মফিজ চাচার একগেঁয়ে মনকে খুশি রাখতে হলে তার মনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা জরুরি ৷ যেমনটা বলবেন তিনি, তার ব্যত্যয় ঘটানো দারুণ মুশকিল ৷ এই আদ্যোপান্ত বর্ষার থৈ থৈ পানিতে শহরে থাকা একমাত্র ভাতিজা ইমরোজ সোহেলকে বলে বসলেন—
‘কাকা, লও দেহি আমার লগে বাঘমারা বুন্দ যাই’ ৷
ইমরোজ অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করলো—
‘বুন্দ’ আবার কি চাচা’?
চাচাত ভাই আলম বললো—
‘ওই যে শত শত ক্ষেতের বিশাল মাঠ, একেই এখানকার পল্লীভাষায় ‘বুন্দ’ বলে’ ৷ ‘ও তাই’ ৷
‘তো চাচা কখন যাবেন’? জিজ্ঞেস করলো ইমরোজ ৷
‘এই ধর দুফুরে খাইয়া-ছাইয়া রওনা করমু’ ৷ বললেন মফিজ চাচা ৷

দুপুরে হরেক পদের তরকারি দিয়ে ভাত আর খাঁটি গরুর দুধের পায়েস খেয়ে মফিজ চাচা, ভাতিজা ইমরোজ সোহেল ও আলম রওনা করলো ৷ তারা যাবে ‘বাঘমারা বুন্দ’ ৷ মফিজ চাচা একটা বিড়ি ধরিয়ে দুই ঠোঁটে পুরে হাতের নতুন কোঁচটা উল্টেপাল্টে দেখছেন ৷ নিখুঁত এই কোঁচ দিয়েই তিনি গ্রীষ্মের খরাঞ্চল আর বর্ষার মিনিসাগর বাঘমারা বুন্দে মাছ ধরবেন ৷ যখন গ্রীষ্ম আসে কিংবা শীতের শুষ্ক মৌসুম, তখন এই বাঘমারা বুন্দের বিস্তীর্ণ ধানি জমিগুলো পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যায় ৷ বর্ষা এলেই কেবল তা জল থৈ থৈ মিনিসাগর রূপ ধারণ করে ৷ মাঝের কোঁচকান্দি নদী ছাপিয়ে পানি এপার-ওপার ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাঘমারা বুন্দের পুরো ধানি জমিগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়ে ৷ তখন এখানে আশপাশের সাত গ্রামের মানুষের মৎস্যরিজিক বৃদ্ধি পায় ৷ যে যেভাবে পারে মাছ ধরে ৷ কয়েক কিলোমিটার বিস্তৃত বাঘমারা বুন্দেই আশপাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের ধানক্ষেত ৷ বছরে দুই সিজন কোনো রকমে ধানচাষ হয় ৷ তবে বর্ষা মৌসুমটায় পানি থাকার কারণে ধানচাষ ব্যাহত হলেও মাছ ধরার ধুম পড়ে যায় ৷

