উষ্ণ রোদ্দুরে অবারিত নীল আকাশ আর গ্রীষ্মের বাহারি ফুলের সুবাস! লন্ডন এখন চোখ জুড়ানো নান্দনিকতায় ভরপুর। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে প্রকৃতির সুতীব্র শিহরণে সবাই বিমুগ্ধ। পাশের ঘরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিনা ও জেনিকার গার্ডেনে রডোডেনড্রন ফুল ফুটেছে। আরো আছে গোলাপ, জেরানিয়াম, সানফ্লাওয়ার, হলিহক, মেরিগল্ড, ক্লেমেটিস, নাস্তুরশিয়াম, লোবেলিয়া, ফুসিয়া, হেবে, গোল্ডেন রড, হানিস্কল প্রভৃতি।
রডোডেনড্রন ফুল বাসার সামনে ও পেছনে থাকায় সহজে সবার নজর কাড়ে। নোবেল জয়ী কবি রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ফুলটি দেখে তাঁর ‘পথের বাঁধন’ কবিতা মনে পড়েছে। ’হঠাৎ কখন সন্ধ্যাবেলায়/ নামহারা ফুল গন্ধ এলায়/ প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে/ অরুণ কিরণে তুচ্ছ/ উদ্ধত যত শাখার শিখরে/ রডোডেনড্রন গুচ্ছ।‘
সিলেট ও আসাম অঞ্চলে বড় গোলাপ নামে পরিচিত এই ফুল বৃটেনের রাজপ্রাসাদ উইন্ডসর ক্যাসেলেও সুবাস ছড়াচ্ছে। গ্রিক ভাষায় ‘রডোন’ অর্থ গোলাপ এবং ‘ডেনড্রন’ মানে গাছ। আদিকাল থেকে হিমালয় পর্বতের পার্শ্বদেশে বিয়ে-শাদী ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে এই ফুল ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। নেপালে এটি জাতীয় ফুল হিসেবে স্বীকৃত।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র আমলে বৃটিশ উদ্ভিদপ্রেমী জোসেফ ডালটন হুকার (১৮১৭-১৯১১) আসাম অঞ্চল থেকে অসংখ্য মূল্যবান সম্পদ ও বৃক্ষরাজি আহরণ করেন। বড় গোলাপ নামে পরিচিত বৃটেনের রডোডেনড্রন তারই অংশ। জোসেফ এশিয়ার দেশে দেশে ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল আবিষ্কার করেন এবং ইউরোপ সহ সারা বিশ্ব ছড়িয়ে দেন। তার পিতা উইলিয়াম হুকার ছিলেন কিউয়ের বিখ্যাত রয়্যাল বোটানিক্যাল গার্ডেনের ডিরেক্টর।
জুন থেকে আগস্ট বৃটেনের সামার সিজন। এখানে বাংলাদেশ বা মধ্যপ্রাচ্যের মত গ্রীষ্মের দাবদাহ নেই। তারপরও ঠান্ডার দেশের মানুষ অল্প গরমে হাঁপিয়ে ওঠে। গরমের এই তাপকে ছাড়িয়ে শরীর ও মনকে ফুরফুরে রাখতে সবচেয়ে সহায়ক প্রশান্তির বৃক্ষছায়া ও বর্ণিল ফুল। এদেশে গাছের অনেক আদর। শহর ও লোকালয়ে ছোট-বড় গার্ডেন আছে। ফুলের মোহন স্পর্শ ছড়িয়ে আছে হাটে-মাঠে ও বাড়ির আঙিনায়।
প্রকৃতিপ্রেমী রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর সহপাঠিদের পরিকল্পনায় উত্তরায়ণে ইসলামিক (মোগল) ও জাপানী স্থাপত্যের অনুকরণে উদ্যান রচিত হয়। রবীন্দ্রনাথের লেখার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সুষমা। ‘এখানে ডালে জড়িয়ে উঠেছে ঝুমকো লতা, এখানে ফল আছে বটের, এখানে রাত্তিরে জোনাকিতে ছেয়ে যায় ঐ কামরাঙার ঝোপ, আর বাদলায় বৃষ্টি যখন ঝরতে থাকে তখন দুলতে থাকে নারকেলের ডাল ঝরঝর শব্দ করে।’
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় রয়েছে হৃদয় জয় করা ফুলের উদ্যান। প্রকৃতির রূপ-রস ও জীববৈচিত্র্য। কৃষ্ণচূড়া, দোলনচাঁপা, ঝিঙেফুল, রাঙাজবা, মহুয়া ইত্যাদি পুষ্পসৌরভ সে রচনাকে সুরভিত করেছে। কবি চেয়েছেন তাঁর মানসপ্রিয়া হেঁটে আসুক পুষ্পবিছানো পথ ধরে। কবির ভাষায়, ‘দিও ফুলদল বিছায়ে পথে বধূর আমার/ কৃষ্ণচূড়ার সাথে রঙ্গন অশোকে/ বুলাল রঙের মোহন তুলিকা লো../ পায়ে পায়ে দলি ঝরা সে ফুলদল/ আজি তার অভিসার।’
কবি নজরুলের প্রিয় কৃষ্ণচূড়া হচ্ছে গ্রীষ্মের আগুন রাঙ্গা ফুল। বড় বড় গাছের পুরোটাই যেন ফুলে পরিপূর্ণ। বাতাসের দোলায় ফুলের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষ্ণচূড়ার এমন বাহারি রূপে মুগ্ধ হয়ে নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জুরী কর্ণে/ আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে।’ আর নজরুলের ঝিঙে ফুল তো সকল বাঙালির মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। ’ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল।/সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল, ঝিঙে ফুল।/ গুল্মে পর্ণে লতিকার কর্ণে/ ঢলঢল স্বর্ণে/ ঝলমল দোলো দুল/ ঝিঙে ফুল।‘
এবার বিলেতে গ্রীষ্মের শুরুতেই ডালে ডালে থোকা থোকা ফুল ফুটেছে। সাদা, হলুদ, গোলাপি ও বেগুনি রঙের ম্যাগনোলিয়া সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। গাছে কেবল ফুল আর ফুল। চেরি ফুল, হালকা গোলাপি আর গাঢ় গোলাপি ফুল রয়েছে সবখানে।
অনেক ফুল আমাদের দেশের মত নয়। এখানকার ক্যামেলিয়ার উজ্জ্বল ঘন সবুজ রঙের পাতা। কামিনীফুল গাছের মতো দেখতে। কিন্তু ফুলগুলো গোলাপের মত রঙ ছড়ায়। তবে নীল রঙের ফুলে আছে বিশেষ আকর্ষণ।
বিলেতের নাস্তেরিয়াম দারুণ উজ্জ্বল। একদম খাড়া হয়ে উঠে। দুর্দান্ত পুষ্পযুক্ত বহুবর্ষজীবী ফুল। আলো-ছায়াময় পরিবেশে এ লতা বেড়ে ওঠে।
বারান্দার টবে লাগানো সাদা রঙের ফুল ক্লেমেটিস। লতানো গাছের প্রতিটি শাখায় সবুজ পাতার সঙ্গে সাদা রঙের ফুলের থোকা। আমাদের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিক জন্মে। বাড়ির বাগানে ব্যাপকভাবে শোভাবর্ধনকারী হিসেবে লাগানো হয়।
জেরানিয়াম ঠান্ডা এবং জ্বলন্ত সূর্যের প্রতিরোধক। উজ্জ্বল রঙের বাহারি লতা হিসেবে ঘরের বেলকনিতে লাগানো হয়। সুগন্ধযুক্ত জেরানিয়াম কক্ষ সতেজ করে। সাদা সীমানা আকারের অদ্ভুত বিন্যাস। সৌন্দর্যের কারণে এই ফুল ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।
সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী একধরনের একবর্ষী ফুলগাছ। এখানকার বাসা-বাড়িতে সূর্যমুখীর ব্যাপক আবাদ হয়। এটি পাখি ও মৌমাছির প্রিয়।
সিলেটের গেন্ধাফুল এখানে গাঁদা বা মেরিগল্ড নামে পরিচিত। উজ্জল হলুদ ও গাঢ় খয়েরী রঙের এই সুগন্ধী ফুল সর্বত্র সহজে জন্মায়।
হলিহক চিরসবুজ ঝোপঝাড়। এই ফুলের সাদা, গোলাপী, মেজেন্টা ইত্যাদি জাত আছে। হারবাল ঔষধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। উদিত সূর্যের আলোয় তার বর্ণ সোনারং হলুদ, কখনওবা স্নিগ্ধ গোলাপি হয়।
যারা ফুল ভালোবাসে, তাদের মনটাও ফুলের মতো স্নিগ্ধ, নির্মল ও সুন্দর। ফুল নাড়া দেয় মানুষের প্রিয়তম অনুভূতিতে। প্রভা ও বিভা উন্মুক্ত হয় সকলের মাঝে। জনপ্রিয় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রিয় ফুল ড্যাফোডিলের হলুদ পাপড়ি বাতাসে দুলতে দুলতে মনে হয় যেন ফুলেরা তাল মিলিয়ে নাচছে আর হাসছে। স্বাগত জানাচ্ছে আপনাকে।