কাজী নজরুল ইসলামের অমর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। ১৯২১-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতার তালতলা লেনের বাসাবাড়িতে একদিন একটি নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ঘটল। কবি লিখলেন,
‘বল বীর
বল উন্নত মামা শির!
শির নেহারি আমার নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির’।
কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪ সি বাড়িটি বিদ্রোহী কবিতার জন্মস্থল। দ্বিতল বাড়িটির নীচতলার দক্ষিণ পূর্ব ঘরটিতে ভাড়ায় থাকতেন কবি নজরুল ইসলাম এবং কবিবন্ধু বিশিষ্ট সমাজকর্মী কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদ।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে আলাপচারিতাই মুজাফ্ফর আহমেদ লিখেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী কবিতাটি লিখেছিল রাত্রীতে। রাত্রীর কোন সময়ে তা আমি জানি না। রাত ১০ টার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে তখন পড়ে শোনাল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। ‘কবিতাটি কখন লেখা হয়েছিল, সে প্রসঙ্গে মুজাফ্ফর আহমেদ লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম শেষ রাতে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। তাঁর ঘুম সাধারণত দেরিতেই ভাঙত, আমার মত তাড়াতাড়ি তার ঘুম ভাঙত না।’ [কাজি নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা-মুজাফ্ফর আহমেদ]

কবিতাটি প্রথম কোন পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল, এই বিষয়ে বিতর্ক আছে। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, ‘বিজলি’তে ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, বাংলা ২১ পৌষ ১৩২৮ -এ। কবি প্রকাশের জন্য কবিতাটি প্রথম দিয়েছিলেন ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার আফজলউল হক সাহেবকে। ‘মোসলেম ভারত’ এর কথিত সংখ্যাটি বার হতে দেরি হওয়ায় কবি’ বিদ্রোহী ‘ কবিতাটি’ বিজলী ‘তে প্রেরণ করেন এবং সেটি আগেই প্রকাশিত হয়। সেইদিক থেকে দেখলে ‘বিজলী’তেই কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘মোসলেম ভারত’- এ কবিতাটি প্রকাশিত হয় ১৩২৮ -এর কার্তিক সংখ্যায়। ‘প্রবাসী’ তে প্রকাশিত হয় ১৩২৮ -এর মাঘ সংখ্যায় আর ‘সাধনা’য় ১৩২৯-এর বৈশাখ সংখ্যায় এবং ‘ধূমকেতু’তে ২২ আগষ্ট ১৯২২সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়।

কবিতাটি সেই সময় সারা দেশকে আন্দোলিত করেছিল (এখনও …)। একাধিক পত্র পত্রিকাই সহস্রবার মুদ্রিত হয়েছে কবিতাটি। রাতারাতি কাজী সাহেবের কাব্যখ্যাতির নেপথ্যেও এই কবিতাটির অবদান সসীম। কবিতাটি যেমন নজরুল ইসলামকে খ্যাতির চূড়ায় উপনীত হতে সাহায্য করেছিল, তেমনি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের জন্মও দিয়েছিল কবিতাটি। নজরুল অনুগামী মোহিতলাল মজুমদারের মনে হয়েছিল, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আত্মবাচক ‘আমি’ শব্দটি কাজী তাঁর রচিত ‘আমি’ নামক প্রবন্ধ থেকে বিদ্রোহী কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় মোহিতলালের এই অভিযোগ খণ্ডন করে ‘মোসলেম ভারত’ সম্পাদককে একটি চিঠিও লেখেন। এই বিষয়টি সেই সময় কবিকে বিড়ম্বনায় ফেলেছিল। সাহিত্য মোহিতলালের সঙ্গে কবির সম্পর্কও তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও, সমালোচক মোহিতলালের এহেন ভাবনা অহেতুক এবং অমূলক। কেননা, মোহিতলাল মজুমদার যে প্রবন্ধটির ভাববস্ত্ত আত্মস্থ করবার অভিযোগ নজরুলের উপর এনেছিলেন, সেটি তাঁর মৌলিক কোন রচনা নয়। ক্ষেত্রমোহন বন্দোপাধ্যায় রচিত ‘অভয়ের কথা’ প্রবন্ধের ভাববস্তু ধারণ করে তিনি লিখেছিলেন ‘আমি’ নামক প্রবন্ধখানি। সাহিত্যে কোন বিষয় ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া দোষের কিছু নয়।