‘আচ্ছা মফিজ চাচা, এই যে কোঁচকান্দি নদীর দুই পাশে বিস্তৃত ধানিজমি, একে আপনারা ‘বাঘমারা বুন্দ’ বলেন কি কারণে’? জানতে চাইলো ইমরোজ ৷ মফিজ চাচা একটা কাষ্ঠ হাসি দিয়ে বললেন— ‘কাকা, এহানে আগিলাদিনের অকটা লাম্বা কাহিনি আছে ৷ আমার পরদাদার আমলের ৷ হেই কাহিনিডাই এই বাঘমারা বুন্দের আসল ইতিহাস ৷ আমার দাদার মুহে এইডার ইতিহাস কতবার যে হুনছি তার হিসাব নাই ৷ আমার দাদার বাবা যিনি আছিলেন তিনি এই অঞ্চলের নামকড়া পালোয়ান আছিলেন ৷ হুদা ইনিই আছিলেন না, এই অঞ্চলের আরো ডজন খানেক লোক পালোয়ান আছিলো ৷ এরা মাইনসের বড় বড়, ভারী ভারী কাম কইরা দিত ৷ বরহি ঈদ আইলে জমিদাররা বড় বড় ষাঁড়-বইস কুরবানি দিত ৷ দেহা যাইত এই পালোয়ানগো কামে লাগত ৷ এল্লা একজন পালোয়ান একটা ষাঁড় বা বইস ধইরা হুয়ায় লাইত, এরপর ইমাম সাব জব করত ৷ একটা বিশাল গাছের ডোম এল্লা এক পালোয়ানই আঙ্গাইয়া এক জায়গাত্তে আরেক জায়গায় লইয়া যাইত ৷ এরা অইলো শক্তিশালী পালোয়ান ৷ আমার পরদাদাও এমন একজন পালোয়ান আছিলেন ৷ তয় ‘বাঘমারা বুন্দ’ নাম হওয়ার ঘটনা অইন্নডা ৷ হেইডা অইলো, একবার বর্ষা মুশুমের ঠিক আগ মুহূর্তে, জেঠ মাসের শেষে কোনো একদিন দুফুরের কড়া রইদের মধ্যে এই বুন্দের মাঝে গরু ছাগল ভেড়ারা ঘাস খাইতাছিলো৷ বুন্দের মাঝে তহন তো ঘাস নাই ধরতে গেলে৷ হেরপরও যা আছিলো তাই টাইন্যা ছিড়া খাইতাছিলো৷ বেশিরভাগই আছিলো এই অঞ্চলের জমিদারগো পশু৷ কড়া রইদ দেইক্কা রাখালরা পশুগুলারে ছাইরা দিয়া গাছের তলে বইয়া জিরাইতাছিলো ৷ কেউ গল্পগুজব করতাছিলো, কেউ ওঙ্গায়তাছিলো, দুয়েকজন ডাবা-তামাক খাইতাছিলো৷ হঠাৎ কইরা ছাগল গরুর পাল এফি হেফি বেহুঁশ অইয়া দৌড় লাগাইতে দেহা গেলো৷ পাগলা ষাঁড়গুলি তো একেকটা দড়ি ছিড়া যেফি ছোক গেছে হেফিই দৌড়াইয়া গেছে ৷ রাখালগর চেতন ফিরা আইলে এরা তো কিছুই বুইজা উঠতে পারলো না ৷ সবাই লাডি লইয়া বুন্দের মাঝখানে দৌড় ফাইরা যাইতে লইছিলো ৷ একজন আগে আগে গিয়া দেহে বুন্দের মাঝে বিরাট এক বাঘ দুই তিনডা ছাগল ফালাইয়া দিয়া ছিড়া ফাইরা খাইতাছে৷ যহন হেই বেডায় বাঘ বাঘ কইরা আওয়াজ দিলো তহন হগলতে বাঘ বাঘ বলে আওয়াজ করতে করতে দৌড়াইয়া জান বাছাইবার চেষ্টা করতাছিলো ৷ মুহূর্তে সাত গেরামের মাইনসের কানে এই আওয়াজ ফইচ্ছা গেলো যে বুন্দের মাঝে গরু ছাগলগর উফরে বাঘে হামলা করছে ৷ গেরামের বউ-বেডিরা ঘরের দরজার খিল দিয়া বাইচ্চা পোলাপাইন কোলে লইয়া একেবারে চুপচাপ অইয়া গেছে ৷

ওইদিকে আমার পরদাদা ও অন্য পালোয়ানরা লাডি-বর্শা লইয়া হাজির ৷ তাগো আতই এহন এই বিরাটাকার বাঘেরে মারার দায়িত্ব ৷ আমার দাদার মুহে হুনছি, পালোয়ানরা ছাইরদিক দিয়া বাঘডারে ঘিরা হগলতে একযোগে ‘মাররররেরর মারর’ কইয়া বর্ষা ইক্কা দিছে ৷ তাগো আত এতই সই আছিলো যে একটা বর্ষাও বাঘের শইল্যে না লাইগ্যা এফি হেফি যায় নাই ৷ মুহূর্তের মইধ্যে এই বুইড়া বাঘ ঠাণ্ডা অইয়া গেছে ৷ এরপর ছাইরদিক থেইকা সাত গেরামের জোয়ান-বুইড়া সব আইয়া জাগুর দিয়া উঠলো ৷ একেকটা পালোয়ানরে ছাইর ফাচজন মিল্লা কান্দে লইয়া সারা বুন্দ ঘুরছে আর জাগুর ফারছে ৷ বাঘডার সারা শইল্যে বারো-তেরোডা বর্শা এক্কেবারে কাডার মতন খাড়া অইয়া বিন্দা রইছে ৷ দেকতে খুব আজব মনে অইছিলো ৷ আমার দাদারা এই তামশা খাড়ায় খাড়ায় দেকছে ৷ দাদায় কইছে, যদি হেই সময়ে ক্যাম্রা থাকত, তাইলে ছবি তুইল্যা রাখতাম যাতে তোরা দেইক্কা বিশ্বাস করতারছ ৷ এরপর থেইকাই মূলত এই বুন্দের নাম ‘বাঘমারা বুন্দ’ অইছে ৷ তবে এই বাঘডায় কোনহান থেইকা আইছে তা আজ্জাও কেউ কইতারে না ৷

