বিদ্রোহী কবিতা রচনার কাল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি মোতাবেক ১৩২৮ বঙ্গাব্দ ২২ শে পৌষ ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এ কবিতা রচনাকালে কবির বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। কিশোর বয়সে এই বিস্ময়কর কবিতা লিখলেন তিনি, যা আজও পর্যন্ত বিশ্বসাহিত্যে বিরল। স্বভাবত প্রশড়ব জাগে—কেন তিনি বিদ্রোহ করলেন এবং কার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেন? এর উত্তর এ কবিতা থেকে সহজে না পাওয়া গেলেও তাঁর সমসাময়িক সময়ের গদ্যরচনা থেকে এর যুৎসই উত্তর পাওয়া যাবে।
ভারতবর্ষ এ সময় ইংরেজদের অধীনে শাসিত ছিল। ৭০০ বছরের স্বাধীন ভারত জোর করে ছলে-বলে-কৌশলে মোগল শাসকদের নিকট থেকে দখল করে নেয় ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠি। দখলদার এই শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব, অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, তিতুমীরের জেহাদ, শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, মুসলিম লীগের আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, প্রভৃতি সংঘ ও সংগঠন স্বাধীনতা আন্দোলন করেছে। সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে এর তেমন কোন প্রভাব দেখা যায়নি। না রবীন্দ্রনাথ, না সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, না অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, না মোহিতলাল মজুমদার—এরা কেউ স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহের কবিতা, জাগরণের কবিতা লিখেননি। বাংলায় একমাত্র ইসমাঈল হোসেন সিরাজী লিখলেন ‘অনল প্রবাহ’ যা ইংরেজরা বাজেয়াপ্ত করে। নজীবর রহমান সাহিত্যরতড়ব লিখলেন গদ্য ‘বিলেতী বর্জন’- এটাও ইংরেজরা বাজেয়াপ্ত করে।
এই টালমাটাল সময়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে ধুমকেতুর মত আবির্ভাব ঘটল নজরুলের। প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা থেকে জানা যায়-

‘বাংলা সাহিত্যে এই শতাব্দীর তৃতীয় দশকের গোড়ায় একবার কিন্তু এমনি অকস্মাৎ তুফানের দূরন্ত দোলা লেগেছিল। সে দোলা যারা প্রত্যক্ষভাবে সেদিন অনুভব করেননি- তাদের পক্ষে শুধু লিখিত বিবরণ পড়ে সে অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ স্বাদ পাওয়া বোধ হয় সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের কাব্য প্রতিভার তখন মধ্যাহ্ন দীপ্তি। দেশের যুব মনে তার আসনও পাকা। তারই মধ্যে হঠাৎ আর একটা তীব্র প্রবল তুফানের ঝাপটা কাব্যের রূপ নিয়ে তরুণ মনকে উদ্বেল করে তুলেছিল।
আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি-
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি।
কবিতার ছন্দে ও ভাষায় একি উত্তাল-তরঙ্গ। কার কণ্ঠে ধ্বনিত এ প্রচণ্ড কল্লোল? …মনে আছে, বন্ধুবর কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত একটি কাগজ কোথা থেকে কিনে নিয়ে অস্থির উত্তেজনার সঙ্গে আমার ঘরে এসে ঢুকেছিলেন। কাগজটা সামনে মেলে ধরে বলেছিলেন- পড়। অনেক কষ্টে যোগাড় করেছি। রাস্তায় কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে এ কাগজ নিয়ে। কি সে এমন কাগজ? … পড়লাম কবিতার নাম ‘বিদ্রোহী’। সেদিন ঘরে-বাইরে, মাঠে-ঘাটে, রাজপথে-সভায় এ কবিতা নীরবে নয়, উচ্চকণ্ঠে শত শত পাঠক পড়ছে। সে উত্তেজনা দেখে মনে হয়েছে, কবিতার জ্বলন্ত দীপ্তি এমন তীব্র যে ছাপার অক্ষরই যেন কাগজ ঝলসে আগুন ধরিয়ে দেবে। … এমন কবিতা এ দেশের তরুণরা যেন এই প্রথম হাতে পেয়েছিল। তাদের উদ্দাম হৃদয়ের অস্থিরতারই এ যেন আশ্চর্য প্রতিধ্বনি। এ কবিতা যে সেদিন বাংলাদেশকে মাতিয়ে দেবে তাতে আশ্চর্য হবার কি আছে! [নজরুল সন্ধ্যা, নজরুল প্রসঙ্গ]

বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন-
বিদ্রোহী পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিক পত্রে- মনে হলো এমন কখনো পড়িনি। অসহযোগের অগিড়বদীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করছিল, এ যেন তাই; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এ-ই যেন বাণী। [নজরুল ইসলাম, কালের পুতুল]

বিদ্রোহী কবিতায় বিদ্রোহের পঙক্তিমালা:
১. আমি ধূর্জটি, আনি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর !
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
২. আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।
৩. আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব-সৃষ্টির মহানন্দে।
৪. মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত ,
যবে উৎপীড়িতের μন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
৫. আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
৬. আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিনড়ব!

