[ঘরে ফেরার সময় হ’তেই মৃদু কান্নার শব্দে মনে হয়; কিছু ফেলে যাচ্ছি নাতো! / নীল ফুল, টক-ঝাল স্বপ্ন, ছদ্ম আদর্শ, কিম্বা অটুট অস্বীকারে বিমুখ প্রেম / অগাধ ধোঁয়া বুক ভাড় করে তোলে / লোকে ভাবে; কিছু দোষ করে ফিরছি / তাকিয়ে দেখি পড়ে আছে আমার জন্মঋণ / আমার স্মৃতিছুট সময় !! বিদ্যুৎ ভৌমিক ]

ভেন্টিলেটারের ভিতর দিয়ে যতটা নীলাশ্মদ্যুতি ছড়ানো আকাশটা দেখা যায়, তার ৯৩ ভাগ সমাধিস্থ থাকে অনেকেরই অন্তস্থলে। যা মনের সমুদ্রে বালতি ডুবিয়ে অন্তঃদর্শনকে চোখের ও প্রজ্ঞার পৃষ্ঠায় তুলে আনার আদ্যোপান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ডেভিড হিউম। ১৭২৩ খ্রীস্টাব্দে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন! কলা বিভাগে গ্রীক ভাষা ও সাহিত্য, তর্রশাস্ত্র, অধিবিদ্যা অধ্যায়নের জন্য তাঁর নাম বিশেষ ভাবে নিথিভুক্ত হয়েছিল। এই বিষয়গুলি ছাড়াও ঐচ্ছিক বিষণ্ণ হিসাবে তিনি গ্রহণ করেছিলেন নীতিবিদ্যা ও গণিত শাস্ত্র। সেই সময়-এর অধিকাংশ ছাত্রের মত ডেভিড তিন বছর শিক্ষাগ্রহণ-এর পর কোনরকম ডিগ্রি ব্যাতিরেকেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর কেতাবী শিক্ষার অবসান হলেও তিনি যে অত্যন্ত জাগ্রতমনা অনুসন্ধিৎসু ছিলেন; এ ব্যাপারে কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই! জ্ঞান পিপাসা নিবারণে ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনে ডেভিড নিজেকে অহর্নিশ ডুবিয়ে রাখতেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর এমন এক সময়ে প্রবহমান হচ্ছিল যখন ব্রিটিশ দার্শনিক ও চিন্তানায়করা ধর্ম ও নৈতিকতার স্বরূপ নিয়ে সক্রিয় আলোচনায় নিবেদিত ছিলেন। ঐ সময়েই ঈশ্বর বিষয়ক গভীর আলোচনার ঝড় ওঠে, গড়ে ওঠে ঈশ্বরবাদী তত্ত্ব। ঈশ্বরবাদ এটা বলা হয় যে, প্রতিটি মানুষেরই স্বাভাবিক ধর্ম আছে যা কেবল মাত্র প্রজ্ঞার সাহায্যে আবিষ্কৃত হয়ে থাকে। সমালোচিত হয় নৈতিক মানবদন্ডরূপে কৃচ্ছতাবাদ যা কিনা মানব প্রকৃতির সহজাত অনুভূতিকে অবহেলা করে বুদ্ধির বিচারকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়। ঈশ্বরবাদ ও কৃচ্ছতাবাদ এই বুদ্ধিবাদী মতবাদগুলোর বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর ছিলেন শ্যাপটসবারী, বিশব বার্কলে, বিশব যোশেফ বাটলার ও ফ্রান্সিস হাটচিসন। সমসাময়িক সাহিত্য ও দর্শনে আগ্রহী ডেভিড হিউম- এর কাছে এঁদের লেখা অজ্ঞাত ছিল না। কেবল সমসাময়িক চিন্তাতেই তিনি কখনই তুষ্ট থাকতেন না। তিনি পূর্বতন ইংরেজি সাহিত্যের এবং মনীষীকূলের; যথা স্যামুয়েল ক্লার্কের Demonstration of the and attributes of God. নিউটনের Principia লকের Essay on human understanding. হবসের Human nature and leviathan বেকনের Novum organum. The advancement of learning. ইত্যাদি শক্তিশালী রচনা সমুদ্রে অবগাহন করতেন। কেবল ইংরেজ চিন্তাধারাতেই নয়, ফাদার ম্যাল ব্রাঁ, রেনে দেকার্ত ইত্যাদি ফরাসি দার্শনিকবৃন্দের রচনাতেও ডেভিড হিউম নিমগ্ন থাকতেন। প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যে সিমেরো, মেনেকো ও প্লুটার্ক এর প্রতি ডেভিডের প্রবল ও অসীম অনুরাগ ছিল। পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের জগতে এই বিশিষ্ট বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গের মত যশ অর্জনের এক অদম্য অভিলাষ ছিল দার্শনিক ডেভিড হিউমের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে নাইন ওয়েলসে ফিরে আসার পর তাঁর পরিবারের ইচ্ছানুসারে তিনি আইন অধ্যায়নে রত হয়েছিলেন। পিতার মত ডেভিডও আইন ব্যবসাকে জীবিকা হিসেবে অন্তরে গ্রহণ করবেন এই ছিল মায়ের একমাত্র ইচ্ছা। কিন্তু ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শন ইত্যাদি বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা ভিন্ন অন্য কিছুতে তাঁর নিজস্ব কোন অভিরুচি ছিল না। তাই অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর আইন অধ্যয়নের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাঁর দর্শন ও সাহিত্যে আসক্তি ও অনুরাগ এত গভীর ছিল যে অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে ডেভিডের
মনে এক অলখ্য বিরূপতা তৈরি হয়েছিল । শুধু তাই নয়। দর্শন ও সাহিত্যকে তাঁর জীবনের সকল আবেগের চালিকা শক্তি ও সকল আনন্দের মহতী উৎসরূপে বর্ণনা করেছেন। তাই তো ন্যায়ধীশবৃন্দের রচনা অপেক্ষা মিসেরো, সেনেকো, শ্যাফটসবারী, বাটলারের রচনা ডেভিডের মনে অধিকতর রেখাপাতে সমর্থ হয়।

