কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক নামটাই যথেষ্ট, এরপর কবিতাগুলোর প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় তাঁর যাদু কলমের ছোঁয়ায়।” এই উক্তিটি করেছিলেন সয়ং কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। আসলে কি, কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক যখন কবিতা লিখবেন বলে কলম ধরেন, তাঁর মধ্যেই তিনি ডুবে যান। একটা কবিতাকে নিজের মত করে গড়া, এবং তার প্রতি নজরদারি, সেটাকে বেশ কিছু কাল পর আবার সম্পাদনা করা, এটাই কবি বিদ্যুৎ-এর একমাত্র বৈশিষ্ট্য ! জীবন থেকে নেওয়া অনেক স্মৃতি, অনেক ভেসে অতীতের ফেলে আসা কথা, ফেলে আসা দুঃখ, বিরহ, রূঢ় অস্বীকারে বিমুখ প্রেম, কিম্বা জন্মঋণ, অথবা তাঁর টক ঝাল স্বপ্ন, এসব কবি বিদ্যুৎ-কে দিয়ে লিখিয়ে নেয় শত শত কবিতা ! আর সেই কবিতাগুলো আগামী দিনে বিশ্বের কাছে এক উদাহরণের রচনাবলী হয়ে দাঁড়ায় ! এটা তাঁর কবিতার পাঠকমাত্রই জানেন।
এই নাও ঝরে যাওয়া আমার হৃদয়
এই নাও
অতৃপ্তির পাত্র
এই নাও সীমাহীন অনুতপ্ত সুখ
এই নাও নিভৃত দীর্ঘশ্বাস
এই নাও আবাল্য প্রেমের একলা শাখা-প্রশাখা
এই নাও
নিরীহ রাত্রির অবগুণ্ঠন
এই নাও কবির প্রেমহীন একমাত্র নিঃসঙ্গতা
এই নাও বাগান ঢাকা যন্ত্রণা
এই নাও লজ্জা-লজ্জা প্রভূত গন্ধ
এই নাও শ্মশানের লম্পট আগুন
এই নাও এক মাস কবিতা না লেখার অবকাশ
এই নাও আমার ঠোঁটের একশ পঞ্চাশটা চুম্বন
দেবার জন্য এসেছি তোমার মুখোমুখি
পারতো এই সব নিয়ে আমাকে হাল্কা কর !!
[১৯৯৫ সালে লেখা অপ্রকাশিত কবিতা কবি বিদ্যুৎ]

এভাবেই কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের কবিতার জন্ম হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ! তবে কবিতার জন্ম হয়- এই কথা যখন কবি শুনবেন, তখন আমার এই নিবন্ধটি পড়ে তিনি প্রচন্ড রেগে যাবেন ! তিনি বিশ্বাস করেন, কবিতার জন্ম হয় না, কবিতা পৃথিবী সৃষ্টির সাথে সাথে পেছন পেছন চলে এসেছে ! আর যদি কবিতার জন্মই হোতো তাহলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বিনয় মজুমদারের মত কবিদের জন্মদিন পালন হোতো না ! তাঁদের সৃষ্টিগুলোর জন্মদিন পালন হোতো ! কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের এইযে ইন্টারফিলোজফি অর্থাৎ অন্তরদর্শন, এটাকে সন্মান দেওয়াটাই বোধ করি কবিতার সাথে আমাদের সন্মান স্থাপন করা। তা না হলে কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে চলার দুঃসাহস আমাদের মধ্যে তৈরি হোতো না ! এটা অবশ্যই কবি বিদ্যুৎ-ই আমাদের মধ্যে সেই বীজ পুঁতে দিয়েছেন, আর সেই বীজ থেকে একটা গাছের জন্ম হয়েছে, সেই গাছটাই হোলো মহাকাব্য ! যার শাখা-প্রশাখা, ডালা-পালা এতটাই বিস্তৃত যে তার ছায়াতে আমরা শীতল হচ্ছি প্রতিদিন ! এটাই কবি বিদ্যুৎ এর কবিতা লেখার সার্থকতা ।
এখানে সব কিছুই দুঃখ-সুখে একাকার
এখানে যা কিছু সঞ্চয়
নির্বোধ বাঁধানো যৌবন
তবু ধূ-ধূ শীর্ণকায় দেহ ছুঁয়ে যায় প্রেমিকের ছদ্মবেশ-
নীল নদী কাউকে দিল না বিশ্রাম
নিমেষেই ভালোবাসা বস্তুটা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে !
এখানে ঘড়ির কৃপণ সময়
বালিহাঁসের একান্ত দোসর,
এখানে সমস্ত অন্তহীন খেলা যেন একাকী বালিকা
তবু নিঃসঙ্গ আছে যেন মন; যথার্থ আয়নার কাছে
এই কবন্ধ প্রেম জব্দ ক’রেছে আলোকিত পথ
অবিশ্রান্ত নীরবতা এই রাজ্যের রাজা হয়ে থাকে
ঘুমন্ত পৃথিবী কাঁদে একলা
পাথরের ঢাকনা খুলে মন সূর্যোদয় দেখে !
[অপ্রকাশিত কবিতা ১৯৯৫ সাল, কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক]

