বাংলার এক প্রভাবশালী ঋতু ‘বর্ষা’। ঋতুবৈচিত্রের বাংলা বারো মাসকে ছয়টি ভাগে বিভাজন করা হয়েছে । তবে বর্ষা ঋতু বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে কবি মনে। বর্ষা কবিদের মন ও আবেগকে যেভাবে আলোড়িত করে; অন্য কোনো ঋতু সে’ভাবে কবি-সাহিত্যিক বা শিল্পিকে আলোড়িত করে না।আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে প্রকৃতি যখন বিপন্ন, ঠিক তখনি রিমঝিম বৃষ্টির বাজনা বাজিয়ে আকাশ জুড়ে আসে বর্ষা। আকাশ ঘন হয় কালো মেঘে কিংবা হালকা মেঘের ভেলা পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো ভেসে বেড়ায় । গাছপালা প্রাণ ফিরে পায়। তাদের শরীরের ধূলোবালি নিমেষেই ধুয়ে মুছে নিয়ে যায় বর্ষা। মাঠের সবুজ ঘাসগুলো জেগে ওঠে। বনে বনে কদম কেয়া ফোটে। সবাই প্রাণের আবেগে স্বাগত জানায় বর্ষাকে। অঝোর বৃষ্টিধারা ভরে দেয় শুকনো খালবিল। শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ মাঠ বৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে সজীব হয়ে ওঠে। ব্যাঙেরা গর্ত থেকে বেরিয়ে এস ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ করতে থাকে। এটাই তাদের বর্ষাকে আবাহন জানানোর সুর। সুর ওঠে টিনের চালে, গাছের ডালে,বনে বনে পাতায় পাতায়।

কবি সাহিত্যিকের কলম বেগবান হয় বর্ষার মোহনীয় রূপে। নানা ছন্দে বর্ণে তারা চিত্রায়িত করেন বর্ষাকে । কবি মনকে আলোড়িত করে বর্ষা। তাই প্রাচীন কবি জয়দেব থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে সকল কবিই কম বেশি আবেগ তাড়িত হয়েছেন বর্ষার প্রভাবে। বর্ষায় কেউ কেউ ডুবে যান অন্তহীন নির্জনতায়। কেউ কেউ অনুভব করেন অনন্ত বিরহ। আবার কেউবা অনুভব করেন বেদনাবিধূরতা। বৃষ্টি ধারার বিষাদ করুণ সুরে প্রিয়া বিহনে বিরহী কবির মন গেয়ে ওঠে, ‘আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে। আমার প্রিয়া ঘন শ্রাবণ ধারায়/আকাশ ছেয়ে মনের কথা হারায়’। কখনও কবির ভাবনা এলোমেলো হয়। কবি আপন মনে গেয়ে ওঠেন, ‘আমি কি গান গাবো যে ভেবে না পাই/ মেঘলা আকাশে উতলা বাতাসে/খুঁজে বেড়াই । কবি-মন ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ায় এখানে সেখানে,অসীম শূন্যতায়। আকাশে ডানা মেলে পাড়ি দেয় নিঃসীম। কবি কলমে ঝরে ঝরনার গান,‘মন মোর মেঘের সঙ্গী। উড়ে চলে দিক দিগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে/ শ্রাবণ বর্ষণ সঙ্গীতে/রিমিঝিমি রিমিঝিমি রিমিঝিম । কিংবা ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘন ঘোর বরিষায়।’
এমন বৃষ্টিঝরা দিনে কবি অনেক কথা বলতে চান। সে কথা মরমের। শুধুই হৃদয়ের অনুভব। হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব।
