“যৌনতা একটা বিরাট সামাজিক শক্তি। …বাঙালি দাম্পত্য আসলে একটা অসুস্থ অবদমনপ্রবণ আধিপত্যমূলক ক্ষমতাকাঠামো। একজন ক্রিয়েটিভ লেখকের প্রধান কাজ একে চ্যালেঞ্জ করা। একে ভিতর থেকে ভেঙেচুরে দেওয়া।” লিখেছেন অর্ণব সাহা। তাঁর ‘বাঙালির যৌনচর্চা: বটতলা থেকে হলুদ বই’ বইটি বাঙালির যৌনভাবনা ও যৌনতা সংক্রান্ত চর্চা নিয়ে এক দীর্ঘ গবেষণার ফসল। সময়কাল উনিশ শতকের শুরু থেকে বিশ শতকের শেষ। অর্থাৎ প্রায় দুশো বছর ধরে বাঙালি জীবন ও যৌনতার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে, তার ধারাবাহিকতা ও রূপান্তর নিয়ে, এই সম্পর্কের ওপর দেশি–বিদেশি প্রভাব নিয়ে, নানা তথ্য ও তত্ত্বের সাহায্যে এই গবেষণামূলক আলোচনাটি চালিয়ে গেছেন লেখক।

অর্ণবের মতে, যৌনতা আমাদের ঐতিহ্য। সমাজে তা বরাবরই ধর্মের সুতোয় বাঁধা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতীয় সাহিত্যে এর ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। পুরাণ পড়লে বোঝা যায়, বহুগামিতা বহুকামিতা সমকামিতা পশুকামিতা— সবরকম যৌনতার কথাই সেখানে আছে। গীতা রামায়ণ মহাভারত কালিদাস কৃত্তিবাসী রামায়ণ বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’ (‘চৌরপঞ্চাশৎ’ জাতীয় কাব্যধারা থেকে নেওয়া) ইত্যাদি থেকে বহু উদাহরণ টেনেছেন অর্ণব। কৌটিল্য নির্দেশ দিয়েছেন, রাজা ইন্দ্রিয় জয় করে, ধর্ম ও অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কামের সেবা করবেন। বাত্সায়নের ‘কামসূত্র’–তে ‘কাম’ এক বিস্তৃত নন্দনতাত্ত্বিক অভিব্যক্তি।

প্রাক–খ্রিস্টীয় যুগ থেকে পনেরো-ষোলো শতক পর্যন্ত লেখা হয়েছে বেশ কিছু ভারতীয় টেক্সট, ‘কাম’ই যার প্রধান বিষয়বস্তু। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, দ্বাদশ শতকে লেখা কোক্ককের ‘রতিরহস্য’, যা সাধারণভাবে ‘কোকশাস্ত্র’ নামে প্রচলিত। এই বইটি অনুসরণ করে ষোলো শতকে কল্যাণমল্ল লেখেন, ‘অনঙ্গরঙ্গ’। কোনও কোনও আলোচক জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’–য় রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলায় কোকশাস্ত্রের প্রভাব আবিষ্কার করেছেন। এই কাব্য রাধাকৃষ্ণের আবেগময় রতিকাহিনির এক ধ্রুপদী নিদর্শন। সতেরো শতকে লেখা দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ (১৬৫৯) কাব্যেও রয়েছে নারী–পুরুষের রতিমিলনের উন্মুক্ত বর্ণনা। সহজযানী বৌদ্ধ ধর্মেও সিদ্ধাচার্যরা দেহকেই সাধনার মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্বে নর-নারীর শরীর এবং দেহমিলনের মধ্য দিয়ে পরমার্থ লাভের ধারণাটি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, সম্ভোগের অভিজ্ঞতা বিনা প্রকৃত ‘রসিক’ হওয়া যায় না। এভাবেই অজস্র উদাহরণ দিয়েছেন অর্ণব।