একসময় কবিতার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা, এসব কিছুই ছিলনা বলা যায় ! আমেরিকাতে তখন সবে-সবে চাকরি- নিয়ে গেছি। আমার পেশা ও নেশা সাংবাদিকতা। আমার সমস্ত বন্ধুরা কবিতা পড়েন, কেউবা লেখালিখিও একটু আধটু করেন ! তাঁদের কাছে কবিতা নিয়ে নানান রকম কথা আমি মাঝে মাঝে শুনেছি ! কিন্তু কবিতাকে নিজের করে অন্তরে গ্রহণ করিনি আমি। মাঝেমধ্যে আমার সংবাদ অফিসের সহকর্মী বন্ধুরা আমাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বিভিন্ন পত্র পত্রিকা পড়তে দিতো এবং সেইসব ম্যাগাজিনের কবিতাগুলো আমাকে বিশেষ টানতো না ! হঠাৎই একদিন কলকাতার একটি ম্যাগাজিনের মধ্যে কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের একটি কবিতা আমার নজর কারলো ! মুগ্ধ ও বিস্ময়ে ওই কবিতাটা আমি করবার যে পড়েছি, তার অন্ত নেই ! ১৯৯৭ সাল কলকাতা বইমেলায় এসেছিলাম, হঠাৎ কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে যায় ! সেই আলাপের ফল গিয়ে পৌঁছায় বন্ধুত্বে। আমি কবি বিদ্যুৎ-এর কবিতার সাথে একটু একটু করে পরিচয় হ’তে থাকি। শেষমেশ তাঁর এবং তাঁর কবিতার প্রচন্ড ভক্ত হয়ে উঠলাম আমি ! যে কোনোদিন কবিতার আশেপাশে যাতায়াত করেনি, সে কিনা আজ কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক-এর ভক্ত ! ভাবলেই অবাক হয়ে যাই !
চোখের কাছে অচেনা সর্বনাশ
ভেতর থেকে দৃশ্যের বিচ্ছেদ
মনের মধ্যে যন্ত্রণার অলি-গলি
নামহীন যত কান্নার নির্দেশ !
এখন থেকে অন্তরে তুমি থাক; কিম্বা অতলে
হৃদয় মেলে রাখ
এইবেলা যদি স্পর্শে ওঠো কেঁপে,
আকাশ থেকে বৃষ্টি আসুক ঝেঁপে
গভীরের সুখ সময়ের পথ ধরে
চলতে – চলতে কোন অতলান্ত ভোরে
স্বপ্নের কথা নিজেকে বলতে-বলতে
ঘুম ভেঙে যায় নিজের অজান্তে !

          কোথায় যেন পুড়ছে অচেনা স্মৃতি
          মিথ্যে - মিথ্যে বিষণ্ণ দুটি চোখ
          কোথায় যেন নামহীন পৃথিবীতে
          ভরে আছে যত মৃত্যুর প্রতিশোধ !
          হঠাৎ যদি ফুল-পাখি-চাঁদ দেখে;
          সময়ের সাথে একা-একা  পথ  চলি
          কবিতার কাছে আশ্রয় খুঁজে নিয়ে
          তিন প্রহরের যন্ত্রণা তাকে  বলি !
          এসব কথা আত্মায় ঘোরে-ফেরে;
          তবুও কেন মন বোঝেনা  তাকে,
          চতুর্দিকের অগণন স্মৃতিগুলো
          আদিগন্ত ভালোবাসা  হয়ে  থাকে ! 

