সময়ের সাথে জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টাই হায়াত বা জীবন। অন্তহীন প্রবহমান সময়ের একটি নির্দিষ্ট ক্ষণে আমরা পৃথিবীতে আবির্ভূত হই, আরেকটি নির্দিষ্ট ক্ষণে আমরা পৃথিবী থেকে অপসৃত হই। হয়তো বা রেখে যাই কিছু স্মৃতি মহাকালের বুকে যা সঞ্চিত হয় ইতিহাসের বারিবিন্দু হিসাবে। সময়ের সাথে তাই ইতিহাসের সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্য। সময়ের অতীত ধারাবাহিকতাই ইতিহাস। আমাদের ঐতিহ্য, সভ্যতা, কৃষ্টি ও বিভিন্ন-বিচিত্র মানব-কৃতিও বিভিন্ন যুগ ও সময়ের ক্রমাবদান। তাই সময় আমাদের জীবন ও কৃতির একান্ত সারথি।
অতএব, সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এ গুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করেই সময়কে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও হিসাবের মধ্যে আনয়নের জন্য একে নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ পরিধিতে বিভক্ত করা হয়েছে। পল, অনুপল, সেকেণ্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদি নানা ভাগে ও পরিচয়ে সময়কে বিভক্ত করা হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বারিবিন্দু নিয়ে সৃষ্টি হয় বিশাল অতল বারিধি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণার সমষ্টিতে গড়ে ওঠে বিস্তীর্ণ ধূসর মরুভূমি। সময়ের পল-অনুপল, সেকেণ্ড, মিনিট নিয়েও তেমনি সৃষ্টি হয় সীমাহীন অনন্তকাল-মহাকাল। ইতিহাস সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে শত-সহস্র-কোটি পল-অনুপল-মুহূর্তের ঘন সন্নিবদ্ধ সাঁকো-বন্ধন। আমাদের জীবনও পল-অনুপল-মুহূর্তের সমষ্টি। পদ্ম-পত্রে অস্থির, চঞ্চল নীরের মত যদিও তার অবস্থান, তবু সময় ও ইতিহাসের সাথে জীবনের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান।
তাই প্রতিটি মুহূর্ত বা সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত আমাদের জীবন যেখানে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, সীমাবদ্ধকালের গণ্ডিতে আবদ্ধ সেখানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান এবং যথাযথভাবে পূর্ণ সদ্ব্যবহারের মধ্যেই এর সার্থকতা। প্রতিদিন প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে যে দিনটির শুরু, সূর্যাস্তের পর সে দিনটি আর কখনো ফিরে আসে না। পরের দিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে আরেকটি নতুন দিনের আগমন ঘটে, পূর্বের দিনটি অতীতের তথা মহাকালের অন্তহীন বুকে বিলীন হয়ে যায়। এভাবে ক্রমাগত আমরা একটির পর একটি নতুন দিনের সম্মুখীন হই এবং বিগত দিনগুলো স্মৃতিময় অতীত বা ইতিহাসে পর্যবসিত হয়।
এভাবে আমাদের বর্তমান মুহূর্তগুলো প্রতিনিয়ত অতীত বা ইতিহাসের অন্তহীন গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে দিনরাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তনের মাধ্যমে আমাদের নশ্বর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটছে। অন্যদিকে, অসংখ্য নতুন জীবনের আগমন ঘটছে পৃথিবীতে। ফলে মানব সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে। অন্যান্য প্রাণীকুলের অবস্থাও তাই। সময়ের ধারা যেমন অব্যাহত, জীবনের ধারাও তেমনি। কিন্তু একটি জীবনের অবস্থান পদ্ম-পত্রে নীর সদৃশ সময়ের বক্ষপুটে অস্থির, চঞ্চল নীরের মতই ক্ষণস্থায়ী। অতএব, সময়ের এ আবর্তন, দিনরাত্রির এ আগমন-নির্গমন অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ, জীবনে তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ থেকে যেমন আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, তেমনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের সঠিক রূপে কাজে লাগানোর ব্যাপারে বিশেষ যতœবান হওয়া কর্তব্য। এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ বলেন :
“আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য।” (সূরা আল-ইমরান : আয়াত-১৯১)।
এভাবে বিশ্ব-জগতের সৃষ্টি, দিন-রাত্রির আগমন-নির্গমন, ঋতু-বিবর্তন ইত্যাদি বিষয় অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করলে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি, সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সময়ের সদ্ব্যবহারে যতœবান হতে পারি। আল্লাহর সৃষ্টি-মাহাত্ম্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করতে পারি।
