তাকে প্রথম দেখার কথা মনে পড়ে।
এত সুন্দর কেউ থাকতে পারে, তাকে দেখার আগে কোনদিন মনেই হয়নি। ছোটবেলা থেকে নারির প্রতি আমার কোন মোহ ছিল না। পাখির কাতর কণ্ঠস্বর আমার মনে রেখাপাত করত। বহুদূরে মিশে যাওয়া নদি হৃদয়কে করত উদাস উন্মন। কিন্তু মাটিতে গড়া মানবির রূপে এত আকর্ষণ থাকতে পারে ধারণাও ছিল না আমার। ওর নাম ¯িœগ্ধা। ডিমের কুসুমের মতো গায়ের রঙ। দুটি উজ্জ্বল চোখ ওর অবয়বে সারাক্ষণ জ¦লে থাকে। হাসির সময় ঠোঁটের ফাঁকে ছলকে উঠে মুক্তোঝরা দাঁত। ওর ঘনকালো চুল, ভারি নিতম্ব আমার চেতনাকে অস্থির করে তোলে। তার পোষাক ছিল অতুলনীয় পরিপাটি। কলেজ যাওয়ার পথে তাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। শহুরে ভদ্র ঘরের অনুপম মানবপুত্তলি মনের অর্গলে কড়া নাড়বে কোনদিন কল্পনা করতে পারিনি।

অজগ্রাম থেকে শহরে এসেছি পড়াশুনা করতে। নদিতে ঘর-বাড়ি গেলে; বিশেষ করে অবস্থাসম্পন্ন পরিবার দারিদ্রের কষাঘাতে নিঃশেষ হতে থাকলে তাদের মানসিকতা যা হয় তার প্রভাব আমার উপর ছিল। সেজন্য শহরের অদূরে অনুন্নত পাড়ায় লজিং থাকতাম। প্রদীপের টিমটিমে আলোয় বড়ো বড়ো মশার কামড় সহ্য করে আমার দিন কেটে যাচ্ছিল। সকালে নমাজ বাদে কোরআন তেলাওয়াত করতাম। বাড়ির কর্তা নামাজি মানুষ। আমার আচরণে সে খুশি হত। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বৃত্তি পাওয়ায় পড়াশুনার খরচ চলে যেত। একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম মন্থর গতিতে। স্নিন্ধা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। সবুজ শাড়ির সাথে টুকটুকে লাল ব্লাউজ ওর রূপের রেখা স্পষ্ট করে তুলেছিল। আমি তার দিকে দৃষ্টিপাত করে কখন যে অসাবধান হয়ে পড়েছি, তাতেই ঘটেছে দূর্ঘটনা। এক সাইকেল আরোহি আমার পা মারাত্মকভাবে জখম করে দিয়েছে। আমি নিজকে সামলাতে না পেরে রাস্তার পাশে পড়ে গেছি। কারা আমাকে হাসপাতালে রেখে গেছে বলতে পারছি না। যখন আমার জ্ঞান ফিরেছে তখন শেষ বিকেল। বাইরের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। একটু পড়ে ওয়ার্ডের বাতি জ¦লে ওঠল। সারাটা ওয়ার্ড উজ্জ্বল আলোয় হেসে ওঠল। ডিটটি ডাক্তার রাউণ্ডে এল সন্ধ্যের অনেক পর। সাথে এল মিষ্টি চেহারার এ্যাপ্রোণ পরা নার্স। আমি খুব ঘাবড়ে গেছি দেখে তারা সাহস দিল। ব্যাণ্ডেজ খুলে জখমের গভীরতা দেখে ডাক্তার নার্সকে আমার প্রতি নজর রাখার নির্দেশ দিল। লায়া নামের নার্সটি যতেœর সাখে জখম ড্রেসিং করে দিত। আমি তার চোখে মমতার ছবি দেখেছি। আমি ছাত্র জেনে সে খুবই প্রীতিপূর্ণ আচরণ করে। আমার প্রতি তার করুণা আরও বেড়ে যায় কারণ আমি ছিলাম একা। আমার খোঁজে কেউ আসেনি এটা তার নজরে পড়তে পারে। অসুস্থতায় শয্যার পাশে স্বজনের বড়ো প্রয়োজন। আমার সে প্রয়োজন কে পূরণ করবে। সেজন্য লায়া আমার পাশে দাঁড়ালে দারুণ সংকুচিত হয়ে যেতাম।

