুসৃত হতো, ইসলামী ভাবধারার কোন প্রতিফলন এতে পরিলক্ষিত হতো না। আকবর-প্রবর্তিত বাংলা সন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থায়িত্ব লাভ করলেও এলাহী সন তেমন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি। ফলে তা স্থায়ী হয় নি।
প্রায় অর্ধ সহস্র বছর পূর্বে বাংলা সনের উৎপত্তি ঘটলেও বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদ্যাপনের কোন প্রাচীন ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বহুজাতির বাস। প্রাচীন যুগ থেকে এখানে দ্রাবিড়, আর্য-অনার্য, জৈন, বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান ইত্যাদি জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বসবাস। এখানে বসবাসকারী কোন জনগোষ্ঠীই কখনো বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করেছে বলে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনামলের শুরু থেকে এখানে বাঙালি মুসলমানরা ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে হিজরী নববর্ষ পালন করে এসেছে। সম্রাট আকবরের আমলে বাংলা সন প্রবর্তিত হলেও বাঙালি মুসলমানগণ কখনো বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদ্যাপন করেছেন বলে জানা যায় না। স্বাধীন বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ মুসলমান। তাদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাংলা নববর্ষ অনুযায়ী পালিত হয় না। ইসলামের সকল উৎসব-অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় বিধি-বিধান হিজরী সন হিসাবে নির্দিষ্ট। সে হিসাবে এটা আন্তর্জাতিক ও বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য এক ও অভিন্ন। পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ সম্পূর্ণ অভিনব ও সাম্প্রতিক কালের উদ্ভাবনা।
হিন্দুদের বার মাসে তের পার্বণের রেওয়াজ থাকলেও পয়লা বৈশাখে নির্দিষ্ট কোন পার্বণ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নেই। তাদের চৈত্র-সংক্রান্তির অনুষ্ঠান মূলত চৈত্রের শেষ দিনে উদ্যাপিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা অবশ্য চৈত্র মাস অতিক্রম করে অনেক সময় বৈশাখ মাসের কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু তাই বলে তা কখনো নববর্ষের উৎসব হিসাবে গণ্য হয় না, চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা বা উৎসব হিসাবেই তা সকলের নিকট পরিচিত। তাছাড়া, চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে যে নির্দয় অনুষ্ঠানাদি সংঘটিত হয়, তা কোন আনন্দানুভূতির প্রকাশ নয়। অতএব নববর্ষের উৎসব হিসেবে তা গণ্য হবার আদৌ উপযুক্ত নয়।
বৌদ্ধদের কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানও ১লা বৈশাখে উদ্যাপিত হয় না। ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ নামে তাদের যে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান তা বৈশাখ মাসে পূর্ণিমার রাতেই উদ্যাপিত হয়ে থাকে। ঐদিন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জš§ দিন হিসাবে এটা সারা বিশ্বে বৌদ্ধদের নিকট অতি পবিত্র দিন। তাই তারা বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেই বৈশাখী পূর্ণিমা উদ্যাপন করে থাকে। কিন্তু ১লা বৈশাখ বা নববর্ষ হিসেবে তাদেরও কোন নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান নেই। একসময় বৌদ্ধ পাল যুগে বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির একাধিপত্য চলছিল, তখনো ১লা বৈশাখে তারা কখনো নববর্ষের কোন উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বলে জানা যায় না।