বাবার সাথে মোবাইলে কথা বলতে পেরে স্নেহার সেকি আনন্দ। সে মোবাইলটা পড়ার টেবিলের ওপর রেখে এক দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে আসে। মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগলো,
-আম্মু, আর কোন চিন্তা নেই। মাত্র পাঁচদিন পর আমার আব্বু বাড়ি ফিরছেন।
সুমাইয়া জাফরিন আগ্রহী গলায় বললেন,
-কি বলিস? তাহলে তোমার বাবা আসছে!
-আসবেনা কেন? বাড়িতে তুমি থাকো, আমি থাকি। বাবাকে ভালোবাসার মতো আমরা ছাড়া আর কে আছে?
-সে কারণে না, মা। তোমার বাবা ব্যবসার ব্যস্ততার কারণে ঈদে বাড়ি আসতে পারেন না। গতকালই আমাকে বললেন এবারও তার বাড়ি আসা হবে না। তুমি কি জাদু করলে জানি না।
-আমি শুধু বলেছি, বাবা ঈদের দিন তোমাকে খুব মিস করবো। অমনি বাবা হাসতে হাসতে বললেন, – আরে পাগলী তোদের রেখে আমিও কী আর থাকতে পারি। মন খারাপ করিসনে। আমি ঈদের আগেরদিনই বাড়িতে চলে আসবো।
-ওহ্! তাহলে এই কথা। ঠিক আছে। তোমার বাবা যখন আসছে তখন আর মন খারাপ করার কোন সুযোগ নেই। যাও এখন হাতমুখ ধুয়ে খেতে আসো।

মায়ের কথামতো স্নেহা হাতমুখ ধুতে পুকুরঘাটের দিকে চলে যায়।

ঈদের আগের দিন। সেই সকাল থেকে স্নেহার মন যেন ছটফট করছে। বাবা কখন ফিরবেন। বাবাকে প্রাণ ভরে দেখে জড়িয়ে ধরে চুমো খাবে সে। বাবার কাছে তার এতোদিনের বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সব কথা আজই ফাঁস করে দেবে সে।

ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে একবার বাড়ির সামনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। আবার ঘরে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকে।
মেয়ের এমন অস্থিরতা দেখে সুমাইয়া জাফরিন বললেন,
-কিরে মা, এমন করছিস কেন?
-মা, বাবা না সেদিন বললেন ঈদের আগের দিন আসবেন। আগামিকালই তো ঈদ। সে হিসেবে তো আজই আসার কথা। তাহলে বাবা এতো দেরি করছেন কেন?
-ওহ্! এই কথা। পাগলী মেয়ে আমার। তোমার বাবা শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছেন। বাড়ি ফিরতে তো একটু সময় লাগবেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবেন।
স্নেহা মায়ের কথা মেনে নিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
হঠাৎ বাবার মুখখানা দেখতে পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে “বাবা! বাবা” বলে এক দৌড়ে বাবার কাছে ছুটে আসে সে।
ওদিকে মেয়ের চিৎকার শোনে সুমাইয়া জাফরিনও বারান্দার দিকে ছুটে আসেন।
মুহূর্তে স্নেহাদের ঘরে আনন্দের জোয়ার বইতে থাকে।
স্নেহার বাবা রহিম মিয়া বহুদিন পর মেয়েকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে অঝরে কাঁদতে থাকেন। বাবাকে এভাবে কাঁদতে দেখে স্নেহাও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
এবার রহিম মিয়া নিজকে সামলে নিয়ে বললেন,
-মামণি, তুমি এভাবে কাঁদছো কেন?
-আগে বলো, তুমি কেন কাঁদলে?
-তোমাদের ছেড়ে আমি একাকী থাকি। আজ বহুদিন পর তোমাদের একসাথে পেয়েছি। তাই আনন্দে কান্না এসেছে। এবার বল-তুমি কেন কাঁদলে?
-বাবা, আজ তোমাকে আমি একটা কথা বলতে চাই।
-কি কথা? বলো।
-আগে বলো, তুমি আমার কথা রাখবে?
-কেন রাখবো না? আমার দশটা নয়, পাঁচটা নয়। একটামাত্র মামণির কথা কী আমি না রেখে পারি?
-তাহলে মনে রেখো- তুমি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছো।
-হ্যাঁ, কথা দিলাম। তুমি যা বলবে আমি তা-ই করবো।
স্নেহা জোরে জোরে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল,
-বাবা, তুমি আমাদের ছেড়ে আর কোথাও যেও না। আমাদের একটু সুখ দিতে তুমি কতো কষ্টই না করছো! তুমিহীন আমাদের কোন সুখের দরকার নেই। প্রয়োজনে আমরা না খেয়ে থাকবো। তবু তোমার সান্নিধ্যে থাকতে চাই, বাবা।
মেয়ের এমন কথায় সুমাইয়া জাফরিন মুখে শাড়ীর আঁচল চেপে ঘরের ভিতরের দিকে চলে গেলেন।

ওদিকে স্নেহার মুখের এক একটা কথা যেন রহিম মিয়ার বুকে শেল হিসেবে বিঁধেছে। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন,
-আসলেই তো আমার আদর-স্নেহ থেকে ওরা বঞ্চিত হচ্ছে। পৃথিবীর কোন সন্তানই তার বাবা-মা’র কাছ থেকে দূরে থাকতে চায় না। ওদের ছেড়ে দূরে পড়ে থাকতে আমারও কী ভালো লাগে!
এই কথা মনে আসতেই তিনি দু’চোখের জলে একাকার হয়ে স্নেহাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
-মামণি, তখন তুমি খুব ছোট ছিলে। আমাদের সংসারে অভাব লেগেই ছিল। অনেক চেষ্টা করেও
এলাকায় কোন কাজ পাইনি। শেষে তোমাদের ছেড়ে শহরে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকদিনের মধ্যেই আমি কাজ পেয়ে যাই। তারপর থেকে সেখানে নিয়মিতভাবে থাকতে শুরু করি। তোমাদের কথা মনে করে করে আমি ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত হয়েছি। বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়েছিল আমার সকল আবেগ-অনুভূতি। যেহেতু আজ আমি তোমাকে কথা দিয়েছি। যাও, আমি তোমাদের ছেড়ে আর কোথাও যাবো না।

বাবার মুখ থেকে এমন আশ্বাস পেয়ে স্নেহা খুশিতে বাবার গালে চুমু খেয়ে বলল,
-তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।
মেয়ের এমন উচ্ছ্বাস দেখে রহিম মিয়ার মনও আনন্দে ভরে যায়।