বর্ষার আবেদন মধ্য যুগের বাংলা কবিতা ও সমসাময়িক কবিদের কবিতায় অনুরণিত। চ-িদাস, বিদ্যাপতি গোবিন্দ দাস কিংবা কালিদাসের কবিতায় বর্ষাকে তাই আমরা পাই নানা ভাবে। বর্ষা যেন এক ভালবাসার কাল। প্রেমে পড়া আর মন দেয়া নেয়ার মোক্ষম সময়। এসময় ভালোবাসার অজানিত এক আহ্বানে উদ্বেলিতে হয়ে ওঠে মানব মন। বর্ষায় মানব মনে প্রেমের জোয়ার আসে। সেই জোয়ারে ভাসতে ভাসতেই কবিরা তাদের বিভিন্ন কবিতায় প্রকাশ করে থাকেন প্রেমের ব্যাকুলতা। তাই বর্ষা কখনও অবিমিশ্র প্রেমের অনুঘটক, কখনো কামনা-বাসনা আকুলতার সরব ভাষা হয়ে দাঁড়ায়। সে জন্যেই গান কবিতা ও গদ্য সাহিত্যে বর্ষা ধরা দেয় পূর্ণাঙ্গ ব্যাপ্তিতে।কালিদাসের মেঘদূত কবিতায় রামগিরি পর্বতের ওপারে নির্বাসিত একাকী জীবনে মেঘ যখন উচুগিরির উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যেতো; তখন বিরহী যক্ষের মনে জাগত প্রিয়া বিরহের যাতনা। তাই তিনি তার চিত্তের ব্যাকুলতা বর্ণনা করে মেঘকে দূত করে পাঠাতেন প্রিয়ার কাছে। এভাবেই মধ্যযুগের কবিতায় বর্ষা এসেছে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের দিশারী হিসেবে। একই ধারায় কবি চ-িদাস তাঁর প্রেম বিরহ কাতরতার কথা প্রকাশ করেন তাঁর কবিতায়-
এঘোর রজনী মেঘের ঘটা/ কেমনে আইল বাটে
আঙ্গিনার মাঝে বধূয়া ভিজিছে/ দেখিয়া পরাণ ফাটে।
আর বিদ্যাপতির রচনায়ও বর্ষার বিরহ কাতরতা কম নয়।
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর/ এ ভরা ভাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।
বর্ষার বিচিত্র ও সার্থক ব্যবহার হয়েছে মধ্য যুগে বাংলা কবিতায়। শুধু প্রেম বিরহ নয়, কবিতায় বর্ষা এসেছে কখনও প্রকৃতির রূপ সুধা বর্ণনায়, কখনো শৈশব- কৈশোরের স্মৃতির নস্টালজিয়ায়।
মনসা মঙ্গল’ কাব্যের রচয়িতা মহাকবি কালিদাস ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ বর্ষার সকল উপাচারে সজ্জিত এক জগৎ-এ প্রবেশ করেন। আকাশ সাজে মেঘলা রূপে। মেঘেরা ভেসে বেড়ায় বাতাসে। ইচ্ছে মতো ঝরে পড়ে যখন তখন। নতুন পানি ভিজিয়ে দেয় বিবর্ণ প্রকৃতিকে। ধানের ক্ষেতে পানি জমে জমে ঢেউ নেচে চলে । এসময় বয়সীরা ছোটদের ঘরে বাইরে যেতে বারণ করেন।
মাইকেল মধুসুদন দত্ত বর্ষাকে কল্পনা করেছেন প্রকৃতির অরূপ শক্তি হিসাবে। তাঁর কবিতায় বর্ষার প্রকৃতি ও মানব প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন দেবতারাও। মধুসুদন দত্তের ‘বর্ষাকাল’ কবিতায় বর্ষার রূপ ফুটে উঠেছে এভাবে,
গভীর গর্জন করে সদা জলধর/উথলিল নদ-নদী ধরনীর উপর
রমনী রমন লয়ে/সুখে কেলি করে /দানবাদি দেব যক্ষ সুখিত অন্দরে।
বিদ্রোহী ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বর্ষা ধরা দিয়েছে বিপুলভাবে । কখনও সরাসরি, কখনও প্রতিকী ব্যঞ্জনায়। বর্ষার মেঘ তাঁর প্রেমিক মনকে উদ্বেলিত করেছে যা কবির বাদল রাতের কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে-
