বাংলা সাহিত্যকে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়; প্রাচীন যুগ দশম থেকে দ্বাদশ মতান্তরে (৬৫০-১২০০)। মধ্যযুগ (১৩৫০-১৮০০)
মধ্যযুগ তিন ভাগে বিভক্ত:
১. আদি মধ্যযুগ
২. মধ্য মধ্যযুগ ও
৩. অন্ত্য মধ্যযুগ

আধুনিক যুগ (১৮০১ থেকে এখন পর্যন্ত)। অন্ধকার যুগ (১২০০-১৩৫০) এ সময় তেমন কোন সাহিত্যিক নিদর্শন না পাওয়ায় এসময় কে কেউ কেউ অন্ধকার যুগ বলেছেন।সে ক্ষেত্রে সাহিত্যে নারীদের ভূমিকা খুব একটা পিছিয়ে নেই বললেই চলে। বরাবরই সাহিত্যে নারী লেখকদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়। এ প্রথা সর্বকালের এবং সর্বযুগের। ইংরেজি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায় মূলত পুরুষদের দ্বারা সাহিত্য নিয়ন্ত্রিত। কখনো কখনো নারী লেখকদের লেখাকে বিভিন্ন সাহিত্যে অবমূল্যায়নও করা হয়ে থাকে।

লেখক কিংবা কবি হওয়ার যে কয়টি উপকরণ অর্থাৎ প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-প্রতারণা, ক্রোধ-দ্রোহ, ক্ষয় আর লয়ের সঙ্গে একাকিত্ব সবই রয়েছে নারীর জীবনে। নারীর এ দগ্ধতা এ যাতনা চিরায়ত। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স কিংবা ইথিওপিয়া থেকে গ্রিস কি রাশিয়ার যে কোনো নারীর জীবনেই রয়েছে এর আগ্রাসন। তাই পৃথিবীজুড়েই নারীর লেখা সাহিত্য পুরুষের পাশাপাশি হয়ে উঠেছে কিংবদন্তি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে যাতনায় বিদ্ধ কিংবা বিষাদিত ডোরিস লেসিং নিজে কিংবা তার উপন্যাসের চরিত্র, ঠিক একই যাতনায় ক্লিষ্ট নাসরীন জাহান নিজে এবং তার উপন্যাসের চরিত্র। একইভাবে ঠিক যে দেশপ্রেমের বোধে অনুপ্রাণিত এরিক মারিয়া রেমার্ক, ঠিক একই প্রেরণায় জ্বলজ্বলে নীলিমা ইব্রাহিম, সেলিনা হোসেন। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে তাই যে কোনো নারী লেখকেরই অবদান অসীম।আর শুধু বাংলাদেশের কথাই যদি বলি -সৃষ্টির শুরু থেকেই সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে চাপানো অন্যায়-শৃঙ্খলিত করে রাখার প্রয়াস আর পরবর্তীতে বাল্যবিবাহ-সতীদাহ প্রথা-বিধবা বিয়ে, নিষিদ্ধ এইসব অন্যায় নারীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে দেয়ার কারণে যুগ যুগ ধরেই নির্যাতিত হয়ে এসেছে বাংলার নারীরা। বিরুদ্ধ সামাজিক প্ররিবেশে নারীর সাহিত্যকর্ম তো দূরের কথা, নারীর লেখাপড়া করার সুযোগটাই যে দুরূহ ছিল তার একটা বাস্তব রূপ আমরা পেয়ে যাই বেগম রোকেয়ার জীবনীতে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে নারীরা আগের তুলনায় একটু এগিয়ে আসার সুযোগ বেশি পায়। গভীরে আটকে রাখা প্রতিভার স্ফুরণ ঘটতে শুরু করে আঠারো শতকের মধ্যভাগে বাংলা সাহিত্যে নারী লেখিকাদের আবির্ভাব ঘটে। সেই সময় যে সব মহীয়সী নারীরা ঘরে ঘরে আলোর প্রদীপ জেলে দিয়ে গেছেন। বাংলা সাহিত্যের এমন গুণী নারী লেখকদের পরিচয় এখানে তুলে ধর হলো-

স্বর্ণকুমারী দেবী

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখ যোগ্য নারী সাহিত্যিক হিসেবে স্বর্ণকুমারী দেবীর নাম পরিচিত। স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৫৫ সালের ২৮ আগস্ট কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতনি ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ মেয়ে। তিনি ছিলেন শিক্ষিত বাঙালী নারীসমাজের প্রথম যুগের অন্যতম প্রতিনিধি। ১৮৭৬ সালে স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ প্রকাশিত হয়। এর আগে ১৮৫২ সালে হানা ক্যাথরিন মুলেনস ‘ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত’ প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রথম ঔপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা

