“টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন। একাত্তরের চিঠি। যুদ্ধরত বাবা চিঠি লিখেছে তার অনাগত সন্তানের কাছে; সেই অনাগত সন্তান আজ বড়ো হয়েছে। স্কুল টিচার। ছাত্রদের তিনি তাঁর অদেখা বাবার চিঠি পড়ে শোনাচ্ছেন।” টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনটি হৃদয় ছুঁয়ে যায় সুরিকার।
‘একাত্তরের চিঠি’ নামে বই হবে। একাত্তরে যারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ করেছিলেন এবং সেই যুদ্ধের ফাঁকে যারা চিঠি লিখেছেন তাঁদের বাবা-মা-স্ত্রী- সন্তানের কাছে সেই চিঠি নিয়ে বই হবে। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছে সবার কাছে চিঠি আহ্বান করা হয়েছে। মনযোগ দিয়ে বিজ্ঞাপন দেখছে সুরিকা। পত্রিকাতেও ‘একাত্তরের চিঠির’ এই বিজ্ঞাপন দেখেছে কিন্তু নজর কাড়েনি। এখন যতোটা ভালো লাগছে ততোটা ভালো লাগেনি তখন।

একাত্তরে ওর বয়স ১ বছরও পূর্ণ হয়নি। ওর বাবা মারা গেছে একাত্তরে। মারা যাওয়ার আগে ওর নামে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন। মা সেটি যত্নে রেখেছিলেন। ওর এস.এস.সি পরীক্ষার শেষদিন ওর মা চিঠি বের করে বলেছিলেন, পড়ো। আরও বলেছিলেন বাবার চিঠি যত্নে রেখো। এটা তোমার সম্পদ। এতোদিন আমার হেফাজতে রেখেছিলাম। এখন বড়ো হয়েছ তোমার সম্পদ তোমাকে দিলাম।

মা আরও বলেছিলেন, জেনে রেখো এই চিঠি যতো ছোটোই হোক হারিয়ে গেলে আর পাবে না। এই চিঠিতে তোমার বাবার যত্ন, আকাক্সক্ষা, ইচ্ছা, বাবার ছোটো ছোটো অনুভূতি যা তোমার জন্মের আগে তোমাকে ঘিরে একটি চারাগাছের মতো ডালপালা মেলেছিল সব এই অক্ষরগুলির সঙ্গে মাখানো আছে। এতে আছে তোমাকে নিজের মতো করে বড়ো করতে না পারার কষ্ট, বুকে না রাখতে পারার ব্যথা, তোমার ছোটো ছোটো আব্দার না শুনতে পারার অথৈ বেদনা, আছে সন্তানকে ঘিরে লালিত এক বাবার মধুর স্বপ্ন। এতে আছে তোমার বাবার হৃদয়ের পরশ, আদর। এটাই তোমার বাবার সর্বাংশ।

সুরিকা দেখেছে মা খুব যত্নে রেখেছেন চিঠিটা। ঠিক হলুদ নয় অনেকটা মাখনের যে হলুদ রঙ, সেই রকম হলুদ নরম একটি কাতান কাপড়ের রূমালে ন্যাপথলিনে জড়িয়ে রেখেছেন চিঠিটি। হয়তো বা এটি মায়ের বিয়ের শাড়ির সঙ্গেকার রূমাল! সুরিকা মায়ের বিয়ের শাড়ি দেখেনি তবে জেনেছে এই রঙেরই ছিল মায়ের বিয়ের শাড়ি। মা, লাল রঙ পছন্দ করেন না, তাই বাবা এই রঙের বিয়ের কাতান কিনেছিলেন। সুরিকা শুনেছে ওর মা বিয়ের সময় অন্য রকম সেজেছিলেন। ঘন চুলে খোপা নয় লম্বা একটা বেণী করেছিলেন। বাবার খোপা পছন্দ ছিল না, তাই বেণী করেছিলেন মা। সাদা রঙের টিপ দিয়েছিলেন বড়ো করে। মুখে আর কোন কারুকাজ ছিল না। কোন সোনার গহনা নয়, ফুলের গহনা ছিল মায়ের সর্বাঙ্গে। বাবার বেলী পছন্দ, মায়ের গাঁদা। বেলী ছিল মায়ের লম্বা বেণীতে,গাঁদ্ াছিল হাতে,গলায়,কপালে। কোমরে বিছাও ছিল গাঁদা-বেলীতে মিলিয়ে!