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে মাত্র দুটি অনুষ্ঠানের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। একটি ‘হালখাতা’ ও অন্যটি ‘পূণ্যাহ’। সাধারণত জমিদারগণের বকেয়া খাজনাদি আদায়ের জন্য ‘পূণ্যাহে’র আয়োজন করা হতো। ব্যবসায়ী-মহাজন, সুদে টাকা লগ্নীকারী, সোনা-রূপা বন্ধককারীগণ বকেয়া পাওনা ও সুদের টাকা উসূল করার জন্য ‘হালখাতা’র আয়োজন করতো। রাজস্ব-বর্ষের শেষ মাস হিসাবে সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে পূণ্যাহ এবং বর্ষ শুরুর মাস হিসাবে বৈশাখের প্রথমার্ধে হালখাতা পালিত হতো। ফসলাদির অবস্থা ও প্রজাসাধারণের আর্থিক সঙ্গতির কথা বিবেচনা করে এ দুটি অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ ঠিক করা হতো। ‘হালখাতা’র আয়োজন তো সারা বৈশাখ মাস ধরেই চলতো, এবং এখনো এভাবেই চলে আসছে। কিন্তু বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখের সাথে এ দুটি অনুষ্ঠানের কোন সম্পর্ক-সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।
জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে পূণ্যাহের অনুষ্ঠান অবান্তর হয়ে পড়েছে। এখন সেটা কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন কোন উপজাতির মধ্যেই প্রচলিত রয়েছে। হালখাতার রেওয়াজ অবশ্য এখনো আছে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি ব্যবসায়ীগণ দীর্ঘকাল থেকে হালখাতার আয়োজন করে আসছে। ‘হাল’ অর্থ চলতি, ‘খাতা’ অর্থ হিসাব বা হিসাবের খাতা। দুটোই ফারসি শব্দ, একত্রে এ দুটি শব্দের অর্থ হলো নতুন হিসাব বা পুরাতন বছরের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খোলা।
পুরনো বছরের বকেয়া আদায় করে নতুন বছরের শুরুতে নতুন হিসাবের খাতা খোলার পদ্ধতি হিসাবে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের জন্য হালখাতা একটি পুরনো রেওয়াজ। কিন্তু তাই বলে এটাকে নববর্ষের অনুষ্ঠান বলা যায় না। এটা একটি মহাজনী পদ্ধতি। ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে এর যতটা সম্পর্ক, বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ততটা নয়, বাংলা নববর্ষের সাথে তো নয়ই। কারণ অনিবার্যভাবে এ অনুষ্ঠান কখনো ১লা বৈশাখে উদ্যাপিত হয় না, আগে যেমন এখনো তেমনি বৈশাখের শুরুর দিকে অথবা বৈশাখ মাসের যে কোন দিন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। তাছাড়া, এ অনুষ্ঠান কেবল স্বল্প সংখ্যক ব্যবসায়ী-মহাজন ও টাকা লগ্নীকারীদের, তাদের বকেয়া টাকা উসূল বা লগ্নীকৃত টাকার সূদ আদায়ের উপলক্ষ হিসাবে এ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। বিপুল সংখ্যক দরিদ্র শ্রেণীর খদ্দের তাদের গাঁইটের পয়সা দিয়ে মহাজনের পাওনা শোধ করার বা উচ্চহারে সূদের টাকা পরিশোধ করার জন্য যে অনুষ্ঠানে যোগদান করে সেটাকে সর্বজনীন আনন্দোৎসব বলা যায় কী ভাবে? এ অনুষ্ঠান সকলে মিলে কোন একটি নির্দিষ্ট দিনেও পালন করে না। যার যার সুবিধামত দিন-ক্ষণ অনুযায়ী এর আয়োজন করে থাকে। সে কারণেও এটাকে সর্বজনীন বলা যায় না। তাছাড়া, হিন্দু সমাজ ও মুসলিম সমাজের হালখাতা পালনের পদ্ধতিও ভিন্ন। হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের ভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ অনুষ্ঠান পালিত হয়। ফলে এতে কোন একক বাঙালি সংস্কৃতি নয়, বরং বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে থাকে।
বৈশাখ মাসে উদ্যাপিত আর একটি অনুষ্ঠানের নাম ‘নবান্ন’। নতুন ফসল ঘরে তোলার পর যে অনুষ্ঠান করা হয় সেটাই নবান্ন অনুষ্ঠান। কিন্তু এটা পালনেরও কোন নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ নেই। তাছাড়া, শুধু বৈশাখ মাসেই নয়, পৌষ মাসেও আমন ধান কাটাকে উপলক্ষ্য করে নবান্ন অনুষ্ঠান করা হয়। বলাবাহুল্য, এ অনুষ্ঠানটিও হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় চিরকাল ভিন্ন রীতি-পদ্ধতিতে উদ্যাপন করে আসছে।