তিনি ১৮৫৮ সালে ত্রিপুরা জেলার পশ্চিম গাঁও এ জন্মগ্রহণ করেন। মুহম্মদ গাজী চৌধুরীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। ফয়জুন্নেসার দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়নি এবং পরিশেষে তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ ঘট।নওয়াব ফয়জুন্নেসার একটিমাত্র সাহিত্য কীর্তি ‘রূপজালাল’। তার এ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।

বেগম রোকেয়া

১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এক রক্ষণশীল পরিবারে সম্পূর্ণ প্রতিকূল এক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে নিজের চেষ্টা ও মনোবল সম্বল করে তিনি ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। বিয়ের পর স্নেহশীল ও মুক্ত মনের অধিকারী স্বামীর সংস্পর্শে এসে তিনি লেখাপড়া করার ও চিত্ত বিকাশের সুযোগ পান। বেগম রোকেয়া রচিত গ্রন্থ তার চিন্তা ও কর্মাদর্শের বাণীরূপ। মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন প্রভৃতি লেখিকার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ‘পদ্মরাগ’ বেগম রোকেয়া রচিত একটি উপন্যাস।

আশাপূর্ণা দেবী

(৮ই জানুয়ারি, ১৯০৯ – ১৩ই জুলাই ১৯৯৫) বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার ও শিশুসাহিত্যিক। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জীবন, বিশেষত সাধারণ মেয়েদের জীবনযাপন ও মনস্তত্ত্বের চিত্রই ছিল তাঁর রচনার মূল উপজীব্য। ব্যক্তিজীবনে নিতান্তই এক আটপৌরে মা ও গৃহবধূ আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন পাশ্চাত্য সাহিত্য ও দর্শন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞা। বাংলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ভাষায় তাঁর জ্ঞান ছিল না। বঞ্চিত হয়েছিলেন প্রথাগত শিক্ষালাভেও। কিন্তু গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণশক্তি তাঁকে দান করে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখিকার আসন। তাঁর প্রথম প্রতিশ্রুতি-সুবর্ণলতা-বকুলকথা উপন্যাসত্রয়ী বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির অন্যতম বলে বিবেচিত হয়। তাঁর একাধিক কাহিনি অবলম্বনে রচিত হয়েছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। দেড় হাজার ছোটোগল্প ও আড়াইশো-র বেশি উপন্যাসের রচয়িতা আশাপূর্ণা দেবী সম্মানিত হয়েছিলেন জ্ঞানপীঠ পুরস্কার সহ দেশের একাধিক সাহিত্য পুরস্কার, অসামরিক নাগরিক সম্মান ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রিতে।

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা

তিনি ১৯০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ সোলায়মান সিদ্দিক। দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। মাত্র নয় বছর বয়সে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আল ইসলাম’ পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ত্রিশ বছর ধরে তার কবিতা সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকায় ছাপা হয়। তার রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পসারিণী’ ১৯৩৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষায় মুসলমান মহিলা কবির এটাই প্রথম প্রকাশিত আধুনিক কবিতার বই।

শামসুন নাহার মাহমুদ

১৯০৮ সালে নোয়াখালী জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বেগম শামসুন নাহার মাহমুদের শিক্ষাজীবন অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনিই বাংলাদেশের মুসলিম মেয়েদের মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট। শৈশবেই শামসুন নাহারের সাহিত্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত তৎকালীন কিশোর পত্র ‘আঙ্গুর’-এ তার প্রথম রচনা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি রচনা করেছেন রোকেয়া জীবনী, বেগম মহল, শিশুর শিক্ষা, আমার দেখা তুরস্ক ও সর্বশেষ রচনা নজরুলকে যেমন দেখেছি।

বেগম সুফিয়া কামাল

তিনি ১৯১১ সালে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ পরগণায় মাতামহ সৈয়দ মুয়াজ্জম হোসেন চৌধুরীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। সুফিয়া কামাল স্কুল কলেজে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি। তবে স্বামীর সংস্পর্শে এসে তিনি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার সুযোগ পান। সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা বাসন্তী সে সময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথাও লিখেছেন। কামিনী রায়ের পর বাংলা সাহিত্যে অনেকদিন পর্যন্ত বিশিষ্ট কোনো নারী কণ্ঠস্বর শোনা যায়নি।বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট মহিলা কবি বেগম সুফিয়া কামাল।

নূরজাহান বেগম

তিনি ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দি ছিলেন
‘মাসিক সওগাত’ এবং ‘সাপ্তাহিক বেগম’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং মা ফাতেমা খাতুন।
বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত এবং সাহিত্যিক। তিনি ভারত উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’ পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে সম্পাদনার কাজে জড়িত এবং ছয় দশক ধরে বেগম পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

