এ কথা আগেই বলে রাখতে হয় যে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের সময়কাল ৭০০-১২০০ সাল। এ সময়ে বাংলা ভাষার একমাত্র সাহিত্য নির্দশন চর্যাপদ; এটি বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মগুরুদের হিতোপদেশ। বাংলায় ইসলাম আগমনের ধারা তখন থেকে শুরু হলেও সাহিত্য চর্চার মত অবস্থার উদ্ভব হয় আরো পরবর্তীকালে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস কেবল কাব্য সাহিত্যের ইতিহাস। অদ্যাবধি এ সময়কার কোন গদ্য সাহিত্য আবিস্কৃত হয়নি।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ১২০০-১৮০০ সালকে মধ্যযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অবশ্য কেউ কেউ এর মধ্যে ১২০০-১৩৫০ সালকে অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করেন। ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক বাংলা বিজিত হলে তাতে দেশে সামজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা দেখা দেয়। ফলে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাও তেমন গতি পায়নি বলে তারা এ অভিযোগ আনয়ন করেন। বাস্তবিক পক্ষে সেসময়ে ইলিয়াস শাহী আমলের পূর্ব পর্যন্ত খিলজী, বলবন ও মামলুক বংশের যে পঁচিশ জন শাসক বাংলাদেশ শাসন করেছিলেন তাদের কারো কারো রাজত্বে পনের বিশ বৎসর দেশে অশান্তি ছিল, অধিকাংশের বেলায় শান্ত পরিবেশ বজায় ছিল বলে ইতিহাস সমর্থন করে। তৎকালীন যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল দিল্লির শাসকের বিরুদ্ধে আর অন্যান্য শাসকদের মাঝে যে অন্তর্বিরোধ ঘটেছিল বলে জানা যায় তা কিন্তু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। ফলে তাতে জন জীবন অস্থির হবার কোন কারণ ঘটেনি। বরং এদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী শিক্ষাদীক্ষা, ধর্মকর্ম, আচার-ব্যবহার প্রভৃতি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর মধ্যে ইসলামী পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠছিল। জনগণ শ্রেণী বিদ্বেষের যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে এসে সামাজিক শান্তি ও অর্থনৈতিক মুক্তি পেতে শুরু করে। তাই সমালোচকদের এ অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী বাংলা বিজয়ের পর ইসলাম প্রচারক মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য ধর্মের সাধারণ জনগণ বাংলা ভাষা চর্চা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ পায় এবং তারা বাংলা সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করে। খিলজীরা তুর্কী হলেও তারা বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান দেখায়। বিজেতা তুর্কীরা এদেশীয় নারীর পাণিগ্রহণ করে বঙ্গবাসী বনে যেতে থাকে। তারা বাঙ্গালীদের মত জীবন ধারনের জন্য নানান উপকথা ও লৌকিক কাহিনীগুলো বাংলায় ভাষান্তরিত করে সেসব শুনানোর ব্যবস্থা করত। তাই অনেকে মনে করেন, মূলত এ সময় থেকেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রযাত্রা ও পৃষ্ঠপোষকতা সূচিত হয়।

অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, ‘মুসলমান শাসকেরা মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছেন। তাদের উৎসাহ দানের ফলেই বাংলা ভাষা যথার্থ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল’ । নতুবা ব্রাক্ষ্মণ্যবাদীরা ‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ/ভাষায়াং মানব শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ’- বলে ধর্মীয় বিষয় দেশীয় তথা বাংলা ভাষায় প্রচারের যে নিষেধ বাণী উচ্চারণ করেছিল তাতে বাংলা সাহিত্যের ভনিষ্যৎ সম্ভাবনাহীন ছিল। মুসলমান শাসকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সে দুর্দিন থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই ড. দীনেশ চন্দ্র সেন মন্তব্য করেছেন ‘আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ই বঙ্গ ভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়িয়েছিল’।