আগের দিনে খুব ঘটা করে নবান্নের অনুষ্ঠান হতো। এটা অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটার মৌসুমে একবার এবং বৈশাখে আউস ধান কাটার মৌসুমে আরেকবার অনুষ্ঠিত হতো। বলাবাহুল্য, এক্ষেত্রেও হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। উভয়েই তাদের স্ব স্ব ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। ফলে এর মাধ্যমে উভয়ের ভিন্ন সাংস্কৃতিক জীবনধারার পরিচয়ও ছিল সুস্পষ্ট।
হিন্দুরা নতুন ধান-দুর্বা, আম-জাম-কলা-লিচু ইত্যাদি ফল এবং মৌসুমী নানা ফুল দিয়ে প্রসাদ তৈরি করে মাটির তৈরি মূর্তি তথা তাদের কাল্পনিক দেব-দেবীর পাদমূলে অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করতো, মন্দিরের পুরোহিত নানারূপ মন্ত্রোচ্চারণ করে, পূজা-অর্চণা শেষে নিবেদিত নৈবেদ্যের সদ্ব্যবহার করতো। তাদের ভক্ত-অনুরক্তরা ও মন্দিরগামীরাও প্রসাদ পেয়ে পরমার্থ লাভের আনন্দে খুশী হয়ে উঠতো। এসব অনুষ্ঠানে অনেক সময় নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার ব্যবস্থা থাকতো। মন্দিরের ঠাকুর-পুরোহিত, পূজারী ও দেবানুগ্রহ-প্রত্যাশীদের জন্য এটা ছিল রীতিমত আনন্দোৎসব। হিন্দুদের মধ্যে এখনো নবান্নের উৎসব পালিত হয়, কিন্তু আগের দিনের সেই আড়ম্বর এখন আর চোখে পড়ে না।
অন্যদিকে, নবান্ন উপলক্ষে মুসলমানগণ মোল্লা-মুনশী-মুরব্বী ও প্রতিবেশীদের জিয়াফত করে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। নতুন ধানের তৈরি ভাত, পিঠা, মোয়া-মুড়কি-নাড়–, আম, কলা, জাম ইত্যাদি নানা রকম ফল, গাইয়ের দুধ ইত্যাদি পরিবেশন করে সংসারের আয়-বরকত, সকলের কল্যাণ ও পরলোকগত ব্যক্তিদের মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করে। মসজিদে শিরণী, পায়েশ, খিচুরী ইত্যাদি পাঠায়, মুসল্লীগণ ও গরীব-মিসকিনরা তা খেয়ে দোয়া করে। কখনো আত্মীয়-স্বজনকে বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে এনে খাওয়ায়, কখনো তাদের বাড়িতে নতুন ফসলে তৈরি পিঠা, মুড়ি, মুড়কি, নাড়–, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি পরব হিসাবে পাঠায়। এ রকম বিভিন্ন উৎসব-আনন্দে মুসলমান বাঙালিরা বছরের প্রথম মাসটি অর্থাৎ বৈশাখ মাস (১লা বৈশাখ নয়) উদ্যাপন করে থাকে। তবে মুসলমানদের অনুষ্ঠানে কখনো নাচ-গান, বাদ্য-বাজনার আয়োজন থাকতো না। আগের দিনে যেভাবে উৎসব-আনন্দ হতো, এখন তার মাত্রা কিছুটা কমে গেলেও গ্রাম বাংলায় এখনো তা বেশ খানিকটা বজায় রয়েছে।
বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখে পূর্ব থেকে কোন উৎসব-অনুষ্ঠান চালু না থাকলেও বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখে বহু পূর্ব থেকে নানা উৎসব-অনুষ্ঠান চালু রয়েছে। বস্তুত বাংলা সন চালু হবার বহু পূর্বেই ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে বিভিন্ন ঋতু বা মাসে বিচিত্র উৎসব-অনুষ্ঠান চালু আছে। বৈশাখ মাসে নতুন ফসল ঘরে তুলে কৃষকরা যেমন সরকারী রাজস্ব আদায় করে, অন্যদিকে তেমনি ব্যবসায়ী ও দোকানীরা হালখাতার আয়োজন করে ভোক্তাদের নিকট থেকে তাদের পাওনা আদায় করে থাকে। হালখাতা উপলক্ষে ব্যবসায়ী-টাকা লগ্নীকারী ও মহাজনগণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, চিড়া-মুড়ি, দই-মিষ্টির দ্বারা তারা স্ব স্ব গ্রাহক-খদ্দের-শুভানুধ্যায়ীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। হালখাতা অনুষ্ঠানটি ব্যবসায়ীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্য বাকি-বকেয়া উসূলের এটি একটি সুবর্ণ মুহূর্ত। হিন্দু মহাজনগণ যারা আগের