এর পাশাপাশি যৌনতা, ক্ষমতা ও নৈতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক দেখাতে গিয়ে তিনি বারবার টেনে এনেছেন মিশেল ফুকো এবং তাঁর তিন খণ্ডে লেখা ‘দ্য হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়ালিটি’ বইটিকে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজকে বিশ্লেষণ করে ফুকো দেখিয়েছেন, পেগান এবং প্রাক–খ্রিস্টীয় যুগে বেশ কিছু যৌননিয়ন্ত্রণের ধারণা গড়ে উঠলেও, সেগুলি আধুনিক যুগের থেকে আলাদা এক জটিল নৈতিকতার ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। যৌনসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল একজন সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যক্তির সম্মানিত নাগরিক হয়ে ওঠার অন্যতম শর্ত। ফুকোর মতে, গ্রিকরা মনে করত, খাদ্য ও পানীয়ের প্রতি মানুষের যেমন স্বাভাবিক আসক্তি দেখা যায়, তেমনই যৌনতার প্রতিও মানুষের তীব্র আসক্তি মানবচরিত্রের পশুত্বের দিকটিকেই প্রকট করে। প্লেটো বলেছিলেন, সেই ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান, যে সঠিক সময়ে ও সঠিক পরিমাণে যৌনতা উপভোগ করে। রুসোর গণিকাগমনের প্রসঙ্গও এসেছে। তবে রোলাঁ বার্ত ও সিমোন দ্য বোভয়া-র লেখা নিয়ে কিছু আলোচনা থাকা হয়তো জরুরি ছিল। মারকি দ্য সাদ-এর প্রসঙ্গ এসেছে, জাকোমো ক্যাসানোভার উল্লেখ থাকলে ভাল হত।

লেখকের মতে, উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বুদ্ধিজীবী— মাইকেল, ভূদেব, বঙ্কিম, রঙ্গলাল প্রমুখের যে-সাহিত্য, যাকে বলা যায় হাই লিটারেচারের ধারা, সেখানে যৌনতাকে অবদমনের চেষ্টা শুরু হয়। দেখানো হতে থাকে, স্বামী–স্ত্রীর যৌনতার বাইরে যে-কোনও যৌনতা খারাপ। জাতিগঠনে সেই অতিরিক্ত যৌনতার কোনও প্রয়োজন নেই। ব্রিটিশ সরকার, ব্রিটিশ মিশনারি এবং ভিক্টোরিয়ান মরালিটি, এই ত্রিমুখী প্রভাবে ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির হাতে ১৮৫০ সাল থেকেই একধরনের শুদ্ধতার প্রক্রিয়া চালু হয়। ১৮৫৩–৫৪ সাল থেকেই বাংলা বইয়ের ক্যাটালগিং শুরু করেন পাদরি জেমস লং। ১৮৫৬ সালে তিনি যখন ‘আদিরসাত্মক’ বলে কোনও কোনও বইকে চিহ্নিত করতে শুরু করেন, তখন থেকেই মরাল কোডিং আরোপ করা শুরু হয়ে যায়। ব্রাহ্মরাও ছিল ভিক্টোরিয়ান মরালিটির ভক্ত। অর্ণব লিখেছেন, বঙ্কিম যৌনতার উনিশ শতকীয় জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সটিকেই তাঁর কথাসাহিত্যে এবং তাত্ত্বিক ভাবনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইন্দ্রিয়ের নিষ্পেষণ নয়, আতিশয্যকেই তিনি অধর্ম বলেছেন। ১৮৬০ ও ১৮৭০–এর দশকে মাইকেলের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ সহ লাম্পট্য ও বেশ্যাসক্তি বিরোধী বেশ কয়েকটি নাটক রচিত হয়। ১৮৬৮ সালে ‘চৌদ্দ’ আইন পাশ হলেও অনেকগুলি প্রহসন রচিত হয়। এইসব প্রহসনেও সমকালীন সমাজের বিভিন্ন যৌন আচরণকে আক্রমণ করা হয়েছে।

