জীবন পরিক্রমায় জীবন বৈচিত্র্যের প্রভাব মানুষের ওপরই সব চাইতে বেশি প্রতিফলিত হয়। একপেশে জীবন যতই সুখের হোক না কেন, তা কোনো এক সময় কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে তার কাছে। জীবনচক্রের এই বৈচিত্র্যহীন পুনরাবৃত্তি তার কাছে হয়ে ওঠে নতুনত্বহীন একঘেয়ে এবং সেই সঙ্গে ক্লান্তিকরও বটে। তার বিপরীতে নিভৃতে লালিত মনের কোণে পুষে-রাখা স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেবার জন্যে এক অদম্য ব্যাকুলতা মানুষের হৃদয়ে অনবরত আলোড়িত হতে থাকে। আর যারা একে কথাই রূপ দান করেন তারাই হলেন কথাসাহিত্যিক। আর এই নতুন ধারার, নতুন রঙের, নতুন কথাসাহিত্যের ফেরিওয়ালা ছিলেন সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ।
তাঁকে নিয়ে মনে আজ কত কথা জাগছে। কত ভালো লাগছে। এই তো সেদিনের কথা। একদিন সাতসকালে আবদুল মান্নান সৈয়দ আমাদের অফিসে এসে হাজির। তখনও অফিস খোলা হয়নি। আমাকে ফোন দিলেন। তোমার অফিসের সামনে। আমি দ্রæত অফিসে চলে এলাম। দেখলাম আবদুল মান্নান সৈয়দ কয়েকটা বই হাতে করে একটা দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘামছেন। আমি তাঁকে তাড়াতাড়ি অফিসে নিয়ে গেলাম। বসালাম। বললেন, চা চায়। একটু পরে চায়ের ব্যবস্থা করা হলো। কবির অত্যন্ত প্রিয়ভাজন বিশিষ্ট ছড়াশিল্পী কবি সাজজাদ হোসাইন খানকে ফোন দিতে বললেন। ফোন দিলাম। কবি সাজজাদ হোসাইন খান ঘণ্টাখানেক পরে এসে হাজির হলেন। এর আগে আল্লামা আবদুল মান্নান তালিব এসে হাজির হয়েছেন। জমিয়ে আড্ডা হলো অনেক সময় ধরে। আমার মনে পড়ে সেটাই আবদুল মান্নান সৈয়দ স্যারের সাথে আমাদের অফিসে শেষ আড্ডা। সৈয়দ স্যার খেতে খুব ভালোবাসতেন। যথারীতি উজ্জ্বল হোটেল থেকে পছন্দ মাফিক খানা-দানা আনা হলো। দুপুরের খাওয়ার পর আড্ডা বেশ দীর্ঘায়িত হলো।
যা হোক, তখন লেখকের ‘সকল প্রশংসা তাঁর’ ডান ধারার কবিতার বইটির মূদ্রণ কাজ চলছিল। এতোটা দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন লেখক এই জীবনে আমি কমই দেখেছি। এই কবিতার বইটি ইতিপূর্বে দু’বার মুদ্রিত হয়ে গেছে, এটি তুতীয় মুদ্রণ। তবুও এই তৃতীয় মুদ্রণেও যেন কোনো প্রকার ত্রæটি-বিচ্যুতি না থাকে তার জন্য তাঁর এই বাড়তি সতর্কতা। কোনো একটি কাজ হাতে নিলে তা সুচারুরূপে সুসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি শান্তিতে ঘুমাতে পারতেন না। বইটির তৃতীয় মূদ্রণ সমাপ্ত হওয়ার পরে তিনি যারপরনাই খুবই খুশি হয়েছিলেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা সাহিত্যের একজন সর্ববিষয়ে পারদর্শী লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে কথাসাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক ও সফল সম্পাদক আর চিত্রশিল্পী। তিনি যে আঁকাআঁকি করতেন তা খুব কম লোকই জানতেন। কবি সাজজাদ হোসাইন খান ও আমার মতো দু’একজন যাদের তাঁর অন্তরমহল ও অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার ছিল তাদের সাথেই শুধু তিনি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো শেয়ার করতেন। জীবনের প্রায় সব বিষয় আবদুল মান্নান সৈয়দ আমার সাথে শেয়ার করেছেন। শেষ জীবনে তাঁর শোবার ঘরে, বসার ঘরে ও পড়ার ঘরে আমাকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দিয়েছিলেন। তখনই তাঁর শিল্পীমনের স্পর্শ আমি পেয়েছিলাম। একদিন স্যারের বাসায় আড্ডা দিতে দিতে কখন যে রাত একটা বেজে গেছে টের পায়নি। উনি তো কিছুতেই ছাড়তে চাইলেন না। রানু ভাবীও। তবুও তাঁদের অমতে সেদিন চলে এসেছিলাম। আবদুল মান্নান সৈয়দ স্যার সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। উনি কয়েকটি পাণ্ডুলিপির কথা সেদিন আমার বলেছিলেন। তার মধ্যে রসূল সা.