‘আমি কঙ্কালের ব্যবসায়ী। পুরাতন পুথি কঙ্কালের মতো। কিন্তু আমি তার ভেতর যুগ যুগান্তের রক্ত- ধমনী ও নিঃশ্বাসের প্রবাহ ধ্বনি শুনিয়াছি। আমার বিশ্বাস, সে যুগের শিল্প স্রষ্টাদের পক্ষে যা সত্য ছিল, আজ তার বিশেষ ব্যতিক্রম ঘটে নাই।’ পুথি ও সাহিত্য জীবন নিয়ে এমনই চিন্তা ছিল আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের। সাহিত্যবিশারদ নিজেকে কঙ্কালের ব্যবসায়ী বলতেন কারণ তিনি এই কঙ্কালের মাঝেই বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসকে খুঁজার চেষ্টা করেছেন, খুঁজেছেন বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। তিনি বলতেন, ‘যে জাতির ঐতিহ্য নেই- তার কিছুই নেই।’

সাহিত্যবিশারদ বাঙালার প্রাচীন ঐতিহ্যের সংগ্রাহক ছিলেন কিন্তু তিনি প্রাচীনপন্থি ছিলেন কনা। ড. আহমদ শরীফ এ সর্ম্পকে বলেন, ‘তাঁর (সাহিত্যবিশারদ) মনের দর্শনে ছিল বাংলার ও বাঙালীর মধ্যযুগের সমাজচিত্র, চোখের সামনে ছিল বাস্তব বর্তমান আর কল্পনায় ছিল ভবিষৎ।’ সাহিত্যবিশারদ মনে করতেন ঐতিহ্য হল মাটির মতন। মাটির উপর ভিত্তি করে যেমন অপূর্ব সুন্দর তাজমহল নির্মিত হয়েছে, তেমনি ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে ভবিষৎ নির্মিত হবে। ‘সংস্কৃতির জন্মপ্রেরণা যেখান হইতেই আসুক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রয়াস পরিবেশ নিরপেক্ষ নহে। এই পরিবেশের প্রধান উপাদান ঐতিহ্য। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার অর্থ ভিত্তিকে অস্বীকার করা।’ তাই বলে তিনি ঐতিহ্যের সবকিছুকে গ্রহনের কথা বলেননি। তিনি মনে করতেন ঐতিহ্যে যা কিছু ভালো তা গ্রহন করতে হবে। আর যা কিছু নিন্দনীয় তা বর্জনের মাধ্যমে নতুন জীবনাদর্শের সৃষ্টি হবে। ঐতিহ্যের শক্তিকে অস্বীকারের কোন উপায় নাই। আবার স্বীকার করে বসে থাকলেও চলবে না। যদি তা ই হয় তবে তা গতানুকগতিক বলে সাহিত্যবিশারদ মনে করতেন। এতে শিল্প সংস্কৃতির মৃত্যু হয়। ঐতিহ্য স্বীকার করে তার প্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষেই ছিলেন তিনি।

তৎকালীন সময় বাংলার মুসলমানরা যখন নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা নিয়ে দ্বিধান্বিত, তখন সাহিত্যবিশারদ বাংলার মুসলমানদের পথ দেখালেন। বাংলার হিন্দুরা যখন সাহিত্য সৃষ্টি নিয়ে বিশ্বজয়ের রথে, তখনে সেই সমাজেরই আরেকটি অংশ অর্থাৎ মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্থ। ফলে যে জাগরণ তৎকালীন সময়ে হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল তা প্রকৃত অর্থে সমাজে আসেনি। মুসলমানরা সেই জাগরণে জাগরিত হতে পারেনি। তাই সাহিত্যবিশারদ হেঁটেছেন ঐতিহ্যের পথে। সাহিত্য সংস্কৃতিতে পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজের কাছে পাঠযোগ্য তাদের কোন রচনা বা গ্রন্থ ছিল না। এই হীনমান্যতা থেকেই সাহিত্যবিশারদ বাংলার ঐতিহ্য সন্ধানে আগ্রহী হয়ে উঠেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘অভিভাষণ সমগ্র’ গ্রন্থের সম্পাদকীয়তে তাঁর সর্ম্পকে বলা হয়েছে ‘বাঙালির ঐতিহ্য সন্ধান করতে করতে নিজেকে তিনি পরিগণিত করেছিলেন বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে।’ পাকিস্থান সৃষ্টির পর যখন শাসকগোষ্ঠি বাঙালির উপর তাদের সংস্কৃতি জোড় করে ছাপিয়ে দিতে চাইছিল, তখনও সাহিত্যবিশারদ এগিয়ে এলেন বাঙালির ঐতিহ্য রক্ষায়। এক সাংস্কৃতিক সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘ঐতিহ্যহীন কোন কিছু গড়িতে গেলে আপনারা ভুল করিবেন। সাধনা পণ্ডশ্রম হইবে মাত্র। অথবা জাতীয় বিকাশের পথ রুদ্ধ করিয়া দিবে। এই কথা আমি বার বার স্মরণ করাইয়া দিতে চাই। মনে রাখিবেন, ঐতিহ্য হইতে দূরে সরিয়া যাওয়ার অর্থ জীবন হইতে দূরে সরিয়া যাওয়া, জীবন হইতে দূরে সরিয়া যাওয়ার অর্থ- পাঠশালার বালকও জানে মৃত্যু।’ এই মৃত্যু পুরো সমাজের মৃত্যু।

