পৃথিবীর তাবৎ শিল্প-সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্মেরই একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট থাকে। বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। মানুষের শ্রম ও সাধনার দ্বারা যা কিছু সৃষ্টি হয়, তার পিছনে সাধারণত দু’টি বিষয়ের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এক. মানুষের পরিবেশ ও প্রকৃতি। দুই. মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবনধারা, ধর্ম-সংস্কৃতি ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যের সূচনাকাল থেকে বাঙালির চিন্তা-চেতনা, জীবনধারা, ধর্ম-সংস্কৃতি এবং এদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রভাব বিভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে আমাদের সাহিত্যে। বাংলা ভাষার বিকাশ ও সমৃদ্ধিতেও এ প্রভাব বহুলাংশে ক্রিয়াশীল।
উত্তরে হিমালয় পর্বতের সুউচ্চ গিরিশৃঙ্গ এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি পরিবেষ্টিত বাংলার পাললিক সমতল ভূমি চিরদিনই উর্বর ও সুজলা-সুফলা। অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় পরিবৃত বাংলার প্রকৃতি চির শ্যামল ও ঘন তরুলতা, গাছ-পালায় সমাচ্ছন্ন। নদীতে নানা জাতের মাছ, গাছে গাছে অসংখ্য ফুল-ফল ও পাখি বাংলার প্রকৃতিকে সারা বছর সজীব ও মুখরিত করে রাখে। কৃষি-নির্ভর বাংলার মানুষ চিরকাল নানা ধরনের কৃষিপণ্যের উপর সহজ-সরল-স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাদের জীবনের স্বপ্ন-সাধ অতি সাধারণ ও অনাড়ম্বর। নিজের ঘর, আবাদি জমি, ফল-ফসল, খাল-নদী-বিলের মাছ আর দিগন্ত-বিস্তৃত মেঠোপথ পেরিয়ে সে স্বপ্নের তরী বড় একটা অগ্রসর হয় না। অল্পে তুষ্ট বাংলার মানুষ তাই চিরদিন নিজের চষা ক্ষেতের ফসল, নদী-বিল-হাওড়-বাঁওড়-পুকুরের মাছ ও বাগানের ফল খেয়ে পরিতৃপ্ত। এ সহজ-সরল আয়েশী জীবনে তারা মাছ ধরে, পানিতে সাঁতার কেটে, নৌকা বাইচ দিয়ে, হাডুডু খেলে, গান গেয়ে জীবনের অবসর মুহূর্তগুলো আনন্দে ভরে তোলার প্রয়াস পায়। নদীর অবিশ্রাম কুলুকুলু তান, পাখির কুজন সর্বদাই বাঙালির মনে এনে দেয় ভাবালুতা। তাই আনন্দ-বেদনা, হর্ষ-বিষাদে তারা সর্বদা গান গায়, গান রচনা করে, কবিতা লেখে, নানারকম কবিয়ালীতে মত্ত হয়ে ওঠে।
তাই দেখা যায়, বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ একধরনের গান বা অর্চনামূলক সঙ্গীত। মধ্যযুগে রচিত বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, নাথ সাহিত্য, আখ্যায়িকা কাব্য, ময়মনসিংহ গীতিকা, পালা গান, সারি গান, জারি গান, কবি গান, খনার বচন ইত্যাদি সবই মূলত গান বা সঙ্গীত। বাংলার শ্যামলিম প্রকৃতি এদেশের মানুষকে সর্বদাই ভাববাদী করে তুলেছে, সহজ-সরল জীবন-দর্শনে উদ্ধুদ্ধ করেছে। এ ভাববাদিতা ও সহজ-সারল্যপূর্ণ জীবন-দর্শন বাংলা সাহিত্যের মূল চেতনা। একারণে বাংলা সাহিত্যে গীতিকবির সংখ্যাই অধিক এবং গীতিকবিতার অজস্রতায় বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার সর্বদা পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটা বাংলার বিশেষ প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রত্যক্ষ প্রভাবের ফল। বাংলার মানুষের মৌল স্বভাব যেমন বাংলার বিশেষ প্রকৃতি ও পরিবেশের দ্বারা পরিগঠিত ও প্রভাবিত, তেমনি বাংলা সাহিত্যও এ মৌল স্বভাবের ব্যতিক্রম নয়।
এবারে দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলার মানুষ বিশেষ কোন একটি ধর্ম-দর্শন বা সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনার দ্বারা প্রভাবিত নয়। এদেশ মূলত অনার্য-অধ্যূষিত অঞ্চল। কিন্তু এদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বহিরাগত জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আগমন করেছে। কেউ রাজ্য জয়ের জন্য, কেউ ঐশ্বর্যের লোভে এবং কেউ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাঙলায় আগমন করেছে। তারা কেউ এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছে, আবার অনেকেই উদ্দেশ্য সিদ্ধির পর এদেশ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছে। তবে সকলেই অল্প-বিস্তর তাদের পদচিহ্ন রেখে গেছে। তাদের ভাষা, ধর্ম, চিন্তা-চেতনা ও জীবন-যাপন প্রণালীর প্রভাব কম-বেশি বাংলার সমাজ-জীবনে পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে একটি মিশ্র চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক আবহ বাংলার সমাজ-জীবনে অন্তঃসলিলা হিসাবে সর্বদা প্রবহমান।