-কে নিয়ে লেখা দু’টি পাণ্ডুলিপির কথা বলেছিলেন। একটা শিশুদের জন্য, অন্যটা বড়দের জন্য। জানি না পাণ্ডুলিপিগুলো কোথায় আছে। বা আদৌও লিখেছিলেন কিনা। তবে বাংলাভাষার সতেরোজন শ্রেষ্ঠ লেখককে নিয়ে লেখা একটা অসাধারণ পাণ্ডুলিপি তিনি আমাকে দেখিয়েছিলেন। সেই পাণ্ডুলিপির নামটা আমি ছাড়া সম্ভবত দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি জানে না। এমনকি রানু ভাবীও না। স্যারের মৃত্যুর পরে ওই বাসায় খুব একটা যাওয়া হয়নি। মাত্র দুই দিন গিয়েছি। একদিন প্রেক্ষণ সম্পাদক খন্দকার আবদুল মোমেনকে নিয়ে আর একদিন বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান ও কথাসাহিত্যিক মাহবুবুল হককে নিয়ে। ভাবী অবশ্য কয়েক বার যেতে বলেছেন, কিন্তু যায় যায় করে আর যাওয়া হয়নি। যদিও স্যারের রচনা সমগ্র সাত খণ্ড প্রকাশিত হয়ে গেছে তবুও সতেরোজনকে নিয়ে লেখা বইটি আলাদাভাবে স্যারের দেয়া নামে প্রকাশ করার ইচ্ছা আমার আছে।
যা হোক, সাহিত্যের প্রায় সকল ক্ষেত্রে তাঁর বেড়ানো ছিল বিজয়ীর বেশে। অসম্ভব লেখনীশক্তির কারণে যিনি সাহিত্যের সমস্ত অট্টালিকায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্ন উল্লেখযোগ্যভাবে রেখে গেছেন । কবিতা, গল্প, উপন্যাস, সাহিত্য সমালোচনা, অনুবাদ, সম্পাদনা ছাড়াও বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ধারার শক্তিশালী সাহিত্যিকদের নিয়ে লিখেছেন অবিশ্রান্তভাবে ও স্বচ্ছতার সাথে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন বিরল প্রতিভাধর একজন শক্তিমান কবিসত্তায় স্বতঃন্তর। স্থান-কাল-পাত্র, বাস্তবতা, সত্যাসত্য ও যোগ-বিয়োগ নির্ণয় করে বাংলা ছোটগল্প রূপায়িত হয়েছে তাঁর শিল্পীসত্তার নান্দনিকতার ছোঁয়ায়। আধুনিক ছোটগল্পের নতুন একটি দিগদর্শন নির্ণিত হয়েছে তাঁর নিজস্ব গতিতে। বহুধা দিগন্তু উন্মোচিত করে তা ছোটগল্পের গণ্ডিকে ছাপিয়ে সবেগে ধাবিত হয়ে স্থান করে নিয়েছে কথাসাহিত্যের সাগরে। গদ্যসাহিত্যের গতি-প্রকৃতি তাঁর ভাব-ভাষার কারণে হয়েছে গতিশীল। যা পাঠকেেক কথাসাহিত্যের এক নবতর কক্ষপথে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। উলঙ্ঘন গতি-প্রকৃতি, রচনা শৈলী, শক্তিমত্তায় গদ্যছন্দের গদ্যরস তাঁর হাতে পেয়েছে নতুন এক মাত্রা। তার লেখা ছোটগল্প শুধু বিষয়-বিচিত্রতায় নয়, রূপ প্রকরণ সৃষ্টির আঙ্গিকেও সত্যিই বিস্ময়কর, অপূর্ব! মধ্যবিত্ত সমাজের আকর্ষণ-বিকর্ষণ, ব্যক্তিসত্তার নৈতিক-অনৈতিক দিক, আশা-নিরাশা, পলিটিক্স ও রাজনীতির মারপ্যাচ, বাস্তববাদ-পরাবাস্তববাদ ও পারিবারিক জীবনের উত্থান-পতন তাঁর গল্পে নিজস্ব একটা পটভ‚মিকা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। যা পাঠকের মনোজগতে নতুন একটা ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আমরা মনে করি, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে যা রবীন্দ্র বলয়কে ভেদ করতে পেরেছে। আধুনিক কথাসাহিত্যের প্লট হয় খণ্ড-বিখণ্ড জীবনযাপনের রূপায়ণ একত্রিত করে। জীবন কোনো রোবট নয় যে, একই নিয়মে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে। রবীন্দ্র ও তৎপরবর্তী গদ্যসাহিত্য যে গতিতে পরিচালিত হয়ে আসছিল আব্দুল মান্নান সৈয়দ সেখান থেকে সরে এসে আধুনিক কথাসাহিত্যের দিগন্তে পদার্পণ করেছেন। গল্পের বেলায় নতুন মাত্রা সৃষ্টিতে তিনি সদা উজ্জ্বল। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর নিজের গদ্য সাহিত্যের রঙই ব্যবহার করেছেন। যা অন্য সকল কথাশিল্পীর রঙিন দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের। আবদুল মান্নান সৈয়দের স্বপ্ন শুধু তার একান্ত নিজের। সেখানে অন্য কারো তুলির আচড় তিনি লাগতে দেননি। অন্যদিকে সমালোচনা সাহিত্যে তিনি যে বিস্তর কাজ করেছেন তা ভাবতে গেলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। বাংলা সাহিত্যের ভাবস¤প্রসারণ, সাহিত্যের সুক্ষè-চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমালোচনাÑ সুপ্রতিষ্ঠিত দক্ষ গবেষক ও কথাসাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও পরবর্তীকালে সাহিত্যে খ্যাতিমান প্রায় সব লেখকের সৃষ্টিতে তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। বলা যায় তার হাত ধরেই নতুনভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে সমালোচনা সাহিত্য, তথা প্রবন্ধ সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গতিশীল একটি ধারা ও কথাসাহিত্যর শক্তিশালী মাধ্যম গল্পসাহিত্য তার হাত ধরেই আধুনিকতার রঙিন ছোঁয়া পেয়েছে। পেয়েছে আলোচিত-আলোকিত রঙ ও গতিশীলতা। সেটা সন্দেহাতীতভাবেই এখন বলা যায়। সেজন্যেই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক অনুভবের চিন্তক ও সব্যসাচী বলা হয়ে থাকে। ডান-বাম দু’দিকেই সমান দক্ষতাসম্পন্ন লেখক ছিলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। ইতিমধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকশিত হয়েছে আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনা সমগ্র সাত খণ্ড। গত ৩০ আগস্ট ২০২০ বাংলা একাডেমি থেকে কবি সোলায়মান আহসানের সাথে গিয়ে ৭টি খণ্ডই কিনে এনেছি। উল্টেপাল্টে দেখেছি তবে এখনো পড়তে পারিনি। এত বিশাল কর্মকাণ্ড দেখে বার বার বিস্মিত হয়েছি। এত ঘনিষ্ঠ ছিলাম কিন্তু এত ব্যাপক সৃষ্টি সম্ভারের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে কখনো বিস্তারিত আবদুল মান্নান সৈয়দ স্যারের মুখে শুনতে পাইনি।

বিষয় প্রক্রিয়া, প্রসঙ্গ, পদ্ধতি, চলমান জীবনের বাস্তবতা কি পরাবাস্তবতা ইত্যাদি তাঁর লেখার মাধ্যমে তিনি জীবিত থাকতেই আধুনিক সাহিত্যের বিচারে উৎকৃষ্ট সাহিত্যাসনে তিনি সমাসীন হয়েছেন। সেজন্যই সাহিত্যসমাজ যথার্থভাবেই তাঁর কথাসাহিত্যকে গ্রাহ্য করেছেন। এভাবেই গদ্যসাহিত্যে তিনি নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। জীবনের শেষ দিকে এসে নিজের গদ্যসাহিত্য বিশেষ করে গল্প নিয়ে একান্ত আঙিনায় আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘গল্প আমার প্রিয়তম মাধ্যম। এরই মধ্যে নতুন গল্পের কুঁড়িও ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু শরীর ও সময়ে ঠিক কুলোচ্ছে না। ভাবছি, আবার গভীরভাবে গল্পে ও