মহাশ্বেতা দেবী

তিনি ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাদেশের ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হিন্দু ধর্মের নিম্নজাত দলিতদের(যাদেরকে অছ্যুত বলে মনে করা হয়) অধিকার নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি অসম সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তবে দেবী নারীবাদিতার ব্যাপারে খুব বেশি উদার মনোভাব পোষণ করতেন না। তিনি সাঁওতাল ও উপজাতিদের ওপর কাজ এবং লেখার জন্য বিখ্যাত। তাঁর লেখা শতাধিক বইয়ের মধ্যে হাজার চুরাশির মা অন্যতম।

নবনীতা দেব সেন

(জন্ম ১৩ জানুয়ারী ১৯৩৮) একজন বাঙ্গালি কবি, লেখক এবং শিক্ষাবিদ। ২০০০ সালে উনি পদ্মশ্রী সন্মানে ভূষিত হন।১৯৫৯ এ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম প্রত্যয়’ প্রকাশিত হয় ও প্রথম উপন্যাস ‘আমি অনুপম’ ১৯৭৬ এ। কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, ভ্রমণ কাহিনী, উপন্যাস মিলে তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৩৮।
তাকে তুলনামূলক সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট অথরিটি মানা হয়। যাদবপুরে তিনি কবি বুদ্ধদেব বসু ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্নেহধন্য ছাত্রী ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি সাহিত্য একদেমি পুরস্কার পান তার আত্মজীবনী মূলক রম্যরচনা ‘নটী নবনীতা’ গ্রন্থের জন্যে। এছাড়াও তিনি মহাদেবী বর্মা ও ভারতীয় ভাষা পরিষদ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকেও বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন।

রিজিয়া রহমান

(জন্ম: ১৯৩৯) স্বাধীনতা উত্তর কালের বাংলাদেশের একজন খ্যতনামা নারী ঔপন্যাসিক। ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যে তার বিচরণ তাঁর প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ অগ্নি স্বাক্ষর। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হল ঘর ভাঙা ঘর, উত্তর পুরুষ, রক্তের অক্ষর, বং থেকে বাংলা।লিখেছেন অভিবাসী আমিও নদী নিরবধি নামে দুটি আত্মজীবনী। উপন্যাসে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকেভূষিত করেছেন।

সেলিনা হোসেন

১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহী শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক। জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রকাশকে তিনি শুধু কথাসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, শাণিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মাণে প্রবন্ধের আকারেও উপস্থাপন করেছেন। বেশ কয়েকটি উপন্যাসে তিনি বাংলার লোক-পুরাণের উজ্জ্বল চরিত্রগুলোকে নতুনভাবে এনেছেন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বিশ বছরেরও বেশি সময় ‘ধান শালিকের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন।


মল্লিকা সেনগুপ্ত

(১৯৬০–২০১১) তাঁর লেখা নারীবাদী ও সংবেদনশীল, সমসাময়িক ও ইতিহাস মুখী। তিনি কুড়িটি বই রচনা করেন। পেশায় তিনি সমাজবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন।
যদিও ১৯৫০ এর দশকে সাহিত্যে পুরুষের প্রাধান্য বেশি ছিল তবে ১৯৮০ এবং ১৯৯০ এর দশকে এবং মলি­কা সেনগুপ্ত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। মলি­কা সেনগুপ্তর লেখা সে সময় সাহিত্যের জগতে একরকম ঝড় তুলেছিল বলা যেতে পারে। মলি­কা সেন গুপ্তের কবিতা এখনো রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।বঙ্গ সাহিত্যে মলি­কা একটি বেশ বড় নাম। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, নারীবাদী এবং শিক্ষাবিদ।মলি­কা তার পুরো কর্ম জীবন সমাজের নারী ও পুরুষের সম অধিকার অর্জন এবং তিনি সমাজে মেয়েদের নিম্ন অবস্থানের বিরুদ্ধে সব সময়ই লেখা-লেখি করেন।

তসলিমা নাসরিন

স্বাধীনতার পর নারীবাদী ও আপসহীন লেখিকা হিসেবে পরিচিত, আলোচিত ও সমালোচিত হন তসলিমা নাসরিন। নারীপ্রগতিবাদী নন বরং কঠোর নারীবাদী যেখানে তিনি পুরুষের প্রতি আক্রোশ পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। তসলিমা নাসরিন ১৯৮২ এবং ১৯৮৩ সালে কবিতা লিখে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তার কবিতা মূল বিষয় বস্তু ছিল নারীদের অসমতা। তিনি মূলত মানবধর্ম, চিন্তার স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং নারীদের সমান অধিকারের জন্য কাজ করেন।
১৯৯০ সালে তসলিমা নাসরিন প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন এবং ১৯৯৩ সালে তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘লজ্জা’ প্রকাশ করেন।

আমরা যদি আরো পিছনে তাকাই তাহলে আরো দুজনের নাম বাংলা সাহিত্যে ওঠে আসে তাঁরা হলেন;