বৈদিক যুগে প্রাচীন হিন্দুধর্ম উপমহাদেশের প্রধান ধর্ম হিসাবে গণ্য ছিল। সংস্কৃত ছিল আর্য ব্রাহ্মণদের ধর্মীয় ভাষা। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ এ ভাষায় রচিত। তাই বলা যায়, অনার্য-অধ্যূষিত বাংলাদেশে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবেশাধিকার ঘটেনি। অতঃপর গৌতম বুদ্ধের আগমন ঘটে। তাঁর প্রচারিত বৌদ্ধধর্ম সমগ্র উপমহাদেশ তথা শ্রীলঙ্কা, বর্মাসহ চীন ও থাইল্যাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক লেখা হয় পালি ভাষায়। বাংলাদেশে তখনও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্ম হয় নি। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ পাল রাজাদের আমলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উম্মেষ ঘটে। পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির যেমন বিস্তার ঘটে, তেমনি বাংলা ভাষার চর্চা ও সাহিত্যের বিকাশও ঘটে তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায়। অবশ্য ঐ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্পূর্ণ পরিচয় আমরা জানতে পারি না। কারণ পরবর্তীতে দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আগত সেন রাজাদের বৌদ্ধ-বিদ্বেষের ফলে বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতি, বৌদ্ধদের লালিত ভাষা-সাহিত্য সবই বিনাশ প্রাপ্ত হয়। ব্রাহ্মণ্য সেন রাজাদের খড়গ থেকে পাল যুগে রচিত বাংলা সাহিত্যও রক্ষা পায়নি। বাংলাদেশ থেকে নেপালে পালিয়ে যাওয়া কোন ব্যক্তি বা দলের বদৌলতে কেবলমাত্র একটি পাণ্ডুিলপি কোন মতে রক্ষা পায়। ১৯১২ সনে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপালের রাজ দরবার থেকে আবি®কৃত ও ১৯১৬ সনে তৎসম্পাদিত সে পাণ্ডুলিপিটিই বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন হিসাবে পরিচিত।
১২০৪ সনে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিল্জী সেন বংশের সর্বশেষ প্রতিভূ রাজা লহ্মণসেনকে পরাজিত করে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। তারপর বাংলাদেশে মুসলিম শাসন কায়েম হয়। মুসলিম শাসনামলের সাড়ে পাঁচশ বছরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আত্যন্তিক বিকাশ ঘটে। ১৭৫৭ সনে পলাশীতে ইংরাজদের সাথে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বাংলায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। এরপর দীর্ঘ ১৯০ বছর এদেশে ইংরাজরা রাজত্ব করে। এভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের লোকেরা বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং তার ফলে বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম এমনকি জীবনধারা নানাভাবে বিবর্তিত-পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন-পরিবর্তনের দ্বারা বাংলা সাহিত্যেও নানা ধরনের চিন্তা-দর্শন ও জীবনাচারের প্রতিফলন ঘটেছে।
অতএব আদি, মধ্য ও আধুনিক যুগে বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপট আলোচনা করলে দেখা যায় যে, কোন একক ধর্ম-সংস্কৃতি বা চিন্তা-চেতনা এর পিছনে ক্রিয়াশীল নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট এর মূলে কাজ করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্ম-সম্প্রদায় বসবাস করেছে। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বোধ-বিশ্বাস। যখনই কোন বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায় বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করেছে, তখন সে বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাস, আদর্শ ও সাংস্কৃতিক আবহ বাংলার সমাজ-সাহিত্য ও জীবনাচারকে প্রভাবিত করেছে। ফলে বিভিন্ন সময় এদেশে বিভিন্ন ধর্মের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা-চেতনা ও জীবনায়ন গড়ে উঠেছে। বাংলা সহিত্যেও অনিবার্যভাবে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। কারণ মানুষের জীবন ধর্মের দ্বারা বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগে এটা বিশেষভাবে প্রযুক্ত, তখন সবদেশেই মানুষের জীবন-সাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ধর্ম। আধুনিক যুগেও একথার সত্যতা একেবারে নিঃশেষিত হয় নি। ধর্মের ব্যাখা-বিশ্লেষণ হয়ত পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু এখনও মানুষ কোন না কোন একটি ধর্মে আত্মস্থ। প্রচলিত বিভিন্ন ধর্ম ছাড়াও প্রকৃতি-পূজারী, নিরীশ্ববাদ, সংশয়বাদ, কমিউনিজম, বিভিন্ন দার্শনিক ও ভাববাদী চিন্তা, দর্শন ইত্যাদি সবই মূলত এক একটি ধর্ম। ‘ধর্ম’ শব্দের অর্থ ধারণ। সে অর্থে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোন না কোন ধর্ম, দর্শন বা মতবাদের ধারক।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীর একসময় এদেশে আগমন করেছিলেন। তাঁর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশে জৈনধর্মের ব্যাপক প্রচার ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্মের আগমনে জৈনধর্ম এদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। ফলে বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্য ও জীবনাচার থেকে পরবর্তীতে জৈনধর্মের প্রভাব প্রায় নিঃশেষিত হয়। বৌদ্ধ পাল শাসনামলে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটে। এদেশের ভাষা-সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, স্থাপত্য-ভাস্কর্যে এর প্রতিফলন ঘটে। সেন আমলে বৌদ্ধদের প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পূর্ণ লোপ পায়। তাদের ধর্ম-সংস্কৃতি, শিল্প-ভাস্কর্য ইত্যাদি সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তা সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্ম ও সভ্যতার প্রভাব এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বদাই কমবেশি বিদ্যমান ছিল। বিশেষত বাংলাদেশের অসমতল ও পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় পালিয়ে থাকা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এ প্রভাব বজায় ছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলে হিন্দু-বৌদ্ধ নির্বিশেষে এদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। ইসলামের প্রভাবে এদেশের সমাজ-সংস্কৃতি, স্থাপত্য-ভাস্কর্য, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি সবকিছুই এক স্বতন্ত্র রূপ ও আদলে গড়ে ওঠে। অবশ্য ইসলামের সাম্য-ভ্রাতৃত্বপূর্ণ উদার মানবিক আদর্শের কারণে পূর্বতন হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতিও পাশাপাশি বিরাজমান ছিল এবং মুসলিম শাসকদের পৃষ্টপোষকতায় তা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ লাভ করেছে। ইংরাজ শাসনামলে বাংলাদেশে ইংরাজি ভাষা ও খ্রীস্টান ধর্মের প্রচার ঘটে। ফলে বাংলার সনাতন জীবনধারায় এক নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ইঙ্গ-বঙ্গ সংস্কৃতির উদ্ভব, ইয়ং বেঙ্গলদের প্রাদুর্ভাব, খ্রীস্টান ধর্মের প্রচার ও রামমোহন-দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্মের গোড়াপত্তন ঘটে। বাংলার গ্রামীণ জনপদে এসবের প্রভাব বড় একটা দেখা না গেলেও শহরাঞ্চলে বিশেষত কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এর প্রভাব লক্ষণীয় হয়। বাংলা সাহিত্যেও এর অনিবার্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
এভাবে দেখা যায়, প্রাচীন ও মধ্যযুগে অন্তত তিনটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভিৎ গড়ে উঠেছে এবং আধুনিক যুগে আরো একটি ধর্মীয় বা পাশ্চাত্য চিন্তাধারা আমাদের সমাজ জীবন ও সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার প্রয়াস পেয়েছে। এভাবে দেখা যায়, কখনো এককভাবে আবার কখনো বিভিন্ন ধর্মসমন্বয়ের মিশ্র প্রভাবে এদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্প-ভাস্কর্য, জীবনাচার ও সামাজিক আদর্শ গড়ে উঠেছে। তাই কখনো একক ধর্মের প্রভাব, আবার কখনো মিশ্র ধর্মের প্রভাব বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনাচার ও সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। অতএব, কোন একক ধর্ম-সংস্কৃতি বা চিন্তা-চেতনার প্রভাবে বা প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধর্মীয় চেতনা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে যুগ যুগ ধরে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার সুসমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলাদেশে যে প্রধান তিনটি ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়, তা হলোÑহিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনবোধের ভিত্তিতে এ তিন জাতির রয়েছে নিজস্ব সুস্পষ্ট ঐতিহ্য। তাদের রচিত সাহিত্যেও তাদের স্ব স্ব ঐতিহ্যিক প্রেরণা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধ পাল রাজাদের আমলে বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব ছিল ব্যাপক। ফলে ঐ সময় বাংলাদেশের শিল্প-ভাস্কর্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছুতেই বৌদ্ধধর্মের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পাল আমলেই বাংলা ভাষার উদ্ভব। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ ধর্মীয় উপাসনা সঙ্গীত হিসাবে যেসব গান বা কবিতা রচনা করেন তা চর্যাপদ ও দোহা হিসাবে খ্যাত। এতে বৌদ্ধধর্মের চিন্তা-চেতনা-ঐতিহ্য ও জীবনাচারের পরিচয় সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের চিরায়ত শ্যামল নিসর্গ, জীবনায়ন এবং চর্যাপদ ও দোহার রচিয়তাদের আচরিত বৌদ্ধধর্মের নিয়ম-নীতি ও ধর্মীয় প্রেরণাই তাঁদেরকে এসব পদ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
পরবর্তীকালে সেন রাজাদের শাসনামলে বৌদ্ধধর্ম, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্প-ভাস্কর্য ইত্যাদি সবকিছুর উপর খড়গাঘাত পড়ে। ফলে তা প্রায় সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সেন রাজাগণ জাতিগতভাবে আর্য এবং ধর্মীয়ভাবে উচ্চ বর্ণীয় হিন্দু ব্রাহ্মণ। অন্যদিকে, বৌদ্ধরা অনার্য এবং বাংলার আদি অধিবাসী। আর্য ব্রাহ্মণগণ এদেশের অনার্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে ঘৃণা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে দেখতো। এদেশ জয় করে তারা শাসন-শোষণ করেছে, এদেশকে তারা কখনো স্বদেশ ভাবতে পারে নি। এদেশের অনার্য জনমণ্ডলীর ধর্ম-ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তারা ছিল অসহিষ্ণু। ফলে বাংলাদেশের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাদের কোন স্থায়ী প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু বাংলার নিম্নবর্ণীয় হিন্দুগণ অনার্য ও এদেশের আদি অধিবাসী। আর্য হিন্দুগণ নিজেদেরকে উচ্চ বর্ণীয় প্রভু সম্প্রদায় এবং নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদেরকে তাদের সেবাদাস হিসাবে বিবেচনা করতো। একারণে হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা সৃষ্টি হয়। এ বিভেদ ও বৈষম্য এত দুর্লঙ্ঘ ও অপ্রতিরোধ্য ছিল যে, আধুনিক যুগের আলোকিত সভ্যতার যুগেও তা বিদূরিত হয় নি। ধর্ম মানুষে মানুষে যে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও উদারতা শিক্ষা দেয়, আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই হিন্দু সমাজ কখনো একটি সংহত, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল, উদার মানবিক সমাজে পরিণত হতে পারে নি। আদি ও মধ্যযুগে হিন্দুদের রচিত সাহিত্যেও এ মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে।
ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সর্বদা প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। বৌদ্ধ পাল যুগে রচিত চর্যাপদে যেমন বৌদ্ধধর্মের দর্শন ও জীবনাচারের প্রতিফলন ঘটেছে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও তেমনি হিন্দু ও মুসলমানদের রচিত সাহিত্যে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় চেতনার প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যযুগে রচিত হিন্দুদের সাহিত্যকে আবার একই নিরিখে বিচার করা যুক্তিযুক্ত নয়। এটাকে দুভাগে বিভক্ত করা সমীচিন। একটি বর্ণ হিন্দুদের রচিত সাহিত্য, অন্যটি নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের রচিত সাহিত্য। বর্ণ হিন্দু বা আর্য-ব্রাহ্মণদের সাথে এদেশের মাটি ও মানুষের সম্পর্ক সৃষ্টি না হওয়ায় তাদের ধর্মীয় আদর্শের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে অতটা প্রতিফলিত হয়নি। মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্য এর একমাত্র ব্যতিক্রম। রাধাকৃষ্ণের শাস্ত্রীয় প্রেমের কাহিনীর ভিত্তিমূলে বৈষ্ণব দর্শন ও কাহিনীর সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ইসলামের প্রভাবে সে শাস্ত্রীয় কাহিনী অনেকটা মানবিক উপাখ্যানের আকারে পরিবেশিত হওয়ায় এবং তাতে নিম্নবর্ণীয় ধর্ম-সম্প্রদায়ের জীবন-দর্শনের খানিকটা প্রতিফলন ঘটার কারণেই তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এখানে উচ্চবর্ণীয় ও নিম্নবর্ণীয় হিন্দু দর্শনের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। উচ্চবর্ণীয় আর্য দেবতা কৃষ্ণের সাথে অনার্য লোকজ নায়িকা রাধার অসবর্ণ প্রেমের মাহাত্ম্য বৈষ্ণব পদাবলিতে রূপকাকারে বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে, বৈষ্ণব সাহিত্য ব্যতিরকে মধ্যযুগে হিন্দুদের রচিত সব সাহিত্যেই নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের ধর্মীয় আদর্শের প্রতিফলন ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। সেন আমলে নির্যাতিত বৌদ্ধদের ধর্মমতেরও একটি প্রচ্ছন্ন ধারা এরসাথে বিযুক্ত হয়েছে। কারণ এদেশের মাটির সাথে নিম্নবর্ণীয় হিন্দু ও নির্যাতিত বৌদ্ধদের সম্পর্ক আদি ও অকৃত্রিম। তারা উভয়েই অনার্য ও নানাভাবে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের দ্বারা সর্বদা নির্যাতিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্য, বিভিন্ন কাহিনী কাব্য, নাথ সাহিত্য, চরিত সাহিত্য, খনার বচন, গান-গাঁথা, রূপকথা, ব্রতকথা, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদি সবকিছুতেই নিম্নবর্ণীয় হিন্দু ও নির্যাতিত বৌদ্ধদের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতিফলন ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় হিন্দু ও বৌদ্ধ মতবাদের সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করা দুরূহ।
মধ্যযুগে মুসলমানদের রচিত বিভিন্ন আখ্যান কাব্য, চরিত সাহিত্য, গান-গাঁথা ইত্যাদিতে ইসলামী আদর্শ-ঐতিহ্য ও চিন্তা-চেতনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলায় মুসলিম শাসনামলে (১২০৪-১৭৫৭) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা ও বিকাশ ঘটে। বলতে গেলে, এ সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পুনর্জন্ম ঘটে। বৌদ্ধ পাল যুগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্ম হলেও সেন আমলে আঁতুর ঘরে সে নবজাতকের অকাল মৃত্যু ঘটে। মুসলিম শাসনামলে নব উদ্দীপনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নব যাত্রা শুরু হয়। ঐ সময় মুসলিম রাজা-বাদশাহ ও অভিজাত শ্রেণীর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু-মুসলমান উভয়েই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায় আত্মনিয়োগ করে। মুক্ত মনে স্বাধীন পরিবেশে সাহিত্য চর্চা করার ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয়ের রচিত সাহিত্যে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটে।
মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। সেন আমলে মৃতবৎ বাংলা ভাষায় নতুন প্রাণ-সঞ্চার ঘটে। ভাষার প্রকৃত সম্পদ হলো শব্দ। যে ভাষায় যত বেশি অর্থবোধক শব্দ রয়েছে, সে ভাষা ততবেশি সমৃদ্ধ ও ভাবপ্রকাশের উপযোগী। সেন আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চাকে দারুণভাবে নিরুৎসাহিত করায় সে যুগে বাংলা ভাষা একেবারে নিঃস্ব ও দৈন্যদশা প্রাপ্ত হয়। মুসলিম আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চাকে উৎসাহিত করার ফলে প্রয়োজনের তাগিদেই এ ভাষা নতুন নতুন শব্দ চয়ন ও স্বীকরণ করে। বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় শব্দের ব্যাপক ব্যবহার এবং বিদেশাগত মুসলমানদের ভাষা আরবি-ফারসি-তুর্কি ও উর্দু থেকে অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবিষ্ট হবার ফলে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়। আধুনিক যুগের অনেক ঐতিহাসিক এ মিশ্র ভাষাকে ‘ফারসি বাংলা,’ ‘মুসলমানী বাংলা’, ‘যাবনী মিশাল বাংলা’ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত করলেও তৎকালে হিন্দু-মুসলিম সকলেই এ ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছেন এবং পরস্পর ভাবের আদান-প্রদান করেছেন। সাহিত্যের ভাব ও বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রেও পূর্বতন বৌদ্ধ ও হিন্দু আদর্শের পাশাপাশি ইসলামি আদর্শ, ঐতিহ্য ও ভাবধারার আলোকে বাঙালি মুসলমানদের স্বতন্ত্র সাহিত্য সৃষ্টি হয়। এভাবে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপট হিসাবে কখনও এককভাবে আবার কখনও মিশ্রভাবে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটে।
ইংরাজ আমলে খ্রীস্টান পাদ্রি ও হিন্দু ব্রাহ্মণদের যোগ-সাজসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন রূপ পরিগ্রহ করে।। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রচলিত বাংলা ভাষায় পরিবর্তন সাধিত হয়। ইতঃপূর্বে প্রচলিত বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু শব্দ বাদ দিয়ে তার বদলে অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য সংস্কৃত শব্দ সমন্বয়ে নতুন কৃত্রিম বাংলা ভাষা তৈরি করা হয়। সে কৃত্রিম ভাষার নাম দেয়া হয়Ñ ‘সাধু বাংলা’। এ কৃত্রিম ভাষা চালু করার উদ্দেশ্যে এ ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করে ছাত্রদেরকে তা পড়ানো হয়। সংস্কৃত সাহিত্যের ভাব ও বিষয় নিয়ে সাধু বাংলায় ফরমায়েশি পুস্তকাদি রচিত হয়। এ নতুন সাধু বাংলার প্রজনন কেন্দ্র হিসাবে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) স্থাপিত হয়। এভাবে ইংরাজ আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একটি পরিবর্তিত-বিবর্তিত রূপ লাভ করে। অবশ্য এ কৃত্রিম বাংলা ভাষা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ইংরাজ পাদ্রী ও সংস্কৃত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও সেখানকার শিক্ষার্থীদের বাইরে বড় একটা প্রসার লাভ করে নি। সাধারণ বাঙালি সমাজে বিশেষত বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তখনও আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দ সংবলিত বাংলা ভাষাই ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
ইংরাজদের আনুকূল্য পেয়ে বাঙালি হিন্দুসমাজ শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই শনৈ শনৈ উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। তারা ইংরাজি ভাষা শিখে ইংরাজি সাহিত্য অধ্যয়ন করে ইংরাজি শিক্ষা-সভ্যতায় অভ্যস্ত হয়ে প্রশাসনিক বিভিন্ন পদ লাভ করে এবং জমিদারী-জোতদারী-ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য লাভ করে। অন্যদিকে ইংরাজদের অধীনতা অস্বীকার করে মুসলমানগণ তখনও ফকির আন্দোলন, বালাকোট আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, টিপু সুলতানের বিদ্রোহ, তিতুমীরের প্রতিরোধ আন্দোলন ইত্যাদির মাধ্যমে একের পর এক স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকে। তারা ইংরাজি ভাষা বর্জন ও ইংরাজদের শিক্ষা-সভ্যতা ও কৃষ্টি-কালচার থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে তারা শুধু রাজ্যহারা হয় নি, পর্যায়ক্রমে সবধরনের চাকরি, জমিদারী-জোতদারী-ব্যবসা-বাণিজ্য ও সকল প্রকার সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়। ১৮৫৭ সনে স্বাধীনতা বিপ্লব, ইতিহাসে যা সিপাহী বিদ্রোহ নামে খ্যাত, ব্যর্থতা বরণের পর মুসলমানদের মধ্যে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে। আপাতদৃষ্টে ইংরাজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনা করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক মুসলিম চিন্তাশীল ব্যক্তি ইংরাজদের সাথে আপোষরফায় উদ্ভুদ্ধ হন। স্যার সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ আমির আলী, নবাব আব্দুল লতিফ প্রমুখ শিক্ষিত চিন্তাশীল ও সমাজ-হিতৈষী ব্যক্তিগণ মুসলমানদেরকে ইংরাজি শিক্ষা গ্রহণে উদ্ভুদ্ধ করার প্রয়াস পান। এভাবে মুসলিম সমাজ সশস্ত্র বিপ্লবের পথ পরিহার করে ধীরে ধীরে ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিভিন্ন সরকারী চাকুরিতে যোগদান করে এবং তাদের অনেকেই সাহিত্য-সাংবাদিকতা ও সমাজসেবায় অংশগ্রহণ করে মুসলিম সমাজের উন্নতিতে অবদান রাখেন। ফলে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দির শেষার্ধে অর্থ্যাৎ বাঙালি হিন্দুর নবজাগরণের প্রায় অর্ধশতাব্দী পর।