জীবন মূলত সময়ের সমষ্টি, একথা শুরুতেই উল্লেখ করেছি। দিনরাত্রির বিবর্তনের এক পর্যায়ে আমরা পৃথিবীতে আবির্ভূত হই, আবার নির্দিষ্ট আয়ুশেষে বিদায় গ্রহণ করি। আমাদের এ আবির্ভাব ও বিদায় মহান স্রষ্টার বিধান ও নির্দেশানুযায়ী এমন নীরবে-সংগোপনে সংঘটিত হয় যে, আমরা সর্বদা তা উপলব্ধি করতেও সক্ষম হই না। অথচ এ আবির্ভাব ও বিদায়ের মধ্যবর্তী সময় যেটাকে আমরা ‘হায়াত’ বলি, তা প্রত্যেকের জীবনে গুরুত্ব বহন করে। আজকের দিনটি কেমন কাটলো, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কীভাবে ব্যয়িত হলো, এ দিনটিতে কতটা অর্জন বা সঞ্চয় হলো, এ অর্জন বা সঞ্চয় জীবনে কতটা সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে এল, অধিকাংশ সময় তা আমরা খতিয়ে দেখিনা।
এই যে সঞ্চয় বা অর্জনের কথা বললাম তা দু’রকম : একটি বস্তুগত, অন্যটি অবস্তুগত। একটি দৃশ্যমান, অন্যটি উপলব্ধিগত। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুগত প্রাপ্তিতে সকলেই পরিতুষ্ট তবে অবস্তুগত প্রাপ্তি হয়ত সত্যিকার জ্ঞানী-বোদ্ধাদের নিকট অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টির গুরুত্ব বুঝানোর জন্য মহান স্রষ্টা তাই সময়ের শপথ নিয়ে বলেন :
“কসম সময়ের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে হকের দাওয়াত দেয় ও ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়।” (সূরা আল-আছর : আয়াত-১-৩)।
যে সময়ের সমষ্টিই জীবন, সে সময়ের শপথ নিয়ে আল্লাহ মানুষকে দু’শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। প্রথম শ্রেণী দ্বিতীয় শ্রেণীর বিপরীত। প্রথম শ্রেণীর পরিচয় না দিয়ে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিচয়ের মধ্যেই প্রথম শ্রেণীর পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক যেসব গুণে গুণান্বিত তার বিপরীতটাই প্রথম শ্রেণীর পরিচয় জ্ঞাপক। এটা আল-কুরআনের বিশিষ্ট প্রকাশভঙ্গি। দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন : তারা ঈমানদার (স্রষ্টায় বিশ্বাসী), সৎকর্মশীল, পরস্পরকে অর্থাৎ অন্য সকলকে হকের (সত্য দ্বীন) দাওয়াত দেয়, নিষ্ঠার সাথে হকের পথে চলার জন্য জীবন পথের সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় প্রদান করে থাকে। অন্য শ্রেণীর মানুষ এর বিপরীত। উপরোক্ত গুণাবলী থেকে তারা বঞ্চিত। আল্লাহ্ এ দু’শ্রেণীর মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে এবং উভয়ের চরম পরিণতির কথা বলতে গিয়ে সময়ের কসম খেয়েছেন। এতে সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জনৈক মনীষী জীবনকে বরফের সাথে তুলনা করেছেন। বরফ তার বিক্রেতার নিকট মূল্যবান পুঁজি। কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে সে পুঁজি এক সময় যখন গলে পানি হয়ে যায় তখন তার আর কোনই মূল্য থাকে না। জীবনও তেমনি সময়ের অদৃশ্য ভেলায় চড়ে এক সময় অনন্তের পথে বিলীন হয়ে যায়। আমাদের মরদেহও তখন বরফগলা পানির মতোই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তাই সময় থাকতেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনা করা কর্তব্য। সময়ের গুরুত্বটা এখানেই। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসের উল্লেখ করা যায়। রাসূলুল্লাহ স. বলেন :
“পাঁচটি বিষয়ের প্রতি (সময় থাকতেই) গুরুত্ব আলোপ কর :
-বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনের,
-রোগাক্রান্ত হবার পূর্বে স্বাস্থ্যের,
-দারিদ্র্য আসার পূর্বে স্বচ্ছলতার,
-ব্যস্ত হওয়ার পূর্বে অবসর সময়ের,
-এবং মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনের।”
সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরোক্ত হাদীসে বিভিন্নভাবে তাই সময়ের গুরুত্বটাই বিশেষভাবে বুঝানো হয়েছে। সময়ের সাথে জীবনের বিভিন্ন অবস্থার কত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক এখানে সেটাই গুরুত্ব সহকারে বুঝানো হয়েছে এবং সময়কে যথাসময়ে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