বাংলায় মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তনের পরিপ্রেক্ষিতে যারা তথাকথিত অন্ধকার যুগের ধোঁয়া তোলেন তখনও ব্যাপক হারে না হলেও বহু সাহিত্য নিদর্শন সৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময়ের প্রথমেই ‘প্রাকৃত পৈঙ্গলের’ মত প্রাকৃত ভাষায় গীতি কবিতা গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। শূণ্য পূরাণ, কলিমা জলাল,নিরঞ্জরণের রুষ্মা, ডাক ও খনার বচন, সেক শুভদয়া, পীর মহাত্ম্যজ্ঞাপক বাংলা আর্যা অথবা ভাটিয়ালী ‘রাগেন গীয়তে’প্রভৃতি বাংলা গান এ সময়ের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য নিদর্শন। মধ্যযুগে অনুবাদ সাহিত্যে মুসলিম কবিগণ ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।
আর স্বভাবিকভাবে গ্রন্থের রচয়িতা হিন্দু হোক মুসলিম হোক মুসলিম শাসনের প্রভাবে এতে মুসলিম সমাজ চিত্র ও ইসলামী ভাবধারা প্রস্ফুটিত হয়। যেমন বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহানবী সা. এর নাম ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে রামাই পন্ডিত তার শূণ্য পুরাণে সর্বপ্রথম ‘মহামদ’ শব্দটি ব্যবহার করে লেখেন: ব্রক্ষ্মা হৈলা মহামদ বৈষ্ণু হৈলা পেকাম্বর/ আদম্ফ হৈল্যা শূল পাণি।/ গণেশ হৈলা গাজী কার্তিক হৈলা কাজি/ ফকির হৈলা যত মুনি।”
এক সময় বিশেষত মধ্য যুগে মুসলমান কবিরা রোমাঞ্চ প্রণয়োপাখ্যানে মানুষের বিজয় ঘোষণা করলেও হিন্দু কবিদের কবিতার আখ্যানভাগের অনুরূপ তাদের সব রচনায়‘হামদ’ আর ‘না‘ত’ পেশ করার প্রশংসিত রীতির প্রচলন করেন।
“প্রথমে ইলিয়াস শাহী আমলের সুলতানদের (১৩৫২-১৪১৪,১৪৪২-১৪৮৭ সাল) পৃষ্ঠপোষকতায় এবং পরবর্তীতে হুসাইন শাহী আমলে (১৪৯৩-১৫৩৮ খৃ:) বাংলা ভাষার চর্চা ব্যাপক প্রসার লাভ করে। সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের (১৩৯৭-১৪১০) পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠে। তার সময়ে কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর (১৩৩৯-১৪০৯) রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনা করেন। বস্তুতপক্ষে এটিই ছিল মুসলিম রচিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ।
আর এখানে কবিতা শুরু হয়েছিলো হামদ-না‘ত দিয়ে। না‘তটি ছিল এরকম,-“জীবাত্মার পরমাত্মা মহাম্মদ নাম।/ প্রথম প্রকাশ তথি হৈল অনুপাম/ যত ইতি জীব আদি কৈলা ত্রিভুবন/ মুহাম্মদ হন্তে কৈলা তা সব রতন” ॥
মাহমুদ শাহী রাজবংশের শাসনকর্তা শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের শাসনামলে(১৪৭৪-৮০ খৃ:) কবি জয়েন উদ্দীনের সাড়া জাগানো উপাখ্যান ‘রসূল বিজয়’ (১৪৭১-১৪৮১) কাব্য প্রণীত হয়। ইসলামী কাব্যধারায় জয়েন উদ্দীন অতি স্মরণীয় নাম। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯খৃ:) আরব বংশীয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি ও তার পুত্র নাসিরুদ্দীন নসরত শাহ (১৫১৯-৩২খৃ:) বাংলা সাহিত্যের চরম পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া নিবাসী মধ্যযুগের কবি আফজাল দ্বিতীয় ফিরোজ শাহের শাসনামলে (১৫৩২-১৯৩৩ খৃ:) নসীহতনামা কাব্য রচনা করেন। তাদের সেনাপতি পরাগল খাঁ, ছুটি খাঁ প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য সহযোগিতা প্রদান করেন। তখন কবিরা কেবল ধর্মীয় ও সামাজিক স্বার্থেই কাব্য চর্চা করতো।
প্রকৃতপক্ষে পঞ্চদশ শতকের কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর ইসলামী ভাধারায় সাহিত্য চর্চার যাত্রা করেন। দৌলত উজীর বাহরাম খান, সাবিরিদ খান, মুহাম্মদ কবির,দোনাগাজী, সৈয়দ সূলতান (১৫৫০-১৬৪৮) প্রমুখ ইসলামী ভাবধারা সম্বলিত কবিতা রচনা ও অনুবাদে বিশেষ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। তাছাড়া ১৮০০ শতকে রংপুরের কবি হায়াত মাহমুদের জঙ্গনামা বা যুদ্ধ কাব্য, চিত্ত উত্থান, হিতজ্ঞান বাণী, আম্বিয়া বাণী প্রভৃতি সমাজে বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করে। অন্যান্য কবিদের রসূল চরিত, নবীকাহিনী, শরীয়াতশাস্ত্র, মারফত