নজরুলের এ বিদ্রোহের কারণ তাঁর গদ্য রচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। উদ্ধৃতি-
১. সর্বপ্রথম, ‘ধুমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেন না, ও-কথার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারত বর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারত বর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন-ভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশান ভূমিতে পরিণত করেছেন, তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোচকা পুটলি বেঁধে সাগর পারে পাড়ি দিতে হবে। [ধুমকেতু’র পথ]
২. পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা-নিষেধের বিরুদ্ধে।

আর এই বিদ্রোহ করতে হলে- সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে- ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ’। [ঐ]
৩. ভগবানের বুকে লাথি মারবার অসম সাহসিকতা নিয়ে বেরিয়েছিলেন মহা বিদ্রোহী ভৃগু। কেন না সে তাঁকে বোঝেনি, তাঁর ভুল। ভুল বলে শোধরাবার চেষ্টা করেছিল, ভগবান যখন তা শুনলেন না, ঘুমিয়ে রইলেন তখন ভৃগু ভগবানের বুকে লাথি মেরে জাগালে। ভগবানও ভৃগুর পদ-চিহ্ন সগৌরবে বক্ষে ধারন করলেন।
৪. তোমার হাতের এ লাঙল আজ বলরাম স্কন্ধ হলের মত ক্ষিপ্ত তেজে গগনের মাঝে উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠুক, এই অত্যাচারীর বিশ্ব উপড়ে ফেলুক-উলটে ফেলুক। আনো তোমার হাতুড়ি, ভাঙ ঐ উৎপীড়কের প্রাসাদ- ধুলায় লুটাও অর্থ-পিশাচ বল-দর্পীর শির। তুলে ধর তোমার বুকের রক্ত মাখা লালে লাল ঝাণ্ডা [রুদ্র মঙ্গল]
৫. নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেন না আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা, আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্য দ্রষ্টা ঋষির আত্মা। আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এ আমার অহঙ্কার নয়, আত্ম-উপলব্ধির আত্মবিশ্বাসের চেতনা লব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। [রাজবন্দীর জবানবন্দী : নজরুলের প্রবন্ধ সমগ্র, পৃ ৭৪]

ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হলে আত্মশক্তিতে জয়ী হতে হবে প্রথম। দেশ স্বাধীন করতে হলে ভীরুচিত্ত দিয়ে হবে না, জনগোষ্ঠির মধ্যে বিভেদ বা স্বাধীনতার প্রশেড়ব দ্বিমত থাকলে সেগুলোর নিরসন আগে করতে হবে। একটি পুরাতন স্থাপনার স্থলে নতুন কোন স্থাপনা করতে হলে- পুরাতনকে ভেঙে নতুনকে গড়তে হবে। এজন্য বিদ্রোহীদের ভাঙার বা ধ্বংস করার সাহসিকতার সাথে নতুন গড়ারও যোগ্যতা থাকতে হবে। ধ্বংসের পরেই সৃষ্টি- এ দ্বিবিধ গুণাবলী থাকতে হবে। নইলে নতুন সমাজ, নতুন দেশ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

বিদ্রোহী বা স্বাধীনতাকামীদের চরিত্র সম্পর্কিত পঙক্তিমালা:
১. আমি চির দুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস
২. আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি নাকো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
৩. আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ !
৪. আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা,
৫. আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর
৬. আমি হোম-শিখা, আমি সাগিড়বক জমদগিড়ব,
৭. আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান!
৮. আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
৯. আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
আমি চণ্ড ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!
১০. আমি খ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
১১. আমি প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস,-আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
১২. আমি কভু প্রশান্ত,-কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী!
১৩. আমি বসুধা-বক্ষে আগেড়বয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগিড়ব-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!