দূপুরে ঘুমিয়ে পড়েছি। জেগে উঠলাম বিকেলে। পাশের ভদ্রলোক বললেন,“খোকা, খুব তো ঘুম দিলে। সেই দূপুর থেকে একটানা ঘুমাচ্ছ। তোমার খোঁজে একটি মেয়ে এসেছিল। সুন্দর দেখতে। লকারে কী যেন রেখে গেল। ডেকে দিতে চাইলাম। নিষেধ করল। বলল,“ঘুমাচ্ছে যখন ঘুমাক।” মনে হয় কাল আসবে। খুব দরদ দেখলাম তোমার প্রতি। কে মেয়েটি শুনি? স্নিগ্ধা না কি নাম যেন বলে গেল।” ভদ্রলোক ডাইবেটিসের রুগি। তার উপর বড়ো ধরণের সার্জারি করাতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন। সারতে বেশ সময় লাগছে। তাকে দেখতে অনেকেই আসে। বেডের চারপাশে দর্শকের ভীড় লেগেই থাকে। এখন কেন জানি কেউ নেই। উনি গল্পের বই পড়ছেন। মুখে বিণœতার বদলে প্রতিভাত হচ্ছে মুচকি হাসি। আমাকে লক্ষ্য করে উনি বললেন,“ডু নট অরি মাই চাইল্ড। বিপদে ভেঙ্গে পড়তে নেই। আল্লাহ সহায়। আমাকে কতজন দেখতে আসে। তাতে কি। সুস্থতা তার হাতে। মানুষ আসে মনের টানে। তা ঐ সুন্দরি মেয়েটি কে? বলছি, তুমি তো স্টুডেন্ট। সফট কোন ম্যাটার থাকতে পারে।” বলে, ভদ্রলোক হেসে ওঠলেন। উনি পাশে থাকায় কোন সমস্যা হচ্ছে না। ওনার তো অনেক নিয়ম কানুন। আমি একা আর কত খাবার খাব। অল্পদিনে ওনার সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতা জন্মে গেছে।

ভাবলাম কে এসেছে আমাকে দেখতে। লায়া তো এখানকার স্টাফ। সে ডিউটি পিরিয়ডে নিয়মিত আসে। আমার পরিচিতির মধ্যে এমন কেউ নেই যে আসতে পারে। স্নিগ্ধা কী আসতে পারে? ওর সাথে তো কোন কথা হয়নি। ওর বান্ধবি ওকে নাম ধরে ডেকেছিল তাই নামটা জেনেছি। দূর্ঘটনার সময় ও আমাকে দেখেছে বোধ হয়। ওরাই মনে হয় আমাকে হাসপাতালে রেখে গেছে। ঘুমে ছিলাম ভালোই হয়েছে। বেড লকারে কি রেখে গেছে একবার খুলেও দেখিনি। অপরিচিতের নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করার অভ্যেস আমার নেই। পরদিন দুপুরে বেডের পাশে বসে খাচ্ছিলাম। স্নিগ্ধা এল ওর মায়ের সাথে। দারুণ মুষড়ে পড়লাম ওদেরকে দেখে। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। মিনমিনে কণ্ঠে শুধু বললাম,‘বসুন।’ ওনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার খোঁজ-খবর নিতে থাকলেন। প্রশ্নের জবাবে হা বা না ছাড়া আমি কিছুই উচ্চারণ করতে পারলাম না। কে যেন শক্ত হাতে টুটি চেপে আমাকে বাকরুদ্ধ করে ফেলেছে। ঝড়ো হাওয়ায় নুয়ে পড়া লতার মতো আমি অবনত হয়ে থাকলাম। স্নিগ্ধা লকার খুলে খাবার অক্ষত দেখে অবাক হল। দারুণ দুঃখ পেল সে আমার আচরণে। স্নিগ্ধার মা বলল, “সে কী! আমি ওসব স্নিগ্ধাকে দিয়ে পাঠিয়েছি। একসিডেন্টে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে। আমরা হাসপাতালে রেখে গেছি। তোমার বাড়ির ঠিকানা জানলে খবর পাঠাতাম।” আমি বললাম, “তা আর লাগবে না। অনেকটা সেরেই গেছি। বাবা-মা শুনলে দুশ্চিন্তা করবেন। অসুবিধা হচ্ছে না তেমন। আপনারা খোঁজ নিচ্ছেন। আমার বাড়ির যোগাযোগ ভালো না। এখান থেকে দূরও বটে।”লায়া এসে পাশে দাঁড়াল। আমার মনে হচ্ছিল লায়া আর স্নিগ্ধা একই আত্মার আলাদা দেহ। রোদপোঁড়া দুপুরে একরাশ ভেজা হাওয়ার মাতামাতি দুজনের চোখে। তার ছোঁয়ায় আমার মন যেন পরম তৃপ্তির ভূবন খুঁজে পায়। আমার অন্তরে ছুটে চলে অনুপম যন্ত্রণার নদি যার ধারা শুধু পাড় ভাঙ্গতে ভালোবাসে।