১৮৫৭ সনের পর হতাশাগ্রস্ত ও চরম বিপর্যস্ত বাঙালি মুসলমানগণ ধীরে ধীরে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে শুরু করলেও সে পথ তাদের জন্য কখনও বাধা-প্রতিবন্ধকতাহীন ছিল না। ইংরাজদের ভেদ-নীতির কারণে এবং হিন্দু-তোষণ ও মুসলিম-বিদ্বেষের ফলে উভয় ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে নানা বিদ্বেষ ও বিভাজন সৃষ্টি হয়। শোষিত-বঞ্চিত-অধঃপতিত মুসলিম জাতি তখন স্বীয় অস্তিত্ব বজায় রাখা ও ভবিষ্যত সম্ভাবনার পথ অবারিত করার উদ্দেশ্যে আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন হয়। মুসলমানদের উন্নতিকে ক্ষমতাশীন ও আধিপত্যবাদী বর্ণ হিন্দু ও ইংরাজগণ সুনজরে দেখে নি, বরং পদে পদে তাদেরকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়। এ প্রসঙ্গে দু’একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা চলে। ১৯০৫ সনে বাংলাকে বিভক্ত করে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়। এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলীয় অধঃপতিত জনপদের উন্নতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় ভারতব্যাপী হিন্দু সমাজ বঙ্গভঙ্গ রদ করার উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। ভারতের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের তুমুল আন্দোলনের মুখে ইংরাজ শাসক মাথা নত করতে বাধ্য হয়। অতঃপর পূর্ববাংলা ও আসামের অনুন্নত জনগোষ্ঠীর জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিকেও হিন্দু কংগ্রেস এমনকি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথসহ বাঙালি হিন্দুগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তার বিরোধিতা শুরু করে। অবশেষে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর দানকৃত জমির উপর এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর জমিদার নবাব আলী চৌধুরীর জমিদারি বন্ধক রাখা টাকায় ১৯২১ সনের ১লা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে মুসলিম সমাজ পদে পদে তাদের উন্নতির পথে প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশি হিন্দুর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় অবশেষে ভারতীয় মুসলমানগণ নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ অনুভব করেন। এ আকাংক্ষার প্রতিফলন ঘটে তাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির কর্মপ্রয়াসে। ১৯৪৭ সনের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দ্বারা তাদের সে আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার আংশিক রূপায়ণ ঘটে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যের ভাব-বিষয় ও আবেদনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটে। ১৯৪৭ সনে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান, পরবর্তীতে যা স্বাধীন বাংলাদেশ নামে পরিচিত হয়, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রধানত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশের সাহিত্যের ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করেছে। শুধু সাহিত্য নয়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার মধ্যেও এ স্বাতন্ত্রিক পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কালক্রমে এ পরিচয় আরো স্পষ্টতর হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। আঞ্চলিকতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র প্রেক্ষাপটই এ পরিচয়কে উজ্জ্বলতর করে তুলবে।
প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বের সকল সাহিত্যে ধর্মের প্রভাব ছিল অনিবার্য। ধর্মের সাথে ইতিহাস ও অন্যান্য মানব-কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই ধর্মীয় বিধি-বিধান ও আচরণের সাথে মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি একাত্ম হয়ে সাহিত্যের উপকরণ সৃষ্টি করেছে। চর্যাপদে এ জীবনঘনিষ্ঠতা বিদ্যমান থাকার কারণেই তা সেকালে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রাচীনকালে বাংলা ভাষায় রচিত ও দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত দোহা, সোনার বচন, খনার বচন, বিভিন্ন প্রবাদ-প্রবচন এবং মধ্যযুগের রচিত বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যে তৎকালিন সমাজের বোধ-বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের যুগপৎ রূপায়ণ ঘটেছে। তাই এ সাহিত্য বাঙালি সমাজে সর্বদা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