সুরিকার বাবার কথা মনে নেই। মনে নেই বাবা কোলে নিতো কিনা ওকে । পাপ্পি দিতো কিনা। কোলে নিয়ে বেড়াতো কিনা। মায়ের কাছে শুনেছে যুদ্ধের আগে গ্রামে থাকতো ওরা। রোজ রাতে ঘুমানোর আগে বাবা ওকে কোলে নিয়ে রাস্তায় যেতো, ভোরে এ পাড়া ও পাড়া। মা, চিঠিটি দেওয়ার পর আগ্রহ নিয়ে চিঠিটি পড়েছে। চিঠি পড়তে পড়তে না থাকা বাবার স্পর্শ পেতে চেয়েছে। যে বাবার কথা মনে নেই সেই বাবাকে অনুভব করতে চেয়েছে! ওকে আর ওর মাকে ছেড়ে যাওয়ার সময়, ছেড়ে থাকতে তাঁর মন কতোটা ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল, চোখের কোলে কতোটা জল জমেছিল ভাবতে চেষ্টা করেছে, বুঝতে চেয়েছে সুরিকা। ওর বাবা, ওর জন্মের সময় ভার্সিটিতে পড়তেন। ওর মা ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছেন। দুইজন ছোটো ছোটো বাবা মায়ের ছোট্ট একটি সন্তান যেন খেলাঘরের খেলার পুতুল আর খেলাঘরের বাবা, মা। খেলাঘরের বাবা সেই একাত্তরেই ওকে কিছু বুঝতে না দিয়েই খেলতে খেলতেই চলে গেছেন। বাবা যাওয়ার সময় ওর মা কি কেঁদেছিল? খেলাঘরের মা কি কখনও কাঁদে? বাবার চিঠি যখনই পড়েছে তখনই এই কথা মনে হয়েছে, মাকে জ্জ্ঞিাসা করতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি।

এই কথা জিজ্ঞেস করলে যদি মা কাঁদেন; বলেন, কেন এই কথা মনে করিয়ে দিলে। মায়ের কষ্ট, মায়ের চোখের জল ও সহ্য করতে পারবে না, কখনও সহ্য করতে পারে না। সেজন্য কখনও মাকে যুদ্ধের কথা জিজ্ঞেস করতে পারেনি। তবে নানির কাছ থেকে শুনেছে যুদ্ধে ওদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল পাকি-সৈন্যরা, কে বা কারা লুট করেছে বাড়ির সব জিনিস-গয়না-টাকা-কড়ি সেসব বলতে পারেন না নানি। পাকি-সৈন্যদের হাতে মারা গেছে ওর দুই মামা, চাচা আর খালাতো ভাই। চাচা চাকরি করতেন, মামারা কলেজে পড়তেন আর খালাতো ভাই ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিল। নানি, ওদের আর ছোটো মামা, ছোটো খালাকে নিয়ে পাশের গ্রামে অপরিচিত এক বাড়িতে দিন পনেরো ছিলেন। তখন ছোটো মামার শরীর খুব খারাপ ছিল। ওর মায়ের শরীরও। এসব কথা নানির কাছে শুনেছে। সুরিকার নিজেরও এসব কথা মনে করতে ইচ্ছা করে না। তবুও কখনও কখনও মনে পড়ে যায়। যারা মারা গেছে তাদের কাউকেও দেখেনি, শুধু ছবি দেখেছে। মাঝে মাঝে ছবি দেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছা করে। মা যখন থাকে না তখন মাঝেমধ্যে কাঁদে। আজ কাঁদতে ইচ্ছা করছে না তবে ‘একাত্তরের চিঠি’র ঠিকানায় বাবার লেখা চিঠি পাঠাতে ইচ্ছা করছে। সুরিকা চিঠি বের করে। পড়ে।