দিনে উচ্চ সূদে গরীব কৃষক-জনসাধারণকে টাকা ধার দিত, সোনা-রূপার গহনা, থালা-ঘটি-বাটি ইত্যাদি বন্ধক রাখতো তারাও এ সময় বিগত এক বছরের সূদের টাকা কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিত। এমন একটা সময় ছিল যখন সুদূর আফগানিস্তান থেকে লম্বা লাঠি হাতে, লম্বা পাগড়ি পরা কাবুলিওয়ালারা এসেও বাংলার গরীব কৃষকদের টাকা ধার দিত, নতুন বছরে ফসল কাটার সময় তারাও এসে সূদের টাকা উসূল করে নিত। তাই বৈশাখ মাস যেমন ফসলের মাস, প্রাপ্তির মাস, আবার তেমনি দেনা-পাওনা পরিশোধের মাস হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস হিসাবে এ মাসে একটা নবতর আবেগ অনুভূতি লাভের অবকাশ যেমন আছে তেমনি বৈশাখের অন্য একটি রূপও আমাদের নিকট অতি পরিচিত। অনেক সময় খরা, অনাবৃষ্টি অথবা অকাল বন্যা আমাদের একান্ত প্রত্যাশার ফসল বিনষ্ট করে ঘরে ঘরে বিষাদের কালো ছায়া বিস্তার করে। এছাড়া, কাল বৈশাখীর তান্ডবলীলার কথা তো সকলেরই জানা। অনেক সময় বৈশাখের প্রচন্ড ঝড় প্রবাহিত হয়ে গ্রাম-বাংলার সুখের সুনিবিড় ছায়াঘেরা ঘর-দুয়ার ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। সে সাথে স্বপ্নভঙ্গ হয় সাধারণ সরল অল্পবিত্ত অগণিত মানুষের। তখন বৈশাখ আনন্দ-উৎসবের মাস না হয়ে বিষাদের বেদনাঘন অনন্ত দুঃখের মাসে পরিণত হয়। এভাবে বৈশাখ শুধু যে ‘ফসলী মাস’ হিসাবে বাঙালির নিকট আনন্দের মাস তাই নয়, কখনো কখনো ‘কাল-বৈশাখী’র রূপে তা ভয়াবহরূপেও ধরা দেয়।
বাঙালি হিন্দু-মুসলমান নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম-নীতি ও প্রথানুযায়ী বৈশাখ মাসটি উদ্যাপন করলেও ১লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন সম্পর্কে কারোই কোন সচেতনতা ছিল না। ১লা বৈশাখে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো না। বৈশাখ মাস ফসল কাটার মাস। তাই এ মাসে কৃষক-কৃষাণীগণ অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটায়। অনেকে খাবার সময় পর্যন্ত পায় না, অনুষ্ঠান করার কথা ভাববার সময় কোথায়? অনেক সময় বৈশাখের নতুন পানির ঢল অকস্মাৎ কৃষকের পাকা অথবা আধা পাকা ফসল ডুবিয়ে দেয়। তখন সারাদিন এমন কি রাতের বেলায়ও ডুবন্ত ফসল কেটে ঘরে তোলার কাজে কৃষককে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আনন্দ-ফূর্তি বা অনুষ্ঠান করার মতো মনের অবস্থা তখন কারোরই থাকে না। তবে ঠিক মত ফসল ঘরে তোলার পর কৃষক-কৃষাণির মনে যে এক অপার্থিব আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, তার কোন তুলনা হয় না।
অবশ্য হালখাতার অনুষ্ঠান অনেকে ১লা বৈশাখে করতো, আবার অনেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে এমনকি বৈশাখ মাসের যে কোন দিন করতো। এখনো ঠিক সেভাবেই হয়ে আসছে। হালখাতা অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট দিন হিসাবে ১লা বৈশাখ কখনো গণ্য হতো না। মূলত পুরো বৈশাখ মাসটাই হিন্দু-মুসলিম উভয়েই স্ব স্ব ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী উদ্যাপন করে আসছে। অনেক সময় বৈশাখ মাস শেষ হয়ে গেলেও পরবর্তী জ্যৈষ্ঠ মাসেও অনেকে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