         চলে যাব ব'লে চোখ ভিজে আসে জলে
         চুপচাপ শুধু  নীরবতা  নিয়ে  থাকি
         চেনা - অচেনায়  অনেকেই  কাছে  থাকে
        মৃত্যুর  পাখি  করে  যায়  ডাকাডাকি !
        নতুন করে আসব আবার ফিরে;
        ডাকবে  কাছে  নতুন  নামে  যখন;
        সেই  পুরাতন  স্মৃতির  ফাঁকে ফাঁকে
        আগের  আমিকে পড়বে  কি  মনে  তখন !! 
       [পত্রাবলী প্রকাশনী কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল—
         কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের কাব্যগ্রন্থ- নির্বাচিত কবিতা । এই
         কবিতাটি এর আগে বেশ কিছু প্রথম শ্রেণীর পত্র পত্রিকায়
         প্রকাশিত হয়েছে]

কবি বিদ্যুৎ ভৌমিককে নিয়ে অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে করে, যা কিনা তাঁর কবিতানির্ভর জীবন-যাপনের বহতা দিনগুলো নিয়ে। সময় ও সুযোগ হলে নিশ্চয়ই একদিন তাঁকে নিয়ে আমার একটা ডকুমেন্টারি মুলক লেখা লিখব ! যেটা বই আঁধারে প্রকাশিত হবে। ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ঐতিহাসিক শহর শ্রীরামপুরের সন্তান এই বিশ্ববিখ্যাত কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের জীবন যাপন এবং কবিতানির্মাণের লালন পালন ! এতটাই তিনি তাঁর কবিতার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় যে বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো পত্র পত্রিকা নেই যে কবি বিদ্যুৎ – কবিতা সেখানে সসম্মানে স্থান করে নিয়েছে ! এছাড়াও তাঁর মহিলা ভক্তের সংখ্যা দিনদিন ভীষণ ভাবে বেড়ে চলেছে !
দেখ পাথর প্রতীক্ষা করে আছে
কি শুনতে চাও ওর ঋণাত্মক কান্না,
চোখের মলাট খুলে খুঁজে নাও অবিনশ্বর গম্ভীরতা !
দেখ নষ্ট চিন্তা রক্তে ভিজে
কবিতা তিন টুকরো হয়েছে
কেউ পূর্ণতায় ভাঙতে চাইছে
মধ্যাকর্ষণের প্রোদ্ভিন্ন আদালত !
দেখ শ্রাবন্তীর বুকের কাঠামো বিবর্ণ খয়েরী
পাথর চেয়ে আছে ঘর – রাস্তা এবং মিছিলে ।
সরল ঠোঁটের মধ্যে ঝুলে আছে
মৃত্যুর প্রার্থনা
পথে পথে স্বপ্নের সম্ভাষণ ছুঁয়ে দেয় ভ্রুণের
অন্তর্গত পরিবর্তন —
দেখ, সত্তার সংগ্রামে প্রতিবাদী হয়েছেন ঈশ্বর !!
[অপ্রকাশিত কবিতা]

                    ঘরে ফেরার সময় হতেই
                    মৃদু কান্নার শব্দে মনে হয়; কিছু ফেলে যাচ্ছি না তো-
                    নীল ফুল, টক-ঝাল স্বপ্ন, ছদ্ম আদর্শ,
                    কিম্বা রূঢ় অস্বীকারে বিমুখ প্রেম
                    অগাধ ধোঁয়া বুক ভার করে তোলে,
                    লোকে ভাবে কিছু দোষ করে ফিরছি
                    তাকিয়ে দেখি পড়ে আছে আমার জন্মঋণ
                    আমার স্মৃতি ছুট্ সময় !!
                    [যুবমানষ-নামক সরকারি পত্রিকায় কবি বিদ্যুৎ-এর কবিতাটা
                      ১৯৯৯ প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাটির নাম ‘সময়’] 

যাঁকে নিয়ে এতকিছু লেখা এবং যাঁর কবিতা নিয়ে পাঠকমহলের মধ্যে নানান ধরনের ভালো-মন্দ আলোচনা, সেই মানুষটি এখন এতটাই আমাদের সমস্ত মন-প্রাণ জুড়ে অধিষ্ঠান করে চলেছেন যা সত্যিই অবাক হবারই কথা ! কবি বিদ্যুৎ ভৌমিককে নিয়ে এই সুদূর আমেরিকা থেকে গবেষণা চলতেই থাকবে, এটা থামার যে নয় !! তাঁর সম্পর্কে আরও নতুন নতুন তথ্য আপনাদের জানাবো এই আশা রেখে আমার কলমের ঢাকনা বন্ধ করলাম। এই লেখা পড়ে আপনাদের কেমন লাগলো, অবশ্যই জানাবেন বন্ধু, এটা আমার একমাত্র আন্তরিক অনুরোধ !!