তত্ত্ব, পীর পাঁচালী, সওয়াল সাহিত্য, মর্সিয়া সাহিত্য,সূফী সাহিত্য, চরিত কথা প্রভৃতি ইসলামী ভাবধারার প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সতের ও আঠার শতকে কাজী দৌলত, মহাকবি আলাওল, আকবর, পরাগল, নওয়াজিশ খান, শরীফ শাহ, আবদুল হাকিম, মুহাম্মদ মুকিম, মুহাম্মদ আলী, বদিউদ্দিন, মুহাম্মদ জীবন, নূর মুহাম্মদ, শাকের মাহমুদ,সৈয়দ হামজা, কবি হামিদ, গরীবুল্লাহ, আবদুর রাজ্জাক, আলিরজা প্রমুখ কবিগণ গান ও কবিতার মাধ্যমে ইসলামী সাহিত্যে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হন। মধ্যযুগে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন বিষয়কে বাংলা ভাষায় সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলতে সবচেয়ে বেশি প্রচেষ্টা চালান শেখ পরান, নেয়াজ, আশরফ,শেখ মুত্তালিব,নাসরুল্লাহ খোন্দকার, মুহাম্মদ ফসিহ, মুহাম্মদ জান, আজমত আলী, শেখ সোলেমান, শেখ ফয়জুল্লাহ,আবদুল্লাহ, কাজী বদিউদ্দিন, মীর মুহাম্মদ শফী, মুহাম্মদ আলী, মুহাম্মদ মুকিম, বালক ফকির, আইনুদ্দিন, সৈয়দ নূরুদ্দীন, আবদুল করিম খোন্দকার, মহিলা কবি রহিমুন্নেসা প্রমুখ। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ইসলামী সাহিত্য হচ্ছে নূরনামা, সুরতনামা, কিফায়তুল মুসাল্লীন, সায়াৎনামা, গোরক্ষ বিজয়,দোররে মজলিস, হাজার মাসাইল, সিহাবুদ্দীননামা, তোহফা, ফায়েদুল মোক্তাদী, ফিকরনামা, মুসার সাওয়াল, হাতেম তাই, আমীর হামজা, কবি মোজাম্মেল হকের নীতি শাস্ত্র প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ।

সৈয়দ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮) চট্টগ্রামের চক্রশালার অধিবাসী ছিলেন। তিনি যেসব কাব্য রচনা করেছেন তন্মধ্যে রয়েছে নবী বংশ, শব ই মিরাজ, রসূল বিজয়, ওফাত ই রসূল, ইবলিসনামা, মারেফাতী গান প্রভৃতি। কবি তার আত্মবিবরণীতে লিখেছেন,“ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম/আল্লাহর মহিমা জান কহিতে অসীম ॥/ প্রথমে প্রণাম করি প্রভু নিরাকার। / আদ্যতে আছিল যাহা করিমু প্রচার ॥ / দ্বিতীয়ে প্রণাম করি রছুল খোদার। / নূর মুহাম্মদ বলি জগতে প্রচার”॥
সৈয়দ নূরুদ্দীন (১৭৩০-১৮৮০সাল) আরবী-ফার্সী শব্দের ব্যাপক ব্যবহার করে দাকায়েক, মুসার সাওয়াল, বাইতুল কুলুব নামে ইসলামী সাহিত্য প্রণয়ন করেন।
মহাকবি আলাওল (১৬৯২-১৭৯৩) তার পদ্মাবতী কাব্যে লিখেন, “নিজ সখা মুহাম্মদ প্রথমে সৃজিলা / সেই জ্যোতি-মূলে ত্রিভুবন নির্মিলা”।।
মুসলিম কবিগণের বাইরে বহু হিন্দু কবিও মধ্যযুগে ইসলামী সাহিত্য চর্চায় বিশেষ অবদান রাখেন। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি মুসলমানদের জীবনধারা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন,
“ ফজর সময়ে উঠি বিছাইয়া লোহিত পাটী
পাঁচ বেরি করয়ে নামাজ”।
মধ্যযুগের শেষ দিকে পুঁথি সাহিত্যের চর্চা হয়। পূঁথি সাহিত্য পুরোপুরি ইসলামী সাহিত্য না হলেও কাহিনী ও ভাবধারা বিশ্লেষণ করলে এ কথা স্বীকার করতে কোন দ্বিধা থাকে না যে, ইসলামী বিশ্বাস ও চেতনা এ সাহিত্যের রন্দ্রে রন্দ্রে বিদ্যমান ছিল। এ সময়কার পূঁথি সাহিত্যে গাজী কালু চম্পাবতী, ইসমাঈল গাজী, গোরচাঁদ পীর, শাহজালাল পীর, ভেরুয়া সুন্দরী, দেওয়ানা মদিনা ইত্যাদি আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাহিত্য।
সাহিত্যকে সমাজের দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করলে নিশ্চিত বলতে হয়, মধ্যযুগে মানুষ অনেক বেশী ধর্মপ্রাণ ছিল। বর্তমানে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্রমশ বিকাশে সাহিত্যের আধুনিক ভাবধারায় ধর্ম বিশেষত ইসলাম গৌণ হয়ে পড়ছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধ বিলুপ্ত হচ্ছে, প্রেমের জায়গা দখল করছে ভোগবাদ। নৈতিক শক্তির অধোগতির ফলে পচন ধরেছে সমাজে। তাই এ ভয়াল বিপর্যয় ঠেকাবার জন্যে আমাদের মোড় ঘুরে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই।

লেখক: ইন্সট্রাক্টর, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, আইবিআইটি চট্টগ্রাম