ধ্বংস ও সৃষ্টি করার যোগ্যতা সম্পনড়ব দ্রোহী স্বাধীনতাকামীদের উপরোক্ত চরিত্রের তির্যক পঙক্তি কবির স্ববিরোধীতা নয় বরং দেশপ্রেমিক মানবগোষ্ঠির চরিত্রশক্তির অমোঘ উপাদান। এ প্রসঙ্গে কবির গদ্যরচনার ও কাব্যপঙক্তির সমতুল্য উদ্ধৃতি:
১. এ দেশের নাড়িতে-নাড়িতে অস্থি-মজ্জায় যে পচন ধরেছে, তাতে এর একেবারে ধ্বংস না হলে নতুন জাত গড়ে উঠবে না। যার ভিত্তি পচে গেছে, তাকে একদম উপড়ে ফেলে নতুন করে ভিত্তি না গাঁথলে তার ওপর ইমারত যতবার খাড়া করা যাবে, ততবারই তা পড়ে যাবে। [আমার পথ: রুদ্র মঙ্গল]
২. স্তুপীকৃত শবের মাঝে শিবের জটার কচি শশী হেসে উঠুক! এই কুৎসিত অসুন্দর সৃষ্টিকে নাশ কর, নাশ কর হে সুন্দর রুদ্র দেবতা! এই গলিত আর্ত সৃষ্টির প্রলয় ভষ্মটিকা পরে নবীন বেশে এসে দেখা দাও। [রুদ্র মঙ্গল]
৩. জাগো জনশক্তি! হে আমার অবহেলিত পদপিষ্ট কৃষক, আমার মুটে-মজুর ভাইরা! তোমার হাতের এ লাঙ্গল আজ বলরাম স্কন্ধে হলের মত ক্ষিপ্ত তেজে গগনের মাঝে উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠুক, এই অত্যাচারীর বিশ্ব উপড়ে ফেলুক-উলটে ফেলুক! আনো তোমার হাতুড়ি, ভাঙ ঐ উৎপীড়কের প্রাসাদ, ধুলায় লুটাও অর্থ-পিশাচ বল দর্পীর শির! [রুদ্র মঙ্গল]

৪. পাতাল পুরের নিদ্রিত অগিড়বসিন্ধুতে ফুঁ দাও, ফুঁ দাও- ফুঁ দিয়ে জ্বালাও তাকে! আসুক নিখিল অগিড়বগিরির বিশ্ব-ধ্বংসী অগিড়বস্রব, ভষ্মস্তুপে পরিণত হোক এ অরাজক বিশ্ব। [তুব্ড়ি বাঁশির ডাক: দুর্দিনের যাত্রী]

স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী কর্মীদের অত্যাচারী শাসকদের সিংহাসনে, বুকে, বিদ্রোহী ভৃগুর মতো লাথি দিতে হবে। এ কাজ করতে গেলে জেল জুলুম নির্যাতন অত্যাচার নেমে আসবে নবী ইব্রাহিমের মত। যেমন নমরুদ তাকে আগুনের কু-লীতে ফেলে দিয়েছিল ধ্বংস করার জন্য, কিন্তু সত্য প্রচারক বিপ্লবী ইব্রাহিমের সাহস ও সত্যপ্রিয় হাসিতে আগুন ফুলের বাগান হয়েছিল। বিপ্লবী কর্মিদের এ রূপ দ্রোহ ও বিপ্লব বাস্তবভাবে করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
এ জাতীয় পঙক্তিমালা:
১. আমি ছিনড়বমস্তা চিণ্ড, আমি রণদা সর্বনাশী,
২. আমি জাহানড়বামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
৩. আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
৪. আমি স্রষ্টা সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিনড়ব!

উপরোক্ত পঙক্তিমালার স্বপক্ষে কবির বিভিনড়ব গদ্য থেকে কিছু উদ্ধৃতি:
১. ভগবানের বুকে লাথি মারবার অসম সাহসিকতা নিয়ে বেরিয়েছিলেন মহাবিদ্রোহী ভৃগু। কেননা সে তাকে বোঝেনি, তার ভুলকে ভুল বলে শোধরাবার চেষ্টা করেছিল, ভগবান যখন তা শুনলেন না ঘুমিয়ে রইলেন, তখন ভৃগু ভগবানের বুকে লাথি মেরে জাগালো। ভগবনও ভৃগুর পদ-চিহ্ন সগৌরবে বক্ষে ধারণ করলেন। ভাবতেও চক্ষে জল আসে। কিন্তু ভগবানের যারা বিদ্রোহী নয়, গো-বেচারি ভক্ত—ভগবানকে প্রভু ভেবে জনম-জনম কাটিয়ে দিলে সাধনায়, তাদের হয়তো সিদ্ধি তিনি দিলেন কিন্তু তাদের কারুর পদাঘাত বুকে ধারণ করে দেখলেন না।

