ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (জন্ম : ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০; মৃত্যু : ২৯ জুলাই ১৮৯১) আখ্যানমঞ্জুরী (১৮৬৩)সমকালের সমাজ-পরিপ্রেক্ষিতে একধরনের সংবাদ-ভাষ্য। প্রতিদিনের মানুষের আচরণীয়কে তিনি গল্পের মোড়কে প্রকাশ করেছেন। তিনটি পর্বে তিনি ইউরোপ-আমেরিকা-মধ্যপ্রাচ্য-প্রাচ্যকে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। কাহিনির চরিত্র হিসেবে কোনো কোনো রাজ্যের সম্রাট, ডিউককে যেমন পাই, তেমনই পাওয়া যায় কৃষক, বিপন্ন-দরিদ্র মানুষ, শিশু-কিশোর, নারী, শিকারি, ডাক্তারসহ নানান পেশা ও বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধি। এগুলো মূলত নীতিশিক্ষার প্রসঙ্গ ও পাঠ। নিবন্ধগুলোর শিরোনামের কিছু পুরনাবৃত্তি আছে বটে; তবে বিষয়ের খাতিরে সে-অসমন্বয়-স্বভাব ক্ষমাযোগ্য। এই উপসম্পাদকীয় ধরনের মন্তব্য বা মুক্তকথা বা খোলাকলাম আমাদের সামনে এক বিপুল জিজ্ঞাসা ও সমস্যা মীমাংসার পথ বাতলে দেয়। এখানে আমরা যেন বর্তমানের এক অভিভাবকীয় কলামিস্টকেই খুঁজে পাই। সমাজ-সংস্কারে বিদ্যাসাগরের এই উপাখ্যানগুলো সমকালে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ রচনা হিসেবে পাঠক মহলে সমাদৃত ছিল, এতোদিন পরে, আজও তা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমভাগের মন্তব্য-ভাষ্যের উল্লেখযোগ শিরোনাম হলো- ‘প্রত্যুপকার’, ‘মাতৃভক্তি’, ‘পিতৃভক্তি’, ‘ভ্রাতৃস্নেহ’, ‘লোভসংবরণ’, ‘গুরুভক্তি’, ‘ধর্মভীরুতা’, ‘অপত্যস্নেহ’, ‘ধর্মপরায়নতা’, ‘নিঃস্বার্থ পরোপকার’, ‘আতিথেয়তা;, ‘প্রভুভক্তি ও দানশীলতা’, ‘সাধুতার পুরস্কার’, ‘পরের প্রাণ রক্ষার্থে প্রাণদান’, ‘নিষ্পৃহতা’, ‘রাজকীয় বদান্যতা’, ‘বর্বরজাতির সৌজন্য’, ‘ভ্রাতৃবিয়োগ’, ‘ন্যায়পরায়নতা’ প্রভৃতি।

উপকারীর উপকার স্বীকার করা এবং তার প্রতি-উপকার করার সুযোগ সবাই পায় না। যারা তা লাভ করেন, তারা সৌভাগ্যবান। বিদ্যাসাগর, ‘প্রত্যুপকার’ কলামে এমনই এক ঘটনার অবতারণা করে, উপকারের প্রতিদান দিতে পারা এক ব্যক্তির স্বীকারোক্তিমূলক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন এভাবে- ‘আমি যে কৃতজ্ঞতা দেখাইবার অবসর পাইলাম, তাহাতেই চরিতার্থ হইয়াছি, ও আশার অতিরিক্ত পুরস্কার পাইয়াছি; আমার অন্য পুরস্কারের প্রয়োজন নাই।’ দরিদ্র এই লোকটি পা ভেঙে পঙ্গু অবস্থায় যখন বিপন্ন ছিল, তখন যে অভিজাত মানুষটি সহায়তা করেছিলেন, একদিন তার বিপদে- যখন তিনি ঘোরাসহ নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন, তখন তাকে উদ্ধার করেন তিনি। বিনিময়ে তাকে পুরস্কার দিতে চাইলে, তাকে চিনতে পেরে লোকটি উপরিউক্ত জবাব দেয়।

‘মাতৃভক্তি’ রচনায় এক সুবোধ কিশোরের জীবন-দর্শন ও মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ প্রতিফলিত হয়েছে। বালক সম্বন্ধে লেখক বলছেন- ‘এই বালক এরূপ সুবোধ ও মাতৃভক্ত না হইলে, বৃদ্ধার দুঃখের অবধি থাকিত না। ফলতঃ অল্পবয়স্ক বালকের এরূপ বুদ্ধি, এরূপ বিবেচনা, এরূপ আচরণ, সচরাচর নয়নগোচর হয় না।’‘অপত্যস্নেহ’তে আছে সন্তানের প্রতি মায়ের অকৃত্রিম মমতার কথা। বাড়িতে আগুন লেগেছে। সবকিছু পুড়ে ছাড়খার। এক দুর্ভাগা মা দেখছেন তার সব সন্তানকে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে আনতে পারেননি। ছোট্ট এক সন্তান আটকে পড়ে। তাকে উদ্ধারের জন্য সে মরিয়া হয়। বিদ্যাসগর লিখছেন সে-আকুতির কথা- ‘অপত্যস্নেহের এমনই মহিমা, সেই স্ত্রীলোক কোনও মতে স্থির হইতে না পারিয়া, শোকসংবরণপূর্বক পুনরায় সেই শিশুসন্তানের আনয়নের নিমিত্ত, জলন্ত গৃহের অভিমুখে ধাবমান হইল।’

আমাদের লোভ ও লাভের নেশা যে সমাজে কতো ক্ষতি করছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। অর্থ-বিত্ত-খ্যাতির জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু আজও কেউ-না-কেউ আছেন, যে বা যারা লোভের উর্ধ্বে। নিজেকে সামলে রাখার এই যে শক্তি, ত্রা মহিমা তুলে ধরেছেন ঈশ্বরচন্দ্র। এক বিপন্ন বৃদ্ধাকে কোনো দানশীল ব্যক্তি সাহায্য করতে চাইলে, তা প্রত্যাখ্যান করে সে নিজের নিষ্পৃহতা আর মহত্বের পরিচয় দেয়। তার অভিব্যক্তি উদ্ধৃত করছি- ‘কিন্তু আপনি যাহা দিতে চাহিতেছেন, তাহা আমার যত আবশ্যক, অনেকের তদপেক্ষা অনেক অধিক আবশ্যক। যদি আমি উহা লই, তাহাদিগকে বঞ্চনা করা হয়; আমার বিবেচনায় এরূপ লওয়া অতি গর্হিত কর্ম।’

‘বর্বরজাতির সৌজন্য’ আখ্যানে দেখা যায় আমেরিকার এক আদিমবাসী মৃগয়ায় গিয়ে এক ইউরোপীয় ব্যক্তির বাড়ির সামনে হাজির হয়। তৃষ্ণা ও ক্ষুধায় তখন যে ক্লান্ত। লোকটি পানীয় ও খাদ্য চাইলে ইউরোপীয় ‘সভ্য’ লোকটি তাকে তিরস্কার করে এবং খাবার বা পানি না দিয়েই তাড়িয়ে দেয়। পরে, ঘটনাক্রমে সভ্য লোকটি আদিমবাসীর কাছে খাবারের সন্ধান করে। তখন সে তাকে আপ্যাায়ন করে এবং বলে- ‘মহাশয়, আমরা বহুকালের অসভ্য জাতি; আপনারা সভ্য জাতি বলিয়া অভিমান করিয়া থাকেন। কিন্তু দেখুন, সৌজন্য ও সদ্ব্যবহার অসভ্য জাতি সভ্য জাতি অপেক্ষা কত অংশে উৎকৃষ্ট।… যে অবস্থার লোক হউক না কেন, যখন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হইয়া আপনকার আলয়ে উপস্থিত হইবে, তাহার যথোপযুক্ত আহারাদির ব্যবস্থা করিয়া দিবেন; তাহা না করিয়া তেমন অবস্থায়, অবমাননা পূর্ব্বক তাড়াইয়া দিবেন না।’- এই উপদেশবাণীর ভিতর দিয়ে লেখক আমেরিকা ও ইউরোপের মানুষের, তাদের সংস্কৃতির পার্থক্যই শুধু প্রকাশ করেননি; তিনি ‘মানুষ’ ধারণার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পরবর্তীকালে আধুনিকতার দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজী নজরুল খাদ্য-সমতা নিশ্চিতকরণ এবং মানুষে মানুষের বিভেদের যে সংস্কৃতি ও রাজনীতি, তার প্রতি আমাদের সচেতন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