বিক্রির হিসেব ধরলে দেখা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের বইয়ের চেয়ে বটতলার বইয়ের— কামিনীকুমার বা হেমলতা–রতিকান্তর বিক্রি ছিল অনেক বেশি। গৌতম ভদ্র দেখিয়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্রের ওপরও বটতলার বইয়ের প্রভাব পড়েছিল। ‘আদিরসাত্মক’ বই নামে যখন নতুন ক্যাটাগরি করা হয়, তাতে এক নম্বর ছিল ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’। জেমস লং-এর লেখা থেকে জানা যায়, ১৮৫৭ সালে ‘বিদ্যাসুন্দর’–এর ৩৭৫০ কপি বিক্রি হয়। সেই সময় কেউ কেউ এমনও বলেছিলেন, ‘এটাই আমাদের জাতীয় সাহিত্য। এটাই আমাদের ধারা।’ লেখক জানিয়েছেন, উনিশ শতকের যৌনরুচি তৈরিতে এই টেক্সটের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বটতলার এই ‘আদিরসাত্মক’ বইগুলি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন অর্ণব। এইসব বইয়ের মধ্যে প্রথমেই আছে, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দূতীবিলাস’ (১৮২৫)। এটি ছিল প্রাক–ঔপনিবেশিক যুগের ঢঙে লেখা একটি পদ্য ন্যারেটিভ। বিষয়, কলকাতার এক ধনী যুবকের লাম্পট্য, পরস্ত্রীসম্ভোগ এবং বহুনারীগমনের নানা কেচ্ছা। প্রসঙ্গত, এই ‘আদিরসাত্মক’ বইগুলিতে রাধাকৃষ্ণের গল্প নানাভাবে ঘুরেফিরে এসেছে।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ‘দূতীবিলাস’ জাতীয় দেশীয় প্রেস থেকে ছাপা অসংখ্য বইপত্র ক্রমেই ‘অশ্লীল’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে। দ্বিতীয় যে-বইটি নিয়ে অর্ণব আলোচনা করেছেন সেটি হল, ১৮৪০ সালে প্রকাশিত ‘স্ত্রীজাতির দুরাচরণের কথা’। তৃতীয় বইটি ‘আদিরস’, যার রচনাকার হিসেবে আছে মহাকবি কালিদাসের নাম। লং-এর ক্যাটালগে এই তিনটি বইয়েরই নাম আছে। ৫০৭টি বটতলার টেক্সট নিয়ে জয়ন্ত গোস্বামীর যে সুবৃহৎ গ্রন্থ, ‘প্রহসনে উনবিংশ শতাব্দীর বাঙালির সমাজচিত্র’, তাতে দেখা যায় বেশির ভাগ প্রহসনের বিষয়ই হল অবৈধ সম্পর্ক। ‘সম্বাদ রসরাজ’ পত্রিকায় সেই সময় ছাপা হত কেচ্ছাসাহিত্য, যার প্রধান উপাদানই ছিল যৌন ব্যাভিচার। এই নিয়েও বিশদে আলোচনা করেছেন লেখক। ‘কেচ্ছা’ কথাটি এসেছে ‘কিস্সা’ থেকে, যা আবার একাধারে ‘কাহিনি’ ও ‘কুত্সা’-র মিলিত রূপ। এর পাশাপাশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘খেউড় সংস্কৃতি’। ‘খেউড়’ বলতে বোঝাত চটুল আদিরসাত্মক ছড়া বা গান। উনিশ শতকের গোড়া থেকেই কলকাতায় ইংরেজি ও ফরাসি পর্নোগ্রাফিক বইয়ের বাজার তৈরি হয়েছিল। জেমস লং ছোটলাটের কাছে পাঠানো চিঠিতে অভিযোগ জানান, কলকাতার রাস্তায় প্রকাশ্যে দেশি–বিদেশি পর্নোপুস্তক ও অশ্লীল ছবির কারবার চলছে রমরমিয়ে।

১৮৫৬ সালের ২১ জানুয়ারি জারি হয় ‘অশ্লীলতা আইন’। এই আইন মোতাবেক আদিরসাত্মক বইপত্রের লেখক–প্রকাশক–বিক্রেতাদের অল্পবিস্তর ধরপাকড়ও শুরু হয়। দেশীয় ভদ্রলোকের বটতলার সাহিত্যবিরোধী অভিযান চলতে থাকে। তথাকথিত বটতলার বই বাংলা ভাষার কথ্য, আঁকাড়া মেজাজটিকে তুলে ধরছিল, যে-ভাষায় দৈনন্দিন জীবনে মানুষ কথা বলে। ছোট–বড় ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত সস্তা, চটি বইগুলির হাজার হাজার কপি পৌঁছে যেত শহর–মফস্সলের পাঠকদের কাছে, যা দেশীয় উচ্চবর্গীয়, তথাকথিত ‘শিষ্ট’ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকদের কাছে ক্রমেই বিপজ্জনক বলে মনে হচ্ছিল। মৌখিক সংস্কৃতির আধারে যা দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশিত হয়েছে, সেই আরবি–ফারসি কিস্সা সাহিত্য হিন্দু কামশাস্ত্র দেবদেবীর উপাখ্যান ভারতচন্দ্র, এই সবকিছুই নতুন মোড়কে হাজির হল বৃহত্তর পাঠকের সামনে। স্কুল-কলেজের ছাত্রেরা, বাঙালি মেয়েদের অন্দরমহলে এই ধরনের বইপত্রের চাহিদা ছিল বিপুল। উনিশ শতকে বাংলায় প্রথম যে-সেক্স ম্যানুয়ালটি লেখা হয়, সেটি অন্নদাচরণ খাস্তগীরের লেখা, ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত।