লেখায় নিজেকে অভিনিবিষ্ট করব। দু’তিন রকম গল্প লেখার চিন্তা জেগে উঠেছে আমার মাথায়। বেশ কিছুকাল ধরে তা জেগে আছে। গল্প-উপন্যাসের চেয়ে সত্য অনেক বেশি বিস্ময়কর! গল্প-উপন্যাস রচনার জন্য সরাসরি অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। যে দুই অভিজ্ঞতা আমার অর্জিত হয়েছে এবং হচ্ছে তা সম্প‚র্ণ বিপরীতধর্মী। তার একটি ব্যক্তিগত, অন্যটি সামাজিক। আমার সাহিত্যজীবনে আমি দেখেছি আমি যা লেখার বিষয় কল্পনা করি, অনেক সময় আমার কলম চলে যায় সম্প‚র্ণ ভিন্ন সড়ক ধরে। সৃষ্টিশীলতার আনন্দ ও বিস্ময় এখানেই। আমার অন্য সব সাহিত্য মাধ্যমের মতো গল্পেও আমি এক জায়গায় থাকিনি। ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে গেছি।’ (দৈনিক আমার দেশ, ২৪ নভেম্বর ২০০৭)।
‘সত্যের মতো বদমাশ’ (১৯৬৮) কথাশিল্পী আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। অশ্লীলতার অজুহাতে পাকিস্তান সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত করে। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাশ’ প্রকাশিত হওয়ার পর আবদুল মান্নান সৈয়দ রচনা করেছেন আরো অসাধারণ অনেক গল্পগ্রন্থ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে ‘চলো যাই পরোক্ষে’ (১৯৭৩), ‘মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা’ (১৯৭৭), ‘নির্বাচিত গল্প’ (১৯৮৭), ‘উৎসব’ (১৯৮৮), ‘নেকড়ে হায়না আর তিন পরী’ (১৯৯৭), ‘মাছ মাংস আর মাৎসর্যের রূপকথা’ (২০০১), ‘নির্বাচিত গল্প’ (২০০০), ‘কেন আসিলে ভালোবাসিলে’ (২০১০) ইত্যাদি।
আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখালেখির একদম শুরুর দিকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭)। ‘জোৎস্না রোদে চিকিৎসা’ (১৯৬৭), ‘সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ (১৯৭৪), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৭৫), ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’ (১৯৭২), ‘পার্কস্ট্রিটে এক রাত্রি’ (১৯৮৩), ‘মাছ সিরিজ’ (১৯৮৪), ‘আমার সনেট’ (১৯৯০), ‘সকল প্রশংসা তার’ (১৯৯৩), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০২), ‘মাতাল কবিতা পাগল কবিতা’ (২০০৬), ‘হে বন্ধুর বন্ধু, হে প্রিয়তমা’ (২০০৬)।

লেখালেখির জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কাজ করেছেন নিগূঢ়ভাবে। বাংলা সাহিত্যের খ্যাত-অখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ, বেগম রোকেয়া ছাড়াও অনেককে নিয়ে তিনি রচনা করেছেন সমালোচনা সাহিত্যের অসামান্য অনেক গ্রন্থ। জীবনী বিষয়ক বই জীবনানন্দ দাসকে নিয়ে লেখা ‘শুদ্ধতম কবি’ (১৯৭২) প্রকাশিত হওয়ার পর সাহিত্য অঙ্গনে তাকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। নতুন করে তিনি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা সাহিত্যে আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ কবিতার দিকপতি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্য সাধনা ও অবদান নির্ধারণ বা স্থির করার কাজে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে এসেছে বেশ কয়েকটি অসাধারণ গ্রন্থ। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘শুদ্ধতম কবি’ (১৯৭২), ‘জীবানন্দ দাশের কবিতা’ (১৯৭৪), ‘জীবনানন্দ দাশ’ (১৯৮৩), ‘জীবনানন্দ’ (১৯৮৪), ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৮৬), ‘জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী’ (১৯৮৭), ‘জীবনানন্দ দাশ’ (১৯৮৮), ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প’ (১৯৮৯)।
