মাটির কবি, মানুষের কবি, সকলের মনের মানুষ যাঁর স্থান প্রতিটি সাহিত্য পিপাসুর হৃদয়ে, সেই কবি কবিরুল ইসলামের জন্ম সপ্তাহে এই নিবেদন। ১৯৩২ সালের ২৪ শে আগস্ট বীরভূমের নলহাটি থানার হরিওকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নলহাটি হরিপ্রসাদ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ করেন। অধ্যাপনা করে গেছেন সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজে।
তাঁর সৃষ্টিশীলতা আন্তর্জাতিক। ‘একদিন এ পৃথিবী আমাদের বাসযোগ্য হবে / স্বপ্নের জানালা খুলে যাবে একদিন’ আশাবাদী কবি। তাঁর কবিতার মর্মমূলে ভালোবাসার গান। এই ভালোবাসা নিছক রক্তের ভালোবাসা নয়, নিসর্গ প্রকৃতির ভেতর অতীন্দ্রিয় জগতের আলো বিচ্ছুরিত শিখা। সারা জীবন তিনি খুঁজে বেরিয়েছেন ভালোবাসার উৎস সন্ধানে। মানুষে মানুষে হানাহানি, ব্যক্তি স্বার্থপরতা আত্মকেন্দ্রিকতা, লোলুপতা ও জিঘাংসায় মানুষের জীবন আকীর্ণ। স্থূল বুদ্ধি নিয়ে মানব জাতি আজও নিজেদের পায়ের তলার মাটি সন্ধানে ব্যস্ত। কবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন অর্থ নয়, সম্পদ নয়, পরমার্থই প্রকৃত ভালোবাসা এনে দিতে পারে।
জীবন যুদ্ধে মানুষ ক্লান্ত, প্রতিনিয়ত লড়াই সংগ্রাম করে তারা বেঁচে আছে। সেই যন্ত্রণার কাঁটা তাঁকে বিদ্ধ করে বারবার। কবি লিখেছেন-
”জীবন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত নিপীড়িত সৈনিক
জীবনের তরী তবু কোনো মতে বেয়ে চলি দৈনিক।”
বাস্তবিকক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, শুধু উপলব্ধি নয়, প্রত্যক্ষ করেছেন সম্পদশালী ব্যক্তিদের নিভৃতে আনাগোনা, যা তাঁর কোনদিনই পছন্দ হয়নি। শত শত নিপীড়িত জনতার যুদ্ধে সামিল হতে চেয়েছেন, সহযোদ্ধা হতে চেয়েছেন। কবিতাই তাঁর জীবন যাপন, কবিতাই তাঁর অস্তিত্বের সংকট মোচন। গভীর সংকটে তাঁর কণ্ঠে নিঃসৃত হয়েছে :
“এই অন্ধকারে তোমরা কই ?
কে কে আছো ?
কে কে আসবে? ভালো বাসবে ? আলো জ্বালবে কে কে?
আলো খুব ভালোবাসি। বস্তুত রক্তের
স্বধর্ম ভালোবাসা! স্বরাজ্যে সম্রাট।”
তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাওয়ার কথা বলেছেন, ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন আলো সকলের চোখে। সন্ত্রস্ত মনে ভীত সঞ্চার হয়েছে কখনও কখনও, তাকে দূরে ঠেলে মনের পিরামিডকে মন ঠিক করে নিয়ে অত্যুচ্চাশা ভাবনার দ্যুতি ছিটিয়ে আশংকা সমূহ দূর করার ত্রাসিত হাসি ছড়িয়ে ”আমি ভয়ে ভয়ে আছি কী জানি কখন, তুমি এসে পড়তে পারো আলোর বাহিরে।” বলে মনকে প্রবোধ সান্ত্বনা দিতে চেয়েছেন।
বীরভূমের সাহিত্যের বিচরণ ভূমিতে তিনিই প্রথম আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছেন কবিতার সংসারে। তিনি আধুনিক সংগীতের তাল, লয়, মাত্রা দিয়ে ভালোবাসার গান গাইতে গাইতে বীরভূমি বাউলগান, মর্সিয়া-জারি, সুফি সন্তদের প্রাণাকুল ভালোবাসার ছোঁয়া মিশিয়ে দিয়ে একাকীকরণ ঘটাতে চেষ্টা করেছেন-
”আমার নিজের বলে কিছু নেই
কখনও ছিল কি ?
যেমন নিজের বাড়ি, শৌখিন আসবাবপত্র
বইয়ের আলমারী
প্রিয়জন বন্ধু কিংবা নারী
আমার নিজের বলে কিছু নেই
বলো, কার থাকে ?”