মৃতপ্রায় মুসলমান সমাজকে তিনি দেখিয়েছেন আলোর দিশা। ফ্রান্সিস শাঁপেলিয়োঁ যেমন হায়ারোগ্লিফিক লিপির পাঠ নির্ণয় করে প্রায় চার হাজার বছর ব্যাপী মিশরীয় সভ্যতার ইতিহাসের দ্বার খুলে দেন। তেমনি সাহিত্যবিশারদ পুথি সংগ্রহের মাধ্যমে মধ্যযুগের ছাপা পড়া অজানা একা ইতিহাসের দ্বার খুলে দেন। মুসলমানদের লুপ্ত প্রায় সাহিত্যকর্ম আবিষ্কার করে বাংলার প্রকৃত রেনেসাঁকে তরান্বিত করেন। তাঁর পূর্বে অনেকেই পুথি সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু সাহিত্যবিশারদের মত এমন উধার মানসিকতা নিয়ে কেউ পুথি সংগ্রহ করেছেন কিনা জানা যায় না। প্রাচীন সাহিত্য ও ঐতিহ্য চেতনার এবং গবেষণার স্বাক্ষর তাঁর সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থসমূহ।

দেশের ইতিহাস ভালোভাবে জানা অতি দরকার বলে তিনি বলেছিলেন এক অভিভাষণে, ‘ঐতিহ্যের প্রেম সাংস্কৃতিক সাধনার আসল সোপান। -ভুলিয়া যাইবেন না, অতীত আমাদের পথ প্রদর্শন করে। সেই আলোকে আমাদের বর্তমান নিয়ন্ত্রিত হইতে পারে। এই জন্য ঐতিহ্যের কথা বার বার স্মরণ রাখা দরকার।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি ধ্রুব নক্ষত্র বিশেষ। ঐতিহ্যের অনুসরণ ও সেই স্রোতধারাকে চিরবহমান করিয়া তোলাই সংস্কৃতিসেবীর আসল কাজ।’ ঐতিহ্যের সাথে দেশের মাটি, গাছ, ফুল, নদী, আচার- আচরণ, জলবায়ুর সম্পর্ক আছে। তাঁর ঐতিহ্য চেতনায় অতীতের প্রতি প্রেম আছে কিন্তু মোহ নাই। তিনি অতীতের সাথে ভবিষৎতের যোগসূ্ত্র স্থাপন করেছেন।

এদেশের মুসলমান যখন বাংলা ভাষাকে তাদের সংস্কৃতির ভাষা নয় বলে প্রত্যাখান করতে চাইল, তখন তিনি আঙ্গুল দিয়ে আমাদের ঐতিহ্যের পথে মুসলমানদের দেখিয়ে দিলেন তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভাষা এই বাংলায়। বাংলা সংস্কৃতি ধ্বংসের যে চেষ্টা চলছিল, তিনি তা প্রতিহত করার জন্যে তরুণদের এগিয়ে আসার জন্য আহবান জানান। দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষতের ছবি চোখের সামনে থাকলে মানুষের মাঝে জীবনবোধ জাগ্রত হয়। আর জাগ্রহ করার একমাত্র পথ দেশের ও মানুষের ইতিহাস জানা। এই ইতিহাসের সাথে দেশের ঐতিহ্যের গভীর সংযোগ।

হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘ঐতিহ্য বিভেদের চামুণ্ডা নয়। …ঐতিহ্যের সাথে যাদের সর্ম্পক নাই তিনি তাদেরকে সমাজের পরজীবী বলতেন। এমন পরজীবী লোক পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়। তাই এমন লোকদের উপদেশ গ্রহন থেকে বিরত থাকা উচিত।
‘আরকান রাজ সভায় বাঙালা সাহিত্য’ বইটি পাঠে স্পষ্টই হবে তখন বাংলা ভাষা আলাদা কোন ধর্ম বা গোষ্ঠির এমন কোন সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন ছিল না। তাই যখন মুসলমানরা বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য একটি ভাষা আমদানি করতে চাইল, তখন সাহিত্যবিশারদ এর বিরোধিতা করেন। তিনি নানা জায়গায় বিভিন্ন সভা সম্মেলনে মুসলমানদের বুঝাতে চাইলেন এই বাংলা ভাষাতেই বাংলার মুসলমানদের উন্নতি নিহিত। ১৯১৮ সালে ‘আল এসলাম’ এ প্রকাশিত এক অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালার মুসলমানগণের পৈত্রিক জন্মভূমি যেখানেই হউক না কেন, বাঙ্গালায় পর্দাপন করিয়া অবধি তাঁহারা খাঁটি বাঙালীই হইয়া গিয়াছেন। একথা বোধ হয় কোন শত্রুও অস্বীকার করিতে পারে না। সুতারাং স্বাভাবিক নিয়মেই বটে, বাঙ্গালা দেশের প্রচলিত বাঙ্গালা ভাষাও তাঁহাদের মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষার স্থানাধিকার করিয়া এত যুগ যুগান্তর পর্যন্ত নির্ব্বিবাদে চলিয়া আসিতেছে।…

চিরকাল মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষা বলিয়া স্বীকৃত ও গৃহিত দেশভাষার স্থলে নূতন ভাষার আমদানী হইলে তাহা পরিণামে সমাজের পক্ষে কেবল মারাত্মক হইবে মাত্র। তাহাতে সমাজের উন্নতি হওয়া দূরে থাকুক, জীবনী শক্তি হারাইয়া উহা বরং একেবারে অচল ও পঙ্গু হইয়া পড়িবে।’ তাঁর কাছে দেশের ঐতিহ্যই ছিল বড়। আর তাই তো তিনি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার পুথি সমান গুরুত্ব ও ভালোবাসা দিয়ে সংগ্রহ করেছেন। তিনি মুসলমানদের জাগাতে চেয়েছেন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পথ বেয়ে আধুনিকতার দিকে। কিন্তু তাই বলে তাঁর মাঝে সাম্প্রদায়িক কোন ভেদ বিভেদ ছিল না। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সকল ধর্ম ও জাতির যৌথ সম্পদ বলে মনে করতেন। হিন্দু মুসলমানদের ঐক্যের উপর তিনি জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু মুসলমানের ধর্ম, আদর্শ ও ঐতিহ্য ভিন্ন হইতে পারে। তাহাদের সৃষ্ট সাহিত্য ও স্ব স্ব ধর্ম্ম, আদর্শ ও ঐতিহ্য অন্যরূপ হইতে পারে। কিন্তু পদ্ম শেফালিকার পার্শ্বে, গুলাব নাগির্স হাস্নাহেনার বাগান গড়িয়া উঠিলে শোভা দ্বিগুন বদ্ধির্ত হইবে বই কমিবে না।…হিন্দু মুসলমান ও পাশ্চাত্য ভাবধারা মিলিয়া বঙ্গ সাহিত্যের ভাবের ত্রিবেণী সঙ্গম সৃষ্টি হইবে।’

সাহিত্যবিশারদ সারাজীবন প্রায় আড়াই হাজারের অধিক পুথি সংগ্রহ করেছেন। তাঁর এই পুথি সংগ্রহের বিজ্ঞাপন চট্টগ্রামের ‘জ্যোতি:’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এ বিজ্ঞাপনের কারণে তাঁকে চাকুরিচ্যুত হতে হয়। এভাবে চাকরি হারিয়ে তিনি আশাহত হননি। বরং আরো দ্বিগুণ আগ্রহ নিয়ে পুথি সংগ্রহে অগ্রসর হন। তাঁর এ আগ্রহ জন্মানোর কারণ হিসেবে ১৯৪৫ সালে তাঁর জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘হিন্দু পুস্তক পত্রিকা পাঠ করিতে করিতে একটা প্রশ্ন আমার মনে আন্দোলিত হইত যে, আধুনিক কালের মত প্রাচীন কালেও কি মুসলমানদের কোন সাহিত্য ছিল না? ঘটনা স্রোতের আবর্ত্তনে আমার জীবনে একটা পরিবর্তন আসিয়া পড়ে।’ তিনি জীবনের প্রতিটাক্ষণ ব্যয় করেছেন এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ করে। প্রাচীন ঐতিহ্যের পূণরুজ্জীবন দিয়েই মুসলমানদের জাগানো সম্ভব’ একথা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন। তাই তো বাঙালী মুসলমানের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্ণয়ে, তার স্বরূপ অনুসন্ধান ও আবিষ্কারেই তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল আলাওলের ‘পদ্মাবতী’র পুথি। ড. এনামুল হক বলেন, ‘আবদুল করিম যখন বৃদ্ধ বয়সে এ কাহিনী বলতেন, তখন তাঁর দন্তহীন মুখে যে হাসি ফুটে উঠতো, তা দেঁতো হাসিকেও মাৎ করে দিতে দেখেছি। ‘পদ্মাবতী’র আবিষ্কারের মাধ্যমে মুসলমানরা জানতে পেরেছে, বাংলার প্রাচীন সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তারা এতীম নয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁদেরও অবদান আছে। এ অবদান কারো চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁরা শ্রেষ্ঠ।