বাদল রাতের পাখী
উড়ে চল যেথা আজো ঝরে জল, নাহিক ফুলের ফাঁকি।
বর্ষাবিদায় কবিতায় কবিমনের যত আকুতি ঝরে পড়ে এভাবে-
‘ যেথা যাও তব মুখর পায়ের বরষা নূপুর খুলি
চলিতে চলিতে চমকে ওঠনা কবরী ওঠে না দুলি
যেথা রবে তুমি ধেয়ানমগ্ন তাপসিদী অচপল
তোমায় আশায় কাঁদিবে ধরায়, তেমনি ফটিক জল’।
কবি শামসুর রাহমান বৃষ্টি বন্দনায় অনাবৃষ্টি কবিতায় লিখেছেন-
টেবিলে রয়েছি ঝুঁকে, আমিও চাষীর মতো বড়
ব্যঘ্র হয়ে চেয়ে আছি খাতার পাতায়,
যদি জড়ো হয় মেঘ, যদি ঝরে ফুল বৃষ্টি
অলস পেন্সিল হাতে বকমার্কা। পাতা জুড়ে আকাশের নীল।
তেমনিভাবে আল মাহমুদ, সৈয়দ সামসুল হক, কবি ওমর আলী, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরীসহ বাংলা-দেশের সমকালীন কবিদের কবিতায় বর্ষা বন্দনা ফুঠে ওঠেছে নিপুণভাবে । বাংলা ভাষার এমন একজন কবিকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি বর্ষা নিয়ে কবিতা লেখেননি। সে কবিতা মান বিচারে যাই-ই হোক না কেন।
কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা তাঁর বৃষ্টি পড়ে কবিতায় বৃষ্টিকে প্রকাশ করেছেন মনের মধুরতায়-
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে/মনে মনে বৃষ্টি পড়ে
বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টি পড়ে/বনে বনে বৃষ্টি পড়ে
মনের ঘরে চরের বনে/নিখিল নিঝুম গাও গেরামে
বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টি পড়ে/বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টি পড়ে
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় বর্ষা এসেছে নানান বিচিত্ররূপে । তিনি বর্ষাকে বন্দনা করেছেন, পূর্ণতা দিয়েছেন। বর্ষার ঘনকালো মেঘে আকাশ হয় ওঠে কালিবরণ । মেঘের কার্পেটে আকাশকে ঢেকে গরুগুরু গর্জন তোলে। তারপর নেমে আসে বৃষ্টির অবিরাম ধারা। সে বৃষ্টিধারা তাঁকে হাত ধরে পৌঁছে দেয় শৈশব- কৈশোরে। রবীন্দ্রনাথের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’। বৃষ্টি এলেই দুরন্ত শৈশব তাঁকে হাতছানি দেয়, আর কবি ডুবে যান প্রগাঢ় নস্টালজিয়ায়; তাঁর কবিতায় ঝরে পড়ে স্মৃতিকাতরতার অঝোর বৃষ্টি-
কবে বৃষ্টি পড়েছিল, বান এলো যে কোথা
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো কবেকার সে কথা।
সেদিনও কি এমনিতরো মেঘের ঘনঘটা
থেকে থেকে বাজ বিজুলি দিছিল কি হানা।
বর্ষা এলে জীবন, জীবনের বন্ধন, জগৎ সংসারের পিছুটান কবির কাছে গৌণ হয়ে ওঠে। অঝোরধারার বৃষ্টি কবির কাছে প্রেমিকার কান্নার মতো বলে হয়। কিন্তু বর্ষায় কবি যুগপৎ আনন্দ বেদনায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। যখন কোরাস তুলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে তিনি আনন্দিত হন, তেমনি মেঘের ঘনঘটা দেখে ভয়ও পান। আর সেটাই বাস্তব। এ কারণেই রবীন্দ্র কাব্যভাবনায় আমরা বার বার দেখি বর্ষাকে বহুমাত্রিকতায় । তাই অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে বর্ষার কবি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি শুধু বর্ষার চিত্রকল্প ফোটান না, সাবধান বাণীও উচ্চারণ করেন। তিনি লেখেন,
‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগণে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে
বাদলের ধারা ঝরে ঝরো-ঝরো
আউষের ক্ষেত জলে ভরো ভরো
কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনায়েছে দেখ চাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।
অতি আলোচিত কবিতাগুলো পাশে সরিয়ে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় ‘অপেক্ষা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
মেঘেতে দিন জড়ায়ে থাকে মিলায়ে থাকে মাঠে,
পড়িয়া থাকে তরুর শিরে, কাঁপিতে থাকে নদীর নীরে
দাঁড়ায়ে থাকে দীর্ঘ ছায়া মেলিয়া ঘাটে বাটে।
বর্ষা দিনের জল-ছল-ছল হাওয়া-উচ্ছ্বল রূপের ছবি ‘ মেঘদূত’ কবিতায় কবি এঁকেছেন এভাবে-
‘‘আজি অন্ধকার দিবা বৃষ্টি ঝরঝর,
দুরন্ত পবন অতি, আক্রমণে তার
বিদ্যুৎ দিতেছে উঁকি ছিড়ি মেঘভার
খরতর বক্রহাসি শূন্যে বরষিয়া।’’
আবারো সেই শঙ্কা প্রকৃতির আগ্রাসী রূপ । পবনের ‘আক্রমণ, বিদ্যুতের ‘বক্র হাসি’ সব মিলিয়ে প্রকৃতির মধ্যে যেন ‘কী হয়, কী হয়’ ভাব, চাপা উত্তেজনা। আবারও সেই বিপন্নতাবোধ।
দিন ছেড়ে এবার কবি গেলেন বর্ষারাতে । নিশীথিনী বর্ষার রূপছায়া ফুটে উঠল রবীন্দ্র লেখনিতে। ‘ভালো করে বলে যাও’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
আজি অন্ধতামসী নিশি।
মেঘের আড়ালে গগনের তারা সবগুলি গেছে মিশি।
শুধু বাদলের বায় করে হায়-হায় আকুলিছে দশ দিশি।’
মেঘ এসে আগে আকাশের আলোকবিন্দুগুলিকে আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে নেয়, অন্যদিকে তার জন্যে বাদলবাতাস হায়-হায় করে যেন শোকপ্রকাশ করে।
‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় তো রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে প্লাবিত করে দিয়েছেন শতধারায়।
স্নিগ্ধসজল মেঘকজ্জল দিবসে
বিবশ প্রহর অচল অলস আবেশে।
শশীতারাহীনা অন্ধতামসী যামিনী,
কোথা তোরা পুরকামিনী।
আজিকে দুয়ার রুদ্ধ ভবনে ভবনে,

জনহীন পথ কাঁদিছে ক্ষুব্ধ পবনে,
চমকে দীপ্তদামিনী।
শূন্য শয়নে কোথা জাগে পুরকামিনী।’
এর শেষ ছত্রটি মনে করিয়ে দেয় বিদ্যাপতির সেই অবিস্মরণীয় পদ-
‘‘এ সখি হামারি দুখক নাহি ওর
ই ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।’’
বর্ষারাতের শীতলতায় দয়িতার অন্তর অনিবার্যভাবেই পেতে চাইবে দয়িতের শরীরী উষ্ণতা। তা না পেলে সে যে মেঘবন্দি হবে। ঠা-া প্রাণহীনবিরহ যেন তাকে নিবিড় একাকীত্বে ঠেলে দেবে।