অর্ণব লিখেছেন, উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতার বাবুরা যে-ভাষায় কথা বলত, মেয়েরা যে-ভাষায় কথা বলত, সেই ভাষায় এমন অনেক শব্দ ছিল, যেগুলো আজকের মাপকাঠিতে দেখলে মনে হবে অশ্লীল। স্বামী বিবেকানন্দের অনেক লেখায় ‘মাগি’ শব্দটা আছে। ১৮৯৮ সালের একটি লেখায় তিনি লিখেছেন, ‘জাহাজের পাছা’। সে যুগের বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রাধামাধব কর একটি সাক্ষাত্কারে বলেছেন, এই যে নব্য পিউরিটানিজ়ম এসেছে, এর সঙ্গে আমি একমত নই। অমৃতলাল বসু বটতলার সাহিত্যের পক্ষে সওয়াল করেছেন। বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর আত্মকথায় লেখেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরে সস্তা রোমান্সধর্মী বই পড়তেই তিনি বেশি ভালবাসতেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘স্মৃতিকথা’-য়, রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’, লালবিহারী দে-র লেখায়, নবীনচন্দ্র সেনের ‘আত্মজীবনী’–তে এই ধরনের বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখা যায়।

যৌনতা নিছক বিষয় হিসেবে আসেনি, একটি ‘ডিসকোর্স’ বা ‘সন্দর্ভ’ হিসেবে কীভাবে গড়ে উঠেছে, তাকেই দেখানো হয়েছে এই বইয়ে। লেখকের ভাষায়, ইউরোপে “সতেরো শতকের পর থেকে যৌন আকাঙ্খাকে ডিসকোর্সে পরিণত করার প্রক্রিয়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছেই হয়ে দাঁড়াল বাধ্যতামূলক।” ফুকো কীভাবে ‘সেক্স’ এবং ‘সেক্সুয়ালিটি’-র মধ্যে তফাত করেছেন এবং দেখিয়েছেন দুটো দু’ধরনের ঐতিহাসিক নির্মাণ, তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এর পরই তিনি ফিরে এসেছেন দেশীয় প্রেক্ষিতে এবং ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতায় যৌনতার প্রভাব ও ভূমিকাকে বুঝতে চেয়েছেন। লেখকের মতে, উনিশ শতকীয় ইংরেজি শিক্ষিত এলিট মননে দেশজ সমাজের যৌন রুচি ও যৌন অভ্যাস এক চূড়ান্ত অশ্লীলতার পরাকাষ্ঠা হিসেবে বিবেচিত হত। শিক্ষিত ভদ্রলোক পরিবারে যৌনতা এবং শরীর সংক্রান্ত যে-কোনও উচ্চারণই এক আরোপিত নৈঃশব্দ্যের আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু পাশ্চাত্য প্রভাবিত যৌনতার ডিসকোর্সের পাশাপাশি দেশজ সমাজের সম্পূর্ণ নিজস্ব যুক্তিকাঠামো ও জ্ঞানভাণ্ডারও সক্রিয় ছিল। এখানে যৌনতাকে খ্রিস্টীয় অর্থে ‘পাপ’ বা শরীরকে ‘পাপের আধার’ হিসেবে না-দেখে জীবনের প্রয়োজনীয় উপভোগের উপাদান হিসেবেই ভাবা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি বই নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন অর্ণব। তাঁর আলোচনায় এসেছে ১৮৬৮ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সদ্ভাবশতক’–এর কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের আত্মকথা। হৈমবতী সেন তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, মাত্র দশ বছর বয়সে পঁয়তাল্লিশ বছরের স্বামীর শয্যাসঙ্গিনী হতে বাধ্য হন তিনি। যৌন উদ্দীপনা নয়, বরং যৌন ভীতি, বিরক্তি, লজ্জা ও তীব্র অনিচ্ছাই তাঁর প্রথম যৌন অভিজ্ঞতার প্রাপ্তি। স্বামী জোর করে সম্ভোগ করতে চান তাঁর সঙ্গে। এমনকী, এক রাতে অকস্মাৎ ঘুম ভেঙে গেলে স্বামীকে এক গণিকা রমণীর সঙ্গে সম্ভোগরত অবস্থায় দেখতে পান তিনি। পাশাপাশি, লেখকের মতে, উনিশ শতকীয় পরিসরে ব্যক্তি–দাম্পত্য–পরিবারকে কেন্দ্র করে যে-যৌন নৈতিকতা বিকশিত হচ্ছিল, সেখানে পুরুষতান্ত্রিক ‘ক্ষমতা’ নিজের প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিল নারীকে। অসংখ্য পুস্তিকা, নাটক, প্রহসন লেখা হয়েছে নারীর ব্যাভিচারকে কেন্দ্র করে। যৌন নৈতিকতার উপাদানগুলি কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল নারীর এক কাম্য নৈতিক মানকে আশ্রয় করে।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রকাশিত হয় দু’টি আত্মকথাধর্মী বই। প্রথম বইটি মানদা দেবীর লেখা ‘শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত’। জবাবি আত্মকথনটি হল রমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘রমেশদার আত্মকথা’। দু’টি বইতেই রয়েছে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত দুই নারী–পুরুষের প্রবৃত্তির অপ্রতিরোধ্য অনলে আত্মাহুতি দিয়ে সমাজচ্যুত হয়ে যাওয়ার ইতিহাস। হেমেন্দ্রকুমার রায় ১৯২৩ সালে ‘মেঘনাদ গুপ্ত’ ছদ্মনামে লেখেন একটি বই, ‘রাতের কলকাতা’। বিশ শতকের গোড়ায় কলকাতার নাইট লাইফ এবং আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের বর্ণনা পাওয়া যায় এই বইয়ে। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় আবুল হাসানাৎ প্রণীত ‘সচিত্র যৌনবিজ্ঞান’। কালিদাস মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘যৌনক্ষুধা ও নারীর সতীত্ব’ (১৯৩৯) বইয়ের ভূমিকায় অদ্বৈত মল্লবর্মণ লেখেন, কিছুদিন আগেও নরনারীর পারস্পরিক যৌনসম্পর্ক নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবার রেওয়াজ ছিল না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে সেই ‘ট্যাবু’ ভাঙছে। নরনারীর পারস্পরিক সম্পর্কের মূল সূত্রটি নিহিত রয়েছে যৌনতার ভিতরেই, ফ্রয়েড ও তাঁর উত্তরসূরি অ্যাডলার ও ইয়ুং ছাড়া এই ব্যাখ্যা বিশেষভাবে উপস্থাপিত করলেন হ্যাভলক এলিস। তাঁর ছয় খণ্ডে সম্পূর্ণ ‘স্টাডিজ় ইন দ্য সাইকোলজি অফ সেক্স’ নামের মহাগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে বসুমতী সাহিত্য মন্দির। প্রসঙ্গত, ১৯৩৯ সালেই প্রকাশিত হয় অবিনাশচন্দ্র ঘোষালের ‘নগ্নতার ইতিহাস’, যার বিষয় ছিল ‘নগ্নতার সংস্কৃতি’।