১২০৪ সনে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিল্জীর বাংলা বিজয়ের পর বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক তথা সমগ্র জীবনায়নে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ও বিপ্লব সংঘটিত হয়। অবশ্য তার অনেক আগে থেকেই মুসলিম পীর-আউলিয়া-দরবেশ ও ধর্ম-প্রচারকদের দ্বারা এদেশে ইসলাম প্রচারিত হতে থাকে। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসলামের প্রচার-প্রসার ব্যাপকতা লাভ করে। যদিও মুসলিম শাসকগণ সরাসরি কেউ ধর্ম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন না, কিন্তু রাজশক্তি মুসলিম হওয়ায় ইসলাম প্রচারে তা অনুকূল ও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। মুসলিম ধর্ম-প্রচারকগণ অনেকটা অনুকূল পরিবেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছেন। ফলে অত্যল্পকালের মধ্যেই হিন্দু-প্রধান বাংলা মুসলিম-প্রধান বাংলায় পরিণত হয়। মুসলিম শাসনের ফলে এদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা, প্রশাসন, আইন-আদালত ও বিচার বিভাগ, ভূমি-ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। অনুরূপভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসারের ফলে এদেশে নতুন সামাজিক ব্যবস্থা, মূল্যবোধ, জীবনাচার ও সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। তৎকালিন সময়ে এটা সর্বাধিক উন্নত, মানবিক ও প্রগতিশীল ব্যবস্থা হিসাবে সকল শ্রেণির বিশেষত বঞ্চিত-নিগৃহীত ও অধঃপতিত মানুষের নিকট অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে দেখা দেয়। ফলে তারা সমাজের সর্বনিম্ন ও অবহেলিত অবস্থা থেকে দ্রুত উন্নততর অবস্থায় উন্নীত হয়ে যথাযোগ্য মানবিক মর্যাদা লাভ করে।
ভাষার ক্ষেত্রেও মুসলিম শাসনামলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। ইতঃপূর্বে সেন-ব্রাহ্মণ্য আমলে বাংলা ভাষা ছিল অত্যন্ত অবহেলিত-অবজ্ঞাত এবং প্রায় মৃত। মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষার নবজš§ ঘটে। তখন বাংলা ভাষার চর্চাকে শুধু উৎসাহিত করা নয়, অসংখ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি ইত্যাদি শব্দের দ্বারা বাংলা ভাষার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে এ ভাষাকে মনের বিচিত্র ভাব প্রকাশের উপযোগী করা হয়। এ ভাষায় সাহিত্য চর্চাকে উৎসাহিত করা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়। ফলে বাংলা ভাষার চর্চা হয় অবারিত ও স্বতঃস্ফূর্ত। সাহিত্য চর্চায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে নব উদ্যমে বাংলা সাহিত্যের চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।
কিন্তু সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমান উভয় জাতি নিজ নিজ ধর্ম ও ঐতিহ্যের দ্বারা প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ হন। হিন্দু কবিরা যেমন হিন্দুধর্ম ও পৌরাণিক কাহিনী ও হিন্দু ঐতিহ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, মুসলিম কবিরাও তেমনি ইসলামি আদর্শ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তবে পরস্পরের মধ্যে কখনো কোন দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয় নি। শান্তিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে তারা উভয়েই স্ব স্ব সৃষ্টিকর্মে নিরত থেকেছেন। ফলে উভয়েই বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে বাংলা সাহিত্যকে সম্মিলিতভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তাই বাংলায় মুসলিম শাসনামলকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতি তখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বহিঃবিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে।
এ কথা স্বীকার্য যে, হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের সাহিত্যের ভাষা সম্পূর্ণ এক ছিল না। মুসলমানদের লেখায় আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ ছিল তুলনামূলকভাবে অধিক। হিন্দু কবিদের কবিতায় কিছু কিছু আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ লক্ষ্য করা গেলেও তার সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। ভাষার ক্ষেত্রে এটা উভয়ের ভিন্ন ঐতিহ্যিক পরিচয় বহন করে। বাংলা ভাষায় প্রচলিত বহু আরবি-ফারসি শব্দ উভয় ধর্মের লোকেরাই সমভাবে অভিন্ন ব্যঞ্জনায় গ্রহণ করেছে, তবু এমন অসংখ্য শব্দ রয়েছে যা উভয় জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহ্যিক ভিন্নতাকেই পরিস্ফুট করে তোলে। মুসলিম শাসনামলে অসংখ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবিষ্ট হয়। এ জাতীয় বহু শব্দ হিন্দু-মুসলিম উভয় জাতির লোকই সমভাবে গ্রহণ করলেও এমন বহু শব্দ রয়েছে, যা বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ভাষা। সঙ্গত কারণেই তা বাঙালি হিন্দুর নিকট গৃহীত হয় নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রশাসন, আইন-আদালত, ভূমি-ব্যবস্থা ইত্যাদি সংক্রান্ত এমন অসংখ্য আরবি-ফারসি শব্দ রয়েছে, যা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই অকাতরে গ্রহণ করেছে। কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় পরিভাষা হিসাবে প্রচলিত অসংখ্য আরবি-ফারসি শব্দ, যা বাঙালি মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য বিবেচিত হলেও বাঙালি হিন্দু তা স্বভাবতই গ্রহণ করে নি। অনুরূপভাবে হিন্দু ধর্মীয় পরিভাষাগত অনেক শব্দ, যা হিন্দুদের নিত্য-ব্যবহৃত ও একান্ত পরিচিত হলেও, বাঙালি মুসলমান তা সঙ্গত কারণেই গ্রহণ করে নি। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ ভিন্ন ঐতিহ্য আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের দু’টি প্রধান স্বতন্ত্র ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপটের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের রচিত সাহিত্যের উপাদানও ভিন্ন। উভয়ের রচিত সাহিত্যের ভাব, বিষয় ও অনুপ্রেরণা দু’টি ভিন্ন ঐতিহ্যিক উৎস থেকে উৎসারিত। হিন্দুরা তাদের ধর্ম, আরাধ্য দেব-দেবী, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আদলে সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। অনুরূপভাবে মুসলমানরা ইসলামি ভাব, আদর্শ, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও মুসলিম বীরদের নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছে। ইংরাজ আমলে ইংরাজি বা পাশ্চাত্য সাহিত্য-শিক্ষা-সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাব বহুলাংশে বাংলা সাহিত্যের উপর পড়লেও তা মূলত আঙ্গিকের ক্ষেত্রে যতটা লক্ষ্যযোগ্য, অন্যক্ষেত্রে ততটা নয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার জনক হিসাবে পরিচিত খ্রীস্টানধর্মে দীক্ষিত ইংরাজি শিক্ষিত মাইকেল মধূসুদন দত্তের সাহিত্যের ভাব-বিষয় ও উপকরণ সবই হিন্দু পুরাণ থেকে সংগৃহীত। আধুনিক বাংলা সহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের মূল অনুপ্রেরণা ও দর্শনও উপনিষদীয় চিন্তা-চেতনা থেকে উৎসারিত। অনুরূপভাবে কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখের রচনাও তাঁদের স্ব স্ব আদর্শ-ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত। এরদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সৃজনশীল প্রতিভা তাঁদের সৃষ্টিকর্মে সর্বদা স্ব স্ব ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক আদর্শ, ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে তাড়িত ও অনুপ্রাণিত হন।
মধ্যযুগে মুসলিম কবিগণ সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে ভাষা ও বিষয়বস্তুগতভাবে যেমন হিন্দুদের থেকে ভিন্ন ঐতিহ্যের অনুসরণ করেছেন, তেমনি সাহিত্যের রূপ-রীতি ও শিল্প-সৌষ্ঠব রূপায়ণের ক্ষেত্রেও ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। আরবি ও ফারসি সাহিত্যের কাহিনী, ভাব ও বিষয়ের অনুসরণে বাংলা কাব্য-কবিতা রচনার ক্ষেত্রে মুসলমান কবিগণ আরবি-ফারসি সাহিত্যের রূপরীতিও বহুলাংশে গ্রহণ করেছে। মধ্যযুগে বাংলা কাব্যে নতুন রূপরীতি প্রবর্তনের ক্ষেত্রে মুসলিম কবিদের অবদান তাই বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।
একই ভৌগোলিক পরিবেশে, অভিন্ন আবহাওয়ায় জীবন-যাপন ও একই ভাষা-ভাষী হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান এ উভয় জাতির রচিত সাহিত্যের ভাব-বিষয়-উপাদান হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উভয় সাহিত্যের আবেদনেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। একটিতে পৌত্তলিক হিন্দুর জীবন-চেতনা, স্বপ্ন-সাধ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রতিফলন ও রূপায়ণ ঘটেছে। অন্যটিতে ইসলামি আদর্শ, জীবন-চেতনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্বপ্ন-কল্পনার বিকাশ ঘটেছে। উভয়ের নিজ নিজ ধর্ম-বিশ্বাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনায়নের ফলেই এ ভিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে এ ভিন্নতা কেবল সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, রাজনৈতিক-সামাজিক আদর্শ ও জাতীয় আশা-আকাংক্ষা ও লক্ষ্য নির্ধারণেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে ১৯৪৭ এ পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ এ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
আমাদের রাজনৈতিক সত্তা, জাতীয় অস্তিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচিতি ইত্যাদি সবই এক অভিন্ন ঐতিহ্যিক সম্পর্ক-সূত্রে সংগ্রথিত। আমাদের সাহিত্যের ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপটও এর আলোকেই বিবেচ্য। ইসলামি আদর্শ-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আমাদের জাতিসত্তার বিকাশে ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আদিকাল থেকেই পরিলক্ষিত হয়েছে। বর্তমানেও তার প্রভাব বিভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়।