কবিতাটির প্রকাশ নজরুলকে বহুল আলোচিত করে তোলে। কবিকে হিসাবে প্রতিষ্ঠা পান নজরুল। ‘বিদ্রোহী’ তখন জনমানবের গণসঙ্গীত হিসাবেই গীত হতে থাকে। কবি পেলেন বিদ্রোহী কবির তকমা। কাব্যজগতে হঠাৎ করেই কবির এই গৌরবময় অবস্থান ও প্রতিপত্তি মেনে নিতে অনেক সাহিত্যমানসের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াল। এঁদের মধ্যে নেতৃত্বস্থানীয় ছিলেন ‘ শনিবারের চিঠি’ সাহিত্যপত্রের সম্পাদক সজনীকান্ত সেন। সজনীকান্ত প্যরোডি (ব্যঙ্গাত্মক কবিতা) লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি প্রায় সকল সমসাময়িক কবিবর্গের বিরুপ সমালোচক ছিলেন (মাইকেল মধুসূদন দত্তকেও ছাড়েননি সজনীবাবু)। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সজনীকান্তের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলাম। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ভাঁড়সদৃশ একটি প্যরোডি লিখলেন সজনীকান্ত-
‘আমি ব্যাঙ
লম্বা লম্বা ঠ্যাং
ভৈরব রসে বরষা আসিলে,
ডাকি যে ঘ্যাঙর ঘ্যাঁং
আমি ব্যাঙ।’
শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেই ক্ষান্ত হননি সজনীকান্ত। সরাসরি কবি নজরুল ইসলামকে ব্যক্তি আক্রমণ করতেও পিছপা হননি তিনি। সজনী লেখেন-
‘গাজী আব্বাস বিটকেল
কল্লি মহাখিটকেল!
লিখে ফেললি কাববি
তাও আবার ছাপবি?
ছাপলেও কাটবে না
কেউ তা চাটবে না।’
শুধু সজনীকান্ত নন, তাঁকে দেখাদেখি অন্যান্য সজনী অনুসারী কবিবর্গও নজরুল ইসলামকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তুললেন । অশোক চট্টোপাধ্যায় লিখলেন-
‘ভাবি শ্বশুরের হিসাব খতিয়া
তরুণ বাঙ্গালি সাগর মাথিয়া
উঠেছি যে আমি নিছক শুদ্ধক্ষীর
আমি বীর!’

শুধু প্যরোডিই নয়, বিদ্রোহী প্রকাশের পর পরই একাধিক পত্র পত্রিকায় কবি এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বিরোধী নিন্দায় মুখর হয়ে উঠলেন সমকালীন কবি নামের অকবিগণ। তেমনই একজন ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল হাকিম ১৩২৯ এর কার্তিক সংখ্যায় লিখলেন ‘বিদ্রোহ দমন’। কয়েকটি চরণ-
‘ওগো বীর
অসংযত বিদ্রোহী অধীর।
সংযত হয়ে নমিত কর তব গর্বিত উন্নত শির।’
একই পত্রিকার একই বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় গোলাম হোসেন নামক জৈনক কবি লিখলেন-
‘তুমি অহংকার মত্ত ইবলিস
তুমি রুদ্র পিশাচ শয়তান খাবিস!’
তুলনায় উন্নত সাহিত্য মানস কবি গোলাম মোস্তফাও নাম লিখিয়ে ফেলেন নজরুল বিরোধীদের দলে। সওগাত পত্রিকায় ‘নিয়ন্ত্রিত’ শিরোনামে কবি লিখলেন-
‘ওগো বীর
সংযত কর, সংহত কর ‘উন্নত’ তব শির।
বিদ্রোহী? শুনে হাসি পায়!
বাঁধন-কারার কাঁদন কাদিয়া বিদ্রোহী হতে সাধ যায়?
সেকি সাজে রে পাগল সাজে তোর?

‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠতম এবং বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে বিরলতম কবিতাগুলির একটি এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। নজরুল কাব্যসাহিত্যের সুউচ্চ পর্বতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা হল এভারেষ্ট সদৃশ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। কবিতাটি কবিকে দিয়েছিল কাব্য খ্যাতি, জনপ্রিয়তা। বাংলা কাব্যের পাঠকগণ কবিকে আপন করে নিয়েছিলেন। হিতকরী সাহিত্য সমালোচকগণ প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন কবিকে। তবে, শুধু জনপ্রিয়তা কাব্যখ্যাতিই নয়, কবিতাটি প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একদল কবি নামের অকবিদের প্রবল বিরুধীতার মুখোমুখি হতে হয় কবিকে। হিংসুটে এই সকল কবিবর্গ কবিকে নিয়ম করে আক্রমণ করতে থাকেন। ক্ষতবিক্ষত করতে সচেষ্ট হন তাঁর কাব্যমানসকে। কয়লা যেমন শত সহস্র প্রচেষ্টা করেও হীরার উপস্থিতি গোপন করতে পারে না, তেমনি নিন্দুকগণ কবি কাজীর সাহিত্য প্রতিভার গতিকে তো রুদ্ধ করতে পারলেন না, বরং নিজেরাই হারিয়ে গেলেন কালের গর্ভে। বেঁচে থাকলেন কবি নজরুল ইসলাম-
‘মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহতারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যূলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া ….’
প্রয়াণ দিবসে, প্রাণের আরাধ্য কবিকে শতকোটি শ্রদ্ধাঞ্জলি॥