‘মেঘমুক্ত’ কবিতায় কবি চিত্রিত করেছেন বর্ষার চলে যাওয়াকে।
‘মেঘ ছুটে গেল, নাই গো বাদল, আয় গো আয়
আজিকে সকালে শিথিল কোমল বহিছে বায়।
পতঙ্গ যেন ছবিসম আঁকা
শৈবাল-পরে মেলে আছে পাখা,
জলের কিনারে বসে আছে বক গাছের ছায়।
আজ ভোর থেকে নাই গো বাদল, আয় গো আয়।’
এছাড়াও নববর্ষা, মেঘদূত, সোনার তরী, আষাঢ়সন্ধ্যা, আষাঢ় প্রভৃতি কবিতায় রয়েছে বর্ষার নিবিড় আধিপত্য ।
কবিতা, ছড়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের প্রচুর গানেও বর্ষাকে আমরা দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথের সেই অনবদ্য বর্ষাসঙ্গীতগুলির দু’একটি একবার ছুঁয়ে দেখি।
‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে/জানিনে জানিনে-কিছুতে যে মন লাগেনা।’
কবি বর্ষাকে প্রকাশ করতে গিয়ে পাগল হাওয়ার কথা বলেন। বাদল দিনে যে হাওয়া বয় তাকে কবি বলছেন ‘পাগলা হাওয়া’। তাঁর লেখায় পাই,
‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে/ চেনা জানার কোন বাইরে/ সেখানে পথ নাই নাইরে।’
বর্ষা মানেই কদম ফুল। কদম ফোটার দিন। কদমের সুঘ্রাণ জানিয়ে দেয় যৌবনবতী বর্ষার আগমনী। রবীন্দ্র কবিতায় গানে বর্ষা আর কদম একাকার হয়ে গছে এভাবে-
‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’
বর্ষা ঋতু কাব্যময়, প্রেমময়। বর্ষার ধারাপাতে নির্জনে ভালোবাসার সাধ জাগে, সাধ জাগে মুখোমুখি বসার। সারাটা জগৎ বিস্মৃত হয়ে একাকার দুটি প্রাণ দুজন দুজনায় বিলীন হবার ইচ্ছে জাগে।
এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়
সমাজ সংসার মিছে সব
মিছে এ জীবনের কলরব
দুজনে মুখোমুখি
গভীর দুখে দুখি
আকাশে জল ঝর অনিবার
জগতে কিছু যেন নাহি আর।
এছাড়াও আছে, বাদল ধারা হল সারা, বাদল-বাউল বাজায় একতারা, বাদল- মেঘে মাদল বাজে, বাদর বর্ষণ নীরদ গরজন, মেঘ ছায়ে সজল বায়ে মন আমার, মেঘ বলেছে ‘যাব যাব’, মেঘের কোলে যায় রে চলে, আষাঢ় কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া, আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে, আবার শ্রাবণ হয়ে এলে ফিরে, শ্রাবণ তুমি বাতাসে কার আভাস পেলে, শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার, শ্রাবণের গগনের গায়, শ্রাবণের পবনে আকুল বিষণ্ন সন্ধ্যায়, শ্রাবণের বারিধারা, এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে, নীল অঞ্জন ঘন কুঞ্জছায়ায় সম্বৃত অম্বর, উতল ধারাবাদল ঝরে, বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো আমার মনে, বৃষ্টিশেষের হাওয়া কিসের খোঁজে, পুব-হাওয়াতে দেয় দোলা, শ্যামল শোভন শ্রাবণ তুমি নাই বা গেলে, কেন পান্থ এ চঞ্চলতা, আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু, থামাও রিমিকি-ঝিমিকি বরিষণ, আধার অম্বরে প্রচ- ডম্বরু বাজিল গম্ভীর গরজনে, হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে, যায় দিন শ্রাবণ দিন যায়, মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো, আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে, পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে, সঘন রাত্রি ঝরিছে শ্রাবণধারা প্রভৃতি ।