এর আসল মানে হচ্ছে, সত্যকে জানবার যার বিপুল ইচ্ছা থাকে তার আঘাতও সত্য সহ্য করে। বুকে করে নিয়ে তার সত্য-নিষ্ঠ, সত্য জাগাবার আকাঙ্খাকে জগতের ভীরু কাপুরুষ ভ–ভক্তদের চোখের সামনে দেখায় যে, এই ফকির পুজারীর নন্দনে সত্য জাগে না। সত্যকে জাগাবার জন্য বিদ্রোহ চাই, নিজেকে শ্রদ্ধা প্রশংসার লোভ থেকে রেহাই দেওয়া চাই। [ধুমকেতুর পথ: রুদ্রমঙ্গল]
২. যে ভৃগু নিদ্রিত ভগবানের বুকে লাথি মেরে জাগায়, সে ভৃগুকে আমি প্রণাম করি। যে নরমু- মালিনী চণ্ডি নিদ্রিত শিবের বুকে তা-ব নৃত্য করে প্রলয় করতালি বাজিয়ে তাকে জাগিয়ে তোলে, সেই অশিব নাশিনীর উদ্দেশ্যে আমার কোটি নমস্কার। শিবকে জাগাও, কল্যাণকে জাগাও। আপনাকে চেনো। বিদ্রোহের মতো বিদ্রোহ যদি করতে পারো, প্রলয় যদি আনতে পারো তবে নিদ্রিত শিব জাগবেই, কল্যাণ আসবেই। লাথির মতো যদি লাথি মারতে পারো, তা হলে ভগবানও বুকে করে রাখে। ভৃগুর মতো বিদ্রোহী হও, ভগবানও তোমার পায়ের ধুলো নেবে। [মোরা সবাই স্বাধীন মোরা সবাই রাজা]

৩. ইবরাহিম যখন বিদ্রোহী হয়ে নমরুদের অত্যাচারকে অত্যাচার আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলে প্রচার করে বেড়াতে লাগলেন, তখন নমরুদ তাকে ধরে এক বিরাট অগিড়ব-জাহানড়বামের সৃষ্টি করে তাতে নিক্ষেপ করলো। কিন্তু ইবরাহিমের কোথাও ফাঁকি ছিল না বলে তার আত্মপ্রসাদ ঐ বিপুল আনন্দের এক ফুঁতে সমস্ত জাহানড়বাম ফুল হয়ে হেসে উঠল। ইবরাহিমের মনে যদি এতটুকু ফাকি থাকত, তবে তখনই নমরুদের আগুন তাকে ভষ্মীভূত করে দিত। [ধুমকেতুর পথ]

৪. উল্কা আমাদের মালা-খসা ফুল, সাইক্লোন আমাদের প্রিয়ার এলোকেশ। সূর্যকু- আমাদের ভগবানাগার। অনন্ত নরক কুঞ্জ। এই অমঙ্গল অভিশাপ আর শনির জ্বালানো রুদ্র-চুল্লির মধ্যে বসে তোমাদের নবসৃষ্টির সাধনা করতে হবে। তোমাদের এই রুদ্র তপস্যার প্রভাবে সকল নরকাগিড়ব ফুল হয়ে ফুটে উঠবে। যেমন- ইবরাহিমের পরশে নমরুদের জাহানড়বাম ফুল হয়ে হেসে উঠেছিল। এস আমার অভিনব তরুণ তপস্বীর দল। তোমাদের ধ্বংসের আহবান করছি।

[আমরা লক্ষ্মী ছাড়ার দল : দুর্দিনের যাত্রী]
দেশ-দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বিপ্লব করতে হবে। অচলায়তন ভাঙতে হবে, নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হবে। এ জন্য সংগ্রামী স্বাধীনতাকামীদের সর্বপ্রথম নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করতে হবে। শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্ব অর্জন করতে হবে, নইলে ক্ষাত্রশক্তির বিরুদ্ধে সফল লড়াই করা যাবে না- বিজয় আনা যাবে না। এ জন্য নজরুল এ কবিতায় প্রথমেই নিজেকে তথা স্বাধীনতাকামী ব্যাষ্টিক আমিকে বোধন করেছেন, তার উত্থান ও বড়ত্ব ঘোষণা করেছেন-
১. বল বীর-
বল উনড়বত মত শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
২. বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি

চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
৩. আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
৪. আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।
৫. আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
৬. আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উনড়বত শির!