আমার হৃদকাননের কুসুম:
সুরিকা,

এ চিঠি যখন পড়বে তখন আমি থাকবো না । হয়তো বা অনেক অনেক দূরের বাসিন্দা হয়ে যাবো তখন আমি। আমার ছোটো সোনামনি, তোমাকে শুধু আমি এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে এনেছি কিছুই করতে পারিনি; পারবো না কখনও! তোমাকে না পারলাম আদর যত্ন করতে, না পারলাম কিছু দিতে। কারণ তোমার অক্ষম বাবার কাছে এমন কিছুই নেই যা তোমাকে দিয়ে যাবো! আমার সময় নেই আমি চলে যাচ্ছি! যাওয়ার সময় আর কিছু নয় শুধু তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত! কারণ যখন বড়ো হবে তখন এক অস্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হবে তোমাকে। সাবধানে থাকবে। মায়ের কথামতো চলতে চেষ্টা করবে। তোমার মা এখন কিশোরী তবুও আমার বিশ্বাস তোমাকে নিয়ে ভালোই থাকবেন তোমার মা। তোমার বিষয়ে বা নিজের বিষয়ে যে সিদ্ধান্তই নেবে, সঠিক সিদ্ধান্তই নেবে। তুমি হয়তো ভাবছো একথা কেন। তোমরা ছোটো, বড়ো হবে! তখন দিনকাল কেমন থাকবে তা অজানা আমার! ভালো থেকো। আমার আদর ভালবাসার সবটুকু আমি তোমাকে দিয়ে গেলাম।

তোমার অক্ষম বাবা ।

চিঠি পড়ে একদিন প্রশ্ন করেছিল মাকে, মা বাবা তো যুদ্ধ গিয়েছিল কিন্তু যুদ্ধের ইতিহাসে বাবার নাম নেই কেন ?
মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, কিছু কিছু মানুষ এ পৃথিবীতে জন্মায় কোন কিছু না পাওয়ার জন্য। তোমার বাবা সেই দলের।
ভাগ্য বলে তো কিছু নেই মা ।
আছে সুরিকা। আমরা মানলেও আছে না মানলেও আছে। অনেকের ক্ষেত্রে দেখবে অতি অল্পে সব পেয়ে যায় আবার কেউ কেউ কষ্টের অধিক কষ্ট করলেও কিছু পায় না।
ওসব কথা থাক মা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাবার নাম নাই কেন সেটা বলো।
সে অনেক কথা মা। আমি তো রাজনীতির মধ্যে ছিলাম কখনও, আজও নেই আগেও ছিলাম না। তবুও জানি তাঁরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। তাদের শ্লোগান ছিল ‘খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান চাই,বাঁচার মতো বাঁচতে চাই’। ‘ভোটের আগে ভাত চাই’। তাঁর ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান সাহেবের অনুসারি। মুক্তিযুদ্ধ তারা করেছেন, দেশ স্বাধীন করেছেন তাঁরা কিন্তু তোমার বাবার মুখে শুনেছি দেশ স্বাধীন করবো দেশের মানুষের জন্য, সেজন্য জীবনপণ। কিছুই চাই না। আমি কখনও যাইনি যুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর নাম লিপিবদ্ধ করার জন্য, কখনও যাইনি কারও কাছে।
তাহলে বাবা কি ঠিক করেননি মা।
সুরিকা, ঠিক বেঠিকের বিচার করবে ইতিহাস। আমি শুধু জানি মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি ঠিক কিন্তু আজও মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার তা বেশীরভাগ মানুষের নেই। দেশ মুক্ত কিন্তু আজও না খেয়ে থাকে মানুষ, চিকিৎসার ওষুধ নেই, নেই পথ্য। ঝড় বৃষ্টিতে নেই মাথার ওপর ছাদ।