গানগুলির কোনটিতে আছে বর্ষার সামগ্রিক রূপবর্ণনা, কোথাও আছে বর্ষার আগমনী, কোথাও বা বিদায়সঙ্কেত, কোথাও বা আছে বর্ষা প্রকৃতিকে পশ্চাদপটে রেখে মানবমনের মেঘ-বৃষ্টির অনুভূতির বিস্তার। ‘বহু যুগের ওপার’ থেকে যেন কোনো বাণী আসে মেঘবাহিত হয়ে।
বর্ষা প্রকৃতির হাত ধরে আসে, আবার প্রকৃতির অনুগামী হয়ে চলেও যায়। কিন্তু প্রতিবার তার আসা-যাওয়ার সাথে সাথে ভাবরাজ্যে যে নাড়া পড়া এই রূপান্তরটা অসীম এবং পৌনঃপুনিক।
শুধু কবিতা বা গান নয়, রবীন্দ্রনাথের গদ্যসম্ভারেও বর্ষাদিনের ছড়াছড়ি। তাকাই ‘জীবনস্মৃতি’তে। সেখানে কবি কুসুমে কুসুমে নিজ জীবনের চরণচিহ্ন রেখে গেছেন। ওই গ্রন্থে বর্ষা দিনের কথা পাওয়া গেল এভাবে-‘‘এক-একদিন সকাল হইতে মেঘ করিয়া আসে; ওপারের গাছগুলি কালো; নদীর উপর কালো ছায়া; দেখিতে দেখিতে সশব্দ বৃষ্টির ধারায় দিগন্ত ঝপসা হইয়া যায়, ওপারের তটরেখা যেন চোখের জলে বিদায়গ্রহণ করে; নদী ফুলিয়া ফুলিয়া উঠে এবং ভিজা হাওয়া ওপারের ডালপালাগুলির মধ্যে যা-খুশি করিয়া বেড়ায়।’’
জীবনের প্রথম বেলাতেই বর্ষার সাথে অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটেছে কবির। জীবনের অনেকটা সময় কবি কাটিয়েছেন এ দেশের শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরে। তখন নদীবক্ষে বোটে বসে অবলোকন করেছেন বর্ষা-দিনের রূপসুধা। আর সেগুলোই বিপুলভাবে উদযাপিত হয়েছে কবির কবিতা গল্প উপন্যাস গান আর চিঠিতে। ‘ছিন্নপত্রে’ বর্ষাদিনের মেঘ কাটার কথা তিনি উল্লেখ করেন এভাবে-
‘‘অনেকদিন পরে মেঘ কেটে রৌদ্রে দশ দিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। প্রকৃতি যেন স্নানের পর নতুন- ধোয়া বাসন্তী রঙের কাপড়টি পরে পরিচ্ছন্ন প্রসন্ন প্রফুল্ল মুখে ভিজে চুলটি মৃদুমন্দ বাতাসে শুকোচ্ছিলেন।’’
‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের বর্ষার রূপ এঁকেছেন এভাবে-
‘বন্যার সময়ে গোরুগুলি যেমন জলবেষ্টিত মলিন পঙ্কিল সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠ প্রাঙ্গণের মধ্যে ভিড় করিয়া করুণ নেত্রে সহিষ্ণুভাবে দাঁড়াইয়া শ্রাবণের ধারাবর্ষণে ভিজিতে থাকে, বাংলাদেশ আপনার কর্দমপিচ্ছিল ঘনসিক্ত রুদ্ধ জঙ্গলের মধ্যে মূকবিষণœ মুখে সেইরূপ পীড়িতভাবে অবিশ্রাম ভিজিতে লাগল। চাষীরা টোকা মাথায় দিয়া বাহির হইয়াছে; স্ত্রীলোকেরা ভিজিতে ভিজিতে বাদলার শীতল বায়ুতে সঙ্কুচিত হইয়া কুটির হইতে কুটিরান্তরে গৃহকার্যে যাতায়াত করিতেছে ও পিছল ঘাটে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলিয়া সিক্তবস্ত্রে জল তুলিতেছে এবং গৃহস্থ থাকিলে কোমরে চাদর জড়াইয়া, জুতো হস্তে, ছাতি মাথায় বাহির হইতেছে। অবলা রমণীর মস্তকে ছাতি এই রৌদ্রদগ্ধ বর্ষাপ্লাবিত বঙ্গদেশের সনাতন পবিত্র প্রথার মধ্যে নাই।’’