চন্দ্রাবতী/রামী

(জন্ম: ১৫৫০ মৃত্যু: ১৬০০) কাজের প্রমাণ সাপেক্ষে চন্দ্রাবতীকেই ধরা যেতে পারে প্রথম নারী কবি। তাঁর অনেক কাজ রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি। তবে, এর বাইরে আরেক জনের কথা এসে যায়। ইনি চন্দ্রাবতীরও আগে জন্ম নিয়েছেন। যদিও তাঁর বিষয়ে সব পণ্ডিত একমত না, তবুও তাঁকে অস্বীকার করা যায় না। কারণ, তাঁরও কিছু কবিতা, ভণিতা খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। এই কবির নাম রামী।
এই রামীকে আমরা জানি। তবে, ভিন্নভাবে। চণ্ডীদাস–রজকিনীর প্রেমের কাহিনি জানেন না, এমন লোক পাওয়াটা বিরলই বটে। প্রেমের মড়া জলে ডোবে না, এই গান শোনেননি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। এই গানেই দুচরণ হচ্ছে, চণ্ডীদাস আর রজকিনী, তাঁরাই প্রেমের শিরোমণিগো। হ্যাঁ, এই রজকিনীই হচ্ছেন কবি রামী।
চণ্ডীদাসের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিলো, সে সম্বন্ধে রামীর রচিত একটি গীতিকা আবিষ্কৃত হয়। এ সম্বন্ধে দীনেশ্চন্দ্র সেন বলেন, চণ্ডীদাসের মৃত্যু সম্বন্ধে প্রায় দুইশত বৎসরের প্রাচীন হস্তলিপি সম্বলিত একটি প্রমাণ বসন্ত বাবু আবিষ্কার করিয়াছেন। যা রামীর রচিত একটি গীতিকা।
কোঁথা যাও ওহে, প্রাণ বঁধূ মোর, দাসীরে উপেক্ষা করি। না দেখিয়া মুখ, ফাটে মোর বুক ধৈর্য ধরিতে নারি।।

তার পিতা মনসা মঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা দ্বিজ বংশী দাস এবং মাতার নাম সুলোচনা৷ নিবাস অধুনা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার পাটোয়ারী গ্রাম৷ তার রচনাগুলোর মধ্যে মলুয়া, দস্যু কেনারামের পালা ও রামায়ণ কথা (অসমাপ্ত) অন্যতম৷ মৈমনসিংহ গীতিকায় তার কথা পাওয়া যায়৷ তাঁর নিজের জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত লোকগাঁথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলার মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসেছে৷)

তবে বাংলা সাহিত্যে নারীলেখক যারা এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী নাম করেছেন তারা সকলেই নারীর অধিকার ও প্রগতি নিয়ে কথা বলেছেন। এটাই ছিল মূল বিষয়। এর বাহিরে কিছু লেখা রয়েছে সেগুলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক। বাংলার নারী সাহিত্যকরা নারীর অধিকার নিয়ে লিখেছেন কারন বাংলার নারী সব সময়ই অবহেলিত ও অত্যাচারিত। যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে কম দেখা যায়।বাংলা সাহিত্যে নারীদের ভুমিকা কম তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাংলায় সবসময়ই নারী শিক্ষার হার কম। দু’দশক পূর্বে নারী শিক্ষাকে অনেকেই “অন্যের চারা গাছে পানি দেয়া”কেই বুঝিয়ে থাকতেন।
এ ছাড়া বাংলার সমাজ ব্যবস্থাও এর জন্য কিছুটা দ্বায়ী। পুরুষস্বাশিত এ সমাজে নারীর প্রগতিকে অনেকেই সহজভাবে নিতে পারে না। মেয়েদের ছেলেবেলা থেকেই নিজেদের মতামত প্রদান থেকে বিরত রাখবার শিক্ষাই দেয়া হয়। মধ্যবিত্ত সমাজে এর প্রবণতা একটু বেশি। তাছাড়া বাংলায় বিয়ে একটি বড় ব্যাপার। মেয়েদের জন্মই হয় মূলত একটি ভালো বিয়ে হবার জন্য। বিয়ের পর সাহিত্য চর্চা অনেক পরিবারের জন্য হাস্যকর ব্যাপার বলেই মনে হয়।
সাহিত্যে সেদিন অবশ্যই আসবে যেদিন ‘সাহিত্যে নারী’ কথাটির বিলুপ্তি ঘটবে। সাহিত্য হবে সার্বজনীন। যেদিন কোনো লেখকে লিখতে হবে না “বাংলা সাহিত্যে নারীর অবদান” বরং লিখবে ‘বিশ্বসাহিত্যে বাংলা সাহিত্যের অবদান ও অবস্থান’।