মানুষের সাধারণ জ্ঞানের সহজ প্রকাশ ঘটে এমন এক নৈতিক ত্বত্ত্বের কথা প্রচার করেছিলেন বাটলার প্রমুখ চিন্তাবিদ। এঁদের
সযত্নে লালিত অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতি ডেভিডকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। মাত্র ১০ পৃষ্ঠার আত্মজীবনীমূলক পুস্তিকা My Own Life থেকে জানা যায়, ১৭১১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ এপ্রিল এডিনবার্গে ডেভিড হিউম জন্মগ্রহণ করেন। ডেভিডের পিতা যোশেফ হোম ও মাতা ক্যাথেরিন উভয়েই ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। এই হোম পরিবার ছিল আর্ল অব হোমস অথবা হিউমের একটি শাখা। হোম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন ডেভিড। ডেভিডের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জন তার থেকে দু’বছরের ও ভগ্নী ক্যাথেরিন এক বছরের বড় ছিলেন। ডেভিডের পিতা যোশেফ হোম বারউইকশ্যায়ারের নাইন ওয়েলসের ভূস্বামী ও ব্যবহারজীবী ছিলেন। এই ভূসম্পত্তি ষোড়শ শতাব্দী থেকে তাঁর পূর্বপুরুষদের অধিকৃত ছিল ।ডেভিডের মাতা ক্যাথেরিন ছিলেন আইন কলেজের সভাপতি President of College of Justice স্যার ডেভিড ফ্যালকনারের কন্যা। তাঁর মাতুল ছিলেন ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অন্যতম। ডেভিডের দু’বছর বয়সে পিতা যোশেফের মৃত্যু হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজের আইন অনুযায়ী সমস্ত সম্পত্তি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা চার বছরের নাবালক জনের হেফাজতে যায় এবং তিনি ৫০ পাউন্ডের বার্ষিক বৃক্তিভোগী হন!

প্রায় ৩০০ বছর আগেকার সমাজেও অর্থের এই পরিমাণ সচ্ছলতার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। মাতা ক্যাথেরিন শিশু সন্তানদের স্বার্থে পুনরায় বিবাহ করলেন। জন সবালক না হওয়া পর্যন্ত তিনিই সম্পত্তির তত্ত্বাবধান করেন। ডেভিডের মাতা ছিলেন ক্যালভিন সম্প্রদায়ভুক্ত একজন ধর্মপ্রাণ মহিলা। নিজের পুত্রদের মধ্যে তিনি সেই বিশ্বাস জানিয়ে তোলার সযত্ন প্রয়াস নিয়েছিলেন। ডেভিড তাঁর মা ও অগ্রজদের সম্পর্কে যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হলেও মায়ের এই বিশ্বাস সহ খ্রীস্টধর্মের সকল মতবাদ ও ধ্যানধারণাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সম্ভবত এই প্রত্যাখ্যান প্রকাশ্য না হওয়ায় মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। হয়তো বা আপন মতকে তিনি উগ্রভাবে প্রবেশ করেননি। ভাবজগতে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চিন্তানায়কদের সাহচর্যে ডেভিড আপ্লুত ছিলেন। দার্শনিক ধ্যান ধারণায় বিভোর ১৮ বছরের তরুণ ডেভিডের মনে ১৭২৯ খ্রীস্টাব্দে চিন্তার এক অভিনব দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়। এই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটে তাঁর প্রথম ও প্রখ্যাত গ্রন্থে A Treatise of Human Nature এ যা পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু চিন্তার জগতে এই মৌলিক দিক আবিষ্কার উত্তেজনা ও তীব্রতা ডেভিডের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে উঠল। মানসিক চাপে তাঁর দেহ মন প্রকোপিত হয়। কিন্তু অনতিবিলম্বে তিনি স্নায়বিক দৌর্বল্যে ও হৃদযন্ত্রের কম্পনে আক্রান্ত হন। তাঁর রোগ নিরাময়ে স্থানীয় ডাক্তার ব্যর্থ হলেন! তবু সব কিছুকে উপেক্ষা করে গভীর উৎসাহ নিয়ে তিনি স্টোয়িক দর্শক পাঠে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন। এই অসুস্থতা তাঁকে অক্ষম করেনি কিম্বা তাঁর মনোবলকে খর্ব করেনি। কিন্তু তাঁর দার্শনিক চিন্তনের গতি সাময়িকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হল। ক্রমাগত পাঁচ বছর যন্ত্রণা ভোগের পর দর্শন চিন্তা থেকে সাময়িকভাবে নিবৃত্ত থাকার ও দর্শন ভিন্ন অন্যান্য কর্মে ব্যাপৃত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ১৭৩৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্কটল্যান্ড ত্যাগ করে রিস্টিলে একটি চিনি কলের করণিক পদে ডেভিড যোগদান করেন। সম্ভবত বিড়ম্বিত ভাগ্য তাঁকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করেছিল!