স্নিগ্ধার কণ্ঠ হতে কষ্ট মেশানো অনুযোগ ঝরে পড়ল। তার খাবার গ্রহণ না করায় সে খুব বিচলিত হল। দারিদ্র আমাকে খ্রিষ্টের মতো গৌরবের আসনে ধরে রাখতে চায়। আমার সংযত অবয়ব স্বাপ্নিক মাধুর্যে দ্বীপ্তিমান হয়ে স্নিগ্ধার আভিজাত্যের মনুমেন্টকে চুরমার করে দিল। মনে হয় ওর মন ভেতর থেকে ডুকরে কাঁদল। ওরা চলে গেলে লায়া কিছু বলতে চাইল। কিন্তু জড়তার সুউচ্চ দেয়াল সবকিছুকে আড়াল করে দিল। দৈন্যতা আমাকে শুভ্র পদ্মের মতো অতুল ঐশ^র্যে সমৃদ্ধ করে নির্জন সরোবরে সাজিয়ে রাখল। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে অশ্রুভেজা চোখে স্নিগ্ধার খাবার মুখে তুললাম। এই অনুগ্রহ হজম করতে আমার মন মোটেই রাজি ছিল না। আমার স্নেহশীল পিতা-মাতার সমুদ্রগভীর ভালোবাসার তুলনায় এ দান নিতান্তই তুচ্ছ।

স্নিগ্ধা ও তার মা কদিন হাসপাতালে এল না। আমি তাদের সামনে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছি না বটে কিন্তু স্নিগ্ধার শুভ্র কপোলতলে জাগ্রত চোখের মায়া দেখতে বড়োই ইচ্ছে হচ্ছিল। লায়া খোঁজ নিচ্ছিল প্রতিদিন। তার মাঝে অকৃত্রিম মমত্ববোধ প্রত্যক্ষ করেছি। ওর কারণেই আমার মনে হয়নি হাসপাতালে আছি। ওর সান্নিধ্যে সুরভিত হাওয়ার তরঙ্গে হৃদয় নেচে ওঠেছিল। সুস্থ হয়ে স্নিগ্ধাকে না জানিয়ে আমি লজিং বাড়িতে চলে যাই। সেখানে দুদিন থেকে চলে যাই বাড়িতে।

চৈত্রে গ্রামে খুব অভাব থাকে। ঘরে চাল থাকে না। বাড়তি ফসল তখন একদম উঠে আসে না। অল্প খেয়ে মায়ের চেহারা মলিন হয়ে গেছে। জিজ্ঞাসা করলে মা বলে অসুখ হয়েছিল তার। আমার পায়ে গভীর ক্ষত দেখে মা আৎকে ওঠলেন। মাকে সব খুলে বললাম। কীভাবে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে এসেছি সব জানালাম মাকে। শুনে মা কেঁদে কেঁদে সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলেন। তাঁর প্রতি মায়ের আনুগত্য দেখে আমি বিস্মিত হলাম। সীমাহীন অনটনের মধ্যে মাবুদের প্রতি এত ভালোবাসা মা রাখেন কেমন করে। গোরু না থাকায় বাবা কোদালে জমি কেটে তৈরি করেন ফসল বোনার জন্য। চৈত্রের খরতাপে তার দেহ পুঁড়ে ছাই হয়ে যায়। দুপুরে বাড়ি ফিরে ক্ষুধার কথা বলে মায়ের অস্থিরতা বাড়ানো ছাড়া বাবা কিছুই করতে পারেন না। এই অভাবি সংসারের সকল বাঁধা পেরিয়ে পড়া শিখে তাদের কষ্ট মোচন করব এমন আশা তারা কেমন করে করতে পারেন। প্রতিদিন বাবা নদি থেকে মাছ ধরে নিয়ে আসেন। মায়ের জমানো চাল দিয়ে আমার উপস্থিতির দিনগুলো ভালোয় চলে। তারপর আধপেটা, উপোষ আর ধূসর মরিচিকার রাজ্যে মেঘের স্বপ্ন দেখা ছাড়া তাদের কোন উপায় থাকে না। যে কটা দিন বাড়িতে থাকলাম-আকাবাঁকা নদিতীর, রোদপোঁড়া প্রান্তর এবং ধূধূ বালুচরে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ালাম। অনেক খুঁজেও শৈশবের হারানো দিনগুলো ফিরে পেলাম না। মায়ের শুকনো মুখ, লায়ার সজল চোখ ও স্নিগ্ধার যৌবনমদির দেহকান্তি প্রকৃতির রুক্ষতার সাথে মিশে আমার অন্তরকে কাঁপিয়ে তুলল।

অনেকদিন দেখা নেই স্নিগ্ধার সাথে। আমি অন্য রাস্তায় ঘুরে কলেজে যাই। ওদের বাড়ির সামন দিয়ে যাই না। আমার এ মানসিকতার কোন ব্যাখ্যা নেই। এক সময় সে পথ ধরে যেতাম। এক সুশ্রি মেয়ের প্রফুল্ল হাসি দেখে মুগ্ধ হতাম। এখন অন্য পথে চলি। ব্যথিত হৃদয়ের অতল গভীরে ডুবে তিক্ত গরল পান করাই আমার অভিলাষ। হঠাৎ একদিন স্নিগ্ধার সাথে দেখা হল। আমাকে দেখে রিকসা ছেড়ে সে সামনে এসে দাঁড়াল। আমাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে প্রশ্ন করল,“বেশ লোকতো আপনি। হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে কোথায় উধাও হয়েছেন? আমরা তো ভেবে অস্থির। আপনাকে কোথায় খোঁজ করব ঠিকানা না জানলে। মা বলেছেন, দেখা পেলে সোজা বাসায় নিয়ে আসবি। তা এভাবে ঘাপটি মেরে থাকার কারণটা কি বলি। কলেজে যান কোন রাস্তায়। আজ বাসায় না নিয়ে ছাড়ছি না। রিকসায় উঠুন, বাসায় যেয়ে তবে কথা হবে।”যেতে যেতে সে অনেক কথা বলল। “আমরা গিয়ে দেখি আপনি চলে গেছেন। মা খুব কষ্ট পেয়েছেন আপনাকে দেখতে না পেয়ে। সে রাতে মা কিছুই খাননি। মা বলেছেন,“তার নাকি একজন বোনপো ছিল আপনার মতো দেখতে। জ¦র হয়ে সে নাকি মারা গেছে। বোনপোকে মা খুব আদর করত।” আমি সহসা বলে ফেললাম,“তুমিও না খেয়ে ছিলে নাকি।” স্নিগ্ধার রক্তিম অধরে লজ্জা এসে ভর করল। মুখ নিচু করে সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

স্নিগ্ধার মা খুশি হলেন আমাকে দেখে। স্নিগ্ধার ব্যস্ততার অন্ত ছিল না। আমাকে পেয়ে সে যেন খুশির জোয়ারে ভাসছিল। বাসায় ঢিলে পোষাক পড়েছে সে। তার ভেতর থেকে এক সাবলীল নারির পুষ্ট শরীর আমার দৃষ্টিকে মদির করে তুলছিল। ওর পড়ার টেবিলে একটি পত্রিকা ছিল। আমি তা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম। পত্রিকার ব্যাকপেজের বিজ্ঞাপনে অনুপম ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল এক সুন্দরি মডেল। তা দেখে ¯িœগ্ধা বলল,“ইস! মেয়েটি কত সুন্দর তাই না? ওর মাথার চুলই বা কত দিঘল।” আমি ফিরে দেখতেই ওর দেহের পরশ পেলাম। আমি লাজুক কণ্ঠে বললাম,“ নিজের কথা কেন বলছো না। তোমার মুখ যে পূর্ণিমা চাঁদের মতো।” কথা শুনে আমার হাতে খোঁচা মেরে স্নিগ্ধা অন্য রুমে চলে গেল।

রাতে স্নিগ্ধার মা অনেক কথা বললেন আমার সাথে। কথার মাঝে উনি গভীর স্বরে বলতে লাগলেন,“ তোমার পরিচয় না জানলেও মন বলে তুমি নিশ্চয়ই কোন ভালো ঘরের সন্তান। আমার বুঝতে বাকি নেই কতটা কষ্টে তুমি পড়াশুনা করছ। জীবনে সফল হতে হলে চেষ্টা ও অর্থ দুটোরই সমান প্রয়োজন। তোমার চেষ্টা আছে কিন্তু অর্থ নেই। তোমার সামনে অনেক কঠিন পথ। মহৎ কাজের জন্য তৈরি হতে হলে কারও না কারও সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। আমি তোমাকে স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে চাই। আজ হতে মনে করবে আমি তোমার একজন নিঃস্বার্থ অভিভাবক।”

ওনার আদেশে আমি লজিং বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে ওঠলাম। ওনার তত্ত্বাবধানে মনোযোগ দিয়ে পড়ে ডিগ্রি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট হল। আমি পড়ার ফাঁকে ইসলামি বইপুস্তক অধ্যয়ন করতে লাগলাম। কুরআন-হাদিস নিয়ে গ্েবষণাও চালাতে থাকলাম। স্নিগ্ধাও অলক্ষ্যে অগোচরে আমাকে অনুকরণ করতে লাগল। আমার প্রতি তার অপরিসীম টান থাকলেও সে যথেষ্ট আবরু রক্ষা করে চলে। আমি ভালো বিশ^বিদ্যালয়ে অঙ্কে অনার্স নিয়ে উচ্চতর পড়াশুনায় মগ্ন হয়ে গেলাম। স্নিগ্ধাও ভালো কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে দারুণ চ্যালেঞ্জ সহকারে পড়তে লাগল। আমাকে অনুভব করে মাঝে মাঝে দীর্ঘ চিঠি লেখে স্নিগ্ধা। যার দেহ জুড়ে থাকে তার হৃদয়ের নেশাতুর আহ্বান আর অনাগত জীবনের স্বপ্নবিধূর কাব্যিক উচ্চাশা।

আমার পড়া শেষ হলে আমি সরকারি কলেজে লেকচারার পদে যোগদান করলাম। তখন স্নিগ্ধা অনার্স ফাইনাল ইয়ারে ভালো রেজাল্টের জন্য নিজকে প্রিপার করতে লাগল। ওর মায়ের প্রবল ইচ্ছায় আমার পরিবারের সম্মতি সাপেক্ষে একদিন আমাদের বিয়ে হল। ও আমার অন্তর জুড়ে প্রেমের সুরভি ছড়িয়ে দিল। আমরা একে অপরকে পেলাম চলার পথের বিশ^স্ত সাথি হিসেবে। হৃদয়ের উদ্দাম তরঙ্গের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা ছুটতে লাগলাম। আমরা এখন দুটো দেহের এক অভিন্ন সত্তা। একে অপরের বিনোদনের সঙ্গি এবং আকাঙ্খার সুসম পরিপূরক।

সেদিন বিকেলে ভার্সিটি থেকে ফিরে দেখি স্নিগ্ধা নিবিষ্ট মনে আসরের নমাজ পড়ছে। নমাজ শেষে ড্রয়ার থেকে একখানা চিঠি বের করে ও আমাকে দিল। দুপুরে পিয়ন দিয়ে গেছে ডাকঘর থেকে। লায়া লিখেছে আমাকে বগুড়া থেকে। সে লিখেছে,“তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল আমার আকাশে নির্মল চাঁদ উদিত হয়েছে। তারপর দেখা নেই। শ্রাবণের মেঘে আমার কল্পনার আকাশ ডেকে গেছে। যে সুষমায় আমার অনালোক ভূবনতে আলোকিত করেছ তা ছিল ক্ষণায়ু বিদ্যুল্লতার মুহুর্তের শিহরণ। বাস্তবতা নির্মম হাতে আমার জীবনের চাকা পেছনে ঘুরালো। আজ আমি নিঃস্ব, ব্যতিত। তখন কেন লড়াই করে তোমাকে অধিকার করলাম না। তোমার খোঁজ যখন জানলাম তখন তুমি অনেক দূরে। সুখের চাঁদ হয়ে অন্য এক আকাশে জোসনা ঝরাচ্ছ। জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে দিনাজপূর ছেড়ে বগুড়া এসেছি। তোমার পরিণয় শুভ হোক এই কামনা করছি”-লায়া।

পত্রখানা স্নিগ্ধার হাতে দিলাম। স্নিগ্ধাও পড়ল সেটি। পড়ে, অভাবনীয় সহজ দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকাল। আমি ওকে নিবিড় করে বুকে টেনে নিলাম। লায়ার স্মৃতি বুকের মলাটে আঁকা ছিল বটে কিন্তু পড়ন্ত বিকেলের রোদের মতো তা ম্লান হয়ে গেছে।