দ্বিতীয় ভাগের মন্তব্য-প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে- ‘দয়া ও দানশীলতা’, ‘যথার্থ পরোপকারিতা’, ‘মাতৃভক্তির পুরস্কার’, ‘অদ্ভুত আতিথেয়তা’, ‘দয়া ও সদ্বিবেচনা’, ‘সৌজন্য ও শিষ্টাচারের ফল’, ‘দয়া, সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতা’, ‘অমায়িকতা ও উদারচিত্ততা’, ‘যথার্থবাদিতা ও অকুতোভয়’, ‘কৃতঘ্নতা’, ‘ধর্মশীলতার পুরস্কার’, ‘শঠতা ও দূরভিসন্ধির ফল’, ‘ঐশিক ব্যবস্থার বিশ্বাস’, ‘সংসারে নম্র হইয়া চলা উচিত’, ‘দোষ স্বীকারের ফল’, ‘নিরপেক্ষা ও ন্যায়পরায়নতা’, ‘যথার্থ বিচার’, ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ প্রভৃতি শিরোনামের আখ্যান। আদর্শ মানব-চরিত্র গঠনে যা যা মানবীয় উপাদান দরকার, তার প্রায় সব কয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এখানে। সংসাওে শান্তি প্রষ্ঠিতার জন্য যে মানুষের সততা, নিষ্ঠা, পক্ষপাতহীন সামাজিক অবস্থান, সৃষ্টিকর্তার প্রতি অসীম আস্থা খুব প্রয়োজন, তা চোখে আঙুল দিয়ে বিদ্যাসাগর আমাদেরকে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করে গেছেন। আজও তাঁর বিপুল সমাজবাদী রচনা আমাদেরকে পথ চলতে সহায়তা করে। বর্তমান প্রজন্ম, বিদ্যাসাগরের দেখানো আদর্শ শিক্ষা ও নৈতিক চিন্তা থেকে যতোই দূরে সওে পড়ছে, ততোই সমাজের জন্য অমঙ্গলের পথ সুগম হচ্ছে। পৃথিবী যেন এখন নীতিহীনদের, ঠগদের, ধর্মহীনদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বিদ্যাসাগর জানেন, ‘ধার্মিকেরা সুখী’ আর ‘সংসারে সুখ মিষ্টিকথায়’।

এই পর্বে ‘ঐশিক ব্যবস্থার বিশ্বাস’ আখ্যান-প্রবন্ধে আমরা দেখি এক এতিম বালক কোনো ডাক্তারের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ নিতে গিয়েছিল। সে কার কাছে যেন শুনেছিল যে, তিনি লোক খুঁজছেন। কিন্তু ডাক্তার জানালেন- এই মুহূর্তে তার কাজের লোকের প্রয়োজন নেই। অবশ্য তিনি ছেলেটিকে নিরাশ না-হওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করেন। তখন, বালকটি ডাক্তারকে তার অবস্থানের কথা জানায়। বালকের বক্তব্যে তার জীবনদর্শন যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনই পাশাপাশি আমরা পেয়েছি এক আশাময়, সম্ভাবনাময় সমাজের ইঙ্গিত। বালকের বিবৃতি- ‘মহাশয়, যদিও আমি অশন বসন সর্ব বিষয়ে, অতিশয় ক্লেশ পাইতেছি, তথাপি একদিনের জন্যও হতোৎসাহ হই নাই, সম্পূর্ণ আশা আছে, আমি অচিরে কোনও স্থানে নিযুক্ত হইয়া আপনকার ক্লেশ দূর করিতে পারিব। দেখুন, এই পৃথিবী অতি প্রকা- স্থান। ঈশ্বর এই পৃথিবীর কোনও স্থানে অবশ্যই আমার জন্য কোনও ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন, এ বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।’