পাঁজি-পুঁথি, দিন-ক্ষণের হিসাব অনুযায়ী যতটা নয়; তারচেয়ে মওসুম হিসাবে বাঙালির নিকট এসব উৎসব-আনন্দের কদর সর্বদা পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যান্য জাতি বিশেষত ইংরাজগণ যেমন বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। বছরের অন্যান্য দিন তারা কঠোর পরিশ্রম করতে অভ্যস্থ, বাঙালিরা সেদিক থেকে অন্যরকম। তারা স্বভাবগতভাবে সংবৎসরই অল্প-বিস্তর কিছু একটা আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকতে পছন্দ করে। এ কারণেই বাঙালি হিন্দুর বার মাসে তের পার্বণের রেওয়াজ চালু হয়েছে। এটা হলো এমন কিছু প্রথা বা সংস্কার যা দীর্ঘকাল ধরে ধীরে ধীরে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এতে ষড় ঋতুর একটি প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে এটা তাদের ধর্ম বা সংস্কৃতির অংগে পরিণত হয়েছে। তাই বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতি প্রধানত ঋতু-বিবর্তনের সাথে বহুলাংশে সংশ্লিষ্ট। ষড়ঋতু-ভিত্তিক তাদের বিভিন্ন উৎসব-আনন্দ, আচার-অনুষ্ঠানের সাথে বিভিন্ন দেব-দেবীর মাহাত্ম্য যুক্ত হয়ে কালক্রমে তা ধর্মীয় গুরুত্ব লাভ করেছে। সে দিক থেকে হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতি বহুলাংশে লোকজ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।
প্রকৃতপক্ষে, আবহমান কাল থেকে বাঙালি মুসলমানদের যেমন নিজস্ব উৎসব-আনন্দ রয়েছে, বাঙালি হিন্দু ও বৌদ্ধদেরও তেমনি নিজস্ব আনন্দ-উৎসব রয়েছে। কিন্তু মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে বাঙালির কোন একক সর্বজনীন উৎসব-আনন্দ অনুষ্ঠানের কোন নির্দিষ্ট দিন এদেশে কখনো ছিল না। কারণ প্রত্যেকটি আনন্দ-উৎসবই প্রত্যেক ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুযায়ী উদযাপন করতো। অতএব, ভিন্নতা থাকবেই। তবে এ ভিন্নতা কখনো কোনরূপ বিরোধ বা সংঘর্ষের জš§ দেয়নি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই নির্বিবাদে ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে।
বাংলাদেশ সর্বদাই ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। বিশেষত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ইসলামের অনুসারী। ইসলাম মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি প্রচার করে থাকে। ফলে মুসলমানগণ সহনশীলতা, মানবিক সম্প্রীতি ও উদার ভ্রাতৃত্ববোধে বিশ্বাসী। অন্য ধর্মের উপর জোর-জবরদস্তিতে তারা বিশ্বাসী নয়। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনামলের সাড়ে পাঁচশ বছরের ইতিহাসে একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় নি। মুসলিম শাসকগণ সর্বদা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান ও উদার ব্যবহার করতেন, কেউ ন্যায়বিচার ও রাজানুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হতো না। ইংরাজ আমলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহুলাংশে বিনষ্ট হয়। তখন মুসলমানগণ নানাভাবে বঞ্চিত, শোষিত ও নির্যাতিত হতে থাকে। অন্যদিকে, হিন্দুরা রাজানুগ্রহ পেয়ে অপরিমিত বিত্ত-বৈভব, জমিদারি-জোতদারি, চাকরি-বাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে রাতা-রাতি অকল্পনীয় উন্নতি লাভ করে। ইংরাজদের ভেদ-নীতির কারণে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। রাজানুগ্রহপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানগণ নানাভাবে নিগৃহীত হতে থাকে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মূল কারণ এটাই।
স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক্কালে উপমহাদেশের মুসলমানদের ন্যায্য দাবি অনুযায়ী যখন ভারত বিভক্ত হয়ে ‘পাকিস্তান’ নামে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো ভয়াবহ রূপ লাভ করে। উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য স্বাধীন, স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে সহজে মেনে নিতে পারে নি। এরই ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। বিভাগোত্তরকালে স্বাধীন ভারতে এ দাঙ্গা তথা সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিম নিধন-নির্যাতন অব্যাহত থাকলেও, স্বাধীন পাকিস্তানে তথা বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বদাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান রয়েছে।
বাঙালি হিন্দু-মুসলিম আবহমান কাল থেকে বৈশাখ মাসে নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান ও প্রথানুযায়ী বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের সাড়ম্বর আয়োজন করলেও বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখে তারা তেমন কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো বলে জানা যায় না। বাংলা নববর্ষ বা ১লা বৈশাখ উদ্যাপনের রীতিটি সাম্প্রতিক কালের। প্রধানত ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি-রেওয়াজের অনুসরণেই বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন শুরু হয়। ফলে প্রথমোক্তের প্রভাব আমাদের নববর্ষ উদ্যাপনে বহুলাংশে প্রতিফলিত। অবশ্য ইদানীং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চেয়ে হিন্দু সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব নববর্ষ উদ্যাপনে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাঙালি হিন্দুরা আবহমানকাল থেকে চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে যেসব উৎসব-অনুষ্ঠান বা মেলার আয়োজন করতো এখন বাঙালি মুসলমানগণ, বিশেষত শহরের এক শ্রেণির মানুষ, বাংলা নববর্ষ অনেকটা সেভাবেই আনন্দ-স্ফুর্তির সাথে উদযাপন করা শুরু করেছে। এক শ্রেণির মুসলিম নামধারী বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি-কর্মীরাই এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এটাকে ‘মিশ্র সংস্কৃতি’ বা হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবজাত বলা যায়। কোন বিশেষ সংস্কৃতির স্বভাব-প্রকৃতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অন্য সংস্কৃতি তার উপরে ভর করবেই। যেমন সেন আমলে বাংলাদেশে বৌদ্ধ আধিপত্য খর্ব হবার ফলে ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতিও হিন্দু ধর্ম-সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে এক লোকজ ধর্ম-সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছিল।
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এবং ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আমরা যেসব উৎসব-অনুষ্ঠান করে থাকি একমাত্র সেগুলোকেই আমাদের সর্বজনীন উৎসব-আনন্দরূপে গণ্য করা চলে। এছাড়া, শতকরা ৯০ জন মুসলিম অধ্যূসিত বাংলাদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকেও যৌক্তিকভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা যায়। ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশ বা বিধান পালনার্থে যে বিশিষ্ট জীবনধারা গড়ে উঠেছে সেটাই বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি। আল-কুরআন ও আল হাদীসের নির্দেশানুযায়ী তা পালিত হয়ে আসছে। তবে ইদানীং তার মধ্যে কিছুটা বিকৃতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা কিছুটা মুসলমানদের অজ্ঞতা ও কিছুটা বিদেশী-বিজাতীয় প্রভাবের ফল, তাতে সন্দেহ নেই।
পাকিস্তান আমলে বিংশ শতকের ষাটের দশকে একটি বিশেষ ধর্ম-নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে সর্বপ্রথম ১লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ চালু হয়। বাংলাদেশ হওয়ার পর এ রেওয়াজ আরো ব্যাপকভাবে চালু হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও ১লা বৈশাখ সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে। তাই স্বভাবতই এ দিনটির গুরুত্ব এখন আমাদের নিকট পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অতএব, এ দিনটি বর্তমানে নানা উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে সরকারী-বেসরকারীভাবে উদ্যাপিত হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিনটি উদ্যাপনের কোন নির্দিষ্ট নীতি বা কর্মসূচী সাধারণ্যে প্রচারিত না থাকায় যে যেমন খুশী তেমনিভাবে তা উদ্যাপন করছে।
১লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি যদিও রাজধানী শহরেই বিশেষরূপে সীমাবদ্ধ, তবু অনুমান করা চলে যে এটা ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। কারণ মাছের পচন তো শুরু হয় মাথা থেকেই। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্যে প্রতিফলিত নয় কেন সেটা যেমন একটি মৌলিক প্রশ্ন, তেমনি হঠাৎ করে বিজাতীয় ইসলাম-বিরোধী নানা অপসংস্কৃতি বিশেষত হিন্দু সংস্কৃতির নানা উৎকট পৌত্তলিক বা কুফরী প্রভাব আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কীভাবে, কাদের দ্বারা, কোন্ উদ্দেশ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে, তা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য তাগিদেই গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। সহস্রাধিক বছর ধরে আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রেখেছি এবং তার ভিত্তিমূলেই আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটেছে, এবং সে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা স্বরূপ ও প্রাণশক্তিতে এতই প্রবল যে, তা শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে এক স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে। অথচ আজ হঠাৎ বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এমনকি ঘটলো যে, আমাদের সংস্কৃতির উপর এমন নগ্ন হামলা শুরু হলো এবং একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থী তরুণ-তরুণী না বুঝে সে আত্মঘাতি ষড়যন্ত্রে সোৎসাহে গা ভাসিয়ে দিল, তা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলা নববর্ষের নামে বর্তমানে যে সব অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হচ্ছে, বাঙালি মুসলমানদের আবহমান সংস্কৃতির ও জীবনাচারের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। বরং বাংলা নববর্ষের নামে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী যাকিছু করছেন তা মূলত হিন্দু সংস্কৃতিরই প্রতিরূপ। ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে তা চালাবার ও একে সর্বজনীন বাঙালির সংস্কৃতি বলে দাবি করা হলেও শতকরা নব্বই জন বাঙালি তথা বাংলাদেশী মুসলমানের ঈমান-আকীদা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের তা সম্পূর্ণ খেলাপ বা পরিপন্থি। এটা আমাদের জন্য বিজাতীয় অপসংস্কৃতি। বিগত হাজার বছর ধরে আমরা এ অপসংস্কৃতির প্রভাব এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছি, আমাদের নিজস্ব প্রাণবন্ত সংস্কৃতির চর্চা ও উৎকর্ষতার মাধ্যমে। আমরা যদি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা না করতাম এবং সে সংস্কৃতি যদি এতটা প্রাণবন্ত ও উৎকৃষ্টতর না হতো, তাহলে আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার বিকাশ কখনো ঘটতো না এবং আমরা কখনো স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাও করতে পারতাম না। আজকের স্বাধীনতা আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তারই অনিবার্য ফল।
তাই এ অপসংস্কৃতি তথা তৌহিদী বিশ্বাসের খেলাপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে এবং তা প্রতিহত করে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উজ্জীবন বা চর্চা করার জন্য সচেতন শিক্ষিত মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলা সন বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্য। বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনা, জীবনাচার ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই বাংলা নববর্ষ চিরকাল উদ্যাপিত হয়ে এসেছে এবং এখনও সে ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে হবে।
নববর্ষের অনুষ্ঠান আজ বিশ্বব্যাপী সর্বত্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রত্যেক দেশ ও জাতি তাদের স্ব স্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির আলোকেই নববর্ষের অনুষ্ঠান করে থাকে। মুঘল আমলে তৎকালিন শাসক-সম্প্রদায়ের অনুসরণে উচ্চ পর্যায়ের অভিজাত মহলে ‘নওরোজ’ উদ্যাপিত হয়েছে। ইংরাজ আমলে ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপনের রেওয়াজ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হয়। ইংরাজরা আমাদের দেশ থেকে বিদায় নিলেও, ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতা ও মন-মানসিকতায় গড়ে ওঠা একশ্রেণির বিত্তবান পাশ্চাত্যপন্থিগণ এখনো তার অনুবর্তন করে চলেছে। বরং ইদানিং ইংরাজি নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং নব্য বিত্তবান শ্রেণির কিছুসংখ্যক তরুণ-তরুণী যে ধরনের উচ্ছৃংখল আচার-আচরণ ও অনৈতিক-সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করেছে, তা নিউইয়র্ক-লন্ডন-প্যারিসের তথাকথিত অভিজাত লম্পটদের আচরণকেও হার মানায়। এটাও এক নিকৃষ্ট ধরনের অপসংস্কৃতি। নববর্ষ উদ্যাপনের নামে এ ধরনের লাম্পট্য শুরু হয়েছে তা কোনরূপ সুরুচি-শালীনতার পরিচায়ক তো নয়ই, কোন ভদ্র-সভ্য সমাজের নিকটই তা গ্রহণীয় হতে পারে না।
বাংলা সনের প্রথম দিনে আগে কোন অনুষ্ঠান হতো না বলে এখন তা হতে পারে না, তা নয়। অবশ্য হতে পারে। তবে তা হতে হবে আমাদের নিজস্ব গৌরবোজ্জ্বল আদর্শ-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আদলে, বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রভাবে নয়। বাংলা সন যেমন আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনেও তেমনি আমাদের আদর্শ-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটা বাঞ্ছনীয়। তাই বিদেশী-বিজাতীয় সংস্কৃতি তথা অপসংস্কৃতির প্রভাব থেকে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালাকে বিমুক্ত রাখা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আমাদের নিজস্ব বোধ-বিশ্বাস ও আচরিত সংস্কৃতির রূপরেখা অনুযায়ী তা পালিত হওয়া বা তার চর্চা করা বাঞ্ছনীয়। পৌত্তলিকতা ও অশ্লীলতা আমাদের সংস্কৃতির সাথে অসংগতিপূর্ণ। তৌহিদী জীবনবোধসম্পন্ন সুস্থ সংস্কৃতিই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য। সুস্থ সংস্কৃতি, সুস্থ-সুন্দর-স্বাস্থ্যেজ্জ্বল জাতি গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
মনে রাখতে হবে, যেসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেলেল্লাপনাকে প্রশ্রয় দেয়া হয় এবং নৈতিকতার অধঃগতি ঘটে, তা সংস্কৃতি নয়, অপসংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো পরিশীলিত, পরিমার্জিত, সুস্থ, বিকাশোš§ুখ চেতনার ধারক। যা কিছু অসুস্থ, অমার্জিত ও নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটায় তাই অপসংস্কৃতি। ইতিহাস সাক্ষী, অপসংস্কৃতি যুগে যুগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে।
আমরা কি ধ্বংসের দিকে যেতে চাই, না সুস্থ-সুন্দর জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে মহৎ ও কল্যাণময় জীবন গড়তে চাই? সে মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করে জাতীয় সাংস্কৃতিক নীতিমালা তৈরি করে এক্ষেত্রে জাতিকে আজ সুষ্ঠু-সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।