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ বাহার সাহিত্যবিশারদকে বাঙালা সাহিত্যের ভাণ্ডারী বলে উল্লেখ করেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঐতিহ্য পাঠে অবশ্যই বার বার ফিরে যেতে হবে সাহিত্যবিশারদের কাছে।

ড. নীলিমা ইব্রাহিম এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বঙ্গীয় মুসলমানের এই প্রাচীন এতিহ্য ও সংস্কৃতির রূপায়ণকেই সমস্ত জীবন ভরে সাহিত্যবিশারদ অন্বেষণ করে গেছেন।’ তিনি এই ঐতিহ্যের খোঁজ করতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্য, পরিবার, অর্থ সব অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। বিলুপ্ত এই জাতীয় সম্পদ উদ্ধারের জন্য তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিখারির মত ঘুরেছেন। আর তাতে তিনি কত অপমাণ হয়েছেন তা আজ কারো অজানা নয়। ড. নীলিমা ইব্রাহিম আরো লিখেন, ‘তিনি দেশকে ভালোবেসে ভাল বেসেছিলেন তার সাহিত্য ও অতীত ঐতিহ্যকে।’

‘বাংলা ভাষা হিন্দুর ভাষা’ বলা সেই সব বিদ্বান ও বিত্তবান মুসলমানদের কাছে তিনি বার বার প্রশ্ন করেছেন তাদের হারানো অতীত জানতে তারা আগ্রহী কিনা? বাংলায় মুসলমানদের মান রক্ষা করতে হলে মহাকবি আলাওলের মতো আত্মহুতি দিতে হবে।

ছাদেক আলীর সেই পুথি যেখানে রামচন্দ্রের ‘বারমাস’ এর দুঃখ বণর্না হয়েছে তা আজ আমরা দেখে অবাক হই, কারণ সেই মধ্যযুগে একজন মুসলমান কতটা দরদ দিয়ে এমন পুথি রচনা করেছেন। আর তা আমাদের সামনে নিয়ে আসেন সাহিত্যবিশারদই। চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে সাহিতবিশারদ রচনা করেন ‘ইসলামাবাদ’ বইটি। এটি তাঁর মৌলিক রচনা। এই বইটিতে তিনি চট্টগ্রামের পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্ঠি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। করেছেন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। এ বইটি পড়লে বুঝা যায় তিনি কতটা ঐতিহ্যের ধারক বাহক ছিলেন।

সুদীর্ঘ জীবনের প্রায় সবটায় তিনি ব্যয় করেন বাংলার প্রাচীন পুথির মাঝে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের খোঁজে। আর তাই তিনি কোন মৌলিক গ্রন্থ রচনার সুযোগ পাননি। তবে তিনি তাঁর পুথিগুলো নিয়ে, মধ্যযুগের জীবন, ঐতিহ্য ও তৎকালীন সমাজ, রাজনীতি নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। সংখ্যায় যেটা ছয়শতাধিক। এই জ্ঞানীর জ্ঞান গরিমায় মুগ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম ধর্মমণ্ডলী তাঁকে ‘সাহিত্যবিশারদ’ ও নদীয়ার পণ্ডিত সমাজ তাঁকে ‘সাহিত্যসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৮৭১ সালের ১০ অক্টোবর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে জন্ম নেয়া এই মনীষির সারাটা জীবন এক মোহের মাঝে থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। ঐতিহ্যকে ধারণ করে ভবিষৎ নির্মাণের কথা বলেছেন বার বার। বলেছেন নিজের পূর্ব পুরুষদের জানার কথা। তাই তো নিজের ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলনে তিনি ছিলেন সবার অগ্রণী। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ অবধি এই ঐতিহ্যকেই তিনি বুকে আগলে রেখেছেন। ১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি লিখছিলেন চট্টগ্রামের ইতিহাস। এমন অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান। জ্ঞানীদের তো এমন মৃত্যুই কাম্য।

মৃত্যুর এত বছর পরও বাংলা ও বাঙ্গালির ঐতিহ্যের প্রশ্ন আসলেই আমাদের সামনে চলে আসে সাহিত্যবিশারদের নাম। আমরা বুঝতে পারি কী এক অমূল্য সম্পদ সাহিত্যবিশারদ সংগ্রহ করেছেন আমাদের জন্য! তাঁর হাতেই আলোকিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়ের। বাংলার ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে তিনি যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন প্রতিটি ঐতিহ্যপ্রেমীর মনে।