সত্যের জয় যে সুনিশ্চিত, সেই পুরনো কথা নতুন করে বলার চেষ্টা করেছেন বিদ্যাসাগর। ‘দোষ স্বীকারের ফল’ কলামটির ক্যানভাসে দেখা যায়, ফ্রান্সের এক রাজা গিয়েছেন জার্মানের এক কারাগার ভিজিট করতে। তো ভিজিটকালে অস্ত্রশালার তত্ত্বাবধায়ক রাজাকে অনুরোধ করেন যে, তার পছন্দ মতো কোনো এক কয়েদিকে মুক্ত করে দেবেন তিনি- এক্ষেত্রে রাজা স্বাধীন মতো তার পছন্দ ও মতামত জানাতে পারবেন। রাজা কারাগার পরিদর্শনকালে বিভিন্ন কয়েদির সাথে আলাপের ছলে জানতে চান- কেন সে কারাগারে। তখন একের পর এক কয়েদি বলতে থাকে- এই রাজ্যে কোনো ন্যায় বিচার নেই। বিনা কারণে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। ভালো মানুষদের রাজ্য এটা না- ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষমেশ রাজা একজনকে পেয়ে যান- যিনি নিজের দোষ স্বীকার করেন। তখন রাজা তত্ত্বাবধায়কের কাছে তার মুক্তির সুপারিশ করেন। ওই সত্যভাষী কয়েদির জবানবন্দি এখানে তুলে দিচ্ছি- ‘আমি অতি দুষ্টস্বভাব ব্যক্তি; স্বভাবদোষে কত লোকের উপর কত অত্যাচার করিয়াছি, বলিতে পারি না। প্রকৃত কথা বলিতে গেলে, আমার মত দুরাত্মা আর নাই। পূর্বে আমি আমার দোষ বুঝিতে পারিতাম না; এখনে সবিশেষ অনুধাবন করিয়া বুঝিতে পারিয়াছি, আমার যেরূপ গুরুতর অপরাধ, সে বিবেচনায় আমি লঘুদ- পাইয়াছি।’

এই গ্রন্থের তৃতীয় ভাগে স্থান পেয়েছে ‘যথার্থ বদান্যতা’, ‘পতিপরায়নতার একশেষ’, ‘দস্যু ও দিগি¦জয়ী’, ‘নৃশংসতার চূড়ান্ত’, ‘চাতুরীর প্রতিফলন’, ‘স্বপ্নসঞ্চয়ন’, ‘সৌভ্রাত্র’, ‘আশ্চর্য দস্যুদমন’, ‘যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ’, ‘অকৃত্রিম প্রণয়’, পুরুষ জাতির নৃশংসতা’ ইত্যাদি। আর কিছু শিরোনাম আছে, যা পূর্বের দুইটি ভাগে আছে। তবে, শিারোনাম প্রায় অভিন্ন হলেও উপাখ্যান কিন্তু আলাদা। এই অংশে সংসারে নারীর সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা, পুরুষতন্ত্র, ভালোবাসার মাহাত্ম্য, পারস্পারিক সম্প্রীতি, দস্যুবৃত্তি ও নৈরাজ্য, মানুষের নৃশংস রূপ- সবকিছুই তিনি তুলে ধরেছেন কাহিনি বা উপাখ্যানের মোড়কে। এগুলো ফিকশন আবার কোনো কোনো বিবেচনায় নন-ফিকশন।

আখ্যানমঞ্জরী একটি আদর্শ সমাজবিধান। বিদ্যাসাগর যে-সমাজে বসবাস করেন, তার রূপান্তরের জন্য দিনরাত চিন্তা করেছেন। কল্পনা ও পরিকল্পনা করেছেন- কীভাবে সমাজের অসঙ্গতিগুলো দূর করে, সামাজিকের অজ্ঞতা ঠেলে সরিয়ে একটা শান্তিময়, স্বস্তিকর সমাজ-কাঠামো নির্মাণ করা যায়। কাজেই, আখ্যানমঞ্জরীর রচয়িতা একজন সমাজবিজ্ঞানী। সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের সফল কারিগর।