কবি কেন প্রত্যয়ী, কেন শ্রেষ্ঠ তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে তাঁর বিভিনড়ব কলাম, প্রবন্ধ নিবন্ধে। উদ্ধৃতি-
১. আমি পরম আত্মবিশ্বাসী। তাই যা অন্যায় বলে বুঝেছি, তাকে অন্যায় বলেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি,- কাহারো তোষামোদ করি নাই, প্রশংসার এবং প্রসাদের লোভে কাহারো পিছনে পোঁ ধরি নাই- আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের, জাতির, দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য তরবারির তীব্র আক্রমন সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি, —তার জন্য ঘরে-বাইরের বিদ্রুপ, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত আমার উপর অপর্যাপ্ত পরিমান বর্ষিত হয়েছে। কিন্তু কোন কিছুর ভয়েই নিজের সত্যকে, আপন ভগবানকে হীন করি নাই। লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম-উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই। নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই। কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা, আমি যে
কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা।
আমি অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, এ আমার অহঙ্কার নয়, আত্ম-উপলব্ধির আত্মবিশ্বাসের চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি। [রাজবন্দীর জবানবন্দি]
২. অনাগত অবশ্যম্ভাবী মহারুদ্রের তীব্র আহ্বান আমি শুনিয়াছিলাম। তাঁর রক্ত আঁখির হুকুম আমি ইঙ্গিতে বুঝেছিলাম। আমি তখনই বুঝেছিলাম আমি সত্য রক্ষার, ন্যায় উদ্ধারের বিশ্ব-প্রলয় বাহিনীর লাল সৈনিক। বাংলার শ্যাম শ্মশানের মায়া নিদ্রিত ভূমে আমায় তিনি পাঠিয়েছিলেন অগ্রদূত তূর্যবাদক করে। [রাজবন্দীর জবানবন্দী]

ব্যক্তিত্ব, আমিত্ব তথা মুক্তিকামী মানবাত্মার বড়ত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হলে, নেতৃত্বের পরিবর্তনের প্রবল আকাঙ্খা থাকতে হবে। সে যোগ্যতা থাকতে হবে। স্বাধীনতাকামীরা, বিপ্লবী-বিদ্রোহীরা যা চাচ্ছে, তা সাধারণ জনগণকে বিপুলভাবে কামনা করতে হবে- এ জন্য বিপ্লবী এবং বিদ্রোহীদের জনসমর্থন কেমন হতে হবে, কত প্রবল হতে হবে তা নজরুল বিভিনড়ব চিত্রকল্পে ও রঙের মাধ্যমে অত্যন্ত আধুনিকভাবে তুলে ধরেছেন।
উদ্ধৃতি:
১. মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য!
২. আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধির!
৩. আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী নয়নে বহ্নি,
৪. আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেমউদ্দাম, আমি ধন্যি।
৫. আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশির!
৬. আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
৭. আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতিফের!
৮. আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
৯. চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
১০. আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-করে-দেখা-অনুখন,
১১. চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন চুড়ির কন-কন।
১২. আমি যৌবন-ভিতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!
১৩. আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া!

উপরোক্ত উদ্ধৃতিসমূহে দেখা যায় একজন বিপ্লবী বা বিদ্রোহীকে নারী বা কিশোরীর প্রেম আকাঙ্খার মত পরম আকাঙ্খিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এর মানে তাকে প্রেমিক হতে হবে- তার বিপ্লব বিদ্রোহকে নারীর ভালোবাসার মত পরম আকাঙ্খিত করে তুলতে হবে।
আবার সুবিধা বঞ্চিত, অথবা বিরহী, বিধবা বা করুণাকামীর প্রতি সাধারণের যে অনুরাগ সমবেদনা থাকে, একজন বিপ্লবীর চারিত্রেও সাধারণের তদ্রুপ আকাঙ্খা থাকতে হবে।
এটা আপাতবিরোধী চরিত্র মনে হলেও এটা মানব চরিত্রের একটি পরম আকাঙ্খার বিষয়। এই বিরোধাভাস অলঙ্কারে কবি বিপ্লবীকে জনগ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়াস চালিয়েছেন। এটা বিদ্রোহী বা বিপ্লবী চরিত্রের রূপ নয় বরং বিদ্রোহীর প্রতি পরম প্রগাঢ় ভালোবাসা, তার ইচ্ছার বা কামনার চরম পরাকাষ্ঠার প্রতিরূপ। এটাও শিল্পের একটি বিদ্রোহ। বিদ্রোহী কবিতার মূল লক্ষ্য হলো দেশ, জাতিকে মুক্ত করা- পরাধীনতা, নিপীড়ন, উৎপীড়ন, অন্যায় যুদ্ধ-বিগ্রহের বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রাম করে বিশ্বকে নিঃক্ষত্রিয় করা।
উদ্ধৃতি:
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব-সৃষ্টির মহানন্দে!
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!