শরীর–যৌনতা সংক্রান্ত রক্ষণশীল আধিপত্যের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’ পত্রিকাগোষ্ঠী। বিশেষ করে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন অর্ণব, যেখানে রয়েছে এমন মন্তব্য, “মানুষের যতো কিছু বৃহত্তর উপলব্ধি সব এই সেক্স–এর সাহায্যেই ঘটছে। ধরো প্রেম, প্রেম তো সেক্স ছাড়া কিছুই নয়।” ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর লেখালেখিকে সেদিন তাত্ত্বিক সমর্থন জানান ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। অর্ণব উল্লেখ করেননি, কিন্তু বেশ্যালয়ের জীবন নিয়ে লেখা রমেশচন্দ্র সেনের ‘কাজল’ উপন্যাসটির উল্লেখ হয়তো এ প্রসঙ্গে জরুরি ছিল। এই বইটিকে অনেকেই রুশ লেখক আলেকসান্দার কুপরিন-এর মহান উপন্যাস ‘Yama: The Pit’–এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসতে পারত জগদীশ গুপ্তের কথাও। পরবর্তীকালের লেখকদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন সমরেশ বসুর ‘বিবর’, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘ডায়েরি’ এবং প্রকাশ কর্মকার ও কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের লেখা দু’টি বিস্ফোরক আত্মকথা, যেখানে রয়েছে বিচিত্র, অবৈধ যৌনসম্ভোগের খোলাখুলি বিবরণ। অর্ণবের মতে, যে-আত্মজীবনী বাঙালি সরাসরি উচ্চারণে লিখে যেতে পারেনি, তার সেই যাবতীয় না-বলতে পারা কথা সে লিখে গেছে সাহিত্যে। নিজেকে ফিকশনালাইজ় করেছে সে। উদয়ন ঘোষ, সুবিমল মিশ্র বা কমল চক্রবর্তীর মতো কারও কারও কাজের উল্লেখ থাকলে হয়তো এই আলোচনা আরও প্রাসঙ্গিক হত।

পাঠকরুচির তাগিদেই ষাট–সত্তর দশকে বাজারে আসতে শুরু করে ‘জীবনযৌবন’, ‘রূপোলি প্রজাপতি’, ‘দেহমন’, ‘তনুমন’ জাতীয় অজস্র পত্রপত্রিকা, বাংলা পর্নোগ্রাফি, যাকে ‘হলুদ বই’ বা ‘বাংলা পানু’ বলা যায়। লেখকের ভাষায়, “পর্নোগ্রাফি, আদতে ব্যক্তিমনের অবদমিত বাসনা, অবরুদ্ধ অবসেশন ও যৌনকল্পনার বাধাবন্ধহীন রিপ্রেজেন্টেশন।” অর্ণবের মতে, “বিশ্বায়নের ফলে ইন্টারনেটের ব্যবহার আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ল। এসে পড়ল হাজার হাজার পর্নসাইট। বাংলা পর্নোগ্রাফির বাজার শেষ হয়ে গেল। কারণ, পড়ার বদলে সে চোখের সামনে রঙিন, জ্যান্ত যৌনতা দেখতে পাচ্ছে। বাংলা পানু আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল। ইন্টারনেটে যৌনতার এক নতুন বাণিজ্যিক চেহারা তৈরি হল। এবং তা উত্তুঙ্গ চাহিদায় বদলে গেল।” অর্ণব আরও বলেছেন, “উন্নত পৃথিবীতে ক্রমশই দাম্পত্য তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। বরং বড়ো হয়ে উঠছে নারীপুরুষের মুক্ত, পারস্পরিক সম্মানবোধের সম্পর্ক। যৌনতার সবচেয়ে বড়ো দিক হল উপভোগ বা প্লেজ়ার, যা বাঙালি দম্পতিরা আজও কল্পনাই করতে পারে না।”

সব মিলিয়ে, এই বই যৌনতা নিয়ে এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, যা বাঙালি পাঠকের কাছে ছিল অনালোচিত এবং যেগুলি জানা জরুরি। সংখ্যালঘু, শিষ্ট সংস্কৃতির প্রতাপে বৃহত্তর জনসাধারণের জীবনে মিশে থাকা যৌনতার দেশজ অভ্যাস ও আচরণগুলি অবদমিত হয়ে আসছিল। কিন্তু এগুলি না-জানলে আমাদের জাতীয় জীবনকে কোনওদিনই পুরোপুরি বোঝা যাবে না। অর্ণব সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকেই তুলে ধরেছেন। তিনি সেই ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন, যা হয়ে উঠেছিল শিষ্ট সংস্কৃতির আধিপত্য এবং যৌনাচরণের স্বতস্ফূর্ত অভিব্যক্তির নিরন্তর সংঘাতভূমি, আবার যে-অভিব্যক্তির ভিতরেও চলেছে নিষেধ ও স্বাধীনতার, আত্মসমর্পণ ও অস্বীকারের ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব।