আমরা যখন সত্তর ও আশির দশকে স্কুল-কলেজে পড়তাম তখন শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণরা তিন ধরনের বই পড়ত।

এক নম্বর হল এপার বাংলা-ওপার বাংলার মিশ্র বাংলা সাহিত্য। এই দুই বাংলার মিশ্র বাংলা সাহিত্যের রথী মহারথী ছিলেন বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, মীর মশাররফ হোসেন, বেগম রোকেয়া, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, সুকুমার রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসিম উদ্দীন, সৈয়দ মুজতবা আলী, বুদ্ধদেব বসু, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সমরেশ বসু, শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, সমরেশ মজুমদার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, হেলাল হাফিজ, জয় গোস্বামী প্রমুখ।

দুই নম্বর ছিল মস্কোর প্রগতি প্রকাশন থেকে বাংলা ভাষায় অনূদিত রুশ ও সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য। এর মধ্যে যেমন পুশকিন, টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, গোর্কি ও অন্যান্যদের সাহিত্য ছিল তেমনি ছিল মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন ও অন্যান্যদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আর্থ-সামাজিক রাজনীতির বইগুলি। এর সঙ্গে গণচীনের মাও সেতুঙের লেখা চীনা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির উপযোগী মার্ক্সবাদী রচনাবলীও অনেকে পড়ত।

আর তিন নম্বর ছিল একটু যারা বেশি ইংরেজী ভাষা শিখত ও জানত তাদের পড়া মূল ইংরেজী ভাষায় লেখা ব্রিটিশ ও আমেরিকান সাহিত্য। এর সঙ্গে ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার কিছু কিছু লেখকের ইংরেজী ভাষায় অনূদিত বই।

এই ছিল মোটামুটি শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত সাধারণ শিক্ষিত তরুণ যুবকদের পাঠ্য তালিকা। এদেরকে কস্মিন কালেও মুসলিম বা ইসলামী সাহিত্য বা তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক সামাজিক-রাজনৈতিক কোন বই পড়তে দেখা যেত না। বাংলা বা ইংরেজী কোন ভাষাতেই এই ধরনের বই এদের পাঠ্য তালিকায় দেখা যেত না।

এই অবস্থার একটা পরিবর্তন দেখা যেতে থাকে আশি দশকের শেষের দিকে। একদিকে তখন ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুজাহিদরা তীব্র লড়াই করছে। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ক্রমাগত দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশেও ইসলাম ধর্মকে আশ্রয় করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে উপনিবেশিকতার প্রভাব মুক্ত করে পুনর্গঠিত করার একটা সমগ্রতাবাদী ইসলামিস্ট চিন্তা ও আন্দোলন দানা বাঁধছে। এই প্রবণতা এদেশের কয়েকটি মফস্বল শহরের বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম দেখা দিয়েছিল। যেমন প্রধানত রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্রেক্ষিতেই এদেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এক শ্রেণির তরুণ সাধারণ শিক্ষিতদের মধ্যে মওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদীর রচনাবলীর পঠন-পাঠন ও ব্যবহারিক চর্চা প্রচলিত হতে থাকে।

অর্থাৎ মওলানা মওদূদী হলেন মুসলিম ও ইসলামী লেখকদের মধ্যে সেই অগ্রণী প্রতিভা যার মাধ্যমে মুসলিম তরুণ শিক্ষার্থীরা আধুনিক ইউরো ও ইন্দোকেন্দ্রিক জ্ঞানবলয় থেকে আধুনিকোত্তর একটি ইসলামকেন্দ্রিক জ্ঞানবলয়ের সন্ধান পেয়েছিল। এর আগে জামালউদ্দীন আফগানী, সৈয়দ আহমদ খান, সৈয়দ আমীর আলী, রশিদ রিদা, মুহাম্মদ ইকবাল প্রমুখের মাধ্যমে এই ধারাটির সূচনা হলেও মওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদীর বহুমাত্রিক ও বিপুল রচনাবলীর মাধ্যমেই এই ধারাটি আধুনিকোত্তর ইসলামকেন্দ্রিকতাকে শক্তিমত্তার সাথে তরুণদের সামনে উপস্থাপন করেছে।

তার এই তাজদীদি চিন্তা ও কর্ম নিশ্চয়ই পর্যালোচনা ও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। যেমন হামিদউদ্দীন ফরাহির নব কোরআন ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে আমিন আহসান ইসলাহী এবং জাভেদ আহমদ গামিদী মওলানার চিন্তা ও কর্মের ক্রিটিক করেছেন। এছাড়া মওলানার এককালের ঘনিষ্ঠ সহচর ড. ইসরার আহমদও মওলানার চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির কিছু কিছু সমালোচনা করেছেন। আর ঐতিহ্যবাদী উলামারা যে তার অনেক সমালোচনা করেছেন সেকথা তো আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বলা যায় বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী চিন্তার সংস্কারবাদী/তাজদীদি ধারার তিনি একজন অন্যতম প্রধান রূপকার।