জীবনানন্দ দাশকে শুদ্ধতম কবি হিসেবে আখ্যা দিয়ে ‘শুদ্ধতম কবি’ (১৯৭২) প্রকাশের পর চতুরদিকে ব্যাপক হৈ চৈ শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর অনেকগুলো প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। তা হলো জীবনানন্দ দাশের ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ প্রথম খণ্ড (১৯৭৬), দ্বিতীয় খণ্ড (১৯৭৮), ‘নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা’ (১৯৭৭), ‘দশ দিগন্তের দ্রষ্টা’ (১৯৮০), ‘বেগম রোকেয়া’ (১৯৮৫), ‘আমার বিশ¡াস’ (১৯৮৪), ‘নজরুল ইসলাম, কালজ ও কালান্তর’ (১৯৮৭), ‘চেতনায় জল পড়ে শিল্পের পাতা নড়ে’ (১৯৭৮), ‘পুনর্বিবেচনা’ (১৯৯০), ‘দরোজার পর দরোজা’ (১৯৯১), ‘ফররুখ আহমদ : জীবন ও সাহিত্য’ (১৯৯৩), ‘বিবেচনা পুনর্বিবেচনা’ (১৯৯৪), ‘স্মৃতির নোটবুক’ (১৯৯৭), ‘রবীন্দ্রনাথ’ (২০০১), ‘আধুনিক সাম্প্রতিক’ (২০০১) ইত্যাদি।
কাজী নজরুল ইসলাম জন্মশতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ সম্পাদনা ছাড়াও কবিতার সাথে সাথে নাট্যসাহিত্যে নিজের বিশেষ অবদানের কথা স্মরণ করে রাখার জন্য বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল নাট্যগুচ্ছ। এ ছাড়া আত্মজীবনীম‚লক লেখা ‘ডায়েরি’ এবং তাঁর ‘নির্বাচিত কলাম’ও প্রবন্ধগ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

বলাবাহুল্য আবদুল মান্নান সৈয়দের অবদান গুরুত্বের সাথে বাংলা সাহিত্যে কাল-কালান্তরের পথ ধরে এগিয়ে যাবে সামনে এটা আমাদের বিশ্বাস। ষাটের দশকে লেখা, তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাশ’ অনন্য সাধারণ গল্পগ্রন্থ। যদিও কেউ কেউ এটাকে অশ্লীলতার অজুহাতে গ্রাহ্যে আনতে গিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন তবুও আধুনিক কথাসাহিত্যের নান্দনিক রঙে তা বিদগ্ধ পাঠকেকে করেছে বিমোহিত। তাঁর এই গল্পের আঙ্গিকে রয়েছে নতুন রীতির চিহ্ন। উত্তর-আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের উলে­খযোগ্য কথাশিল্পীদের লেখার জমিন হলো আত্মদর্শন। তাঁর ‘সত্যের মতো বদমাশ’ গল্পগ্রন্থে ষাটের দশকেই আত্মোপলব্ধি ও আত্মদর্শন যথেষ্টে শক্তিশালী ও সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এর পরে তাঁর আরও কয়েকটি গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। আমরা মনে করি কথা-সাহিত্যের ময়দানে তিনি জীবনের অতলান্তে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
যা হোক, তথ্য প্রযুক্তির বৈপ্লবিক উৎকর্ষের এই যুগে পারস্পরিক যোগাযোগ ও অবাধ তথ্য প্রবাহের ফলে অন্য সকল কিছুর মতো সাহিত্যের দূর-দিগন্তও এখন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আজ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সাহিত্য তথা কথাসাহিত্যের রূপ, রস, গন্ধ পাঠকমাত্রই আস্বাদন করতে পারছে। প্রকৃতপক্ষে আজ আর কোনো কিছুই মানুষের অগোচরীভ‚ত থাকছে না। আমাদের বিশ্বাস আবদুল মান্নান সৈয়দ সৃষ্ট বিশাল সাহিত্যভাণ্ডারও বিশ্বসাহিত্যসাগরে স্থান করে নেবে।