এটাই বর্ষায় বাংলার গৃহস্থ মানুষের চিত্র । তাদের জীবনে বর্ষার দিনে তেলমাখা গরম মুড়ি বড়া বা পান খেয়ে তামাক টেনে খেয়ে অলস সময় কাটাবার সুযোগ নেই। ক্ষেতের ফসলই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় । সেই ক্ষেতগুলি জলে ভিজছে ডুবছে। কে জানে তলিয়ে যাবে কিন্।া তার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে কৃষককে। ফসল বাঁচাতে হবে। তাই মাথায় টোকা দিয়েই হোক আর খালি মাথাতেই হোক ক্ষেত দেখতে যেতেই হবে তাদের। মেয়েদের অবস্থা আরো সঙ্গীন। তাদের ভিজে-ভিজেও বাড়ির কাজ করতেই হবে। জল আনতে পিছল-ঘাটে যেতেই হবে। তাই বর্ষাতেও তাদের নিষ্কৃতি নেই। পুরুষদের জন্যে চাদর, জুতো, ছাতি ইত্যাদি আছে। বর্ষাতেও নারী পুরুষের আবহমানকালের বৈষম্যের স্বরূপটি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেতে পারেনি।
হাট ছাড়া গ্রামীণ জীবন অচল। রবীন্দ্র গল্পে ফুটে উঠেছে গ্রামের হাট। ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পে দেখি-
‘ছোটো একটা নদীর ধারে হাট। বর্ষাকালে নদী পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। কতক নৌকায় এবং কতক ডাঙায় কেনাবেচা চলিতেছে, কলরবের অন্ত নাই। পণ্যদ্রব্যের মধ্যে এই আষাঢ় মাসে কাঁঠালের আমদানিই সবচেয়ে বেশি, ইলিশ মাছও যথেষ্ট। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে; অনেক বিক্রেতা বৃষ্টির আশঙ্কায় বাঁশ পুঁতিয়া তাহার উপর একটা কাপড় খাটাইয়া দিয়াছে।’
রবীন্দ্রনাথ জীবনকে দেখেছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিবিড়ভাবে। তাঁর গভীর দৃষ্টি ছোট ছোট দৃশ্যকেও তুচ্ছ জ্ঞানে দূরে সরিয়ে রাখেনি। তাই বৃষ্টিভেজা হাটের এক অনবদ্য ছবি তার লেখনীকে দেয় অনন্য মাত্রা।
আমরা বর্ষাকে ভালবাসি, ভালবাসি বর্ষার লেখকদের। বর্ষাবিহীন বাংলাদেশ আমরা ভাবতেই পারি না। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ূ পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বাংলার ষড়ঋতু এরই মধ্যে তিনটি ঋতুতে পরিণত হয়েছে। শীত, বসন্ত ও বর্ষা ছাড়া অন্য তিনটি ঋতু কখনই বা যায় আসে তা যেন বোঝাই যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে লড়াই সংগ্রাম করে এই তিনটি ঋতু নিজেদের অস্তিত্ব এখনো টিকিয়ে রেখেছে। তারপরও লেখকদের লেখনীতে বাংলার ষড়ঋতু মূর্ত হয়ে থাকবে চিরকালই।
আর বেঁচে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনবদ্য বর্ষাসম্ভার নিয়ে । জয়তু বর্ষা!

লেখক; কথাসাহিত্যিক,প্রাবন্ধিক, কলামলেখক