হিসাবের সুবিধার জন্য নানা যতিচিহ্ন দিয়ে আমরা অখণ্ড সময়কে নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ পরিসরে বিভক্ত করেছি। ইতিহাস পর্যালোচনার জন্য শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদির হিসাবটা স্বাভাবিক, কিন্তু একটি জীবনের জন্য তা অতিশয় দীর্ঘ। সহস্রাব্দ তো অকল্পনীয়, শতায়ু হবার নসীবই ক’জনের ভাগ্যে ঘটে? দশক, বছর, মাস বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র সময়-পরিসরকে কেন্দ্র করেই জীবনের সকল ভাবনা, পরিকল্পনা ও কর্মায়োজন। জীবনের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মায়োজনকে একটি সুষ্ঠু নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার জন্য সেকেণ্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বর্ষ ইত্যাদি গণনার সূত্রপাত। জীবনে আমাদেরকে অনেক কিছু করার প্রয়োজন হয়। হিসেব করে নিয়মমাফিক সবকিছু না করলে জীবনে সাফল্য আসতে পারে না। সে জন্যই মানুষ সময় নিরূপণের জন্য ঘড়ি আবিষ্কার করেছে, দিন-তারিখ মেলাবার জন্য পঞ্জিকা, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি তৈরি করেছে। আমরা এখন ঘড়ি, পাঁজি-পুঁথির হিসাব অনুযায়ী চলতে ব্যাপকভাবে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি। এসব আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ দিন-রাত্রির আবর্তন সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্রের পরিক্রমণ, ঋতুর পরিবর্তন, প্রকৃতির দৃশ্যমানতার বিবর্তন, জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন মানুষ সময়কে অতি সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে এসেছে।
পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সনের উৎপত্তি হলেও প্রত্যেক সনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, প্রতি সনের মাসের সংখ্যা বারো। মহামহিম আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন :
“নিশ্চয় আল্লাহ বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা বারো, আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতে।” (সূরা তাওবা : আয়াত-৩৬)।
অবশ্য প্রত্যেক সনের মাসের সংখ্যা বারো হলেও, প্রতি মাসে দিনের সংখ্যা বা প্রতি সনে বর্ষের দিন সংখ্যায় তারতম্য বিদ্যমান। এর কারণ কোন সন চন্দ্রের হিসাব এবং কোন সন সূর্যের হিসাবে চলে। চন্দ্রের হিসাবে নিরূপিত সনকে চান্দ্রবর্ষ এবং সূর্যের হিসেবে নিরূপিত সনকে সৌরবর্ষ বলে। চান্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ দিন ৯ ঘন্টায় এবং সৌরবর্ষ হয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টায়। ফলে চান্দ্রবর্ষ অপেক্ষা সৌরবর্ষ ১০/১১ দিন বড়। সৌরবর্ষ সূর্যের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় বাৎসরিক ঋতু-পরিক্রম বা মাস, দিন, ঘন্টা, মিনিট ইত্যাদি নির্দিষ্ট সময়ে আবর্তিত হয়। ফলে আমাদের হিসাব ও গণনার কাজে বিশেষ সুবিধা হয়। অন্যদিকে, চান্দ্রবর্ষ চন্দ্র-পরিক্রমের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় এবং সৌরবর্ষ থেকে এটা ১০/১১ দিন কম হওয়ায় রোযা, হজ্জ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় ইবাদতসমূহ পালনে বিশেষ সুবিধা হয়। বিশ্বের সকল অঞ্চলের মানুষই বছরের সকল ঋতুতে ঘুরে-ফিরে রমযান, হজ্জ, ঈদ ইত্যাদি পালনের সুযোগ পায়। অন্যথায়, কোন দেশে প্রতি বছর শুধু শীতকালেই রমযান পালিত হতো, আবার কোন দেশে শুধু গ্রীষ্মকালেই রমযানের আগমন ঘটতো। তা হতো ন্যায়বিচার বা ইনসাফের খেলাফ। কিন্তু মহান স্রষ্টার বিধানে কোন অবিচার বা বৈষম্য থাকতে পারে না। তাই তিনি এসব ইবাদতকে চান্দ্রবর্ষের সাথে সংযুক্ত করে পৃথিবীর সব অঞ্চলের সকল মানুষের প্রতি সুবিচার করেছেন। বান্দার প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে এটি একটি বড় নিয়ামত। এ নিয়ামত ও তার তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন :
“তিনিই উষার উন্মেষ ঘটান, তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত্রি এবং গণনার জন্য সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন, এ সবই পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিরূপণ।” (সূরা আন্আম : আয়াত-৯৬)।
আল্লাহ বলেন :
“তিনিই সূর্যকে তেজষ্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং এর মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ কোন কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেন নি। ….দিন ও রাত্রির পরিবর্তনে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সে সব কিছুর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।” (সূরা য়ূনুস : আয়াত-৫ ও ৬)।
আল্লাহ্র অসংখ্য নিদর্শনসমূহের মধ্যে সূর্য ও চন্দ্র দু’টি স্পষ্ট নিদর্শন। একটি তেজষ্কর, অন্যটি জ্যোতির্ময়। একটি জগতের তাবৎ প্রাণিকূলকে নানা কর্মের আয়োজনে সজাগ ও কর্মচঞ্চল করে তোলে, অন্যটি বিশ্রাম ও নিদ্রার স্বপ্নময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ দু’টি এবং এ দু’টির সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর সুনির্দিষ্ট পরিক্রমের ফলে দিন-রাত্রি, মাস-বছর, ঋতু-তিথির হিসাব সংরক্ষণ এমনকি, পৃথিবীর সকল সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ বলেন :
“সূর্য ও চন্দ্র পরিক্রম করে নির্ধারিত কক্ষপথে।” (সূরা র্আ-রাহমান : আয়াত-৫)।
আল্লাহ রাত ও দিনের নিদর্শনদ্বয়ের বর্ণনা দিয়েছেন। সূর্যালোকে সমুজ্জ্বল দিনের বিশেষ বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন : “আমি রাত ও দিনকে করেছি দু’টি নিদর্শন; রাত্রির নিদর্শন অপসারিত (অর্থাৎ অন্ধকারে আচ্ছাদিত) করেছি এবং দিনের নিদর্শনকে আলোকপ্রদ করেছি যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ-সংখ্যা ও হিসাব নিরূপণ করতে পার।” (সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত-১২)।
দিন ও রাত্রি, চন্দ্র এবং সূর্যের নির্দিষ্ট আবর্তন ও তার গূঢ় তাৎপর্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন :
“তাদের জন্য এক নিদর্শন রাত্রি, তা থেকে আমি দিবালোক অপসারিত করি, সকলেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবং সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চন্দ্রের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল (এ হিসাবে জ্যেতির্বিজ্ঞানীগণ চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনযিল বা তিথিতে বিভক্ত করেছেন); অবশেষে তা শুষ্ক বক্র, পুরাতন খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা; এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।” (সূরা ইয়াসীন : আয়াত-৩৭-৪০)।
পৃথিবীতে বিভিন্ন সন বা বর্ষপঞ্জি আবিষ্কারের পেছনে বিশেষ ঘটনা বা ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় পণ্ডিতগণ বছরের পর বছর নীলনদের জোয়ার-ভাটা ও সন্নিহিত অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বছর গণনার রীতি চালু করেন। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ঈসা-পূর্ব ৪৬ অব্দে মিসর জয় করার পর মিসরীয়দের মধ্যে প্রচলিত সৌরবর্ষ বা ঋতুচক্রের হিসাব অনুযায়ী প্রণীত পঞ্জিকা সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করেন। জুলিয়াস সিজার মিসরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী সোসিজেনিসের সহযোগিতায় রোমান বর্ষপঞ্জির ব্যাপক সংস্কার করেন। তিনি রোম-সাম্রাজ্যে সর্বপ্রথম সৌরবর্ষ পঞ্জিকার প্রচলন করেন এবং ১ মার্চের পরিবর্তে ১ জানুয়ারি থেকে নববর্ষ গণনা শুরু করেন। তখন থেকে প্রাচীন রোমান বর্ষপঞ্জির নাম হয় সিজারিয়াস বর্ষপঞ্জি। রোম নগরীর পত্তনকালের স্মরণে রোম বা সিজারিয়াস বর্ষপঞ্জির সূত্রপাত।
বর্তমান বিশ্বে ক্রিশ্চিয়ান এরা বা খ্রীস্টাব্দ অর্থাৎ ঈসাব্দ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ সনের প্রবর্তন হয় হযরত ঈসা (আ.) বা খ্রীস্টানদের নিকট যিনি যীশু খ্রীস্ট নামে পরিচিত তাঁর স্মরণে। অবশ্য হযরত ঈসার জীবিতাবস্থায় নয়; তাঁর মৃত্যুর ৭৫০ বছর পর রোমের খ্রীস্টান পাদ্রীগণ এ বর্ষগণনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ইউরোপ-আমেরিকা তথা সমগ্র বিশ্বের বিস্তৃত জনপদে খ্রীস্টান ধর্ম সম্প্রসারিত হবার ফলে এবং তারও পরে ইংরেজ, ফরাসী ও ওলন্দাজ সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র বিস্তৃত হবার ফলে খ্রীস্টাব্দ বা ঈসাব্দও পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ও প্রচলিত সর্বাধিক জনপ্রিয় সন এটা। আমাদের দেশেও এর প্রচলন রয়েছে, এমনকি, কার্যত বাংলা সনের চেয়েও এর প্রচলন ও জনপ্রিয়তা অধিক।