মফিজ চাচা বাঘমারা বুন্দের ইতিহাস বলতে বলতে আলমকে নিয়ে বাঘমারা বুন্দে কখন যে নেমে পড়েছেন টেরই পাননি ৷ ইমরোজ পাড়ে সটান দাঁড়িয়েই আছে ৷ তার শহুরে দৃষ্টি বাঘমারা বুন্দের থৈ থৈ স্বচ্ছ পানিতে সুদূরে ভেসে চলেছে ৷ ওদিকে আকাশটাও গুমোট হয়ে এসেছে ৷ কালোমেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশ এখনই বুঝি রাজ্যের বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করবে ৷ গ্রামের মানুষজনের এমনতরো সাদামাটা জীবনের কত গল্প-কবিতা ইমরোজ সোহেল পড়েছে সাহিত্যের পাতায় পাতায় ৷ কতশত উপন্যাসের পটভূমি এই গ্রামীণজীবন ৷ বর্ষা,বৃষ্টি, কাঁদামাটি আর এমন স্বচ্ছ পানিতে গ্রামের বাচ্চাদের দাপাদাপিই তো সাহিত্যের মূল উপাদান ৷ ইমরোজ সাহিত্যের পাতায় এই নির্মল প্রকৃতির জীবনকাহিনি পড়েছে ঠিক, কিন্তু কখনো তাদের প্রকৃতি ও জীবনের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি তার ৷ ইমরোজ সোহেলের মনে হলো, এটাই আসল জীবন ও বেঁচে থাকার প্রাণরস ৷ গ্রামের নিষ্কলঙ্ক আহার্য আর নির্মল বাতাস শহরের কোথায় আছে? শহরে থেকে সে মেঘেভরা আকাশ, রিমঝিম বৃষ্টি আর বিজলিচমক দেখেছে কত ৷ কিন্তু কখনো হৃদয় দিয়ে উপভোগ করা হয়নি এ আনন্দমুখরতা ৷ আজ সে সুযোগ হলো বুঝি ৷

মফিজ চাচা কোঁচ নিয়ে পজিশন অব্যাহত রেখে মাছের ভুস ভুস অনুসরণ করে কতদূর চলে গেছেন ইমরোজ এতক্ষণ তা খেয়ালই করেনি ৷ মফিজ চাচাও আপনমনে মাছশিকারে ব্যস্ত ৷ এই বিকালে সাধারণত গ্রামের মানুষজন তেমন কেউ মাছ ধরতে আসে না ৷ ওরা আসে সকাল সকাল ৷ দলবেঁধে ৷ তখন পুরো বাঘমারা বুন্দে শুধু মানুষের পা আর হাতের কসরত চলে ৷ এই মুহূর্তে মফিজ চাচা, আলম, ইমরোজ সোহেল এবং দূর দুরান্তে দু-চারজন উৎসুক মৎস্যপ্রেমী ছাড়া তেমন কেউ নেই ৷

‘কাকা, নাইম্যা যাও দেহি’! ডাক দিয়ে বললেন মফিজ চাচা ৷ ইমরোজ বোধহয় এতক্ষণ এই ডাকেরই অপেক্ষা করছিলো ৷ ট্রাউজারটা হাল্কা গুটিয়ে ভয়ডরহীনভাবে নেমে পড়লো ইমরোজ ৷ পঁচিশ বছরের জীবনে এই প্রথম ইমরোজ দাদাবাড়ির বিখ্যাত বাঘমারা বুন্দে বর্ষাবিলাস করতে নেমেছে৷ হাঁটুসমান পানিতে নামার সাথে সাথেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো ৷ এ দৃশ্য দেখবার মতো ৷ অন্তত ইমরোজ সোহেলের মতো কংক্রিটের শহরে বসবাসরত যান্ত্রিক মানুষদের জন্য এ এক অনন্য উপভোগ্য মুহূর্ত ৷