আমিত্ব ধারনা থেকে দূরে সরে অতীন্দ্রিয় ভালোবাসার জগতে দাঁড়িয়ে সবাইকে এক চোখে দেখতে চেয়েছেন। নিজস্বতা বলতে তাঁর কিছুই নেই, সকলেই সকলের জন্য। এক পরমার্থের নতুন দ্যোতনা।
“আমার বাংলাকে আমি হৃদয়ে পাবার পরমার্থ প্রয়োজনে
আ-যোজন চলে যেতে পারি
আপাতত সঙ্গীহীন জোৎস্নার দর্পণে
বিষন্ন ঋতুর মুখোমুখি।”
বাংলার প্রতি বাঙালি জাতির প্রতি আজন্ম ভালোবাসার স্রোতধারা বিলিয়ে দিতে পারেন নিজেকে কুলষমুক্ত করে তুলতে। কবি রবীন্দ্র প্রভাব কাটিয়ে উঠতে চেয়েছেন, কিন্তু রবীন্দ্রপ্রীতি মুছে দেননি। রবীন্দ্রানুরাগ তাঁকে আকর্ষণ করত, রবীন্দ্র প্রেমের ইঙ্গিত পেয়েছি কবিস্বরে-
”রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনলে মুহূর্তে আমার
জন্মান্তর ঘটে যায়।”
কবিরা নাকি স্বপ্নাস্বপ্নাভিলাসী হয়ে থাকে, বাস্তবের সাথে সমন্বয় থাকে না, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা, কিন্তু তিনি তাকে ফুৎকার দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বলছেন-
“তুমি ছিলে এইবোধ বোধের বাস্তবে
তুমি আছো তুমি বেঁচে রবে
আগামী জন্মের ভ্রূণ আমাদের ধ্যানে
যেমন নীরবে বাড়ে সূর্যের সম্মানে
তেমনি নিশ্চিত তুমি হবে
আমাদের দিবারাত্র স্বগত সংলাপে
ভালোবাসতাম ভালোবাসি
নিরবধিকাল এই রকম বাঁশি
আমাদের স্তবে মনস্তাপে।”
বিপরীতধর্মী শব্দ ব্যঞ্জনা কিরূপ সহজ সরল প্রেরণার ভেতর দিয়ে অনায়াস ভঙ্গিতে সত্যের উচ্চারণে বুঝিয়ে দিলেন, যে ভ্রূণ চির সত্য, যে প্রাণ সূর্য্যের আলোরেখার উত্তাপে সাড়া দিয়ে জেগে ওঠে, তার মধ্যে তুমিও আসবে, ভালো বাসবে পৃথিবীর মানুষকে।
আধুনিক রোমান্টিক কবি চলে গেলেন আমাদের পথে দাঁড় করিয়ে রেখে, বাকি পথ সামলানোর দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন। তিনি চলে যেতে পারেন না, তিনি বারবার ফিরে এসেছেন আমাদের মাঝে-
“আমরা কেবলই আসি ফিরে ফিরে আসি
কোথাও যাচ্ছি না, শুধু ফেরা”
তিনি ফিরে আসেন তাঁর কবিতার মধ্যে, শব্দের মায়া বন্ধনে, ভাবের নিভৃতে, ছন্দের নির্মাণে, চেতনার আলোকে, দীপ্তিতে। ভালবাসা দিয়ে ভালোবাসার গান যেমন গান গাওয়া যায়, তেমনি ভালোবাসা দিয়ে যুদ্ধও করা যায়। সেই যুদ্ধে মৃত্যু নেই, পরাজয় নেই, হিংসা, ক্রুরতা, রিরংসা, নিষ্ঠুরতা নেই, নেই গ্লানি, আছে আশ্চর্য পরিবর্তন, বাঁচার অনন্য রসদ। তাই মহাপুরুষদের মতো বাণী ছড়িয়ে ভালোবাসার দামামা বাজিয়ে নতুন করে বাঁচতে বলেছেন,
“ভালোবাসা নিয়ে ঢের যুদ্ধ হয়ে গেছে
এই যুদ্ধ প্রাণের, গানের
ভালোবাসা নিয়ে আরও ঢের যুদ্ধ হবে
এই যুদ্ধ মানাভিমানের।
এই যুদ্ধে জয় নেই, পরাজয়ও নেই
চলো যাই উৎসে উজানের
ভালোবাসা নিয়ে আরও ঢের যুদ্ধ হবে
এই যুদ্ধ আবহমানের।”
এই ভোগবাদের দুনিয়ার অবসান ঘটবে, আসবে অনাকাঙ্খিত সমাজ ব্যবস্থা, যা দুনিয়াতে নতুন স্বর্ণ যুগ বহন করবে। তিনি তাই মানুষের জন্য একটি পবিত্র ভূমি সন্ধান করে বেড়ান, যেমন এক একজন মানুষ সবার জন্য জীবনভর এক পবিত্রভূমি সন্ধান করে বেরিয়েছে। ভালোবাসার আলোপথে বৃত্তের ব্যাস, ব্যাসার্ধ, পরিধি অতিক্রম করে অন্তর্লীন পথে হেঁটে হেঁটে চলেছেন একজন ক্লান্তিহীন পরিব্রাজক হয়ে, তাঁর চোখে নবীন পুনরুত্থান, অন্তরে একনদী বিশ্বাস নিয়ে নতুন যুগের সন্ধানে ।
“এক হাজার বছর পরে যদি স্বর্ণ যুগ আগে
স্ববাসে প্রবাসী কেউ যখন থাকবে না।”
জীবনানন্দ দাশের পথে হাঁটতে চাননি, তিনি বাস্তব সত্যকে স্বীকার করে সেই স্বর্ণযুগের প্রত্যাশী হয়ে রইলেন। তাঁর ভালোবাসার গান ভালোবাসার যুদ্ধ হয়েই নতুন যুগের সূচনা করবে। কবিকে আমাদের ভালবাসা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই।
কবির কাব্যগ্রন্থ : কুশল সংবাদ (১৯৬৭, তুমি রোদ্দুরের দিকে (১৯৭১), বিবাহ বার্ষিকী (১৯৭৭), বিকল্প বাতাস (১৯৭৮), বিদায় কোন্নগর (১৯৮২, মাগো, আমার মা (১৯৯৬), কাব্য সমগ্র: প্রথম খণ্ড (১৯৮৬), কাব্য সমগ্র : দ্বিতীয় খন্ড (২০০২), নির্বাচিত কবিতা (২০০২), ইত্যাদি।