ঈসাব্দের পরেই দ্বিতীয় প্রধান আন্তর্জাতিক সন হিসাবে হিজরী সনের প্রচলন ও এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পরিলক্ষিত হয়। আগে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র রাজকার্য বা সরকারীভাবে হিজরী সনের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার স্থান দখল করেছে ঈসাব্দ বা খ্রীস্টাব্দ। তবে তার পাশাপাশি হিজরী সন এখনো টিকে আছে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র। অন্য কোন কারণে না হলেও একমাত্র ধর্মীয় কারণে এ সন মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সর্বদা অনিবার্যভাবে টিকে থাকবে। কারণ রোযা, হজ্জসহ ইসলামের বহু ইবাদত যেমন- দুই ঈদ, শবে কদর, শবে বরাত, আশুরা, ঈদে মিলাদুন্নবী, আখিরী চাহার সোম্বা ইত্যাদি সরাসরি হিজরী সন বা চান্দ্রমাসের সাথে সম্পৃক্ত।
হিজরী সনের প্রবর্তন করেন মূলত রাসূলুল্লাহ সা. স্বয়ং। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারূক রা. আনুষ্ঠানিকভাবে এটা চালু করেন। মহানবীর সা. ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনার স্মরণে হিজরী সনের উৎপত্তি। মহানবী সা. মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহ্ নির্দেশে ৬২২ ঈসায়ীর ২০ সেপ্টেম্বর নিজ জন্মভূমি পবিত্র মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। ঐ সময় আরবদেশে বহুবিধ সনের প্রচলন ছিল। যেমন হযরত নূহ আ.-এর মহাপ্লাবনের স্মরণে ‘বন্যাসন’, আবরাহার হস্তিবাহিনী নিয়ে কা’বা ধ্বংসের প্রচেষ্টার স্মরণে ‘হস্তি সন’, ‘হবুতি সন’, ‘লুই সন’, ‘খসরু সন’, মহানবীর (সা.) জন্ম সন’, ‘আম উল ফজুর’, ‘আম উল ফতেহ’ ইত্যাদি সন প্রচলিত ছিল। তবে এর অধিকাংশই ছিল আঞ্চলিক বা গোত্রীয়, ব্যাপকভাবে এর কোনটিরই প্রচলন ছিল না। এর মধ্যে ‘হস্তি সন’ কিছুটা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মহানবীর সা. জন্মের মাত্র কয়েক দিন পূর্বে ইয়েমেনের শাসক আবরাহা বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে খানায়ে কা’বা ধ্বংস করতে এসে মক্কার অদূরে মুযদালিফার ওয়াদিউন্নার (অর্থ : অগ্নি-উপত্যকা) নামক স্থানে আল্লাহ্র ইচ্ছায় ক্ষুদ্র আবাবীল পাখির প্রস্তরাঘাতে সদলবলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার অলৌকিক ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে হস্তি সনের উৎপত্তি। তৎকালে এ ঘটনা সমগ্র আরব সমাজে ছিল এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনা। ফলে এ সন মোটামুটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও আদৃত হয়।
তবে এ সনটি ছিল এক অভিশপ্ত জালেম শাসকের স্মৃতিবাহক। তাই মহানবী সা. ইসলামের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা হিজরতের স্মরণে হিজরী সন প্রবর্তন করেন। ঐতিহাসিক তাবারীর বর্ণনা মতে, রাসূলুল্লাহ সা. যেদিন তদানীন্তন ইয়াস্রিফ- যা মহানবীর সা. আগমনের সাথে সাথে ‘মদীনাতুর রাসূল’ নাম ধারণ করে- উপনীত হন, সেদিন থেকেই হিজরতের স্মরণে নতুন সন গণনার নির্দেশ দেন। তিনি নজরানের খ্রীস্টানদের সাথে যে সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করেন তাতে তারিখ হিসাবে হিজরতের পঞ্চম দিন উল্লেখ করা হয়। ঐ সময় থেকে মদীনায় হিজরতের প্রথম বছর, দ্বিতীয় বছর এভাবে লোকমুখে এ সনের প্রচার হতে থাকে। কিন্তু এভাবে হিজরী সনের প্রচার ও তা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বিধিবদ্ধভাবে এ সন প্রচলিত হয় হযরত উমরের রা. শাসনামলে ৬৩৮ ঈসায়ীতে। এর পটভূমি নিম্নরূপ :
বিশিষ্ট সাহাবা হযরত আবূ মূসা আশআরী রা. খলীফা উমরকে রা. জানান যে, খলীফার ফরমান ও পত্রাদিতে নির্দিষ্ট দিন-তারিখের উল্লেখ না থাকায় তা অনেক সময় নানা রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। ফলে খলীফা উমর রা. বিশিষ্ট সাহাবাদের নিয়ে এক পরামর্শ সভা ডাকেন। সভায় হযরত আলী ইবনে আবূ তালিব রা. হিজরতের বছর থেকে নতুন সন গণনার প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি সকলেরই মনঃপূত হয়। কারণ হিজরতের পর থেকে স্বয়ং মহানবীর সা. নির্দেশক্রমেই দিন-তারিখ গণনার পদ্ধতি যথারীতি চালু ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে সেটা তখনও প্রথাগত সন হিসাবে সুবিন্যস্ত হয়নি। তাই পরামর্শ সভা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, হিজরতের বছর থেকে নতুন হিজরী সন গণনা করা হবে। এ নতুন সনে তৎকালে আরবদেশে প্রচলিত মাসসমূহের নাম বহাল রাখা হয়। কারণ এ মাসগুলির সঙ্গে আরবদেশের ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতির এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আল-কুরআনেও এ মাসগুলির উল্লেখ রয়েছে এবং হাদীস শরীফে এ মাসগুলোর ভিত্তিতে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগীর সুস্পষ্ট বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। তাই এ মাসগুলোর নাম এবং ক্রম পরিবর্তন করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এ কারণে হিজরী সন গণনার ক্ষেত্রে কিছুটা সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন পড়ে।