আমার করার ক্ষমতা নেই শুধু দেখি আর কষ্ট পাই । মনের ভেতর ঘুরপাক খায় এতগুলো বছর মুক্ত হয়েছে দেশ। মুক্তির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাতে থাকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে,বাড়ছে ছিনতাই,খুন। সম্ভ্রমহানীর মতো নির্মম ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। কেন শিশু শ্রম, কেন নারী-শিশু পাচার? কেন হচ্ছে এসব? কে জানে, কে দেবে এর জবাব। আর কার কাছেই বা জবাব চাইবো বলো। কে জবাব দিবে কেন এক শ্রেণীর হাতে লক্ষ কোটি টাকা আর এক শ্রেণী না খেয়ে থাকে? বিচার হচ্ছে, কিন্তু সবাই কি বিচার পাচ্ছে! তোমার বাবার লড়াই ছিল এই অসামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধে। তাঁর চাওয়া ছিল সবাই খাবে,সবাই পাবে। দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন সকলে যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধে মারা গেছে। কষ্টে জ্বলে উঠে সুরিকা বলেছিল কিন্তু এমন কেন হবে? আমরা প্রতিবাদ করতে পারি। সুরিকার মনে আছে ওর মা করুণ হেসেছিলেন। এসব নিয়ে ভেব না সুরিকা। তুমি পড়ালেখা করো যাতে মানুষের মতো বাঁচতে পারো। বাবার কথা মনে করে একজন মানুষেরও যদি উপকারে আসো তবে তোমার বাবার আত্মা খুশি হবে,শান্তি পাবে ।

বাবার চিঠি পড়তে পড়তে বাবার কথা খুব মনে পড়ে সুরিকার। ওর মনে হয় সকলের বাবা আছে, ওর বাবা কেন নেই! বাবা যদি থাকতেন তবে কার কী ক্ষতি হতো! কারও তো কোন ক্ষতি হতো না! বাবার চিঠি আবার পড়ে। ওর চোখ জলে ভেসে যায়। বাবার চিঠি হাতে, বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলে, বাবা, বাবা তুমি কেমন করে জানতে এই রকম এক অস্থিতিশীল সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমাকে, আমাদের পথ চলতে হবে। লেখাপড়া করতে হবে। ওর বাবা এতো দূরদর্শী ছিলেন। মাত্র ২২ বছরের জীবন ছিল বাবার। এইটুকু জীবনের পথ চলতে চলতে এতোকিছু অনুভব করতে পেরেছিলেন ওর বাবা। বাবা আমার বাবা । কাঁদতে থাকে সুরিকা ।

কি হয়েছে সুরিকা। কাঁদছিস কেন।
ওর মা যে কখন ফিরেছে বুঝতেই পারেনি সুরিকা। মাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
কাঁদছিস কেন?
বাবা নেই কেন মা?
আহারে পাগল মেয়ে বাবা কি কারও চিরকাল থাকে।
মা, ভাবছিলাম বাবার চিঠিটা ‘একাত্তরের চিঠি’ র ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবো।
কেন !
ইচ্ছা হচ্ছিল।
না না একাজ কখনই করো না। তোমার না থাকা বাবার চিঠি। এ চিঠি কেবল তোমারই। একান্তই তোমার, তোমার একার সম্পদ। অন্য কারও নয় ।
আমি দেবো মা। সবাই আমার বাবাকে জানবে।
তোমার বাবা নেই। আর এতো বছর পরে তোমার বাবাকে মানুষের জেনে কি হবে। মানুষ কি তোমার বাবার জন্য একটা মিনার বানিয়ে দেবে। তোমার বাবার নামে কোন স্কুল কিংবা কোন রাস্তা। এই চিঠি তুমি দেবে ওদের, ওরা ছাপবে কি ছাপবে না তাও বলতে পারবে না। যদিও ছাপে কেউ পড়বে কিনা তাও বলতে পারো না। তাছাড়া এ চিঠি তোমার একান্ত ব্যক্তিগত একে কেন সবার মধ্যে বিলিয়ে দেবে ।
তাই তো মা। তুমি ঠিক বলেছো।
মা, সব সময় ঠিকই বলে সোনা।

মা, মেয়েকে বুকে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর দুজনে মিলে চিঠিটা পড়ে। একবার,দুইবার,তিনবার,চারবার,পাঁচবার।
পড়ার পর আবার ন্যাপথলিন দিয়ে সেই রূমালে পেঁচিয়ে চুমু খেয়ে কপালে ঠেকিয়ে জায়গা মতো রেখে দেয়।

এটা ওদের জীবনে একাত্তরের বিশেষ দলিল।