তখন আরব দেশে বছরের প্রথম মাস ছিল মুহররম। হযরত উসমান বিন আফ্ফানের রা. প্রস্তাব ও সকলের সম্মতিতে হিজরী সনের প্রথম মাস হিসাবে এটা অপরিবর্তিত থাকে। যদিও হিজরত সংঘটিত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে। এভাবে প্রচলিত আরবি সনের প্রথম মাস ও তারিখের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করার উদ্দেশ্যে হিজরতের দুই মাস আট দিন পিছিয়ে পয়লা মহররম থেকে হিজরী সন গণনা শুরু হয়। সে হিসাবে হিজরী সনের শুরু ৬২২ ঈসায়ীর ১৬ জুলাই অর্থাৎ হিজরতের বছর থেকে। ৬৩৮ ঈসায়ীতে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা তাঁর খিলাফত কালে তৎকালিন বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শক্রমে এবং সকলের সম্মতিক্রমে হিজরী ১৭ সনে ১০ জমাদিউল আউয়াল বুধবারের দিন এক আমিরী ফরমান বলে হিজরী সন চালু করেন। সেই থেকে সমগ্র বিশ্বে বিশেষত মুসলিম বিশ্বে হিজরী সন চালু আছে।
বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ্র শাসনামল ও সিংহাসনারোহণের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে বিভিন্ন সনের উদ্ভব ঘটে। এভাবেই শকাব্দ, হর্ষাব্দ, অশোকাব্দ, গুপ্তাব্দ, ফলাব্দ, বিক্রমাব্দ বা বিক্রম সম্বৎ, পালাব্দ, ভারত সন, শালিবন সন, জালালী সন, সেকান্দর সন ইত্যাদি সনের উৎপত্তি হয়। বাংলা সনেরও উৎপত্তি ঘটে মুঘল সম্র্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণের সময় থেকে। বাংলার স্বাধীন নবাব হুসেন শাহের আমলে বাংলা সনের উৎপত্তি হয় বলে অনেকের ধারণা ছিল। কিন্তু এখন সকলে একমত যে, সম্রাট আকবরের আমলেই এ সনের উদ্ভব ঘটে। ‘আকবর নামা’র বিবরণ থেকে এটা সন্দেহাতীত রূপে প্রমাণিত হয়।
মুঘল আমল থেকে উপমহাদেশে সরকারীভাবে হিজরী সন চালু ছিল। যদিও সম্রাট আকবর ‘এলাহী সন’ চালুর চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি তাতে সফল হননি। হিজরী সন চান্দ্রমাসের হিসাবে গণনা করা হয়। সেকালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত সনের অধিকাংশই চান্দ্রমাসের হিসাবে গণনা করা হতো। তখন বাংলাদেশের অন্যান্য সনের সাথে লক্ষ্মণ সেনও প্রচলিত ছিল। রাজা লক্ষ্মণ সেনের সিংহাসনারোহণের সময় থেকে এ সন গণনা করা হতো। এটাও ছিল চান্দ্রমাসের হিসাব অনুযায়ী। চান্দ্রবছরের সাথে সৌর বছরের পার্থক্য ১০/১১ দিন। এ গরমিল দূর করে চান্দ্রবর্ষের হিসাবকে সৌরবর্ষের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য হিন্দু জ্যোতিষীগণ প্রতি তিন চান্দ্রবছরে এক মাস অতিরিক্ত যোগ করে দিতেন। এ মাসটিকে তারা বলতেন ‘মলমাস’। সন গণনার এ অসংগতি দূরীকরণার্থে এবং খাজনাদি আদায় ও রাজকীয় অন্যান্য কার্যাদি সম্পাদনের সুবিধার্থে একটি নতুন সন চালু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ফলে সম্রাট আকবর তাঁর নবরত্নের অন্যতম বিজ্ঞ আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজীকে নতুন সন উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন।
‘আমীর-উল মুল্ক’, ‘আযাদ-উদ্-দৌলা’, ‘রোস্তম সানী’ প্রভৃতি উপাধিপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও পণ্ডিত ফতেহউল্লাহ সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের বছর অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরী বা ১৫৫৬ ঈসাব্দ পর্যন্ত হিজরী সনকে অপরিবর্তিত রেখে পরবর্তী সময় থেকে নতুন সন সৌরমাসের হিসাব অনুযায়ী গণনার ব্যবস্থা করে নতুন সন উদ্ভাবন করেন। এভাবে হিজরী সনের ভিত্তিতে নতুন সন তৈরী হলেও নতুন সনের হিসাব সৌরবছরের সাথে যুক্ত হওয়ায় দুই সনের মধ্যে বছরে ১০/১১ দিনের এবং ৩৩ বছরে এক বছরের ব্যবধান তৈরি হয়। ফলে নতুন সনের প্রবর্তনের সময় থেকে বিগত ৪৪৫ বছরে হিজরী সনের সাথে এর ন্যূনাধিক ১৩ বছরের ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যবধান ক্রমাগত বৃদ্ধিই পেতে থাকবে।
সম্রাট আকবর ফসল বোনা ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তাঁর রাজত্বকালের উনত্রিশতম বছর অর্থাৎ ১৫৮৫ ঈসায়ীতে শাহী ফরমান জারি করে এ নতুন সন চালু করেন। চালু করার পর থেকেই এ সন ‘ফসলী সন’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশে এ সন বঙ্গাব্দ নামেও পরিচিত। ‘ফসলী’ লকবটিও বহাল থাকে। বছরের নির্দিষ্ট দিনে খাজনা আদায়, অন্যান্য কর সংগ্রহ ও প্রজাসাধারণের সাথে শাহী দরবারের লেনদেনের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কাজে নতুন সন ব্যবহার করা হলেও মুঘল রাজ-দরবার ও মুসলিম সমাজে সর্বত্র ব্যাপকভাবে হিজরী সন ব্যবহৃত হতো। তাই দু’টি সনের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার্থে নতুন সনে হিজরী মাসের নাম গ্রহণ না করে দেশীয় শকাব্দের নাম গ্রহণ করা হয়। তৎকালিন বাংলাদেশে যে সকল সন প্রচলিত ছিল তার মধ্যে শকাব্দ অন্যতম। সে হিসাবে শকাব্দের মাসের নামগুলো সকলের মনে রাখা সহজ হয়। এ নামগুলো প্রায় সব নক্ষত্রের নামানুসারে। যেমন ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নামে বৈশাখ, ‘জ্যেষ্ঠা’ থেকে জ্যেষ্ঠ, ‘আষাঢ় পদ’ থেকে আষাঢ়, ‘শ্রাবণী’ থেকে শ্রাবণ, ‘ভাদ্রাদি’ বা ‘ভাদ্রপদ’ থেকে ভাদ্র, ‘অশ্বিনী’ থেকে আশ্বিন, ‘কৃত্তিকা’ থেকে কার্তিক, ‘পূষ্যা’ বা ‘পুষ্প’ থেকে পৌষ, ‘মঘা’ থেকে মাঘ, ‘ফল্গুনী’ থেকে ফাল্গুন এবং ‘চিত্রা’ থেকে চৈত্র।
উপরোল্লিখিত মাসগুলোর মধ্যে একমাত্র অগ্রহায়ণ মাসটি কোন নক্ষত্রের নামানুসারে হয়নি। ‘অগ্র’ থেকে অগ্রহায়ণ। এ অর্থে অগ্রহায়ণকে বছরের প্রথম মাস হিসাবে গণ্য করা উচিত। কিন্তু নতুন সন যখন প্রচলন করা হয় তখন ছিল বৈশাখ মাস। তাই বৈশাখ মাসকেই বছরের প্রথম মাস হিসাবে গণ্য করা হয়। ফসল কাটার মাস হিসাবেও বৈশাখের গুরুত্ব রয়েছে। অগ্রহায়ণ মাস আমন ধান কাটা ও মাস-মশুর-সরিষা আবাদের মওসুম হলেও বৈশাখে বাঙালির প্রধান ফসল আউস ধান, তিল, কাউন, প্রধান অর্থকরী ফসল পাট ইত্যাদি কাটার মওসুম। এ সময় বাংলাদেশের প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, পেয়ারা, কলা, লেবু, আম্রা ইত্যাদি ফল পাকে। এজন্য বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠকে ‘মধুমাস’ও বলা হয়। নানারূপ ফসল ও ফল পাকার মাস হিসাবে বৈশাখ মাসে নানাবিধ উৎসব-আনন্দেরও আয়োজন হয়ে থাকে। এজন্য বাংলা সনের প্রথম মাসটির একটি আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে।
বাংলা সনের কোন মাস ২৯, কোন মাস ৩০, ৩১ এমনকি ৩২ দিনে গণনার নিয়ম থাকায় এবং এ সম্পর্কিত আরো কিছু সমস্যা থাকায় এ সমস্ত সমস্যা ও জটিলতা দূর করে বাংলা সনের বিভিন্ন দিন-তারিখ একটি বৈজ্ঞানিক ও স্থায়ী ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে বাংলা একাডেমী প্রাচ্যের প্রখ্যাত মনীষী, বহু ভাষাবিদ, জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ঈসায়ী ১৯৬৩ সনের মে মাসে ‘বাংলা সালের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণ উপ-সংঘ’ নামে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এ উপ-সংঘ বা কমিটি ছিল নিম্নরূপ :
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (সভাপতি), অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান (তদানীন্তন পরিচালক, বাংলা একাডেমী), অধ্যক্ষ আবুল কাসেম (সদস্য), শ্রীযুক্ত সতীশ চন্দ্র শিরোমণি, জ্যোতিভূষণ (সদস্য), শ্রীযুক্ত অবিনাশ চন্দ্র কাব্য-জ্যোতিষতীর্থ (সদস্য), পণ্ডিত তারাপদ ভট্টাচার্য কাব্য ব্যাকারণ পুরাণ স্মৃতিতীর্থ জ্যোতিশাস্ত্রী (আহ্বায়ক)।
উক্ত উপ-সংঘ দীর্ঘ তিন বছর নানারূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গবেষণা-পর্যালোচনার পর সহজ পদ্ধতিতে বাংলা সনের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারণের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশমালা পেশ করেন :
“ক. মুঘল আমলে বাদশাহ আকবরের সময়ে হিজরী সনের সংগে সামঞ্জস্য রক্ষা করে যে বংগাব্দ প্রচলিত করা হয়েছিল তা থেকে বছর গণনা করতে হবে।
খ. ইংরেজি মাস ২৮, ৩০ কিংবা ৩১ দিনে হয়। উপসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা মাস গণনার সুবিধার জন্য বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত পাঁচ মাসের প্রতি মাস ৩১ দিন হিসাবে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত বাকী সাত মাস ৩০ দিন হিসাবে গণ্য করা হবে।
গ. অতিবর্ষের (লিপইয়ার) চৈত্র মাস ৩১ দিনে হবে। ৪ দ্বারা যে সাল বিভাজ্য, তাই অতিবর্ষ বলে পরিগণিত হবে।” (দ্র. মুহম্মদ আবু তালিব : বাংলা সনের জন্মকথা, পৃ. ৪৮)।
ঈসায়ী ১৯৬৬ সনের ১৭ ফেব্র“য়ারি বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত উপসংঘের শেষ বৈঠকে এ সুপারিশমালা পেশ করা হয়। এ বৈঠকে উপসংঘের সকল সদস্য ছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে বাংলা একাডেমীর জীবন-সদস্য অধ্যাপক এম. এ. হামিদ টি. কে. এম. এস-সি উপস্থিত ছিলেন। উক্ত বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যে :
“যেহেতু রাশি, নক্ষত্র এবং ঋতুর সংগে বাংলা মাসের পর্যায়ক্রম নির্ণয় হয়, সেইজন্য বৈশাখ মাস ১লা এপ্রিল হইতে গণনা করা সম্ভবপর নহে। মুঘল আমলে আকবরের সময় যে বংগাব্দ প্রচলিত করা হইয়াছিল তাহা হইতেই বৎসর গণনা করিতে হইবে এবং সেই হিসাবে আগামী পহেলা বৈশাখ হইবে ১৩৭৩ বাংলা সাল। বাংলা একাডেমীর তরফ হইতে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তানুযায়ী ১৩৭৩ সালের জন্য একটি দেওয়াল পঞ্জি তৈয়ার করিতে হইবে।” (দ্র. পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৭-৪৮)।
উপসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলা একাডেমী ১৩৭৩ বাংলা সন থেকে উক্ত সুপারিশের আলোকে যথারীতি দেয়াল পঞ্জি প্রকাশ করতে থাকে। ১৩৭৭ সনে (ঈসায়ী ১৯৭০) বাংলা একাডেমী উক্ত সুপারিশের আলোকে একটি ডায়েরীও প্রকাশ করে। ১৯৭৭ ঈসায়ীতে বাংলাদেশ সরকার বাংলা একাডেমীর বর্ষপঞ্জি সর্বত্র চালু করার জন্য নির্দেশ দেন।
বাংলা সনের ইতিহাসে উপরোক্ত ঘটনাক্রমগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন। বাংলা সনের উদ্ভাবক আমীর ফতেহউল্লাহ শিরাজীর নামের সাথে এভাবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর নামও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বর্তমানে উক্ত সংশোধিত বাংলা সনই বাংলাদেশে প্রচলিত। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলা সন আর পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত সন এক নয়, তাদের পঞ্জিকাও ভিন্ন। মুসলমানদের দ্বারা আবিষ্কৃত ও প্রবর্তিত এবং সর্বোপরি হিজরী সনের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৪৭ ঈসায়ীতে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলা সনের পরিবর্তে শকাব্দ ব্যবহার করে আসছে। এরদ্বারা পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বাংলা সনের সাথে একাধারে ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও দেশীয় ভৌগোলিক-প্রাকৃতিক যোগসূত্র প্রমাণিত হয়।
প্রধানত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মুঘল আমলে হিজরী সনকে সৌর হিসাবে পরিবর্তিত করে বাংলা সন তৈরী করা হয়। ফলে বৈশাখ থেকে চৈত্র এটা রাজস্ব-বর্ষ হিসাবে গণ্য হয়। ইংরাজ আমলে সরকারী কাজে ঈসায়ী বা গ্রেগরীয়ান বর্ষ চালু হলেও রাজস্ব আদায়ের জন্য পুরনো রাজস্ব-বর্ষই চালু থাকে। ইংরেজ সরকার এবং জমিদার শ্রেণী বাংলা সনের হিসাবেই রাজস্ব আদায় করতেন। পাকিস্তান আমলে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত করা হলেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তীকালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সরকার অদ্যাবধি ভূমি-রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলা সনের হিসাব বহাল রেখেছেন। বলাবাহুল্য, বাংলা একাডেমী কর্তৃক গঠিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাংলা সনে কিছু সংশোধনী আনা হয়, বাংলাদেশ সরকার সেটাই অনুসরণ করে চলেছেন।
উপরে সনের হিসাব সংরক্ষণের গুরুত্ব, বিভিন্ন সনের উদ্ভব ও বাংলা সনের জন্ম ও তার ক্রম-বিকাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলা সনের সাথে আরবি হিজরি সনের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং এর সাথে বাংলাদেশের ভৌগলিক আবহাওয়া, ঋতু-পরিবর্তন, সামাজিক অবস্থা ও জীবন-বৈচিত্র্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান।